ড. শ্রীরাধা দত্তের সাক্ষাৎকার

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই

ড. শ্রীরাধা দত্ত, ভারতীয় শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফর এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে তিনি ঢাকা স্ট্রিম-এর সঙ্গে কথা বলেছেন।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ১৯: ৫৭
ড. শ্রীরাধা দত্ত। ছবি: সংগৃহীত

স্ট্রিম: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গেছেন। সেখান থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে পৌঁছেছেন। এই সফরকে কীভাবে দেখছেন?

শ্রীরাধা দত্ত: ভারতে জনপরিসরে এ নিয়ে আমি খুব একটা উত্তেজনা বা ওরকম কিছু দেখিনি। আমার মনে হয়, এটি একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যে ভালো থাকবে, তা সবারই জানা। আমার ধারণা, ভারতের স্পর্শকাতরতার বিষয়টি মাথায় রেখেই তিনি হয়তো প্রথম সফর হিসেবে সরাসরি চীনকে বেছে নেননি। তবে ভারতে কেউ এটা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন নয়। কারণ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুরাতন। ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সম্পর্কে গত কয়েক যুগে দুই দেশের মধ্যে চমৎকার কাজ হয়েছে। তাই চীনের সঙ্গে এই কূটনৈতিক যাতায়াত অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে ভারতের সেনসিটিভিটির কথা বিবেচনা করেই তিনি আগে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন বলে আমার মনে হয়।

স্ট্রিম: বাণিজ্যের বাইরে মালয়েশিয়া সফরের আর কী কী তাৎপর্য দেখছেন? বিশেষ করে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে পুরোনো একটা সম্পর্কও রয়েছে...

শ্রীরাধা দত্ত: একদমই তাই। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুব বেশি নয়, প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এর বড় অংশই বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণিজ্য কীভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায়, সেদিকে জোর দিচ্ছেন। মালয়েশিয়া থেকে বিনিয়োগ নিয়ে কথা হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে আমরা দেখেছি, প্রযুক্তি ও জ্বালানিসহ বেশ কিছু খাতে তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

এর বাইরে বিএনপি বা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে মালয়েশিয়ার শীর্ষ নেতাদের একটি পারিবারিক সুসম্পর্ক রয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তাদের স্ত্রী-কন্যারা বাংলাদেশে এসে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। সেই পুরোনো সম্পর্কের প্রভাব এখনো অব্যাহত আছে। পরবর্তী প্রজন্ম এই সম্পর্কগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করে। গত কয়েক বছরে এদিকে তেমন নজর দেওয়া না হলেও, বর্তমান সরকার এখন মনোযোগ দিচ্ছে। শুনলাম দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ও সুস্পষ্ট প্রতিফলন এই সফরে ঘটছে।

স্ট্রিম: মালয়েশিয়ার পর তিনি চীনে গেছেন। সেখানে অবকাঠামোসহ নানা খাতে চুক্তি বা সমঝোতা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার এই গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ভারত কি উদ্বেগের চোখে দেখছে?

শ্রীরাধা দত্ত: দেখুন, বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে চীনের সঙ্গে কাজ হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন কতটা সহযোগিতা প্রদান করেছে, তা আমরা জানি। উদাহরণস্বরূপ, আপনাদের নয়টি সেতু নির্মাণে তারা সহায়তা করেছে। তাই তাদের সঙ্গে কাজ করাটা স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এটি মূলত অতীতের ধারাবাহিকতা মাত্র। আগের সরকারের সময়েও চীনের সঙ্গে চমৎকার কাজ হয়েছে, বর্তমান সরকারের সঙ্গেও হবে। অতীতে বিএনপি সরকারের আমলেও এমনটা হয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে যে বৈদেশিক নীতি বজায় রেখেছে, চীনের সঙ্গে এই সম্পৃক্ততা তারই একটি অংশ। এখানে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু দেখছি না।

স্ট্রিম: গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে আপনার বিশ্লেষণ কী? এই সরকার কি ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে, নাকি বহুমুখী কূটনীতির দিকে এগোচ্ছে?

শ্রীরাধা দত্ত: আমরা যারা অ্যাকাডেমিক, তারা প্রায়ই ‘ভারসাম্য’র কথা বলি। কিন্তু বিষয়টি এর চেয়েও বিস্তৃত। বঙ্গোপসাগর বা ভারত মহাসাগরে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণেই বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা এখন বাড়বে। আমার ধারণা, বাংলাদেশ সবার সাথেই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় শক্তি কিংবা ভারতের পাশাপাশি ছোট দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ ভালো। তাই আমি এটিকে শুধু ‘ভারসাম্য’ বলতে চাই না। বরং বলব, যখন যার কাছ থেকে যা প্রয়োজন, বাংলাদেশ সেভাবেই এগোচ্ছে। বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তারেক রহমান বলেছিলেন, তারা সবার সাথে কাজ করতে চান এবং সমদূরত্ব বজায় রাখবেন। তাই এটি মূলত প্রয়োজনভিত্তিক কূটনীতি।

স্ট্রিম: বাংলাদেশ যখন চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে, তখন কি ভারতের অস্বস্তির জায়গা তৈরি হয় না? নতুন সরকার কতটা আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে করেন?

