জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ছায়াযুদ্ধ থেকে সরাসরি সংঘাত: ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা কোন দিকে যাচ্ছে

প্রতীকী ছবি

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টিরও বেশি প্রদেশ নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ পর্দার অন্তরাল থেকে বেরিয়ে এসে এ সংঘাত এখন এক পূর্ণাঙ্গ ও সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার ভয়াবহতা দক্ষিণ ইরানের মিনাব কাউন্টিতে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৫ জন শিশুর মৃত্যুতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

রাজধানী তেহরানসহ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ এবং কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় এ সামরিক তৎপরতা পুরো অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এ হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলি স্থাপনাকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

রক্তভেজা ধ্বংসস্তূপ আর শোকাতুর তেহরানের এ সরাসরি সংঘাত কেবল দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতিকে এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্যমতে, এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অপূরণীয় এবং তেহরানের ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি বিশ্বকে এক সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

ছায়াযুদ্ধের রূপরেখা

দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত সরাসরি যুদ্ধের বদলে প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছিল, যেখানে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করত। প্রত্যুত্তরে ইসরায়েল সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে আক্রমণ না করে ‘মোসাদ’-এর মাধ্যমে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের গুপ্তহত্যা, সাইবার হামলা এবং সিরিয়ায় ইরানি সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে তেহরানের প্রভাববলয়কে দুর্বল করার কৌশল নেয়।

এই ছায়াযুদ্ধে উভয় পক্ষই একে অপরের রেড লাইন বা সীমারেখা বজায় রেখে চলত, যাতে কোনোভাবেই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়। তবে গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নাশকতামূলক এ কর্মকাণ্ডগুলো মূলত একে অপরের সামরিক সক্ষমতা ও ধৈর্য পরীক্ষা করার একটি দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশল ছিল। এই ধূর্ত এবং পরোক্ষ যুদ্ধের অবসান ঘটে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির সরাসরি ও ভয়াবহ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে, যা দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এ গোপন সংঘাতকে প্রকাশ্য ধ্বংসযজ্ঞে রূপান্তর করে।

কেন পরিস্থিতির পরিবর্তন হলো?

দশকব্যাপী চলে আসা ছায়াযুদ্ধের সমীকরণ মূলত পাল্টে যায় যখন কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে সিরিয়ায় ইরানি কনস্যুলেটে সরাসরি হামলা চালানো হয়, যার প্রতিক্রিয়ায় ইরান প্রথমবারের মতো নিজ ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এ সরাসরি পাল্টা আক্রমণ দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতিকে সমাহিত করে উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান ভয়ের সংস্কৃতিকে চিরতরে ভেঙে দিয়েছে। এখন আর কোনো পক্ষই প্রক্সি বা তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি একে অপরের সামরিক সক্ষমতা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ যৌথ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ এ সংঘাতকে কেবল আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং একে একটি বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে।

ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষায় ওয়াশিংটনের এ নজিরবিহীন সামরিক হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। ফলে এ সংঘাত এখন আর ছায়াযুদ্ধের চোরাগুপ্তা পথে নেই, বরং পরাশক্তিগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণে এক মহাপ্রলয়ংকরী যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। এ পরিবর্তনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকটের এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা যুক্ত হয়েছে।

উত্তেজনা কোন দিকে যাচ্ছে?

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপই এক মহাপ্রলয়ের সংকেত দিচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েলের এ সরাসরি সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে এ উত্তেজনার তিনটি সম্ভাব্য গতিপথ পরিলক্ষিত হয়:

১. সীমিত সংঘাত ও কৌশলগত ভারসাম্য

সীমিত সংঘাতের তত্ত্বে বিশ্বাসী বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান ও ইসরায়েল উভয়ই জানে যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ কারও জন্যই বিজয় বয়ে আনবে না। এ মডেলে, ইরান হয়তো তার ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রক্সি নেটওয়ার্ক (যেমন হিজবুল্লাহ ও হুথি) ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনায় সুনির্দিষ্ট পাল্টা হামলা চালাবে, যা হবে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার একটি ‘যথাযোগ্য জবাব’।

ইতিহাসে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরানি হামলার পর দুই পক্ষই কিছুটা সংযম প্রদর্শন করেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টি আক্রান্ত হওয়ায় এবং মিনাবে ১৬৫ জন শিশুর মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনায় জনরোষ তুঙ্গে থাকায়, কেবল সীমিত পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমন করা তেহরানের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশা করছে যে, বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞের বদলে সাইবার হামলা বা সীমান্ত সংঘর্ষের মাধ্যমে এ উত্তেজনা থিতু হতে পারে।

২. সর্বাত্মক যুদ্ধ ও অস্তিত্বের সংকট

যদি কোনো পক্ষ পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে ভুল হিসাব কষে বড় ধরনের কোনো জনবহুল শহর বা পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাত হানে, তবে তা একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। ইরানের ২০টি প্রদেশে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এতটাই ব্যাপক যে, তেহরান এখন তার টিকে থাকার লড়াই হিসেবে ‘পারমাণবিক প্রতিরক্ষা’ নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে সরাসরি আঘাত করে, তবে ইরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এর ফলে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাক একযোগে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—যা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোকেও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এ রণক্ষেত্রে টেনে আনবে; যা প্রকারান্তরে একটি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সূচনা করবে।

৩. কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা

বিগত কয়েক দিনে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। এ অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো জাতিসংঘে জরুরি ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তুলতে পারে। তবে সমস্যা হলো, ২৮ ফেব্রুয়ারির রক্তক্ষয়ী হামলার পর ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরমপন্থী মনোভাব তীব্র হয়েছে; তারা এখন আর কেবল আলোচনার টেবিলে সন্তুষ্ট হতে রাজি নয়।

কূটনৈতিক পথে সংকট সমাধানের সম্ভাবনা বর্তমানে খুবই ক্ষীণ, কারণ ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না করে পিছু হটতে চাইছে না। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিনাবের শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সোচ্চার হলেও, কার্যকর কোনো বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা বা মধ্যস্থতা যতক্ষণ না বড় পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রণক্ষেত্রেই এ সংকটের ফয়সালা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ইরান ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ এক রক্তক্ষয়ী সরাসরি যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে, যা আজ সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ ইরানের মিনাবে ১৬৫ জন নিষ্পাপ শিশুর প্রাণহানি এবং ২০টি প্রদেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি এক মহাপ্রলয়ংকরী যুদ্ধের পূর্বাভাস।

এই সামরিক উন্মাদনার ফলে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২৫-১৩২ মার্কিন ডলার এবং ডব্লিউটিআই ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০-১২৬ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০-২০০ ডলার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি যদি ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের কারণে পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা কার্যত থমকে যাবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও প্রধান পরাশক্তিগুলোকে কেবল নিন্দা জানিয়ে ক্ষান্ত না হয়ে দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। যদি এই মুহূর্তে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি কার্যকর না করা হয়, তবে এই আঞ্চলিক দাবানল খুব দ্রুতই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করবে, যার চড়া মূল্য দিতে হবে সমগ্র মানবসভ্যতাকে। তাই আগামীর পৃথিবীকে এক দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে সামরিক শক্তির আস্ফালন পরিহার করে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার কোনো বিকল্প নেই।

সম্পর্কিত