ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার
ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নীতি নির্ধারণ এবং গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। দেশের ব্যাংক খাতের চলমান গভীর সংকট, খেলাপি ঋণের ভয়াবহতা, ব্যাংক একীভূতকরণ, পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের সংস্কার ও উত্তরণের উপায় নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম: আমাদের ‘ব্যাংক খাত সংকটগ্রস্ত’—এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কতটা একমত?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এখানে ‘সংকট’ শব্দটি বললে আসলে কম বলা হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের ব্যাংকিং খাতের অবস্থান তলানিতে। আমাদের মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি এবং খেলাপি ঋণের হার—সব মিলিয়ে কেবল ‘সংকট’ বললে কম বলা হয়।
এই খাতের দিকে আমাদের নজর বেশি হওয়ার কারণ হলো, আমাদের আর্থিক ব্যবস্থা মূলত ব্যাংকনির্ভর। প্রথাগতভাবে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শেয়ারবাজার বা বিমা খাতেরও ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে এগুলোর ভূমিকা নামমাত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরোনো একটি হিসাবে দেখেছি, আমাদের মোট আর্থিক ব্যবস্থার ৯০ শতাংশের বেশিই ব্যাংকনির্ভর। বাকি ১০ শতাংশের কম জুড়ে রয়েছে শেয়ারবাজার, বিমা ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। সুতরাং, এমন একটি ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোকে ভালো অবস্থানে না নিতে পারলে নিশ্চিতভাবেই দেশের পুরো আর্থিক কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়বে।
স্ট্রিম: আপনার মতে, দেশের কত শতাংশ ব্যাংক বর্তমানে সংকটে রয়েছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আমার দৃষ্টিতে শীর্ষস্থানীয় ৩-৪টি ব্যাংক বাদে বাকি সবই সংকটের মধ্যে রয়েছে।
স্ট্রিম: এই ৩-৪টি ব্যাংক কি বেসরকারি খাতের? সরকারি খাতের সব ব্যাংকই কি সংকটে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: অবশ্যই। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর করুণ দশার মূল কারণ বিভিন্ন মহলের বহুমুখী হস্তক্ষেপ। সিবিএ, ঋণখেলাপি, সরকার এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই তাদের এই দশা। তবে অবাক করার বিষয় হলো, অন্যান্য সরকারি ব্যাংকের তুলনায় সোনালী ব্যাংক এখন কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে। সাবেক চেয়ারম্যান জিয়ারুল হাসান সিদ্দিকীর সময় থেকেই আমরা সোনালী ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি হতে দেখেছি। তবে যেকোনো মানদণ্ডে বিচার করলে সামগ্রিকভাবে সোনালী ব্যাংকও এখনো খারাপ অবস্থানেই আছে।
স্ট্রিম: বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বড় বা সফল ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের নাম বলা হয়। এই ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা কী? এ নিয়ে তো অনেক আলোচনা চলছে…
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: ইসলামী ব্যাংককে আপনি কীভাবে বিচার করবেন? প্রথমত, তাদের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ার কথা। কিন্তু আমি মনে করি, সেখানে শরিয়াহর কোনো প্রয়োগই নেই। আমি তাদের কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করি, আপনাদের মোট পোর্টফোলিওতে ‘মুদারাবা’ বা ‘মুশারাকা’র হার কত? এটি ১ শতাংশও নয়। তাহলে এটি ইসলামী হলো কীভাবে?
ইসলামী নাম ব্যবহার করে প্রথাগত ব্যাংকের মতো আচরণ করলে তাকে আমি ইসলামী ব্যাংক বলব না। দেশের মানুষ ইসলামী নাম পছন্দ করে বলেই তারা এটি ব্যবহার করছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের কার্যক্রম সাধারণ ব্যাংকের মতোই। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ‘মার্কআপ’ এবং প্রথাগত ব্যাংকের ‘সুদ’—উভয়ই পূর্বনির্ধারিত। শরিয়াহ অনুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত যেকোনো লাভই অনৈসলামিক।
স্ট্রিম: বাজারে সুকুক বন্ড ছাড়া হয়েছে। এটি আগেও ছিল, সম্প্রতি নতুন করে আবার ছাড়া হলো। এক্ষেত্রে সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা কেমন দেখেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: বন্ড মূলত একটি ঋণের দলিল। যে প্রকল্পের বিপরীতে এটি ছাড়া হবে, সেই প্রকল্পকে অবশ্যই আয়বর্ধক হতে হবে। তা না হলে টাকা শোধ হবে কীভাবে? এছাড়া, বন্ডটি ইসলামী শরিয়াহ মেনে চলছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। বাংলাদেশে যারা ইসলামী ব্যাংকিং করেন, তাদের বুঝতে হবে এখানে কেউ সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক কোনো পথ তৈরি করে দেবে না। দ্বৈত অর্থব্যবস্থার মধ্যেই তাদের শরিয়াহর পথটি খুঁজে নিতে হবে।
স্ট্রিম: সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে ৫টি ব্যাংক একীভূত (মার্জার) করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো চলমান। বর্তমান সরকারও এটি বিবেচনা করছে। এটি কতটা কার্যকর হবে বলে মনে করেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এটি কাজ করবে বলে মনে হয় না। আমরা শুরুতেই সাবেক গভর্নরকে বলেছিলাম যে এই সিদ্ধান্ত সঠিক হচ্ছে না। কারণ, একীভূতকরণ সাধারণত ভালো ও খারাপ ব্যাংকের মধ্যে হয়; ভালো ব্যাংক খারাপটিকে অধিগ্রহণ করে। তাত্ত্বিকভাবে বলা হয় মার্জার মানে ‘২+২=৫’, অর্থাৎ একীভূত হলে ফলাফল আরও ভালো হবে। কিন্তু এখানে কয়েকটি খারাপ ব্যাংককে একসঙ্গে করা হয়েছে, ফলে ফলাফল খারাপই হবে! একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে কে কার কাছ থেকে শিখবে?