শ্রীরাধা দত্ত: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবসময় বলে আসছেন, ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ভারতের সঙ্গে তারা কাজ করবেন। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সাথেও সম্পর্ক রাখবেন। তিনি এটাও জানেন, ভারতের সঙ্গে এগোলে তাদের কিছু স্বাভাবিক স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় রাখতে হয়। বর্তমানে পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। তবে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেকোনো দেশের সাথেই যোগাযোগ রাখতে পারে।

টিভি বা গণমাধ্যমের প্রচারণায় কান না দিয়ে সরকারি পর্যায়ে একটি ডায়ালগ মেকানিজম তৈরি করা প্রয়োজন। মানুষ কেন অবৈধভাবে বা বিনা নথিতে আসছে, তা আমাদের বুঝতে হবে। বাংলাদেশিরা যদি শ্রমজীবী হিসেবে আসে, তবে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশের মতো তাদের একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা যায় কি না, তা ভাবা উচিত।

এখানে আস্থার মূল জায়গাটি হলো—এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বাংলাদেশ কখনো ভারতবিরোধী কিছু করবে না এবং অন্য কোনো দেশকে বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টি-ইন্ডিয়া তৎপরতা চালাতে দেবে না। আনুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলনের অনেক আগেই তিনি এই কথা জানিয়েছেন।

যেহেতু আমাদের নতুন হাইকমিশনার সদ্য ঢাকায় পৌঁছেছেন, আমি আশা করছি এবার ভারতের সঙ্গেও পুরোদমে কাজ শুরু হবে এবং আমরা খুব শিগগিরই একটি স্বাভাবিক সম্পর্কের দিকে এগোতে পারব। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির মাঝেও বাংলাদেশ সবার সাথে ভালো কাজ করবে—আমি সম্পর্কটিকে এই ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখছি।

স্ট্রিম: চীন সফর থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অর্জন কী হতে পারে বলে আপনি মনে করছেন?

শ্রীরাধা দত্ত: আমার মতে, সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। চীনের সহায়তায় বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই অনেক সেতু ও যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এখন হয়তো পদ্মার ওপর ব্যারেজ বা এ জাতীয় নতুন কোনো প্রকল্পের বিষয়ে আলোচনা হবে। তাছাড়া চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের বন্দর ও অন্যান্য খাতেও তাদের আগ্রহ রয়েছে।

রাজনৈতিক সম্পর্ক তো ভালো বটেই, পাশাপাশি চীন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা অংশীদার। তবে আমি সম্প্রতি শুনেছি, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা খাতে শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে তুরস্কসহ অন্যান্য দেশের সাথেও অংশীদারত্ব বাড়ানোর আলোচনা করছে। এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও হেলদি পদক্ষেপ। নিজেদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে সবার সাথে লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখলে কোনো দেশই এটিকে ভিন্ন নজরে দেখবে না।

স্ট্রিম: কিন্তু চীনের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতাকে যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখে বলে অনেকে মনে করেন। এই সফর কি বাংলাদেশের জন্য কোনো ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?

শ্রীরাধা দত্ত: আমার তা মনে হয় না। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, এই সম্পর্কটি নিয়ে ভারত এখন অত্যন্ত বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা করে। তারা জানে, চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। আমরা এই বিষয়টির প্রশংসা করি যে, দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো বাংলাদেশ কখনোই চীনের ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়েনি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সবসময়ই সতর্ক।

স্পর্শকাতরতার জায়গাটাও বুঝতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত রয়েছে, যা ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ এটি খুব ভালোভাবে বোঝে। আমি আশা করি, বন্দর বা অন্য কোনো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এমন কিছু হবে না, যা অকারণে ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে আমার বিশ্বাস—অন্য কোনো সম্পর্কের ক্ষতি না করেই তিনি সবার সাথে কাজ এগিয়ে নিতে পারবেন।

স্ট্রিম: গত ৫ আগস্টের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে নতুন সরকার ও নতুন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে সেই সম্পর্কের অবস্থা এখন কেমন?

