বদিউর রহমানের সাক্ষাৎকার
বদিউর রহমান সাবেক সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান। সরকারি চাকরিতে সততা, আপসহীন মনোভাব এবং প্রশাসনিক দৃঢ়তার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়ার পর লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত আছেন। তাঁর আত্মজীবনী ডোমুরুয়া থেকে সচিবালয় ও সরকারি চাকরিতে আমার অনুভূতিসমগ্র–তে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের অন্দরমহলের অনেক অজানা তথ্য জানা যায়। দেশের বর্তমান অর্থনীতি, বাজেট ও রাজস্ব আদায়, আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং জনপ্রশাসন সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
মুজাহিদুল ইসলাম

স্ট্রিম: নতুন অর্থবছর এবং নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। বাজেটে ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বিদায়ী বছরের আদায় এবং বর্তমান অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
বদিউর রহমান: এটি একটি বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ঠিকই, তবে ১৮ কোটি মানুষের বিকাশমান অর্থনীতির একটি দেশের জন্য আমি এটিকে খুব বেশি মনে করি না। বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি থাকলেও নতুন এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।
তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ব্যক্তিগত কর ফাঁকি রোধ এবং কর আদায়ে প্রভাব বিস্তার বন্ধ করতে হবে। সরকার প্রধানকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে যে—আয়কর, শুল্ক বা ভ্যাট, সব ক্ষেত্রেই প্রণীত আইন অনুযায়ী যার কাছে যতটুকু পাওনা আছে, তা পুরোটাই আদায় করা হবে। এখানে কোনো তদবির চলবে না এবং রাজস্ব বোর্ডকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে।
বর্তমান সরকারপ্রধান বেশ কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যেমন—তাঁরা প্লট নেবেন না বা শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না। ঠিক একইভাবে, সরকারপ্রধানকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সবাইকে আইন অনুযায়ী নিজেদের কর পরিশোধ করতে হবে। শুরুতেই সরকারপ্রধানকে নিজের কর ঠিকমতো পরিশোধ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক সময় সরকারপ্রধানরাও ঠিকমতো কর দিতেন না—তা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেভাবেই হোক না কেন।
সুতরাং, তিনি নিজে কর দেবেন এবং তাঁর মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদেরও নিয়মমাফিক কর পরিশোধের নির্দেশ দেবেন। এরপর ধাপে ধাপে দলের সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এই রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সর্বস্তরে যদি এই সদিচ্ছা থাকে এবং রাজস্ব বোর্ডের কাজে কোনো ধরনের বাধা বা হস্তক্ষেপ না করা হয়, তবে বিশাল এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কোনো কঠিন বিষয় নয়।
স্ট্রিম: রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বিশাল, অথচ জুলাই-ডিসেম্বরের জন্য একটি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে কি আপনি কোনো সামঞ্জস্য দেখছেন, নাকি বৈপরীত্য রয়েছে?
বদিউর রহমান: মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেওয়া হয়েছে। সরকার মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি অর্জনের জন্য সরকার চাল, ডাল, চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর প্রচুর রাজস্ব ছাড় দিয়েছে।
কিন্তু আমাদের দেশের বড় সমস্যা হলো, সরকারের দেওয়া এই ছাড়ের সুফল সাধারণ ভোক্তা পায় না; ব্যবসায়ীরা তা নিজেদের পকেটে ঢোকান। উল্টো, বাজেটের পর কোনো কারণ ছাড়াই তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। যেমন, আমি নিজে দেখেছি, বাজেটের পর নতুন কোনো করারোপ না হলেও পাড়া-মহল্লার কনফেকশনারি আইটেমগুলোর (টোস্ট, কেক ইত্যাদি) দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বিদ্যুৎ বিল বা কর্মচারীদের বেতন বাড়ার অজুহাত দেন।
তাই সরকার যে সুবিধা দিচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা দরকার। মনিটরিং না থাকলে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের কিছুতেই সন্তুষ্ট করা যাবে না।
স্ট্রিম: একদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, অন্যদিকে সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। এ দুটির কারণে কি অর্থনীতিতে কোনো সংঘাত তৈরি হবে?
বদিউর রহমান: না, বৈপরীত্য হবে না। সংকোচনমূলক নীতি নেওয়া হয়েছে সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য। রাজস্ব আদায় বাড়লে উভয়ের মধ্যে একটি সমন্বয় চলে আসবে। অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করতে হলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে।
দেশি বা বিদেশি—যেকোনো বিনিয়োগকারী প্রথমে দেখেন বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ আছে কি না। তারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ধর্মঘট-হরতালমুক্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চান। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে নির্বিঘ্নে মুনাফা তুলে নেওয়ার নিশ্চয়তা এবং শ্রমিক অসন্তোষমুক্ত পরিবেশ তাদের কাম্য।
উৎপাদন নির্বিঘ্ন হলে বেকারত্ব কমবে। মানুষের হাতে টাকা এলে খরচ বাড়বে, যার ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বা 'ভেলোসিটি অব মানি' বৃদ্ধি পাবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতি এলে জিডিপি বাড়বে এবং তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে।
স্ট্রিম: সরকার পাঁচ বছরে পাঁচ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: সিটি গ্রুপ, বেক্সিমকো বা মোমেন গ্রুপ) বেশ খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান কি বাড়বে, নাকি আমরা নতুন সংকটের দিকে যাচ্ছি?