মার্জার সব সময়ই একটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। কিন্তু এখানে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন না পারছে একীভূত হতে, না পারছে বের হয়ে আসতে। সাবেক গভর্নর ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম ভালো পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি, শেষ পর্যন্ত তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।
স্ট্রিম: আগের গভর্নরের কাজের মূল্যায়ন—বিশেষ করে ড. আহসান এইচ মনসুরের পদক্ষেপগুলো যদি আপনাকে মূল্যায়ন করতে বলা হয়?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: ড. আহসান মনসুর অত্যন্ত জ্ঞানী একজন মানুষ। দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুর দিকে তিনি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, আমরা সেগুলোর বেশ প্রশংসা করেছিলাম। যেমন, খারাপ ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন করা কিংবা মুদ্রা বিনিময় হার (এক্সচেঞ্জ রেট) ব্যবস্থাপনায় তাঁর সাহসী পদক্ষেপগুলো আমাদের আশান্বিত করেছিল। তিনি সারা জীবন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করেছেন, তাই তাঁর নীতিগুলোতে আইএমএফের কাজের ধরনের একটি ছাপ দেখা যায়।
তবে, তিনি ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স’ নামে যে অধ্যাদেশটি করেছেন, সেটি পড়লে মনে হয় ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের একমাত্র উপায় বুঝি একীভূতকরণ (মার্জার)। আমি এর সঙ্গে একেবারেই একমত নই। ব্যাংক পুনর্গঠনের আরও অনেক বিকল্প পথ রয়েছে।
স্ট্রিম: সে ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী হবে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আমার প্রথম পরামর্শ হলো, সরকারি বা জনগণের করের টাকা দিয়ে কোনো বেসরকারি ব্যাংককে উদ্ধার (বেইলআউট) করা যাবে না। কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করে সেখানে ৩০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে জোগান দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এগুলো দেখলে অন্য ঋণখেলাপিরাও উৎসাহিত হবে। তারা ভাববে, যা খুশি তাই করা যায়, বিপদে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক তো টাকা ছাপিয়ে দিয়েই বাঁচাবে! কিন্তু টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে এবং মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। আমরা শুরু থেকেই বলেছিলাম এটি ঠিক হচ্ছে না।
স্ট্রিম: বর্তমান সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিবর্তন এনেছে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করতে গিয়ে রাস্তায় আন্দোলন পর্যন্ত হলো। ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে বলেছেন, খাতটি অস্থিতিশীল হতে পারে। আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক একটু বেশি অস্থিরতা দেখিয়েছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আমার তো মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক এখানে বেশি শিথিলতা দেখিয়েছে। আপনি যখন কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবেন, তারা আন্দোলন করবেই। কিন্তু আন্দোলনের মুখে এতটা নত হওয়া ঠিক হয়নি। ব্যাংকের চেয়ারম্যান কে হবেন, তা ব্যাংকের পর্ষদ বা বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিক করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যাঁকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করেছিল, তিনি অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কিন্তু তাঁর গায়ে ‘দোসর’ তকমা লাগিয়ে দেওয়া হলো। এর তো কোনো প্রমাণ নেই! বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের পরিবেশও এখন বেশ খারাপ। একজন ডেপুটি গভর্নর তো সরকারি দায়িত্ব পালন করেন। সরকার মিটিংয়ে ডাকলে তাঁকে তো যেতেই হবে। মিটিংয়ে যাওয়া মানেই তো আর কারও ‘দোসর’ হয়ে যাওয়া নয়।
স্ট্রিম: শুরুতে আপনি খেলাপি ঋণ নিয়ে বলছিলেন। এটি কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা কি এখনো আছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: অবশ্যই আছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিকভাবে হিসাব করলে আমাদের খেলাপি ঋণ নিশ্চিতভাবেই মোট ঋণের ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ, ১০০ টাকা ঋণ দিলে তার ৬০ টাকাই খেলাপি। আর এই খেলাপি ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশই হলো ‘মন্দ ঋণ’, যা পুনরুদ্ধারের আর কোনো সম্ভাবনাই নেই।
স্ট্রিম: এককালীন ঋণ পরিশোধ করলে সুদ মওকুফ করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এতে কি ব্যাংকের ঋণদান ক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এতে কোনো লাভই হবে না, উল্টো খেলাপিরা উৎসাহিত হবে। এই নীতিতে কেবল আসল টাকা ফেরত দিলেই সুদ মাফ করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখানে বড় একটি নৈতিক প্রশ্ন আছে—আপনি কার টাকা মাফ করছেন? গভর্নর বা ব্যাংকের এমডি চাইলেই তো টাকা মাফ করতে পারেন না। টাকাটা আমানতকারীদের। একমাত্র তাঁরাই এটি মওকুফ করতে পারেন। আপনি কি আমানতকারীদের অনুমতি নিয়েছেন?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কাজ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। অথচ অনেক ব্যাংক থেকে সাধারণ মানুষ ১০-২০ হাজার টাকাও তুলতে পারছেন না। ব্যাংকের নির্বাহীরা এখন বলছেন, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া তাঁদের ‘নৈতিক দায়িত্ব’। আমি বলি—এটি কেমন নৈতিক দায়িত্ব? আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়া তো আপনার আইনগত দায়িত্ব!