শ্রীরাধা দত্ত: ৫ আগস্টের পর একটা অদ্ভুত ও কঠিন সময় পার হয়েছে। সেসময় ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে মিছিল বা নানা ধরনের ভারতবিরোধী কার্যকলাপ দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর কিছুটা উন্নতি হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে নতুন নির্বাচিত সরকার আসার প্রথম দিন থেকেই ভারত ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানে আমাদের প্রতিনিধিরা ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনিও আসবেন বলে জানিয়েছেন।

যদিও শীর্ষ পর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি, তবে আমাদের নতুন হাইকমিশনার দায়িত্ব নিয়েছেন। আমি আশা করি, দ্রুতই ভিসা সমস্যার সমাধান হবে। চিকিৎসা ভিসা কিছু দেওয়া হলেও তা আগের তুলনায় অনেক কম। গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে চমৎকার কানেক্টিভিটি তৈরি হয়েছিল। বাস, ট্রেন চলাচল থেকে শুরু করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। আমার বিশ্বাস, এই সম্পর্ক আবার তার পুরোনো ছন্দে ফিরবে এবং সামনের দিকে এগোবে।

স্ট্রিম: দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত হত্যা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো বিষয়গুলো সবসময়ই অস্বস্তিকর। সাম্প্রতিক সীমান্ত সংকটকে কীভাবে দেখছেন?

শ্রীরাধা দত্ত: ভারতের ফেডারেল ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় সবকিছু দিল্লির পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে সীমান্তে যে সংকট চলছে, বিশেষ করে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ আটকে পড়া মানুষদের অবস্থা—এটি একটি চরম মানবিক সংকট। কোনো দেশই তাদের নিতে চাইছে না। টিভিতে দেখেছি, মানুষগুলোকে কী করুণ অবস্থায় রাখা হয়েছে! মানুষকে এভাবে ট্রিট করা যায় না।

মূলত এই অনিবন্ধিত যাতায়াত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। ভারতে কেউ বলে তিন মিলিয়ন, কেউ বলে দশ মিলিয়ন মানুষ এসেছে, যা বাংলাদেশ সবসময় অস্বীকার করে। কাজের খোঁজে যারা আসে, তারা আইনি প্রক্রিয়ায় না এসে স্থানীয়ভাবে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই শ্রমবাজারের যাতায়াতকে যদি একটি বৈধ আইনি কাঠামোর আওতায় আনা যেত, তবে এই সংকট তৈরি হতো না। আমি আশা করি, দুই দেশ তাদের বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমেই আলোচনা করে এই মানবিক ও সীমান্ত সংকটগুলোর দ্রুত সমাধান করবে।

স্ট্রিম: পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্তে ‘পুশ ইন-পুশ ব্যাক’-এর ঘটনা বাড়ছে। এটি কি দুই দেশের বাণিজ্য বা অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

শ্রীরাধা দত্ত: স্বাভাবিকভাবেই এর কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দিল্লি থেকে বা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই বিষয়গুলো কারোরই ভালো লাগার কথা নয়। তবে আমাদের বুঝতে হবে, এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী এজেন্ডা ছিল। কৃত্রিমভাবে যে জনমিতির পরিবর্তন হয়েছে, তারা সেটি সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ক্ষমতায় এসে তারা সাধারণ ভোটারদের দেখাতে চাইছে, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে।

তবে আমি আশা করি, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ধরনের পদক্ষেপ সমর্থন করে না এবং সম্প্রতি এসব ঘটনা কিছুটা কমেছেও। এই মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যে মাথা ঠান্ডা রেখে আলোচনা হওয়া খুব জরুরি। কিছুদিন আগে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কথা হয়েছে শুনেছি, তবে তা এখনো কোনো সমাধানের দিকে যায়নি। এখানে টিভি বা গণমাধ্যমের প্রচারণায় কান না দিয়ে সরকারি পর্যায়ে একটি ডায়ালগ মেকানিজম তৈরি করা প্রয়োজন। মানুষ কেন অবৈধভাবে বা বিনা নথিতে আসছে, তা আমাদের বুঝতে হবে। বাংলাদেশিরা যদি শ্রমজীবী হিসেবে আসে, তবে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশের মতো তাদের একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা যায় কি না, তা ভাবা উচিত।

স্ট্রিম: ২০২৬ সালে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। অন্যদিকে তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। পানি বণ্টনের এই জট কি এবার খুলবে?

শ্রীরাধা দত্ত: যতটুকু জানি, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে দুই দেশের টেকনিক্যাল টিম ও যৌথ নদী কমিশন কাজ করছে। একটি কৃষিভিত্তিক দেশ এবং ভাটির দেশ হিসেবে পানির প্রবাহ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর দিল্লি সেটা খুব ভালো করেই বোঝে। গঙ্গার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নবায়নে হয়তো কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি অবশ্যই হয়ে যাবে। তাই চুক্তি না থাকার কারণে কোনো অচলাবস্থা তৈরি হবে না।

বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত রয়েছে, যা ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ এটি খুব ভালোভাবে বোঝে। আমি আশা করি, বন্দর বা অন্য কোনো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এমন কিছু হবে না, যা অকারণে ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলবে।

