তেলাপোকাদের আন্দোলন: বদলে যাচ্ছে ভারতের ছাত্র রাজনীতি?

লেখা:
লেখা:
অত্রি ভট্টাচার্য

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

গত কয়েক মাসে ভারতের উচ্চশিক্ষা ও ছাত্রসমাজ এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের সাক্ষী হয়ে রইল। জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট)-কে কেন্দ্র করে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা শুধু পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে ভারতের ছাত্র রাজনীতির চরিত্রই বদলে দিচ্ছে।

দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলির গতানুগতিক কর্মকাণ্ডকে পাশ কাটিয়ে তরুণরা এবার স্বতঃস্ফূর্ত, বিকেন্দ্রীভূত ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে, যার প্রভাব আগামী দিনের রাজনৈতিক অভিমুখ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

২০২৬ সালের মে মাসে নিট-ইউজি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পরপরই অসংগতির অভিযোগ জমা পড়তে থাকে। একাধিক কেন্দ্রে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুঞ্জন এবং মূল্যায়নে স্বচ্ছতার অভাবকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় #ReformNEET2026 হ্যাশট্যাগটি ভাইরাল হয়, পরে যা রাস্তায় নামার ডাক দেয়। জুনের প্রথম সপ্তাহে দিল্লি, পাটনা, চেন্নাই, কলকাতা ও ভোপালের মতো শহরগুলিতে একযোগে হাজার হাজার মেডিকেল ও ডেন্টাল আসনের প্রত্যাশী শিক্ষার্থী বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে।

এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এর নেতৃত্বে কোনো পরিচিত রাজনৈতিক মুখ নেই। এলজিবিটি+ কর্মী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী—নানা পটভূমির তরুণ-তরুণী সামনে এসেছেন। দিল্লির প্রতিবাদ সমাবেশে ১৯ বছর বয়সি অংশগ্রহণকারী অনুষ্কা রায় বলেন, “আমরা কোনো দলের পতাকা বহন করছি না। আমাদের দাবি একটাই—শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা।”

ভারতের ছাত্র রাজনীতি ঐতিহ্যগতভাবেই বড় রাজনৈতিক দলগুলির সহযোগী সংগঠন যেমন এবিভিপি, এনএসইউআই, এসএফআই, স্টুডেন্টস ইসলামিক অর্গানাইজেশন প্রভৃতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে এসেছে। ক্যাম্পাস নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় ইস্যু—সবখানেই এই সংগঠনগুলির আধিপত্য ছিল। কিন্তু ২০২৬-এর নিট আন্দোলন যে ধারা তৈরি করেছে, তাতে দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলির প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

৫ জুলাই ২০২৬, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. স্মিতা চক্রবর্তী ইন্ডিয়া টুডে-তে একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, “শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন মূলত ‘ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি’র প্রতিচ্ছবি। এখানে কোনো স্থায়ী নেতা বা কেন্দ্রীয় কমিটি নেই; বরং টেলিগ্রাম, সিগনাল আর ইনস্টাগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অনুভূমিক সংগঠন কাঠামো ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।”

২০২৬-এর নিট আন্দোলন নিঃসন্দেহে ভারতের ছাত্র রাজনীতিকে এক ক্রান্তিকালে দাঁড় করিয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলির সহায়তা ছাড়াও তরুণ সমাজ নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।

বস্তুত, দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলির প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে পরবর্তী সময়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার চেষ্টাও তৃণমূলের কাছে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি। হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “তোমরা দলীয় স্বার্থে আন্দোলন হাইজ্যাক করতে এসো না। এই লড়াই আমাদের, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।”

এই মনোভাব ক্রমশ সর্বভারতীয় স্তরে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।

নিট আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মূল শক্তি সোশ্যাল মিডিয়ার ছোট ছোট গোষ্ঠী। ‘নিট জাস্টিস ফোরাম’ নামে একটি ইনস্টাগ্রাম পেজ দাবি করছে, তাদের ফলোয়ার সংখ্যা এখন ২.৩ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। ১৮ জুন ২০২৬, পেজটির অ্যাডমিন ওয়্যার-কে (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “আমরা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নই। আমাদের কাজ তথ্য সরবরাহ করা, আইনি সহায়তা দেওয়া এবং বিকেন্দ্রীভূত প্রতিবাদের পরিকল্পনা করা।”

শুধু তথ্য আদান-প্রদান নয়, অর্থ সংগ্রহেও ডিজিটাল মাধ্যম কাজে লেগেছে। ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ‘কেটো’-র মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৬০ লক্ষ টাকা সংগৃহীত হয়, যা পরে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়তে এবং বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদী শিবির চালাতে ব্যয় করা হয়েছে। এই স্বচ্ছ ও গণভিত্তিক আর্থিক মডেল ছাত্র রাজনীতির পুরনো পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

প্রথম দিকে প্রশাসন আন্দোলনকে 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' বলে উড়িয়ে দিলেও এর ব্যাপকতা ও স্থায়িত্ব নীতিনির্ধারকদের নড়িয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৮ জুন একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে, যেখানে প্রথমবারের মতো আন্দোলনকারী ছাত্র প্রতিনিধিদেরও সদস্য রাখা হয়। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) চেয়ারপারসন ১০ জুলাই সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হন, যা সরাসরি সম্প্রচারিত হয় ইউটিউবে। এই স্বচ্ছতার সংস্কৃতি আগামী দিনে ছাত্রদের দাবির প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ অমর্ত্য সেনের একটি উদ্ধৃতি এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক: শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; ছাত্ররা যখন ন্যায়বিচার ও যুক্তির প্রশ্নে সরব হয়, তখনই গণতন্ত্র সবচেয়ে মজবুত হয়।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, নেতৃত্বহীন আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণে ব্যর্থ হতে পারে। ১৯ জুলাই ২০২৬, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. রঞ্জিত দাস দ্য টেলিগ্রাফের কলামে লিখেছেন, “এখন পর্যন্ত আন্দোলনটি সফলভাবে গতিশীলতা ধরে রেখেছে, কিন্তু কোনো কাঠামোগত বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়া এটি শেষ পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”

পাশাপাশি, ডিজিটাল বিভাজন, গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা এবং আঞ্চলিক ভাষার চাহিদাকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার মতো বিষয়গুলিও সামনে আসছে।

২০২৬-এর নিট আন্দোলন নিঃসন্দেহে ভারতের ছাত্র রাজনীতিকে এক ক্রান্তিকালে দাঁড় করিয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলির সহায়তা ছাড়াও তরুণ সমাজ নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা রাহুল গান্ধীর মতো নেতাদের উপস্থিতি ছাড়াই কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থীর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর কেন্দ্রীয় সরকারকে নমনীয় হতে বাধ্য করেছে—এই বাস্তবতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দিকেই ইঙ্গিত করছে।

এখন দেখার বিষয়, এই গতিশীলতা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ইতোমধ্যেই ‘স্টুডেন্টস ফর ট্রান্সপারেন্সি’ নামে একটি সর্বভারতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে একটি বিকল্প, অরাজনৈতিক মতামত প্রদানকারী সংগঠন হিসেবে কাজ করা।

  • অত্রি ভট্টাচার্য: ভারতীয় গবেষক ও লেখক

(লেখাটি ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া)

Ad 300x250

সম্পর্কিত