স্ট্রিম: ঋণ উদ্ধারে ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এই কোম্পানির ধারণা ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সাহেবের সময় থেকেই আলোচিত হচ্ছে। এদের কাজ হবে খেলাপিদের কাছ থেকে দুর্দশাগ্রস্ত বা মন্দ ঋণগুলো কিনে নেওয়া। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার হবে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করলেই যে ব্যাংক ব্যবসা ভালো চলবে, তা নয়। ব্যাংকিং ব্যবসা নির্ভর করে জনগণের আস্থার ওপর। ইসলামী ব্যাংকসহ পুরো ব্যাংক খাতে আস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
তবুও ভাগ্য ভালো যে বিদেশি ব্যাংকগুলো এখনো আমাদের ঋণপত্র (এলসি) গ্রহণ করছে। আস্থার সংকট চরমে পৌঁছালে তারা যেদিন এলসি নেওয়া বন্ধ করে দেবে, সেদিন দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যই বন্ধ হয়ে যাবে।
স্ট্রিম: নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা কেমন দেখছেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: তাদের অবস্থাও একই রকম। ১৯৮৯-৯১ সালের দিকে যখন এদের লাইসেন্স দেওয়া হয়, তখন কথা ছিল এরা আর্থিক বাজারে একটি বৈচিত্র্য আনবে। তাদের দেখে প্রথাগত ব্যাংকগুলো শিখবে। কিন্তু কোথায় সেই বৈচিত্র্য? তারা সাধারণ ব্যাংকের মতোই আমানত নিচ্ছে এবং ঋণ দিচ্ছে। বরং এখন তারা আমানতের জন্য ব্যাংকগুলোর ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
স্ট্রিম: ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা বা নির্বাহীরা, যাঁরা ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের কি দায়বদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: অবশ্যই তাঁদের দায়বদ্ধ করতে হবে। তা না হলে আস্থা ফিরবে না। একটি ঋণ খেলাপি হওয়ার জন্য কি শুধু গ্রাহকই দায়ী? গ্রাহক তো ব্যাংকের জ্ঞাতসারেই খেলাপি হন। ব্যাংকারদের দায়িত্ব ছিল গ্রাহককে সঠিক পরামর্শ দেওয়া, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ হলে ঋণ না দেওয়া। ব্যাংকাররা সেই পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ব পালন করেননি বলেই আজ এই দশা।
স্ট্রিম: সুদের হারের বর্তমান পরিস্থিতি খেলাপি ঋণ বা এনপিএল-এর ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আমাদের দেশে খেলাপি ঋণ মূলত দুই ধরনের—ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃত। যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, সুদের হার নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, কারণ তারা মূল টাকাটাই ফেরত দিতে চায় না। সুদের হার কেবল অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। আমরা বরাবরই বলে আসছি, ব্যাংকগুলোর একটি 'লোন ওয়ার্কআউট টিম' থাকা উচিত। এই টিম অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের ব্যর্থতার কারণগুলো বিশ্লেষণ করে ব্যাংকিং নিয়মের মধ্যে থেকে তাদের সহায়তা করবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে গিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্ট্রিম: সিটি গ্রুপের বিষয়টি তো সামনে এসেছে। তারা তো আগে কখনো খেলাপি ছিল না। তাদের ক্ষেত্রে প্রধান কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: ব্যাংকাররাই মূলত তাদের ডিফল্টার বানিয়েছে। ৪০টি ব্যাংক মিলে যদি একটি মাত্র গ্রুপের ওপর এত বড় ঋণ-ঝুঁকি নেয়, তবে সেটি কোনো সুস্থ ব্যাংকিং হতে পারে না। ওই একটি গ্রুপ ফেল করলে সবগুলো ব্যাংকই বিপদে পড়বে। জাপানে একটি নিয়ম আছে—‘ওয়ান করপোরেট, ওয়ান ব্যাংক’ । আর আমাদের দেশে ৪০টি ব্যাংক মিলে যদি একটি মাত্র করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাহিদা মেটায়, তাহলে কি বুঝতে হবে দেশে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ওই একটিই?
স্ট্রিম: বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের সরবরাহ ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে, যা গত ১২ বছরে সর্বনিম্ন। এই অবস্থায় আমরা কীভাবে বিনিয়োগ বাড়াব?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আগে যেভাবে বিনিয়োগের নামে হরিলুট হতো, সেভাবে বিনিয়োগ বাড়ার কোনো দরকার নেই। আগে বোর্ডে প্রভাব খাটিয়ে ১০০ টাকার জায়গায় ৫০০ টাকা বের করে নেওয়া হতো, যা অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ঋণ সরবরাহ কমার একটি ভালো দিক হলো, এখন ব্যাংকে কিছুটা সুশাসন ফিরতে শুরু করেছে। বোর্ডের ওপর নজরদারি বাড়ায় অপ্রয়োজনীয় ঋণের চাহিদা কমেছে। তাছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণেও বিনিয়োগকারীরা কিছুটা নিরুৎসাহিত।
স্ট্রিম: বিদেশি বিনিয়োগের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: দেশীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিদেশিরা আসবে না। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবাহ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা পায় না। বিদেশিরা প্রথমেই দেখে যে, দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবাহই তো বাড়ছে না, তাহলে আমরা কেন যাব? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের অবস্থা কঙ্গো বা উগান্ডার চেয়েও খারাপ হয়ে যাবে। মূলত এ কারণেই বিদেশি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আসছে না।
স্ট্রিম: আমরা এক বছরের মধ্যে ৬.৫% প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই, যেখানে বর্তমানে আমরা ৪-এর কাছাকাছি আছি। এক লাফে এতটা এগোনো কি সম্ভব?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একসঙ্গে এত বড় লাফ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এর আগে কোনো এক ভদ্রলোক বলেছিলেন যে দেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে দেবেন। এরপর কয়েকজন হিসাব কষে দেখালেন যে, সিঙ্গাপুর হতে হলে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার অন্তত ৩০ শতাংশ হতে হবে! আমি মনে করি, এগুলো শুধু জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য বলা মুখরোচক কথাবার্তা।
আমরা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে চাই। তবে সেখানে পৌঁছাতে হলে আপনাকে অবশ্যই আইনকানুন এবং যথাযথ পরিপালনের মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বা উল্টাপাল্টা কাজ করে ওই জায়গায় পৌঁছানোর কোনো অর্থ নেই, কারণ সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না।
স্ট্রিম: আপনি সম্প্রতি পুঁজিবাজারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সেখানকার বর্তমান অবস্থা কেমন দেখছেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: বর্তমানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে পরিবর্তন এসেছে। আগের কমিশন বেশ কিছু সংস্কারের কথা বলেছিল। সাবেক চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত সৎ মানুষ ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। শুধু সততা দিয়ে তো আর বাজার চলে না! আপনি কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করবেন না, কেবল বসে বসে এর-ওর ওপর জরিমানা করবেন আর মানুষের চাকরি খাবেন—এটা তো হতে পারে না। তাঁরা ২০-২৫ জন দক্ষ মানুষের চাকরি খেয়েছেন। নতুন করে কি তাঁরা এমন লোক তৈরি করতে পারবেন? যাই হোক, আশার কথা হলো এখন নতুন একটি কমিশন দায়িত্ব নিয়েছে। নতুন কমিশনের প্রধান নিজেই অত্যন্ত স্বনামধন্য একজন ব্যক্তি এবং তিনি বাজার সম্পর্কে খুব ভালো বোঝেন।
স্ট্রিম: নতুন কমিশনের হাত ধরে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এর জন্য সঠিক পলিসি দরকার। ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদী যে ঋণ দেয়, সেখানে একটি সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত। তাহলে বাধ্য হয়েই উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারে আসবে। এছাড়া সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, এতে সরকারি বন্ড মার্কেট বিকশিত হবে। পাশাপাশি মিউনিসিপ্যাল বন্ড চালু করা উচিত, যাতে সিটি কর্পোরেশনগুলো সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে বন্ডের মাধ্যমে নিজেদের অর্থ নিজেরাই সংগ্রহ করতে পারে।
স্ট্রিম: আপনি দীর্ঘদিন বিআইবিএম-এ ব্যাংকারদের পড়িয়েছেন। অন্যান্য দেশ কি কখনো এমন সংকটে পড়েছিল? পড়ে থাকলে তারা কীভাবে সেখান থেকে উদ্ধার পেয়েছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: গ্রিস ও শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালেই দেখবেন, তারা চরম সংকট থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরাও পারবো, তবে সেজন্য দুটি জিনিস অপরিহার্য—সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই দুটি ঠিক থাকলে আইনকানুন ও কমপ্লায়েন্স এমনিতেই চলে আসবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে খেলাপি ঋণের মতো সমস্যা মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই সমাধান করা সম্ভব। আমাদের মূলত এই সদিচ্ছারই বড় অভাব।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নীতি নির্ধারণ এবং গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। দেশের ব্যাংক খাতের চলমান গভীর সংকট, খেলাপি ঋণের ভয়াবহতা, ব্যাংক একীভূতকরণ, পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের সংস্কার ও উত্তরণের উপায় নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
.png)
স্ট্রিম: আমাদের ‘ব্যাংক খাত সংকটগ্রস্ত’—এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কতটা একমত?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এখানে ‘সংকট’ শব্দটি বললে আসলে কম বলা হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের ব্যাংকিং খাতের অবস্থান তলানিতে। আমাদের মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি এবং খেলাপি ঋণের হার—সব মিলিয়ে কেবল ‘সংকট’ বললে কম বলা হয়।
এই খাতের দিকে আমাদের নজর বেশি হওয়ার কারণ হলো, আমাদের আর্থিক ব্যবস্থা মূলত ব্যাংকনির্ভর। প্রথাগতভাবে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শেয়ারবাজার বা বিমা খাতেরও ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে এগুলোর ভূমিকা নামমাত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরোনো একটি হিসাবে দেখেছি, আমাদের মোট আর্থিক ব্যবস্থার ৯০ শতাংশের বেশিই ব্যাংকনির্ভর। বাকি ১০ শতাংশের কম জুড়ে রয়েছে শেয়ারবাজার, বিমা ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। সুতরাং, এমন একটি ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোকে ভালো অবস্থানে না নিতে পারলে নিশ্চিতভাবেই দেশের পুরো আর্থিক কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়বে।
স্ট্রিম: আপনার মতে, দেশের কত শতাংশ ব্যাংক বর্তমানে সংকটে রয়েছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আমার দৃষ্টিতে শীর্ষস্থানীয় ৩-৪টি ব্যাংক বাদে বাকি সবই সংকটের মধ্যে রয়েছে।
স্ট্রিম: এই ৩-৪টি ব্যাংক কি বেসরকারি খাতের? সরকারি খাতের সব ব্যাংকই কি সংকটে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: অবশ্যই। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর করুণ দশার মূল কারণ বিভিন্ন মহলের বহুমুখী হস্তক্ষেপ। সিবিএ, ঋণখেলাপি, সরকার এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই তাদের এই দশা। তবে অবাক করার বিষয় হলো, অন্যান্য সরকারি ব্যাংকের তুলনায় সোনালী ব্যাংক এখন কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে। সাবেক চেয়ারম্যান জিয়ারুল হাসান সিদ্দিকীর সময় থেকেই আমরা সোনালী ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি হতে দেখেছি। তবে যেকোনো মানদণ্ডে বিচার করলে সামগ্রিকভাবে সোনালী ব্যাংকও এখনো খারাপ অবস্থানেই আছে।
স্ট্রিম: বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বড় বা সফল ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের নাম বলা হয়। এই ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা কী? এ নিয়ে তো অনেক আলোচনা চলছে…
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: ইসলামী ব্যাংককে আপনি কীভাবে বিচার করবেন? প্রথমত, তাদের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ার কথা। কিন্তু আমি মনে করি, সেখানে শরিয়াহর কোনো প্রয়োগই নেই। আমি তাদের কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করি, আপনাদের মোট পোর্টফোলিওতে ‘মুদারাবা’ বা ‘মুশারাকা’র হার কত? এটি ১ শতাংশও নয়। তাহলে এটি ইসলামী হলো কীভাবে?
ইসলামী নাম ব্যবহার করে প্রথাগত ব্যাংকের মতো আচরণ করলে তাকে আমি ইসলামী ব্যাংক বলব না। দেশের মানুষ ইসলামী নাম পছন্দ করে বলেই তারা এটি ব্যবহার করছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের কার্যক্রম সাধারণ ব্যাংকের মতোই। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ‘মার্কআপ’ এবং প্রথাগত ব্যাংকের ‘সুদ’—উভয়ই পূর্বনির্ধারিত। শরিয়াহ অনুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত যেকোনো লাভই অনৈসলামিক।
স্ট্রিম: বাজারে সুকুক বন্ড ছাড়া হয়েছে। এটি আগেও ছিল, সম্প্রতি নতুন করে আবার ছাড়া হলো। এক্ষেত্রে সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা কেমন দেখেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: বন্ড মূলত একটি ঋণের দলিল। যে প্রকল্পের বিপরীতে এটি ছাড়া হবে, সেই প্রকল্পকে অবশ্যই আয়বর্ধক হতে হবে। তা না হলে টাকা শোধ হবে কীভাবে? এছাড়া, বন্ডটি ইসলামী শরিয়াহ মেনে চলছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। বাংলাদেশে যারা ইসলামী ব্যাংকিং করেন, তাদের বুঝতে হবে এখানে কেউ সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক কোনো পথ তৈরি করে দেবে না। দ্বৈত অর্থব্যবস্থার মধ্যেই তাদের শরিয়াহর পথটি খুঁজে নিতে হবে।
স্ট্রিম: সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে ৫টি ব্যাংক একীভূত (মার্জার) করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো চলমান। বর্তমান সরকারও এটি বিবেচনা করছে। এটি কতটা কার্যকর হবে বলে মনে করেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এটি কাজ করবে বলে মনে হয় না। আমরা শুরুতেই সাবেক গভর্নরকে বলেছিলাম যে এই সিদ্ধান্ত সঠিক হচ্ছে না। কারণ, একীভূতকরণ সাধারণত ভালো ও খারাপ ব্যাংকের মধ্যে হয়; ভালো ব্যাংক খারাপটিকে অধিগ্রহণ করে। তাত্ত্বিকভাবে বলা হয় মার্জার মানে ‘২+২=৫’, অর্থাৎ একীভূত হলে ফলাফল আরও ভালো হবে। কিন্তু এখানে কয়েকটি খারাপ ব্যাংককে একসঙ্গে করা হয়েছে, ফলে ফলাফল খারাপই হবে! একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে কে কার কাছ থেকে শিখবে?
মার্জার সব সময়ই একটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। কিন্তু এখানে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন না পারছে একীভূত হতে, না পারছে বের হয়ে আসতে। সাবেক গভর্নর ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম ভালো পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি, শেষ পর্যন্ত তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।
স্ট্রিম: আগের গভর্নরের কাজের মূল্যায়ন—বিশেষ করে ড. আহসান এইচ মনসুরের পদক্ষেপগুলো যদি আপনাকে মূল্যায়ন করতে বলা হয়?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: ড. আহসান মনসুর অত্যন্ত জ্ঞানী একজন মানুষ। দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুর দিকে তিনি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, আমরা সেগুলোর বেশ প্রশংসা করেছিলাম। যেমন, খারাপ ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন করা কিংবা মুদ্রা বিনিময় হার (এক্সচেঞ্জ রেট) ব্যবস্থাপনায় তাঁর সাহসী পদক্ষেপগুলো আমাদের আশান্বিত করেছিল। তিনি সারা জীবন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করেছেন, তাই তাঁর নীতিগুলোতে আইএমএফের কাজের ধরনের একটি ছাপ দেখা যায়।
তবে, তিনি ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স’ নামে যে অধ্যাদেশটি করেছেন, সেটি পড়লে মনে হয় ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের একমাত্র উপায় বুঝি একীভূতকরণ (মার্জার)। আমি এর সঙ্গে একেবারেই একমত নই। ব্যাংক পুনর্গঠনের আরও অনেক বিকল্প পথ রয়েছে।
স্ট্রিম: সে ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী হবে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আমার প্রথম পরামর্শ হলো, সরকারি বা জনগণের করের টাকা দিয়ে কোনো বেসরকারি ব্যাংককে উদ্ধার (বেইলআউট) করা যাবে না। কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করে সেখানে ৩০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে জোগান দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এগুলো দেখলে অন্য ঋণখেলাপিরাও উৎসাহিত হবে। তারা ভাববে, যা খুশি তাই করা যায়, বিপদে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক তো টাকা ছাপিয়ে দিয়েই বাঁচাবে! কিন্তু টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে এবং মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। আমরা শুরু থেকেই বলেছিলাম এটি ঠিক হচ্ছে না।
স্ট্রিম: বর্তমান সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিবর্তন এনেছে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করতে গিয়ে রাস্তায় আন্দোলন পর্যন্ত হলো। ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে বলেছেন, খাতটি অস্থিতিশীল হতে পারে। আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক একটু বেশি অস্থিরতা দেখিয়েছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আমার তো মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক এখানে বেশি শিথিলতা দেখিয়েছে। আপনি যখন কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবেন, তারা আন্দোলন করবেই। কিন্তু আন্দোলনের মুখে এতটা নত হওয়া ঠিক হয়নি। ব্যাংকের চেয়ারম্যান কে হবেন, তা ব্যাংকের পর্ষদ বা বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিক করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যাঁকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করেছিল, তিনি অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কিন্তু তাঁর গায়ে ‘দোসর’ তকমা লাগিয়ে দেওয়া হলো। এর তো কোনো প্রমাণ নেই! বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের পরিবেশও এখন বেশ খারাপ। একজন ডেপুটি গভর্নর তো সরকারি দায়িত্ব পালন করেন। সরকার মিটিংয়ে ডাকলে তাঁকে তো যেতেই হবে। মিটিংয়ে যাওয়া মানেই তো আর কারও ‘দোসর’ হয়ে যাওয়া নয়।
স্ট্রিম: শুরুতে আপনি খেলাপি ঋণ নিয়ে বলছিলেন। এটি কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা কি এখনো আছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: অবশ্যই আছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিকভাবে হিসাব করলে আমাদের খেলাপি ঋণ নিশ্চিতভাবেই মোট ঋণের ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ, ১০০ টাকা ঋণ দিলে তার ৬০ টাকাই খেলাপি। আর এই খেলাপি ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশই হলো ‘মন্দ ঋণ’, যা পুনরুদ্ধারের আর কোনো সম্ভাবনাই নেই।
স্ট্রিম: এককালীন ঋণ পরিশোধ করলে সুদ মওকুফ করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এতে কি ব্যাংকের ঋণদান ক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এতে কোনো লাভই হবে না, উল্টো খেলাপিরা উৎসাহিত হবে। এই নীতিতে কেবল আসল টাকা ফেরত দিলেই সুদ মাফ করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখানে বড় একটি নৈতিক প্রশ্ন আছে—আপনি কার টাকা মাফ করছেন? গভর্নর বা ব্যাংকের এমডি চাইলেই তো টাকা মাফ করতে পারেন না। টাকাটা আমানতকারীদের। একমাত্র তাঁরাই এটি মওকুফ করতে পারেন। আপনি কি আমানতকারীদের অনুমতি নিয়েছেন?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কাজ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। অথচ অনেক ব্যাংক থেকে সাধারণ মানুষ ১০-২০ হাজার টাকাও তুলতে পারছেন না। ব্যাংকের নির্বাহীরা এখন বলছেন, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া তাঁদের ‘নৈতিক দায়িত্ব’। আমি বলি—এটি কেমন নৈতিক দায়িত্ব? আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়া তো আপনার আইনগত দায়িত্ব!
স্ট্রিম: ঋণ উদ্ধারে ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এই কোম্পানির ধারণা ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সাহেবের সময় থেকেই আলোচিত হচ্ছে। এদের কাজ হবে খেলাপিদের কাছ থেকে দুর্দশাগ্রস্ত বা মন্দ ঋণগুলো কিনে নেওয়া। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার হবে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করলেই যে ব্যাংক ব্যবসা ভালো চলবে, তা নয়। ব্যাংকিং ব্যবসা নির্ভর করে জনগণের আস্থার ওপর। ইসলামী ব্যাংকসহ পুরো ব্যাংক খাতে আস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
তবুও ভাগ্য ভালো যে বিদেশি ব্যাংকগুলো এখনো আমাদের ঋণপত্র (এলসি) গ্রহণ করছে। আস্থার সংকট চরমে পৌঁছালে তারা যেদিন এলসি নেওয়া বন্ধ করে দেবে, সেদিন দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যই বন্ধ হয়ে যাবে।
স্ট্রিম: নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা কেমন দেখছেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: তাদের অবস্থাও একই রকম। ১৯৮৯-৯১ সালের দিকে যখন এদের লাইসেন্স দেওয়া হয়, তখন কথা ছিল এরা আর্থিক বাজারে একটি বৈচিত্র্য আনবে। তাদের দেখে প্রথাগত ব্যাংকগুলো শিখবে। কিন্তু কোথায় সেই বৈচিত্র্য? তারা সাধারণ ব্যাংকের মতোই আমানত নিচ্ছে এবং ঋণ দিচ্ছে। বরং এখন তারা আমানতের জন্য ব্যাংকগুলোর ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
স্ট্রিম: ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা বা নির্বাহীরা, যাঁরা ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের কি দায়বদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: অবশ্যই তাঁদের দায়বদ্ধ করতে হবে। তা না হলে আস্থা ফিরবে না। একটি ঋণ খেলাপি হওয়ার জন্য কি শুধু গ্রাহকই দায়ী? গ্রাহক তো ব্যাংকের জ্ঞাতসারেই খেলাপি হন। ব্যাংকারদের দায়িত্ব ছিল গ্রাহককে সঠিক পরামর্শ দেওয়া, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ হলে ঋণ না দেওয়া। ব্যাংকাররা সেই পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ব পালন করেননি বলেই আজ এই দশা।
স্ট্রিম: সুদের হারের বর্তমান পরিস্থিতি খেলাপি ঋণ বা এনপিএল-এর ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আমাদের দেশে খেলাপি ঋণ মূলত দুই ধরনের—ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃত। যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, সুদের হার নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, কারণ তারা মূল টাকাটাই ফেরত দিতে চায় না। সুদের হার কেবল অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। আমরা বরাবরই বলে আসছি, ব্যাংকগুলোর একটি 'লোন ওয়ার্কআউট টিম' থাকা উচিত। এই টিম অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের ব্যর্থতার কারণগুলো বিশ্লেষণ করে ব্যাংকিং নিয়মের মধ্যে থেকে তাদের সহায়তা করবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে গিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্ট্রিম: সিটি গ্রুপের বিষয়টি তো সামনে এসেছে। তারা তো আগে কখনো খেলাপি ছিল না। তাদের ক্ষেত্রে প্রধান কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: ব্যাংকাররাই মূলত তাদের ডিফল্টার বানিয়েছে। ৪০টি ব্যাংক মিলে যদি একটি মাত্র গ্রুপের ওপর এত বড় ঋণ-ঝুঁকি নেয়, তবে সেটি কোনো সুস্থ ব্যাংকিং হতে পারে না। ওই একটি গ্রুপ ফেল করলে সবগুলো ব্যাংকই বিপদে পড়বে। জাপানে একটি নিয়ম আছে—‘ওয়ান করপোরেট, ওয়ান ব্যাংক’ । আর আমাদের দেশে ৪০টি ব্যাংক মিলে যদি একটি মাত্র করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাহিদা মেটায়, তাহলে কি বুঝতে হবে দেশে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ওই একটিই?
স্ট্রিম: বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের সরবরাহ ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে, যা গত ১২ বছরে সর্বনিম্ন। এই অবস্থায় আমরা কীভাবে বিনিয়োগ বাড়াব?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আগে যেভাবে বিনিয়োগের নামে হরিলুট হতো, সেভাবে বিনিয়োগ বাড়ার কোনো দরকার নেই। আগে বোর্ডে প্রভাব খাটিয়ে ১০০ টাকার জায়গায় ৫০০ টাকা বের করে নেওয়া হতো, যা অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ঋণ সরবরাহ কমার একটি ভালো দিক হলো, এখন ব্যাংকে কিছুটা সুশাসন ফিরতে শুরু করেছে। বোর্ডের ওপর নজরদারি বাড়ায় অপ্রয়োজনীয় ঋণের চাহিদা কমেছে। তাছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণেও বিনিয়োগকারীরা কিছুটা নিরুৎসাহিত।
স্ট্রিম: বিদেশি বিনিয়োগের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: দেশীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিদেশিরা আসবে না। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবাহ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা পায় না। বিদেশিরা প্রথমেই দেখে যে, দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবাহই তো বাড়ছে না, তাহলে আমরা কেন যাব? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের অবস্থা কঙ্গো বা উগান্ডার চেয়েও খারাপ হয়ে যাবে। মূলত এ কারণেই বিদেশি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আসছে না।
স্ট্রিম: আমরা এক বছরের মধ্যে ৬.৫% প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই, যেখানে বর্তমানে আমরা ৪-এর কাছাকাছি আছি। এক লাফে এতটা এগোনো কি সম্ভব?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একসঙ্গে এত বড় লাফ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এর আগে কোনো এক ভদ্রলোক বলেছিলেন যে দেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে দেবেন। এরপর কয়েকজন হিসাব কষে দেখালেন যে, সিঙ্গাপুর হতে হলে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার অন্তত ৩০ শতাংশ হতে হবে! আমি মনে করি, এগুলো শুধু জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য বলা মুখরোচক কথাবার্তা।
আমরা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে চাই। তবে সেখানে পৌঁছাতে হলে আপনাকে অবশ্যই আইনকানুন এবং যথাযথ পরিপালনের মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বা উল্টাপাল্টা কাজ করে ওই জায়গায় পৌঁছানোর কোনো অর্থ নেই, কারণ সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না।
স্ট্রিম: আপনি সম্প্রতি পুঁজিবাজারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সেখানকার বর্তমান অবস্থা কেমন দেখছেন?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: বর্তমানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে পরিবর্তন এসেছে। আগের কমিশন বেশ কিছু সংস্কারের কথা বলেছিল। সাবেক চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত সৎ মানুষ ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। শুধু সততা দিয়ে তো আর বাজার চলে না! আপনি কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করবেন না, কেবল বসে বসে এর-ওর ওপর জরিমানা করবেন আর মানুষের চাকরি খাবেন—এটা তো হতে পারে না। তাঁরা ২০-২৫ জন দক্ষ মানুষের চাকরি খেয়েছেন। নতুন করে কি তাঁরা এমন লোক তৈরি করতে পারবেন? যাই হোক, আশার কথা হলো এখন নতুন একটি কমিশন দায়িত্ব নিয়েছে। নতুন কমিশনের প্রধান নিজেই অত্যন্ত স্বনামধন্য একজন ব্যক্তি এবং তিনি বাজার সম্পর্কে খুব ভালো বোঝেন।
স্ট্রিম: নতুন কমিশনের হাত ধরে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: এর জন্য সঠিক পলিসি দরকার। ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদী যে ঋণ দেয়, সেখানে একটি সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত। তাহলে বাধ্য হয়েই উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারে আসবে। এছাড়া সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, এতে সরকারি বন্ড মার্কেট বিকশিত হবে। পাশাপাশি মিউনিসিপ্যাল বন্ড চালু করা উচিত, যাতে সিটি কর্পোরেশনগুলো সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে বন্ডের মাধ্যমে নিজেদের অর্থ নিজেরাই সংগ্রহ করতে পারে।
স্ট্রিম: আপনি দীর্ঘদিন বিআইবিএম-এ ব্যাংকারদের পড়িয়েছেন। অন্যান্য দেশ কি কখনো এমন সংকটে পড়েছিল? পড়ে থাকলে তারা কীভাবে সেখান থেকে উদ্ধার পেয়েছে?
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: গ্রিস ও শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালেই দেখবেন, তারা চরম সংকট থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরাও পারবো, তবে সেজন্য দুটি জিনিস অপরিহার্য—সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই দুটি ঠিক থাকলে আইনকানুন ও কমপ্লায়েন্স এমনিতেই চলে আসবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে খেলাপি ঋণের মতো সমস্যা মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই সমাধান করা সম্ভব। আমাদের মূলত এই সদিচ্ছারই বড় অভাব।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
তৌফিক আহমদ চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।
.png)
.png)

মাহি, পরীমনি, স্নিগ্ধা—প্রত্যেকেই একা দাঁড়িয়েছেন, আর প্রতিবারই একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে অপরাধ নয়, অভিযোগকারীর দিকেই। যতদিন এই ক্রম না পাল্টাবে, ততদিন এই বৃত্ত ভাঙবে না।
১ ঘণ্টা আগে
গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জাতীয় বাজেটের বাস্তবায়ন কঠিন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন আরও কমবে, সেটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের বছরের চাইতেও এডিপির কম বাস্তবায়ন হয়েছে পরবর্তী অর্থবছরে।
১৭ ঘণ্টা আগে
একটু হিসাব করলেই বোঝা যায় এই লক্ষ্যটা কত বড়। পাঁচ বছরে দিন থাকে মোট ১ হাজার ৮২৫টি। এই সময়ে ৫০ কোটি গাছ লাগাতে হলে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার চারা রোপণ করতে হবে। ঘণ্টার হিসাবে তা দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজার ৪০০টিতে!
২০ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আবারও আলোচনায় বসেছে বাংলাদেশ। আগের ঋণ কর্মসূচির বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেটি প্রত্যাশামতো এগোয়নি। এবার আইএমএফের মূল জোর দুটি বিষয়ে—এক. রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি; দুই. সরকারের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা।
৩০ জুলাই ২০২৬