সাক্ষাৎকারে বদিউল আলম মজুমদার
ড. বদিউল আলম মজুমদার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। সদ্য গঠিত সরকারের যাত্রা, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও শপথ বিতর্ক, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। নিচে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
মুজাহিদুল ইসলাম

স্ট্রিম: জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে অনেকদিন পর একটি নির্বাচন হলো এবং বিএনপি সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র মেরামত এবং 'জুলাই জাতীয় সনদ'-এর ভিত্তিতে তারা বেশ কিছু প্রতিশ্রুতির কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তাদের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নতুন সরকারের এই প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: ‘বৃক্ষ তার ফলে পরিচয়’। বিএনপি সরকার গঠন করেছে খুব বেশিদিন হয়নি। তাই এখনই তাদের সম্পর্কে কোনো উপসংহার টানা বা চূড়ান্ত মতামত ব্যক্ত করার সময় আসেনি। তবে তারা ইতোমধ্যে কিছু কিছু কার্যক্রম করেছে, যেগুলো আমরা এর চেয়ে ভালো আশা করেছিলাম।
যেমন, তারা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সিটি কর্পোরেশনগুলোতে প্রশাসক বসানো হবে। সিটি কর্পোরেশনগুলোর মেয়াদ বহুদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা আশা করেছিলাম, এগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার জন্য তারা দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করবে। কিন্তু তারা সেখানে প্রশাসক বসিয়েছে, যা আমাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল না। আমি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিশ্বাস করি। স্থানীয় সরকারই গণতন্ত্রের ভিত রচনা করে। এটি একটি বিষয়।
আরেকটি হলো, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণ করে নতুন একজনকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন, মানুষের ধারণা অনুযায়ী তিনি অত্যন্ত সফল ছিলেন। আমাদের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের এবং ভয়ানক সমস্যার মধ্যে ছিল। ব্যাংকিং খাতে ধস নামতে পারত। মনে করা হয়—এবং একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমিও মনে করি—ব্যাংকিং খাতে যাতে ধস না নামে, সে বিষয়ে আহসান মনসুর বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি আমাদের অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় আনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং ব্যাংকিং খাতে এমন অনেকগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন, যেগুলো অব্যাহত থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার তাকে পরিবর্তন করে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হ্যাঁ, এটা হতেই পারে। কিন্তু যাকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে, তার যোগ্যতা ও পটভূমি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ব্যাংকিং বা অর্থনৈতিক খাতে তার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা নেই।
স্ট্রিম: জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে বিএনপির সংসদ সদস্যরা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তারা কেন এই শপথ নেওয়া থেকে পিছিয়ে আসছে এবং এর সমাধান কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: দুর্ভাগ্যবশত এই প্রশ্নটি উঠেছে, যা একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয়। আমাদের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তিতে যে নির্বাচন হলো, তার আগে একটি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আমাদের সাংবিধানিক ও শাসন প্রক্রিয়ার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে শেখ হাসিনা একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন। একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা দেশে বিরাজ করছিল। এগুলোর পরিবর্তনের জন্য আমাদের শাসন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের দরকার ছিল, রাষ্ট্র মেরামতের দাবি উঠেছিল। সেই রাষ্ট্র মেরামতের জন্যই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষর করা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে গণভোট হয়েছে এবং সেই গণভোটে মানুষ বেশ কিছু সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে।
নির্বাচন ও গণভোটের আগে ক্ষমতাসীন বিএনপি রাজি হয়েছিল যে, গণভোট এবং নির্বাচন একই দিনে হবে। তারা যে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছিল এবং সেই স্বাক্ষরের ভিত্তিতে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেখানে সবার কাছে এটি সুস্পষ্ট ছিল যে নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দুটি শপথ নেবেন। একটি হলো সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ, আরেকটি হলো গণভোটের রায়কে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ সদস্য হিসেবে শপথ। কিন্তু বিএনপি দলীয় সদস্যরা দ্বিতীয় শপথটি নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন। এটিও এক ধরনের হতাশার সৃষ্টি করেছে।
তারপরও আমরা তাদেরকে বিশ্বাস করতে চাই। তারা হয়তো এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা অনেকের মতেই সঠিক ছিল না, তবে তাদের যাত্রা তো সবে শুরু। আমি আশা করতে চাই এবং বিশ্বাস করতে চাই যে, তারা এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং ইতোমধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনাও করতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল করে। ভুল করে তা স্বীকার করে নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কিন্তু কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি মানুষের বিশ্বাস ও সাহসিকতারই পরিচায়ক।