তিস্তার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার সবসময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ওপর দায় চাপিয়ে এসেছে। কিন্তু তিনি যে রাজি হননি, তার একটা যৌক্তিক কারণ ছিল। তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে গ্যারান্টি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পানি থাকে না। গত ২৫-৩০ বছরে তিস্তার পানি যে অনেক কমে গেছে, তা আমি পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে হিসেবে নিজেই দেখেছি। তাই পুরোনো ডেটা দিয়ে এখন চুক্তি হবে না, নতুন করে ডেটা সংগ্রহ করতে হবে। এখন যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, তাই আগের মতো মমতা ব্যানার্জিকে দোষারোপ করার অজুহাত আর হাতে নেই। তাই আশা করছি, তারা অন্তর্বর্তীকালীন কোনো চুক্তির দিকে এগোবে।

স্ট্রিম: পানি বণ্টন নিয়ে এই দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন সমাধানে বিকল্প কোনো উপায় কি আছে? বা কৃষি কাঠামোগত কোনো পরিবর্তনের কথা কি ভাবা যায়?

শ্রীরাধা দত্ত: আমরা সবসময় শুধু পানির প্রবাহ বা কিউসেক নিয়ে বিতর্ক করি। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ—দুটি দেশই কৃষিভিত্তিক। আমি মনে করি, দুই দেশেরই এখন পানির পরিমাণের চেয়ে পানির ব্যবহারের দিকে নজর দেওয়া উচিত।

আধুনিক কৃষিতে হাইব্রিড বীজ এবং চাষের নতুন প্রযুক্তির কারণে এখন আগের চেয়ে অনেক কম পানিতে বেশি ফসল ফলানো সম্ভব। তিস্তা বাংলাদেশের রংপুর বিভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়, যেখানে শিল্পকারখানা নেই বললেই চলে, পুরোটাই কৃষিনির্ভর এলাকা। সেখানে কৃষকদের ঠিক কী ধরনের সেচ বা ফসল প্রয়োজন, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা হওয়া দরকার। বাংলাদেশের কৃষকরা যেমন কম মাটিতে বা জলাভূমিতে চমৎকার চাষাবাদ করতে শিখেছেন, ভারতেও তেমনি অনেক আধুনিক কৃষি পদ্ধতি রয়েছে।

শুধু পানির প্রবাহ নিয়ে বিতর্ক না করে দুই দেশের কৃষি বিশেষজ্ঞদের উচিত যৌথভাবে কাজ করা। আমাদের বুঝতে হবে, এই পানি দিয়ে ঠিক কী করা হবে এবং কীভাবে আধুনিক কৃষির মাধ্যমে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। আমি আশা করি, নতুন প্রজন্মের গবেষকরা বিষয়টিকে এই নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন।

স্ট্রিম: দক্ষিণ এশিয়া বা এশিয়া অঞ্চলে চীন-ভারত দ্বৈরথের মাঝে বাংলাদেশের কার্যকর কূটনীতি কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

শ্রীরাধা দত্ত: চীনের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সীমান্ত সমস্যা রয়েছে এবং প্রায়শই সেখানে উত্তেজনা দেখা দেয়। কিন্তু এটি যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে চীন এখনো ভারতের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। ব্রিকসের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে ভারত ও চীন একসঙ্গে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি কখনোই কেবল ‘সাদাকালো’ বা ‘এটি নয়তো ওটি’ নিয়মে চলে না। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সীমান্ত উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে অন্যান্য বাণিজ্যিক ও দ্বিপাক্ষিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এভাবেই দেখা উচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও স্পষ্টভাবে বলেছেন, তাঁরা ভারতের সঙ্গে কাজ করতে চান। চীন বা পাকিস্তান ইস্যুতে কোন বিষয়গুলো ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে, সে সম্পর্কে বাংলাদেশ বেশ সচেতন। বাংলাদেশ যদি ভারতের এই স্পর্শকাতরতার জায়গাগুলো বিবেচনায় রাখে, তবে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

বর্তমানে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীনের যে সক্ষমতা রয়েছে, তা বিশ্বের খুব কম দেশেরই আছে। চীন যদি বাংলাদেশকে সেই সহযোগিতা দেয়, তবে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই তা গ্রহণ করবে। তাছাড়া বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রেকর্ড বেশ ভালো। তারা এখন পর্যন্ত কোনো ঋণের ফাঁদে পড়েনি। ভবিষ্যতেও পড়বে না বলে আমি বিশ্বাস করি। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন। তাই যে দেশ এই সহায়তা দেবে, বাংলাদেশ তাদের দিকেই ঝুঁকবে—এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমি মনে করি, ভারত এই বাস্তবতাটি খুব ভালোভাবেই বোঝে।

স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শ্রীরাধা দত্ত: ধন্যবাদ আপনাকেও।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত