জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সরকার পরিবর্তনেই শেষে হতে পারে যুদ্ধ

লেখা:
লেখা:
জো গিল

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১৯: ৫৮
তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বোমা হামলা

গত সপ্তাহান্তে তেহরানের তেল মজুত কেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে পুরো শহরের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। রাস্তায় রাস্তায় জ্বলতে দেখা যায় আগুন। এই হামলার বিষাক্ত ধোঁয়া তেহরানের প্রায় এক কোটি মানুষের গলা ও ফুসফুসে প্রবেশ করেছে। এর পরিণামে আগামী বছরগুলোতে ক্যানসার, নানা ধরনের অসুস্থতা ও অকালমৃত্যু মারাত্মক আকার ধারণ করবে। এটি অনেকটা নাইন-ইলেভেনের হামলার পরের অবস্থার মতো। সেসময় তাৎক্ষণিক মৃত্যুর চেয়ে ধুলোবালিজনিত ক্যানসারেই বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল।

তেহরানের এই দৃশ্য যেন কেয়ামতের মতো। এটি ৩৫ বছর আগের উপসাগরীয় যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী কুয়েতের তেলের খনিতে আগুন ধরিয়ে দিনের বেলাতেই রাতের অন্ধকার নামিয়ে এনেছিল। তবে সেই ধ্বংসযজ্ঞ কোনো জনবহুল শহরের কেন্দ্রে ঘটেনি।

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ও নির্মমতা

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের এই যুদ্ধটি পুরোপুরি একটি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ও অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এর শুরু। এরপর একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ১৬৫ জন স্কুলছাত্রীকে হত্যা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন নির্মমতা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধেও তারা একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বোমা ফেলে ৪০০ শিশু ও তাদের মা-বাবাকে হত্যা করেছিল। মার্কিন যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ উল্লাসের সাথে বলেছেন, আকাশ থেকে বি-৫২, বি-২ বোমারু বিমান ও ড্রোন দিয়ে দিনভর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল লেবানন ও বৈরুতের সাধারণ মানুষের ওপর অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ৭ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছে। এক সপ্তাহে প্রায় ৬০০ মানুষ মারা গেছে, যার মধ্যে ৮৬ জন শিশু। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এই নির্মম বোমা হামলাকে গাজার মতোই ‘সামরিক অভিযান’ নাম দিয়ে স্বাভাবিক হিসেবে প্রচার করছে।

তেলের দখল ও প্রচুর টাকা কামানোর ছক

ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ক্ষমতায় এলে তিনি সব যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন। কিন্তু গাজা ও লেবাননে হত্যাযজ্ঞ থামেনি। উল্টো তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে উস্কানিহীন যুদ্ধ শুরু করেছেন। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের কথায় এই যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়েছে। তিনি বলেছেন, “ইরান সরকারের পতন হলে আমরা প্রচুর টাকা কামাব। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের কাছে বিশ্বের ৩১ শতাংশ তেল আছে। আমরা এর অংশীদার হব, যা চীনের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন।”

ইরানে হয়তো সরকার পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু এই যুদ্ধ থামাতে হলে আসলে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের বেপরোয়া সরকারগুলোর পতন হওয়া জরুরি। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের মানুষ যুদ্ধ-উন্মাদনায় ভুগছে। তারা নেতানিয়াহুকে অন্ধভাবে সমর্থন দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন না তুললে এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই।

এর মানে হলো, ভেনেজুয়েলার নেতা মাদুরোকে অপহরণ এবং ইরানের ওপর যুদ্ধ—দুটোই মূলত বিশ্বজুড়ে তেল নিয়ন্ত্রণের কৌশল। এর মাধ্যমে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে আটকাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্পের কেলেঙ্কারি ঢাকতে বেপরোয়া পদক্ষেপ

এই যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িত। একটি শব্দে তা হলো—‘এপস্টাইন’। জেফ্রি এপস্টাইনের গোপন নথিতে ট্রাম্পের নাম রয়েছে। ট্রাম্প এমন সময়ে এই যুদ্ধ শুরু করেছেন, যখন তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের পুরোনো জবানবন্দি ফাঁস হয়েছে।

ট্রাম্প এখন মারাত্মক চাপে আছেন। তার জনপ্রিয়তা তলানিতে। নিজের দুর্বলতা ঢাকতেই তিনি বেপরোয়া হয়ে পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের মতো আগ্রাসন চালাচ্ছেন। পুতিনের মতো তার লক্ষ্যও ‘সরকার পতন’। এর ফলে বিশ্ব ব্যবস্থা চরম অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।

তৈরি হয়েছে ‘যুদ্ধের বলয়’

বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালে এখন একটি ‘যুদ্ধের বলয়’ চোখে পড়বে। এটি আফ্রিকার সুদান থেকে শুরু হয়ে ইয়েমেন, ইরান, ইসরায়েল, লেবানন পেরিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন পর্যন্ত ছড়িয়েছে। হরমোজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় এবং তেল-গ্যাসে হামলার কারণে এই যুদ্ধ এখন পুরো বিশ্বকে জড়িয়ে ফেলেছে। অনেকেই একে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু বলে মনে করছেন।

কার পতন আসলে জরুরি

এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, কেউ জানে না। তবে ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। সাদ্দাম বা গাদ্দাফির মতো ইরান একক পরিবার শাসিত নয়। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অনেক শক্ত। নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প ভেবেছিলেন খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের শাসন ভেঙে পড়বে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইসরায়েল চায় ইরানে গৃহযুদ্ধ বাধাতে। আর আমেরিকা চায় কেবল তেল।

ইরানে হয়তো সরকার পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু এই যুদ্ধ থামাতে হলে আসলে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের বেপরোয়া সরকারগুলোর পতন হওয়া জরুরি। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের মানুষ যুদ্ধ-উন্মাদনায় ভুগছে। তারা নেতানিয়াহুকে অন্ধভাবে সমর্থন দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন না তুললে এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই।

ইরানের নতুন নেতা মোজতবা খামেনির প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যক্তিগত কারণ রয়েছে। হামলায় তার বাবা, মা, স্ত্রী, ছেলে ও বোন নিহত হয়েছেন। ইরান এখন আর সংঘাত এড়াতে চাইছে না। তারা চূড়ান্ত আঘাত হানতে প্রস্তুত।

সবশেষে প্রশ্ন একটাই: কোন দেশের সরকারের পতন আগে ঘটবে, এবং এর জন্য রক্ত ও সম্পদের কত বড় মূল্য বিশ্বকে চোকাতেই হবে?

(মূল প্রবন্ধটি ইংরেজিতে লিখেছেন জো গিল। তিনি লন্ডন, ভেনেজুয়েলা এবং ওমানে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, মর্নিং স্টার এবং মিডল ইস্ট আইয়ের মতো সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। মিডলইস্ট আই থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

সম্পর্কিত