স্ট্রিম: এই যে দ্বিতীয় শপথটি তারা নিলেন না, এর ফলে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে বা জনমনে ঠিক কী ধরনের সংকট বা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে? সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি কতটা বড় বাধা বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: একটি বিতর্ক হলো—যেহেতু গণভোটে ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, জনগণ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে এবং এগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জনগণ সম্মতি দিয়েছে; সেহেতু জনগণের সম্মতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তাদের শপথ নেওয়াটা এই প্রচেষ্টারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু তারা সেই শপথ নেয়নি।
আমি আশা করি তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে। তারা শপথ নেবে এবং শপথ নিয়ে জনগণের রায় অনুযায়ী সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। কারণ শুধু বিএনপি নয়, আরও অনেক রাজনৈতিক দল লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছে যে, তারা জুলাই জাতীয় সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। আমি আশা করি তারা তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করবে এবং এর মাধ্যমেই চলমান বিতর্কের অবসান হবে।
স্ট্রিম: কিন্তু এই শপথ ও সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে অনেকে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। এই সাংবিধানিক ও আইনি বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এখন সুনির্দিষ্টভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: আমাদের কিছু ব্যক্তি এখন বিষয়টি নিয়ে আদালতে গিয়েছেন। আমি মনে করি না এটি আদালতের কোনো বিষয়। জনগণ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে। যারা আদালতে গিয়েছেন, তারা এই বিতর্কের সমাধান সংবিধানে খুঁজছেন; কিন্তু এর সমাধান সংবিধানে নেই। কারণ যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, তা সংবিধানে নেই। এমনকি যা যা হয়েছে বা হচ্ছে, তার অনেক কিছুই সংবিধানে নেই। এগুলো সংবিধানের বাইরে হয়েছে জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি হিসেবে। তাই আমাদেরকে সংবিধানের বাইরে গিয়ে জনগণের সম্মতির মাঝেই সমাধান খুঁজতে হবে।
আদালত এ ব্যাপারে যে হস্তক্ষেপ করেছে, আমি মনে করি না তা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। কারণ, এই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ হলো রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট একটি দলিল। আইনের অঙ্গনে একটি মতবাদ (ডকট্রিন) আছে, যাকে বলা হয় ‘ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোশ্চেন’। দেশের ও মানুষের কল্যাণে রাজনীতিবিদরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এগুলো রাজনীতিবিদদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত; আদালতের এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা সঠিক নয়।
আমি এবং অনেক আইনজীবীই মনে করেন যে, জুলাই জাতীয় সনদ একটি রাজনৈতিক দলিল। রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন আলাপ-আলোচনা করে এসব বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছে, তাই এগুলো আদালতের হস্তক্ষেপের বিষয় নয়। আদালত এ বিষয়ে যে রুল জারি করেছে, আমার ও অনেক আইনজীবীর মতেই তা সঠিক হয়নি। যারা জনগণের প্রতিনিধি, সেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই এর সমাধান করবেন। আর এর সমাধান কিন্তু আসতে হবে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে; আমাদের সংবিধানে এর কোনো সমাধান নেই।
তাই আমি আশা করি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করবে। আমাদের এখানে যে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা বিরাজমান ছিল, তার অবসান ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের দিকে তারা অগ্রসর হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে রক্তের ঋণ সৃষ্টি হয়েছে—আমরা এখন যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি—এর মাধ্যমেই আমরা সেই রক্তের ঋণ শোধ করবো। আমরা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করবো, যাতে দেশে আর কখনোই স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে না আসে।
স্ট্রিম: গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করেছে এবং এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, ড. ইউনূস সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং এসব নিয়ে কিছু তদন্ত বা খোঁজখবর চলছে। অন্যদিকে আরেকটি মহল থেকে বলা হচ্ছে যে, এসব অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনি নিজেই একটু আগে বলছিলেন যে, এটি রক্তের ওপর দাঁড়ানো একটি অভ্যুত্থান। সেই অভ্যুত্থানের পর গঠিত একটি সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: কেউ দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। কেউ যদি অন্যায় করে থাকে, তবে সেই অন্যায়ের জন্য তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর কতটুকু সত্যতা আছে তা আমরা জানি না। তাই এগুলোর নির্মোহ তদন্ত হওয়া দরকার এবং তদন্তের মাধ্যমে এর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। তারা যদি অন্যায় করে থাকে, তবে তাদের শাস্তি পাওয়া উচিত। আর যদি অন্যায় না করে থাকে, তবে সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার যে তারা কোনো অন্যায় করেননি। তারা তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কারও দৃষ্টিতে হয়তো সফল হয়েছেন, আবার কারও দৃষ্টিতে সফল হননি—এটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু তারা কোনো অন্যায় কাজ করেননি, সেটি যদি সত্য হয়, তবে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই তা প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার।
স্ট্রিম: আমরা দীর্ঘদিন পর একটি নির্বাচন দেখলাম এবং অনেকেই বলছেন যে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভালো একটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ জামায়াতে ইসলামী এখনও পর্যন্ত 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' বা নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ তুলছে। নির্বাচনের প্রায় এক মাস পরেও যখন এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, আপনি একজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ হিসেবে এ বিষয়ে কী বলবেন?
বদিউল আলম মজুমদার: আমরা দেখেছি যে, নির্বাচনটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। যারা ভোট দিতে চেয়েছেন, তারা ভোট দিতে পেরেছেন। নির্বাচন কোনোদিনই শতভাগ সুষ্ঠু হয় না, কিছু না কিছু সমস্যা থাকেই। তবে আমরা দেখেছি যে, দিনের বেলা মানুষ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। কিন্তু যখন ফলাফল আসা শুরু করল, তখন শুধু জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেই নয়, বিএনপির পক্ষের কিছু প্রার্থীও প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, ভোট গণনার মধ্যে কোনো রকম কারচুপি বা জালিয়াতি হয়েছে, অর্থাৎ গণনায় সমস্যা আছে।
এর পাশাপাশি এই নির্বাচনে আরও কয়েকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যেমন, অনেক প্রার্থী ছিলেন যাদের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ আছে এবং যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। বস্তুত, তাদের নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্যতাই ছিল না। নির্বাচন কমিশনের শিথিলতার কারণে এ ধরনের অযোগ্য ব্যক্তিরা যদি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, তাহলে নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের সমীকরণই বদলে যায়। দেখা গেছে, এদের মধ্যে অনেকেই বিজয়ী হয়েছেন, আর যাদের বিজয়ী হওয়ার কথা ছিল তারা পরাজিত হয়েছেন। এটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আমরাও এটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি এবং গণমাধ্যমসহ অনেকের পক্ষ থেকেই এই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আমরা দাবি করেছিলাম যে, যেহেতু এসব প্রশ্ন উঠেছে, তাই নির্বাচন কমিশন যেন গেজেট প্রকাশের আগেই এগুলো তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা প্রতিটি আসন ধরে ধরে পর্যালোচনা করতে পারত—কোন আসনে সঠিকভাবে নির্বাচন হয়েছে, কোন আসনে ছোটখাটো সমস্যা হয়েছে যা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না, আর কোন আসনে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর অভিযোগগুলো তদন্ত করে তারা হয় নির্বাচন বাতিল করে দিত, না হয় নির্বাচন বৈধ ও সঠিক হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত জানাত। নির্বাচন যদি সঠিক না হয়ে থাকে, তাহলে সেটি বাতিল করে নতুন নির্বাচনের নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন যদি গেজেট প্রকাশ করে ফেলে, তখন বিষয়টি আর তাদের এখতিয়ারে থাকে না; সেটি আদালতের এখতিয়ারে চলে যায় এবং নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তখন এগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আমাদের উচ্চ আদালতের রায় আছে যে, নির্বাচনের সময় যদি গুরুতর কোনো অভিযোগ ওঠে, তবে নির্বাচন কমিশন তদন্ত সাপেক্ষে সেই নির্বাচন বাতিল করতে পারে, অথবা বৈধ ঘোষণা করার পরই কেবল গেজেট প্রকাশ করতে পারে।
তাই আমাদের দাবি ছিল, যে আসনগুলোতে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশন সেগুলো তদন্ত করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরই যেন গেজেট প্রকাশ করে। আপনারা দেখেছেন, ঋণখেলাপির অভিযোগের কারণে আদালত অন্তত দুটি আসনে নির্বাচনী ফলাফল স্থগিত করার রায় দিয়েছেন। এই কাজটি কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেই করতে পারত।
স্ট্রিম: আমাদের দেশে এই ধরনের নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি প্রক্রিয়াটি আসলে কতটা কার্যকর বা সময়সাপেক্ষ?
বদিউল আলম মজুমদার: এখন যেহেতু নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে ফেলেছে, তাই বিষয়টি আদালতেই সুরাহা হতে হবে। আমরা আশা করতে চাই যে, নির্বাচনে এমন গুরুতর কোনো অনিয়ম বা কারচুপি হয়নি, যার কারণে মানুষের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ বা অনাস্থা তৈরি হতে পারে। যেসব আসনে অভিযোগ উঠেছে, আমরা আশা করি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে সুরাহা করা হবে।
আমাদের দেশে একটি বড় সমস্যা হলো, বিষয়গুলো ট্রাইব্যুনালে গেলে তা একপ্রকার হিমঘরে চলে যায় এবং সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যেও এগুলোর আর চূড়ান্ত সুরাহা হয় না। আমরা আশা করি, বর্তমানে যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে, তারা দ্রুততার সঙ্গে এসব বিচার সম্পন্ন করবে। কেউ যদি সত্যিকারের ও যৌক্তিক কারণে সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন, তারা যেন বিচার পান। যথাসময়ে প্রতিকার না পেলে এবং অন্যায় করে পার পেয়ে গেলে, অন্যায় আরও উৎসাহিত হয়। সেই পুরোনো কথাটি তো আছেই—‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ (বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকার করা)। তাই আমরা দ্রুততার সঙ্গে এসব অভিযোগের সুরাহা চাই।
স্ট্রিম: দেখা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি দিন দিন জটিল রূপ নিচ্ছে। আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। আবার জ্বালানির জন্যও আমরা ওই অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করি। এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। সামনের দিনগুলোতে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, জনশক্তি রপ্তানি এবং দ্রব্যমূল্যের ওপর এর প্রভাব আসলে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: এর প্রভাব ইতোমধ্যে ভয়াবহ হওয়া শুরু করেছে। তবে পরিস্থিতি কতটা খারাপ হবে, তা নির্ভর করছে এই অবস্থা কতদিন বিরাজমান থাকে তার ওপর।
স্ট্রিম: এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ আছে কী?
বদিউল আলম মজুমদার: আমাদের প্রস্তুতির জায়গাটা হলো অর্থনীতি সচল রাখা। আমাদের অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়, বিশেষ করে জ্বালানি তেল। আবার অনেক পণ্য আমরা রপ্তানিও করি। যদি এই আমদানি-রপ্তানি বাধাগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। অর্থনীতি স্থবির হয়ে গেলে অনেকেই কর্মসংস্থান হারাবেন।
শুধু তাই নয়, এই যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে পর্যুদস্ত হবে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে আমাদের প্রায় দুই কোটির মতো প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন। সেই দেশগুলোর অর্থনীতি খারাপ হলে প্রবাসীদের আয় ও অর্থনৈতিক অবস্থা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে, যার ফলে বাংলাদেশে আসা রেমিট্যান্স প্রবাহও কমে যাবে।
তাই আমরা আশা করি, এই যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান ঘটবে এবং এর একটি ন্যায্য সমাধান আসবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল মিলে যে আক্রমণ চালিয়েছে, তার দ্রুত অবসান হওয়া প্রয়োজন। আমরা চাই যুদ্ধ বন্ধ হোক এবং শান্তি বিরাজ করুক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার একটি যৌক্তিক ও ন্যায্য সমাধান হওয়া উচিত; কোনো অন্যায্য সমাধান নয়। 'জোর যার, মুল্লুক তার'—এই নীতির ভিত্তিতেই কিন্তু আক্রমণগুলো হয়েছে। এর অবসান না হলে বিশ্বে শান্তি আসবে না। আর বিশ্বে শান্তি বিরাজ না করলে আমরা কেউই শান্তিতে থাকতে পারব না; আমাদের সবার জীবনেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সকলের স্বার্থেই এই যুদ্ধের অবসান হওয়া দরকার এবং 'জোর যার, মুল্লুক তার'—এই অপসংস্কৃতির অবসান হওয়া দরকার।

ড. বদিউল আলম মজুমদার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। সদ্য গঠিত সরকারের যাত্রা, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও শপথ বিতর্ক, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। নিচে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
স্ট্রিম: জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে অনেকদিন পর একটি নির্বাচন হলো এবং বিএনপি সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র মেরামত এবং 'জুলাই জাতীয় সনদ'-এর ভিত্তিতে তারা বেশ কিছু প্রতিশ্রুতির কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তাদের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নতুন সরকারের এই প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: ‘বৃক্ষ তার ফলে পরিচয়’। বিএনপি সরকার গঠন করেছে খুব বেশিদিন হয়নি। তাই এখনই তাদের সম্পর্কে কোনো উপসংহার টানা বা চূড়ান্ত মতামত ব্যক্ত করার সময় আসেনি। তবে তারা ইতোমধ্যে কিছু কিছু কার্যক্রম করেছে, যেগুলো আমরা এর চেয়ে ভালো আশা করেছিলাম।
যেমন, তারা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সিটি কর্পোরেশনগুলোতে প্রশাসক বসানো হবে। সিটি কর্পোরেশনগুলোর মেয়াদ বহুদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা আশা করেছিলাম, এগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার জন্য তারা দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করবে। কিন্তু তারা সেখানে প্রশাসক বসিয়েছে, যা আমাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল না। আমি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিশ্বাস করি। স্থানীয় সরকারই গণতন্ত্রের ভিত রচনা করে। এটি একটি বিষয়।
আরেকটি হলো, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণ করে নতুন একজনকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন, মানুষের ধারণা অনুযায়ী তিনি অত্যন্ত সফল ছিলেন। আমাদের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের এবং ভয়ানক সমস্যার মধ্যে ছিল। ব্যাংকিং খাতে ধস নামতে পারত। মনে করা হয়—এবং একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমিও মনে করি—ব্যাংকিং খাতে যাতে ধস না নামে, সে বিষয়ে আহসান মনসুর বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি আমাদের অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় আনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং ব্যাংকিং খাতে এমন অনেকগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন, যেগুলো অব্যাহত থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার তাকে পরিবর্তন করে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হ্যাঁ, এটা হতেই পারে। কিন্তু যাকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে, তার যোগ্যতা ও পটভূমি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ব্যাংকিং বা অর্থনৈতিক খাতে তার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা নেই।
স্ট্রিম: জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে বিএনপির সংসদ সদস্যরা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তারা কেন এই শপথ নেওয়া থেকে পিছিয়ে আসছে এবং এর সমাধান কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: দুর্ভাগ্যবশত এই প্রশ্নটি উঠেছে, যা একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয়। আমাদের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তিতে যে নির্বাচন হলো, তার আগে একটি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আমাদের সাংবিধানিক ও শাসন প্রক্রিয়ার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে শেখ হাসিনা একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন। একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা দেশে বিরাজ করছিল। এগুলোর পরিবর্তনের জন্য আমাদের শাসন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের দরকার ছিল, রাষ্ট্র মেরামতের দাবি উঠেছিল। সেই রাষ্ট্র মেরামতের জন্যই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষর করা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে গণভোট হয়েছে এবং সেই গণভোটে মানুষ বেশ কিছু সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে।
নির্বাচন ও গণভোটের আগে ক্ষমতাসীন বিএনপি রাজি হয়েছিল যে, গণভোট এবং নির্বাচন একই দিনে হবে। তারা যে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছিল এবং সেই স্বাক্ষরের ভিত্তিতে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেখানে সবার কাছে এটি সুস্পষ্ট ছিল যে নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দুটি শপথ নেবেন। একটি হলো সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ, আরেকটি হলো গণভোটের রায়কে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ সদস্য হিসেবে শপথ। কিন্তু বিএনপি দলীয় সদস্যরা দ্বিতীয় শপথটি নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন। এটিও এক ধরনের হতাশার সৃষ্টি করেছে।
তারপরও আমরা তাদেরকে বিশ্বাস করতে চাই। তারা হয়তো এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা অনেকের মতেই সঠিক ছিল না, তবে তাদের যাত্রা তো সবে শুরু। আমি আশা করতে চাই এবং বিশ্বাস করতে চাই যে, তারা এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং ইতোমধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনাও করতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল করে। ভুল করে তা স্বীকার করে নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কিন্তু কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি মানুষের বিশ্বাস ও সাহসিকতারই পরিচায়ক।
স্ট্রিম: এই যে দ্বিতীয় শপথটি তারা নিলেন না, এর ফলে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে বা জনমনে ঠিক কী ধরনের সংকট বা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে? সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি কতটা বড় বাধা বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: একটি বিতর্ক হলো—যেহেতু গণভোটে ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, জনগণ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে এবং এগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জনগণ সম্মতি দিয়েছে; সেহেতু জনগণের সম্মতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তাদের শপথ নেওয়াটা এই প্রচেষ্টারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু তারা সেই শপথ নেয়নি।
আমি আশা করি তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে। তারা শপথ নেবে এবং শপথ নিয়ে জনগণের রায় অনুযায়ী সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। কারণ শুধু বিএনপি নয়, আরও অনেক রাজনৈতিক দল লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছে যে, তারা জুলাই জাতীয় সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। আমি আশা করি তারা তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করবে এবং এর মাধ্যমেই চলমান বিতর্কের অবসান হবে।
স্ট্রিম: কিন্তু এই শপথ ও সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে অনেকে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। এই সাংবিধানিক ও আইনি বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এখন সুনির্দিষ্টভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: আমাদের কিছু ব্যক্তি এখন বিষয়টি নিয়ে আদালতে গিয়েছেন। আমি মনে করি না এটি আদালতের কোনো বিষয়। জনগণ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে। যারা আদালতে গিয়েছেন, তারা এই বিতর্কের সমাধান সংবিধানে খুঁজছেন; কিন্তু এর সমাধান সংবিধানে নেই। কারণ যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, তা সংবিধানে নেই। এমনকি যা যা হয়েছে বা হচ্ছে, তার অনেক কিছুই সংবিধানে নেই। এগুলো সংবিধানের বাইরে হয়েছে জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি হিসেবে। তাই আমাদেরকে সংবিধানের বাইরে গিয়ে জনগণের সম্মতির মাঝেই সমাধান খুঁজতে হবে।
আদালত এ ব্যাপারে যে হস্তক্ষেপ করেছে, আমি মনে করি না তা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। কারণ, এই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ হলো রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট একটি দলিল। আইনের অঙ্গনে একটি মতবাদ (ডকট্রিন) আছে, যাকে বলা হয় ‘ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোশ্চেন’। দেশের ও মানুষের কল্যাণে রাজনীতিবিদরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এগুলো রাজনীতিবিদদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত; আদালতের এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা সঠিক নয়।
আমি এবং অনেক আইনজীবীই মনে করেন যে, জুলাই জাতীয় সনদ একটি রাজনৈতিক দলিল। রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন আলাপ-আলোচনা করে এসব বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছে, তাই এগুলো আদালতের হস্তক্ষেপের বিষয় নয়। আদালত এ বিষয়ে যে রুল জারি করেছে, আমার ও অনেক আইনজীবীর মতেই তা সঠিক হয়নি। যারা জনগণের প্রতিনিধি, সেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই এর সমাধান করবেন। আর এর সমাধান কিন্তু আসতে হবে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে; আমাদের সংবিধানে এর কোনো সমাধান নেই।
তাই আমি আশা করি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করবে। আমাদের এখানে যে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা বিরাজমান ছিল, তার অবসান ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের দিকে তারা অগ্রসর হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে রক্তের ঋণ সৃষ্টি হয়েছে—আমরা এখন যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি—এর মাধ্যমেই আমরা সেই রক্তের ঋণ শোধ করবো। আমরা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করবো, যাতে দেশে আর কখনোই স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে না আসে।
স্ট্রিম: গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করেছে এবং এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, ড. ইউনূস সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং এসব নিয়ে কিছু তদন্ত বা খোঁজখবর চলছে। অন্যদিকে আরেকটি মহল থেকে বলা হচ্ছে যে, এসব অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনি নিজেই একটু আগে বলছিলেন যে, এটি রক্তের ওপর দাঁড়ানো একটি অভ্যুত্থান। সেই অভ্যুত্থানের পর গঠিত একটি সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: কেউ দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। কেউ যদি অন্যায় করে থাকে, তবে সেই অন্যায়ের জন্য তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর কতটুকু সত্যতা আছে তা আমরা জানি না। তাই এগুলোর নির্মোহ তদন্ত হওয়া দরকার এবং তদন্তের মাধ্যমে এর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। তারা যদি অন্যায় করে থাকে, তবে তাদের শাস্তি পাওয়া উচিত। আর যদি অন্যায় না করে থাকে, তবে সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার যে তারা কোনো অন্যায় করেননি। তারা তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কারও দৃষ্টিতে হয়তো সফল হয়েছেন, আবার কারও দৃষ্টিতে সফল হননি—এটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু তারা কোনো অন্যায় কাজ করেননি, সেটি যদি সত্য হয়, তবে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই তা প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার।
স্ট্রিম: আমরা দীর্ঘদিন পর একটি নির্বাচন দেখলাম এবং অনেকেই বলছেন যে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভালো একটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ জামায়াতে ইসলামী এখনও পর্যন্ত 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' বা নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ তুলছে। নির্বাচনের প্রায় এক মাস পরেও যখন এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, আপনি একজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ হিসেবে এ বিষয়ে কী বলবেন?
বদিউল আলম মজুমদার: আমরা দেখেছি যে, নির্বাচনটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। যারা ভোট দিতে চেয়েছেন, তারা ভোট দিতে পেরেছেন। নির্বাচন কোনোদিনই শতভাগ সুষ্ঠু হয় না, কিছু না কিছু সমস্যা থাকেই। তবে আমরা দেখেছি যে, দিনের বেলা মানুষ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। কিন্তু যখন ফলাফল আসা শুরু করল, তখন শুধু জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেই নয়, বিএনপির পক্ষের কিছু প্রার্থীও প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, ভোট গণনার মধ্যে কোনো রকম কারচুপি বা জালিয়াতি হয়েছে, অর্থাৎ গণনায় সমস্যা আছে।
এর পাশাপাশি এই নির্বাচনে আরও কয়েকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যেমন, অনেক প্রার্থী ছিলেন যাদের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ আছে এবং যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। বস্তুত, তাদের নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্যতাই ছিল না। নির্বাচন কমিশনের শিথিলতার কারণে এ ধরনের অযোগ্য ব্যক্তিরা যদি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, তাহলে নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের সমীকরণই বদলে যায়। দেখা গেছে, এদের মধ্যে অনেকেই বিজয়ী হয়েছেন, আর যাদের বিজয়ী হওয়ার কথা ছিল তারা পরাজিত হয়েছেন। এটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আমরাও এটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি এবং গণমাধ্যমসহ অনেকের পক্ষ থেকেই এই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আমরা দাবি করেছিলাম যে, যেহেতু এসব প্রশ্ন উঠেছে, তাই নির্বাচন কমিশন যেন গেজেট প্রকাশের আগেই এগুলো তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা প্রতিটি আসন ধরে ধরে পর্যালোচনা করতে পারত—কোন আসনে সঠিকভাবে নির্বাচন হয়েছে, কোন আসনে ছোটখাটো সমস্যা হয়েছে যা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না, আর কোন আসনে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর অভিযোগগুলো তদন্ত করে তারা হয় নির্বাচন বাতিল করে দিত, না হয় নির্বাচন বৈধ ও সঠিক হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত জানাত। নির্বাচন যদি সঠিক না হয়ে থাকে, তাহলে সেটি বাতিল করে নতুন নির্বাচনের নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন যদি গেজেট প্রকাশ করে ফেলে, তখন বিষয়টি আর তাদের এখতিয়ারে থাকে না; সেটি আদালতের এখতিয়ারে চলে যায় এবং নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তখন এগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আমাদের উচ্চ আদালতের রায় আছে যে, নির্বাচনের সময় যদি গুরুতর কোনো অভিযোগ ওঠে, তবে নির্বাচন কমিশন তদন্ত সাপেক্ষে সেই নির্বাচন বাতিল করতে পারে, অথবা বৈধ ঘোষণা করার পরই কেবল গেজেট প্রকাশ করতে পারে।
তাই আমাদের দাবি ছিল, যে আসনগুলোতে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশন সেগুলো তদন্ত করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরই যেন গেজেট প্রকাশ করে। আপনারা দেখেছেন, ঋণখেলাপির অভিযোগের কারণে আদালত অন্তত দুটি আসনে নির্বাচনী ফলাফল স্থগিত করার রায় দিয়েছেন। এই কাজটি কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেই করতে পারত।
স্ট্রিম: আমাদের দেশে এই ধরনের নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি প্রক্রিয়াটি আসলে কতটা কার্যকর বা সময়সাপেক্ষ?
বদিউল আলম মজুমদার: এখন যেহেতু নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে ফেলেছে, তাই বিষয়টি আদালতেই সুরাহা হতে হবে। আমরা আশা করতে চাই যে, নির্বাচনে এমন গুরুতর কোনো অনিয়ম বা কারচুপি হয়নি, যার কারণে মানুষের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ বা অনাস্থা তৈরি হতে পারে। যেসব আসনে অভিযোগ উঠেছে, আমরা আশা করি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে সুরাহা করা হবে।
আমাদের দেশে একটি বড় সমস্যা হলো, বিষয়গুলো ট্রাইব্যুনালে গেলে তা একপ্রকার হিমঘরে চলে যায় এবং সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যেও এগুলোর আর চূড়ান্ত সুরাহা হয় না। আমরা আশা করি, বর্তমানে যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে, তারা দ্রুততার সঙ্গে এসব বিচার সম্পন্ন করবে। কেউ যদি সত্যিকারের ও যৌক্তিক কারণে সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন, তারা যেন বিচার পান। যথাসময়ে প্রতিকার না পেলে এবং অন্যায় করে পার পেয়ে গেলে, অন্যায় আরও উৎসাহিত হয়। সেই পুরোনো কথাটি তো আছেই—‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ (বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকার করা)। তাই আমরা দ্রুততার সঙ্গে এসব অভিযোগের সুরাহা চাই।
স্ট্রিম: দেখা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি দিন দিন জটিল রূপ নিচ্ছে। আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। আবার জ্বালানির জন্যও আমরা ওই অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করি। এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। সামনের দিনগুলোতে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, জনশক্তি রপ্তানি এবং দ্রব্যমূল্যের ওপর এর প্রভাব আসলে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: এর প্রভাব ইতোমধ্যে ভয়াবহ হওয়া শুরু করেছে। তবে পরিস্থিতি কতটা খারাপ হবে, তা নির্ভর করছে এই অবস্থা কতদিন বিরাজমান থাকে তার ওপর।
স্ট্রিম: এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ আছে কী?
বদিউল আলম মজুমদার: আমাদের প্রস্তুতির জায়গাটা হলো অর্থনীতি সচল রাখা। আমাদের অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়, বিশেষ করে জ্বালানি তেল। আবার অনেক পণ্য আমরা রপ্তানিও করি। যদি এই আমদানি-রপ্তানি বাধাগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। অর্থনীতি স্থবির হয়ে গেলে অনেকেই কর্মসংস্থান হারাবেন।
শুধু তাই নয়, এই যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে পর্যুদস্ত হবে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে আমাদের প্রায় দুই কোটির মতো প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন। সেই দেশগুলোর অর্থনীতি খারাপ হলে প্রবাসীদের আয় ও অর্থনৈতিক অবস্থা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে, যার ফলে বাংলাদেশে আসা রেমিট্যান্স প্রবাহও কমে যাবে।
তাই আমরা আশা করি, এই যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান ঘটবে এবং এর একটি ন্যায্য সমাধান আসবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল মিলে যে আক্রমণ চালিয়েছে, তার দ্রুত অবসান হওয়া প্রয়োজন। আমরা চাই যুদ্ধ বন্ধ হোক এবং শান্তি বিরাজ করুক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার একটি যৌক্তিক ও ন্যায্য সমাধান হওয়া উচিত; কোনো অন্যায্য সমাধান নয়। 'জোর যার, মুল্লুক তার'—এই নীতির ভিত্তিতেই কিন্তু আক্রমণগুলো হয়েছে। এর অবসান না হলে বিশ্বে শান্তি আসবে না। আর বিশ্বে শান্তি বিরাজ না করলে আমরা কেউই শান্তিতে থাকতে পারব না; আমাদের সবার জীবনেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সকলের স্বার্থেই এই যুদ্ধের অবসান হওয়া দরকার এবং 'জোর যার, মুল্লুক তার'—এই অপসংস্কৃতির অবসান হওয়া দরকার।

ভারতে এসআইআরের প্রথম পরীক্ষাগার বিহার। সেখানে নারী, আদিবাসী, দলিত ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর কোপ পড়েছে। এমনকি সেখান থেকেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিদ্বেষ এসে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের ডিজিটাল মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়া মিথ্যা প্রচার করে সত্যটাকে ঢেকে রেখেছিল।
১ দিন আগে
বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি কৌশলগত জলপথ—হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব—এখন বারুদঠাসা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের ৪০ দিন পর দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষে ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি ছাড়াই হরমুজ প্রণালিতে একক নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে।
১ দিন আগে
বিশ্বায়নের এই যুগে অর্থনীতির প্রকৃত প্রাণরস প্রবাহিত হয় এক অদৃশ্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই নেটওয়ার্কটি সমুদ্রের তলদেশে বিছিয়ে রাখা ফাইবার অপটিক সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে গঠিত। এগুলোই আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদান এবং ব্যাংকিং লেনদেনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ব্যাংক, বিনিয়োগ সংস্থা, ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ এব
১ দিন আগে
পাকিস্তানের বন্দরনগরী গওয়াদারে সদ্য নিয়োগ পাওয়া একদল প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে সাম্প্রতিক এক আলোচনায় বেলুচিস্তানের কর্পস কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাহাত নাদিম আহমেদ খান জানতে চান, কোন কোন কারণ শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যে সশস্ত্র আন্দোলনের প্রতি ঝোঁক তৈরি করছে।
২ দিন আগে