বদিউর রহমান: অর্থবছর মাত্র শুরু হয়েছে। সরকারকে অন্তত ছয় মাস সময় দেওয়া উচিত। কর্মসংস্থানের এই লক্ষ্যমাত্রা ধাপে ধাপে অর্জন করতে হবে। প্রথম বছরের শেষে বোঝা যাবে তারা সঠিক পথে আছে কি না। সরকার কিছু বন্ধ কলকারখানা চালু করে এবং অর্থায়ন করে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করছে।
তবে এই অর্থায়ন যদি দলীয় বিবেচনায় বা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে হয়, তবে তা কাজে আসবে না। প্রকৃত ও যোগ্য উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিলে তবেই সুফল মিলবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকার দলীয় হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কখনোই দলীয়করণ করা উচিত নয়। প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ হলে যোগ্যতার অবমূল্যায়ন হয় এবং নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের স্বভাব হলো সবসময় অতিরিক্ত মুনাফা করা। প্রত্যাশিত বড় মুনাফা না হলেই তারা 'টার্গেট লস'-এর ধুয়া তুলে কান্নাকাটি শুরু করেন। তাই সরকারের নীতি বাস্তবায়নের জন্য কঠোর মনিটরিং এবং যোগ্য স্থানে যোগ্য ব্যক্তি বসানো অপরিহার্য। অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে বড় কোনো প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়; যেমন ছোট চাকার ইঞ্জিন দিয়ে বড় ট্রাকের গতি বা দূরত্ব অতিক্রম করা যায় না।
স্ট্রিম: নতুন সরকার বলছে, গত ১৭ বছরে যে প্রশাসন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে তারা কাজ করার মতো ভালো লোক খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের মনমতো লোক দিয়ে কাজ করানো যাচ্ছে না। তাহলে প্রশাসনের কাজগুলো কীভাবে চলবে?
বদিউর রহমান: এটি আমাদের রাজনীতির একটি হীনমন্যতা ও দৈন্য। ক্ষমতায় এসেই পূর্ববর্তী সরকার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে—এমন দাবি করা একধরনের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি। প্রত্যেক সরকারেরই কিছু ভালো কাজ থাকে। বিগত সরকারের আমলে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশ কিছু বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। এগুলো তো অস্বীকার করার উপায় নেই। ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে, আর দুর্নীতির বিচার করতে হবে।
প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে কখনো ভালো কিছু হয় না। যেমন, এরশাদের আমলের উপজেলা পদ্ধতিটি চমৎকার ছিল; এর মাধ্যমে প্রশাসনিক কাজ ও বিচার ব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায়ে চলে গিয়েছিল এবং একটা গতি এসেছিল। কিন্তু এরশাদ বিএনপির কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়েছিলেন বলে, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেই উপজেলা পদ্ধতি বাতিল করে দেন। আমি তখন বিজি প্রেসের ডেপুটি কন্ট্রোলার, আমি নিজেই দেখেছি কত দ্রুত সেই রেজুলেশন ছাপানো হয়েছিল। অথচ এখন তো আবার সেই উপজেলা ব্যবস্থাতেই ফিরে আসতে হয়েছে।
নেতৃত্বকে জানতে হবে কীভাবে কাজ আদায় করে নিতে হয়। গৃহকর্ত্রীকে যেমন জানতে হয় গৃহকর্মীর কাছ থেকে কীভাবে কাজ আদায় করতে হবে, ঠিক তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও জানতে হবে আমলাদের দিয়ে কীভাবে নীতি বাস্তবায়ন করতে হয়। সরকারে যদি দলীয়, অযোগ্য বা অপদার্থ লোক বসানো হয়, তবে তারা কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবে না।
স্ট্রিম: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারেও দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনে অনেককে দুই-তিন ধাপ ডিঙিয়ে পদোন্নতি দিয়ে সচিব বা অতিরিক্ত সচিব করা হচ্ছে। অথচ তারা মাঝখানের স্তরগুলোতে কাজ করে আসেননি, ফলে পারফর্মও করতে পারছেন না। এই প্রক্রিয়াটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বদিউর রহমান: আমি কখনোই এই প্রক্রিয়াটি সমর্থন করি না। প্রশাসনে এই গণপদোন্নতি ও দলীয়করণের শুরু হয়েছিল বেগম জিয়ার প্রথম আমল থেকে, '৯২-এর ফেব্রুয়ারিতে যখন প্রথম গণ পদোন্নতি দেওয়া হলো। পদের চেয়ে বেশি পদোন্নতি দেওয়া এবং দলীয় বিবেচনায় পদায়ন করার মাধ্যমেই প্রশাসনের মান কমতে শুরু করে।
বঙ্গবন্ধুর আমলে তো অন্য কোনো দল ছিলই না, তাই দলীয়করণের প্রশ্ন ওঠেনি। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে প্রশাসনে কোনো দলীয়করণ ছিল না। তার ক্ষমতায় আসা বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু একজন প্রশাসক হিসেবে তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ এবং অতুলনীয়। একটি উদাহরণ দিই—মোহাম্মদ আলী নামের এক কর্মকর্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু-ভক্ত ও আওয়ামী ঘরানার। ইআরডির জয়েন্ট সেক্রেটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে তার নাম প্রস্তাব করা হলে কিছু চাটুকার প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বলেছিলেন, "উনি তো বঙ্গবন্ধু-ভক্ত, তাকে কি এই পদে দেওয়া ঠিক হবে?" তখন জিয়াউর রহমান জানতে চেয়েছিলেন, লোকটির দক্ষতা ও সততা কেমন। যখন বলা হলো তিনি শতভাগ দক্ষ এবং তার সততা প্রশ্নাতীত, তখন জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, "তাহলে তিনি বঙ্গবন্ধু-ভক্ত হলে আমার অসুবিধা কী? আমার তো এমন সৎ ও দক্ষ লোকই দরকার।"
কিন্তু এরপর বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই প্রশাসনকে চরমভাবে দলীয়করণ করেছে। এক সরকার যাকে বাদ দিয়েছে বা বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছে, পরের সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে সব বকেয়াসহ এক লাফে সচিব বানিয়ে দিয়েছে। 'জনতার মঞ্চ' বা 'উত্তরা ষড়যন্ত্র'—এসবের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রকে বিভক্ত করা হয়েছে। এভাবে দল পুষতে গিয়ে অদক্ষ লোকদের প্রশাসনে বসানো হয়েছে। বর্তমান সরকারেও এমন কিছু লোক রয়েছেন, যাদের সুনাম বা অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়।
আমলাতন্ত্র দুর্বল হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ার মান কমিয়ে দেওয়া। জিয়াউর রহমানের সময়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও মেধাভিত্তিক। তখন ১৬০০ নম্বরের লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা হতো, যার মধ্যে ১০০ নম্বরের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষাও ছিল। এছাড়া তিন ঘণ্টার দুটি দীর্ঘ রচনা (বাংলা ও ইংরেজি) লিখতে হতো। ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের নম্বর মিলিয়ে মোট ২২০০ নম্বরের ওপর মেধা যাচাই হতো। পরবর্তীতে এই সিলেবাস কাটছাঁট করে ১০০০ নম্বরে নামিয়ে আনা হয় এবং পাস নম্বর ৫০% থেকে কমিয়ে ৪৫% করা হয়। এতেই মেধাবীদের ছেঁকে আনার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
প্রশাসনকে ঠিক করতে হলে তিনটি কাজ করতে হবে:
প্রথমত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সেই পুরোনো কঠোর সিলেবাস ফিরিয়ে এনে নিখাদ মেধার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনে দলীয়করণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। কার কী রাজনৈতিক পরিচয় তা না দেখে, পারফরম্যান্স বা যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
তৃতীয়ত, 'হায়ার অ্যান্ড ফায়ার' নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কেউ দায়িত্বে অবহেলা বা গলদ করলে সাথে সাথে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
আগে সিভিল সার্ভিসের একটা শক্ত অবস্থান ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে ক্যাবিনেট মিটিংয়ে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হলেই আমরা (আমলারা) উঠে চলে আসতাম। আর এখন আমলাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে সুযোগ দেওয়া হয়, যার ফলে পুলিশের ওসি পর্যন্ত দলীয় স্লোগান দেয়! এটা বন্ধ হতে হবে। রাজনীতি করবেন রাজনীতিকরা, আর আমলাতন্ত্রের একমাত্র দায়িত্ব হবে সরকারের নীতি সুচারুরূপে বাস্তবায়ন করা।
স্ট্রিম: দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনে অনেক আমলা ও সচিব দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন...
বদিউর রহমান: ‘পলিটিক্যাল মাস্টার’ (রাজনৈতিক শাসক) এবং ‘ব্যুরোক্রেট সার্ভেন্ট’ (আমলা)—এই দুজনের কাজের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত নেবেন রাজনীতিকরা, আর তা বাস্তবায়ন করবেন আমলারা। বাস্তবায়নের সময় কোনো অসংগতি দেখলে আমলারা তা রাজনীতিকদের জানাবেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়ভার রাজনীতিকদেরই।
মন্ত্রীরা নিজেদের সুবিধার জন্য আমলাদের দলীয়করণ করবেন কেন? একটি প্রাসঙ্গিক গল্প বলি—এক রাজা তার পোষা বানরকে আদর করে কোলে বসিয়ে খাওয়াতেন, কিন্তু খাওয়া শেষে বেত দিয়ে দুটি বাড়ি দিতেন, যাতে বানর তার নিজের জায়গা মনে রাখে। একদিন উজিরের কথায় রাজা বেত মারা বন্ধ করে দিলেন। এর কয়েকদিন পর দেখা গেল, বানর কোল থেকে আর নামে না, একপর্যায়ে সে রাজার মাথায় গিয়ে উঠেছে! এর মানে হলো, রাজনীতিকদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে শাসকের ভূমিকাতেই থাকতে হবে, আর আমলাদের থাকতে হবে সেবকের ভূমিকায়।
মন্ত্রী যদি দুর্বল হন বা আমলাদের সাথে টেন্ডার, ঘুষ বা অবৈধ কাজের ভাগাভাগি করেন, তবে আমলারা তো সুযোগ নেবেনই। তাই মন্ত্রীকে ফাইলের সব নিয়মকানুন না জানলেও, আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নেতৃত্বগুণ, দক্ষতা ও শক্ত মানসিকতা থাকতে হবে।
স্ট্রিম: বাজেটের পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার কথা হচ্ছে। কেউ বলছেন এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আবার সরকারি চাকরিজীবীরা বলছেন এটি অনেকদিন ধরে আটকে আছে। অনেকের মতে, বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
বদিউর রহমান: বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে পে-স্কেল দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। তবে বড় প্রশ্ন হলো, সরকার তো এটি দেবে, কিন্তু বেসরকারি খাতের কী হবে? বেসরকারি খাতের চাকরিদাতারা কি এই বাড়তি ব্যয়ের সাথে খাপ খাওয়াতে পারবেন?
তবে ‘বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে’—এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। দুর্নীতি মানুষের মজ্জাগত সমস্যা। এই সরকারের আমলেও আমি দেখেছি, এক সচিব খুব সাধারণ একটি কাজের জন্য লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। দুর্নীতিবাজকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বা বেতন বাড়িয়ে ভালো করা যায় না; তাকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হয়।
কিন্তু আমাদের সিস্টেমে দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। যারা বিদেশি বন্ধুদের দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননার স্বর্ণ আত্মসাৎ করেছে বা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে চাকরি করেছে, তাদের কি চাকরি গেছে? কয়েকদিন আগে ৩৬ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ দেওয়া হলো। এটি তো কোনো শাস্তি হলো না! কারণ তারা সব আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও পেনশন পাবেন। অপরাধ করলে তদন্ত করে চাকরিচ্যুত করতে হবে। ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ নীতি কঠোরভাবে কার্যকর না থাকলে প্রশাসন কখনোই ঠিক হবে না।
স্ট্রিম: দুর্নীতির এই ব্যাপকতার পেছনে আপনি মূল কারণ হিসেবে কী দেখছেন?
বদিউর রহমান: হালে বেনজীর, সাইফুজ্জামান, এনবিআরের মতিউর বা কাস্টমসের একাধিক কর্মকর্তার দুর্নীতির খবর সামনে এসেছে। কিন্তু তাদের কয়জনের সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করেছে? দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশন, পিএসসি বা রাজস্ব বোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি সরকার দলীয় প্রভাবমুক্ত, সৎ ও দক্ষ লোক বসাতে পারবে? যদি পারে, তবেই সুফল মিলবে।
মূলত তিনটি কারণে আমাদের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর হচ্ছে না:
প্রথমত, মানুষের ব্যক্তিগত বিবেক বা ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব। মানুষের লোভ ও সম্পদের মোহ প্রকট আকার ধারণ করেছে।
দ্বিতীয়ত, দুর্বল আইনি ও বিচার ব্যবস্থা। আমাদের বিচারব্যবস্থা আস্থাহীনতায় ভুগছে। আইনের ফাঁকফোকরে দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছে। দেখা যায়, এক সরকারের আমলে যার ফাঁসির আদেশ হয়, সরকার বদলালে আরেক বিচারক তাকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেন।
তৃতীয়ত, সামাজিক প্রতিরোধের অভাব। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হতো, আলেম সমাজ তাদের বাড়িতে দাওয়াত খেতেন না। আর এখন উল্টো চিত্র; দুর্নীতিবাজদের কাছেই মানুষ বেশি যায়, কারণ তারা বেশি টাকা খরচ করতে পারে।
এই কালোটাকা দিয়ে তারা ১০-২০ কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন কেনে এবং এমপি-মন্ত্রী হয়। সমাজে জাতে ওঠার জন্য তারা টিভি চ্যানেল, পত্রিকা বা বিশ্ববিদ্যালয় খোলে। লক্ষ্মীপুরের পাপুল বা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মতো লোক, যারা রাজনীতির মাঠে কোনোদিন ঘাম ঝরায়নি, তারা কীভাবে এমপি হয়? কারণ এখন মনোনয়ন কেনাবেচা হয়। সংসদে এখন ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই ব্যবসায়ী। যারা রাজপথে জেল-জুলুম খেটেছে, সেই ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এভাবে কেনাবেচার পর্যায়ে চলে যায় এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তবে রাষ্ট্রের বাকি সব অঙ্গ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পচে যাবে। কারণ, দিন শেষে রাজনীতিকরাই আমাদের শেষ ভরসা। রাজনৈতিক কাঠামো সৎ ও পরিচ্ছন্ন না হলে সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব।
স্ট্রিম: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেখানে আপনার কিছু সুপারিশ ছিল, কিন্তু আমলাদের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত না হয়ে পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়। এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
বদিউর রহমান: যেকোনো সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের তা ধারণ করার সক্ষমতা থাকতে হয়। শুধু সে সময়ই নয়, এর আগেও এ. টি. এম. শামসুল হকের নেতৃত্বে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চমৎকার সব সুপারিশ অবহেলিত হয়েছে। এর মূল কারণ হলো, আমাদের রাজনীতিকরা আমলাতন্ত্রকে তার পেশাদারি নিয়মে চলতে দেন না; বরং চরমভাবে দলীয়করণ করেন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধার বদলে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
প্রশাসনকে মেরিট বা মেধাভিত্তিক করতে হলে উপসচিব, যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য পিএসসির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল সচিব পদটি সরকার নিজের সিদ্ধান্তে নিয়োগ দিতে পারে। একবার বিসিএস দিয়ে চাকরিতে ঢুকেই কেবল সিনিয়রিটির ভিত্তিতে আজীবন পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে, যোগ্যতার ভিত্তিতে 'হায়ার অ্যান্ড ফায়ার' পদ্ধতি চালু করতে হবে।
আগে কীভাবে নিয়মকানুনকে ব্যবহার করে দলীয়করণ করা হতো, তার একটি উদাহরণ দিই। একসময় পদোন্নতির জন্য ১০০ নম্বরের একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ঠিক করা হলো—যার মধ্যে ১০ বছরের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন) ৬০% এবং ভাইভাতে ৪০% নম্বর। দেখা যেত, একজন অত্যন্ত মেধাবী কর্মকর্তা ১০ বছর ধরে এসিআরে 'আউটস্ট্যান্ডিং' (৯০%) পেয়ে এখানে ৫৪ নম্বর পেলেন। কিন্তু তাকে আটকানোর জন্য ৪০ নম্বরের ভাইভাতে দেওয়া হলো মাত্র ২০। ফলে মোট ৭৪ পেয়ে তিনি পদোন্নতি থেকে বাদ পড়লেন (পাস নম্বর ছিল ৭৫)। অন্যদিকে, দলীয় আনুগত্য থাকা একজন মাঝারি মানের কর্মকর্তা এসিআরে গড়ে ৬০% পেয়ে এখানে পেলেন ৩৬। কিন্তু তাকে পাস করানোর জন্য ভাইভাতে ৪০-এর মধ্যে ৩৯ দিয়ে দেওয়া হলো! এভাবে হিসাব মিলিয়ে অযোগ্যদের উপরে আনা হয়েছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশোধের খেলা। এক সরকার ক্ষমতায় এসে বিরোধী আমলে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে রাখে। এরপর সরকার বদল হলে, নতুন সরকার এসে সেই বঞ্চিতদের সব বকেয়াসহ ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে একলাফে সচিব বানিয়ে দেয়। এই খেলা চলতেই থাকে।
স্ট্রিম: এতে তো জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে...
বদিউর রহমান: শুধু অর্থের অপচয় নয়; একজন অপদার্থকে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসালে সে তো মানসম্মত সেবা দিতে পারে না। ফলে সাধারণ জনগণ ও সরকার উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অচলায়তন ভাঙতে একটি শক্ত উদ্যোগ দরকার। আমি মনে করি, তারেক রহমান যদি রাজনৈতিকভাবে তার মায়ের চেয়ে তার বাবার (জিয়াউর রহমান) প্রশাসনিক নীতি বেশি অনুসরণ করেন, তবে তিনি বেশি সফল হবেন।
রাজনীতিকরা যদি আমলাদের দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করতে চান, তবে আমেরিকার 'স্পয়েলস সিস্টেম'-এর মতো সরকার বদলের সাথে সাথে দলীয় লোকদের দিয়ে প্রশাসন চালানোর পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। যদি দেখেন দলীয় লোক দিয়ে সচিবালয় চালানো সম্ভব নয়, তবে আমলাতন্ত্রকে নিজস্ব নিয়মে পেশাদারিত্বের সাথে চলতে দিতে হবে।
এমপিদের বিনা শুল্কে গাড়ি দেওয়ার মতো অনৈতিক সুবিধা বন্ধ করতে হবে। এই যে এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তাদের গণহারে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে—এটি বন্ধ হওয়া উচিত। আজ যাদের অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে, রেজিম চেঞ্জ হলে তারা আবার ফিরে এসে আগের জায়গায় বসবেন, আর আজকের সুবিধাভোগীদের সরাবেন। এভাবে চলতে থাকলে প্রশাসন কখনো স্থিতিশীল হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে একটি সুষ্ঠু চর্চা ও ঐকমত্য গড়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি।
স্ট্রিম: এবার একটু রাজনীতি প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে চান। এর আগে আগস্টেও একই কথা বলেছিলেন। এ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
বদিউর রহমান: এতে এত অসুবিধা কীসের? শেখ হাসিনা যদি দেশে আসতে চান, আসুন না! তার যদি ফাঁসির মুখোমুখি হওয়ার সাহস থাকে, তবে তিনি আসতেই পারেন। গতকাল অন্য কয়েকটি টিভিতেও আমাকে একই প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমি বলেছি—আই ডু ওয়েলকাম। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুসের মতো তিনি যদি আবার চেষ্টা করতে চান, করুক।
তবে সমস্যা হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায়। বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে, ঠিক যেমন তারা একসময় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। এখন জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি এক হয়ে তাদের 'কমন শত্রু' আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে চাইছে। শেখ হাসিনা যদি সত্যিই ফিরে আসেন, তবে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, অথবা অনেকেই সুযোগ বুঝে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে পারে।
সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরতে ২১ বছর লেগেছিল। এবার টানা ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তাদের কত বছর লাগবে, তা হয়তো ঐকিক নিয়মে মেলানো যাবে না। কিন্তু রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, জোর করে দমিয়ে রাখা যায় না।
আমি কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই; এমনকি জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তেরও আমি বিরোধিতা করেছিলাম। আমি বলি, কাউকে নিষিদ্ধ না করে সবাইকে ভোটের মাঠে নামতে দিন, জনগণ যাকে খুশি তাকে ভোট দিক। এই যে ভিপি নুর বা জোনায়েদ সাকির মতো নেতারা বড় বড় বক্তব্য দিচ্ছেন, তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে ভোটে আসতে দিন না! শুধু নিজের দলের লোক দিয়ে দেশ চালালে আর অন্য সব কিছু 'উইডআউট' করে দিলে কাজ হবে না। আপনি নিজের দলকে শক্তিশালী করুন, কর্মীদের নেতৃত্ব বিকশিত করুন, প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত রাখুন—দেখবেন সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক হয়ে যাবে। ক্ষমতায় এসেই যদি পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ছক কষতে শুরু করেন, তবে যা হওয়ার তাই হবে।
স্ট্রিম: সম্প্রতি আদালতের রায়ের পর কেউ কেউ বলছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবারও ফিরে আসছে এবং আগামী নির্বাচন এর অধীনেই হবে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে আগের জটিলতাগুলো তো রয়েই গেল। এই জটিলতা কে মেটাবে?
বদিউর রহমান: আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনোই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পছন্দ করি না। একটি রাজনৈতিক দল যদি পাঁচ বছর দেশ চালাতে পারে, তবে তারা নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে না কেন? এখানেই আমাদের ট্র্যাজেডি। এর মানে হলো, রাজনৈতিক সরকারের ওপর আমাদের আস্থা নেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কেন প্রশ্নবিদ্ধ হলো? কারণ, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া শুরুতে এটি চাননি; তাকে আন্দোলন করে এটি মানতে বাধ্য করা হয়েছিল। আবার আওয়ামী লীগও প্রথমবার (১৯৯৬ সালে) এবং ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ক্ষমতায় আসার পর ভয় পেয়ে গেল। তারা ভাবল, এই ব্যবস্থা থাকলে পরেরবার হয়তো তারা বাদ পড়তে পারে। এ কারণেই তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর আয়োজন করে ক্ষমতায় টিকে ছিল।
রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়াটাই পৃথিবীর নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশে দলীয় সরকার কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন দেয় না। হাবিবুল আউয়াল, নূরুল হুদা বা রকিবউদ্দীন কমিশন—যেই আসুক না কেন, সরকার সবসময় নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রভাব খাটায়। ডিসিদের (জেলা প্রশাসক) রিটার্নিং অফিসার বানিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এই সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হলো, জেলা প্রশাসকদের বাদ দিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার পেছনেও রাজনীতিবিদরাই দায়ী। বিএনপি আমলে কে. এম. হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করার জন্য বিচারপতির অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, যাত্রাতেই গলদ ছিল! আবার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তিন জোটের রূপরেখাও পরে কেউ মানেনি। বারবার সামরিক শাসন এসেছে এবং এরশাদ বা জিয়ার মতো সামরিক শাসকরা যখন দল গঠন করেছেন, তখন এই রাজনীতিবিদরাই তাদের দলে যোগ দিয়ে সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়েছেন। রাজনীতিবিদেরা সৎ না হলে কোনো ব্যবস্থাই কাজে আসবে না।
স্ট্রিম: তাহলে কি আমাদের রাজনীতি কখনোই ঠিক হবে না?
বদিউর রহমান: কেন হবে না? কিন্তু সত্যি কথা বললে অনেকেই মন খারাপ করেন। এই যেমন ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপির হাফিজ সাহেব, মান্নান ভূঁইয়া বা সাইফুর রহমানরা সংস্কারপন্থী হয়ে খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার চেষ্টা করেছিলেন। মান্নান ভূঁইয়া মারা যাওয়ার পর খালেদা জিয়া একটি শোকবার্তাও দেননি, যা তাদের ভেতরের কোন্দল প্রমাণ করে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগেও তোফায়েল, সুরঞ্জিত, রাজ্জাক এবং আমু—এই চারজন 'স্টার' হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তাদের এমনভাবে কোণঠাসা করলেন যে, তারা 'স্টার র্যাটস' বা ইঁদুর হয়ে গেলেন!
কর্ণেল অলির মতো লোক, যিনি জিয়ার খুব কাছের ছিলেন, তিনিও এখন কোথায়? দল বদলাচ্ছেন কেন? যতক্ষণ রাজনীতিতে এই পচনশীল অবস্থা, অসহিষ্ণুতা এবং পরিবারতন্ত্র থাকবে, ততক্ষণ কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে যদি গণতান্ত্রিক চর্চা শুরু হয়, তবে দেশের সার্বিক অবস্থাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যাবে।
স্ট্রিম: আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কি কোনো আশা আছে? আমরা ৭১, ৯১ এবং ২০২৪-এ রক্ত দিয়েছি, কিন্তু আজও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি...
বদিউর রহমান: অবশ্যই আশা আছে, তবে এটি সময়ের ব্যাপার। যেসব দেশ একসময় জলদস্যু বা ডাকাতদের দ্বারা শাসিত হতো, তারাও তো এখন সভ্য হয়েছে। তাদের ১০০-২০০ বছর লেগেছে, আর আমাদের তো মাত্র ৫৫ বছর হলো।
আমরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছি না কারণ আমরা সবসময় অতীতকে অস্বীকার করতে চাই। এখনকার ২৪-এর যোদ্ধারা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে বা তাদের পূর্বসূরিদের অবদানকে অস্বীকার করতে চান। মীর জাফরের নামেও যদি কোনো রাস্তা থাকে, তা থাকতে দেওয়া উচিত; কারণ সেটি ইতিহাসের অংশ।
অধ্যাপক ইউনূসের সরকারের সময়ে যে প্রতিহিংসা ও সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে অন্তত ৫-৭ বছর লাগবে। তারেক রহমান ও ইউনূসের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কেমন হবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে আমাদের আশাবাদী থাকতে হবে। দেশ তো আমাদেরই, তাই আশা ছাড়লে চলবে না।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
বদিউর রহমান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

বদিউর রহমান সাবেক সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান। সরকারি চাকরিতে সততা, আপসহীন মনোভাব এবং প্রশাসনিক দৃঢ়তার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়ার পর লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত আছেন। তাঁর আত্মজীবনী ডোমুরুয়া থেকে সচিবালয় ও সরকারি চাকরিতে আমার অনুভূতিসমগ্র–তে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের অন্দরমহলের অনেক অজানা তথ্য জানা যায়। দেশের বর্তমান অর্থনীতি, বাজেট ও রাজস্ব আদায়, আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং জনপ্রশাসন সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
.png)
স্ট্রিম: নতুন অর্থবছর এবং নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। বাজেটে ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বিদায়ী বছরের আদায় এবং বর্তমান অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
বদিউর রহমান: এটি একটি বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ঠিকই, তবে ১৮ কোটি মানুষের বিকাশমান অর্থনীতির একটি দেশের জন্য আমি এটিকে খুব বেশি মনে করি না। বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি থাকলেও নতুন এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।
তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ব্যক্তিগত কর ফাঁকি রোধ এবং কর আদায়ে প্রভাব বিস্তার বন্ধ করতে হবে। সরকার প্রধানকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে যে—আয়কর, শুল্ক বা ভ্যাট, সব ক্ষেত্রেই প্রণীত আইন অনুযায়ী যার কাছে যতটুকু পাওনা আছে, তা পুরোটাই আদায় করা হবে। এখানে কোনো তদবির চলবে না এবং রাজস্ব বোর্ডকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে।
বর্তমান সরকারপ্রধান বেশ কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যেমন—তাঁরা প্লট নেবেন না বা শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না। ঠিক একইভাবে, সরকারপ্রধানকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সবাইকে আইন অনুযায়ী নিজেদের কর পরিশোধ করতে হবে। শুরুতেই সরকারপ্রধানকে নিজের কর ঠিকমতো পরিশোধ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক সময় সরকারপ্রধানরাও ঠিকমতো কর দিতেন না—তা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেভাবেই হোক না কেন।
সুতরাং, তিনি নিজে কর দেবেন এবং তাঁর মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদেরও নিয়মমাফিক কর পরিশোধের নির্দেশ দেবেন। এরপর ধাপে ধাপে দলের সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এই রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সর্বস্তরে যদি এই সদিচ্ছা থাকে এবং রাজস্ব বোর্ডের কাজে কোনো ধরনের বাধা বা হস্তক্ষেপ না করা হয়, তবে বিশাল এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কোনো কঠিন বিষয় নয়।
স্ট্রিম: রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বিশাল, অথচ জুলাই-ডিসেম্বরের জন্য একটি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে কি আপনি কোনো সামঞ্জস্য দেখছেন, নাকি বৈপরীত্য রয়েছে?
বদিউর রহমান: মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেওয়া হয়েছে। সরকার মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি অর্জনের জন্য সরকার চাল, ডাল, চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর প্রচুর রাজস্ব ছাড় দিয়েছে।
কিন্তু আমাদের দেশের বড় সমস্যা হলো, সরকারের দেওয়া এই ছাড়ের সুফল সাধারণ ভোক্তা পায় না; ব্যবসায়ীরা তা নিজেদের পকেটে ঢোকান। উল্টো, বাজেটের পর কোনো কারণ ছাড়াই তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। যেমন, আমি নিজে দেখেছি, বাজেটের পর নতুন কোনো করারোপ না হলেও পাড়া-মহল্লার কনফেকশনারি আইটেমগুলোর (টোস্ট, কেক ইত্যাদি) দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বিদ্যুৎ বিল বা কর্মচারীদের বেতন বাড়ার অজুহাত দেন।
তাই সরকার যে সুবিধা দিচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা দরকার। মনিটরিং না থাকলে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের কিছুতেই সন্তুষ্ট করা যাবে না।
স্ট্রিম: একদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, অন্যদিকে সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। এ দুটির কারণে কি অর্থনীতিতে কোনো সংঘাত তৈরি হবে?
বদিউর রহমান: না, বৈপরীত্য হবে না। সংকোচনমূলক নীতি নেওয়া হয়েছে সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য। রাজস্ব আদায় বাড়লে উভয়ের মধ্যে একটি সমন্বয় চলে আসবে। অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করতে হলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে।
দেশি বা বিদেশি—যেকোনো বিনিয়োগকারী প্রথমে দেখেন বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ আছে কি না। তারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ধর্মঘট-হরতালমুক্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চান। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে নির্বিঘ্নে মুনাফা তুলে নেওয়ার নিশ্চয়তা এবং শ্রমিক অসন্তোষমুক্ত পরিবেশ তাদের কাম্য।
উৎপাদন নির্বিঘ্ন হলে বেকারত্ব কমবে। মানুষের হাতে টাকা এলে খরচ বাড়বে, যার ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বা 'ভেলোসিটি অব মানি' বৃদ্ধি পাবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতি এলে জিডিপি বাড়বে এবং তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে।
স্ট্রিম: সরকার পাঁচ বছরে পাঁচ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: সিটি গ্রুপ, বেক্সিমকো বা মোমেন গ্রুপ) বেশ খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান কি বাড়বে, নাকি আমরা নতুন সংকটের দিকে যাচ্ছি?
বদিউর রহমান: অর্থবছর মাত্র শুরু হয়েছে। সরকারকে অন্তত ছয় মাস সময় দেওয়া উচিত। কর্মসংস্থানের এই লক্ষ্যমাত্রা ধাপে ধাপে অর্জন করতে হবে। প্রথম বছরের শেষে বোঝা যাবে তারা সঠিক পথে আছে কি না। সরকার কিছু বন্ধ কলকারখানা চালু করে এবং অর্থায়ন করে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করছে।
তবে এই অর্থায়ন যদি দলীয় বিবেচনায় বা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে হয়, তবে তা কাজে আসবে না। প্রকৃত ও যোগ্য উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিলে তবেই সুফল মিলবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকার দলীয় হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কখনোই দলীয়করণ করা উচিত নয়। প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ হলে যোগ্যতার অবমূল্যায়ন হয় এবং নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের স্বভাব হলো সবসময় অতিরিক্ত মুনাফা করা। প্রত্যাশিত বড় মুনাফা না হলেই তারা 'টার্গেট লস'-এর ধুয়া তুলে কান্নাকাটি শুরু করেন। তাই সরকারের নীতি বাস্তবায়নের জন্য কঠোর মনিটরিং এবং যোগ্য স্থানে যোগ্য ব্যক্তি বসানো অপরিহার্য। অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে বড় কোনো প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়; যেমন ছোট চাকার ইঞ্জিন দিয়ে বড় ট্রাকের গতি বা দূরত্ব অতিক্রম করা যায় না।
স্ট্রিম: নতুন সরকার বলছে, গত ১৭ বছরে যে প্রশাসন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে তারা কাজ করার মতো ভালো লোক খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের মনমতো লোক দিয়ে কাজ করানো যাচ্ছে না। তাহলে প্রশাসনের কাজগুলো কীভাবে চলবে?
বদিউর রহমান: এটি আমাদের রাজনীতির একটি হীনমন্যতা ও দৈন্য। ক্ষমতায় এসেই পূর্ববর্তী সরকার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে—এমন দাবি করা একধরনের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি। প্রত্যেক সরকারেরই কিছু ভালো কাজ থাকে। বিগত সরকারের আমলে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশ কিছু বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। এগুলো তো অস্বীকার করার উপায় নেই। ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে, আর দুর্নীতির বিচার করতে হবে।
প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে কখনো ভালো কিছু হয় না। যেমন, এরশাদের আমলের উপজেলা পদ্ধতিটি চমৎকার ছিল; এর মাধ্যমে প্রশাসনিক কাজ ও বিচার ব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায়ে চলে গিয়েছিল এবং একটা গতি এসেছিল। কিন্তু এরশাদ বিএনপির কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়েছিলেন বলে, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেই উপজেলা পদ্ধতি বাতিল করে দেন। আমি তখন বিজি প্রেসের ডেপুটি কন্ট্রোলার, আমি নিজেই দেখেছি কত দ্রুত সেই রেজুলেশন ছাপানো হয়েছিল। অথচ এখন তো আবার সেই উপজেলা ব্যবস্থাতেই ফিরে আসতে হয়েছে।
নেতৃত্বকে জানতে হবে কীভাবে কাজ আদায় করে নিতে হয়। গৃহকর্ত্রীকে যেমন জানতে হয় গৃহকর্মীর কাছ থেকে কীভাবে কাজ আদায় করতে হবে, ঠিক তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও জানতে হবে আমলাদের দিয়ে কীভাবে নীতি বাস্তবায়ন করতে হয়। সরকারে যদি দলীয়, অযোগ্য বা অপদার্থ লোক বসানো হয়, তবে তারা কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবে না।
স্ট্রিম: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারেও দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনে অনেককে দুই-তিন ধাপ ডিঙিয়ে পদোন্নতি দিয়ে সচিব বা অতিরিক্ত সচিব করা হচ্ছে। অথচ তারা মাঝখানের স্তরগুলোতে কাজ করে আসেননি, ফলে পারফর্মও করতে পারছেন না। এই প্রক্রিয়াটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বদিউর রহমান: আমি কখনোই এই প্রক্রিয়াটি সমর্থন করি না। প্রশাসনে এই গণপদোন্নতি ও দলীয়করণের শুরু হয়েছিল বেগম জিয়ার প্রথম আমল থেকে, '৯২-এর ফেব্রুয়ারিতে যখন প্রথম গণ পদোন্নতি দেওয়া হলো। পদের চেয়ে বেশি পদোন্নতি দেওয়া এবং দলীয় বিবেচনায় পদায়ন করার মাধ্যমেই প্রশাসনের মান কমতে শুরু করে।
বঙ্গবন্ধুর আমলে তো অন্য কোনো দল ছিলই না, তাই দলীয়করণের প্রশ্ন ওঠেনি। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে প্রশাসনে কোনো দলীয়করণ ছিল না। তার ক্ষমতায় আসা বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু একজন প্রশাসক হিসেবে তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ এবং অতুলনীয়। একটি উদাহরণ দিই—মোহাম্মদ আলী নামের এক কর্মকর্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু-ভক্ত ও আওয়ামী ঘরানার। ইআরডির জয়েন্ট সেক্রেটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে তার নাম প্রস্তাব করা হলে কিছু চাটুকার প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বলেছিলেন, "উনি তো বঙ্গবন্ধু-ভক্ত, তাকে কি এই পদে দেওয়া ঠিক হবে?" তখন জিয়াউর রহমান জানতে চেয়েছিলেন, লোকটির দক্ষতা ও সততা কেমন। যখন বলা হলো তিনি শতভাগ দক্ষ এবং তার সততা প্রশ্নাতীত, তখন জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, "তাহলে তিনি বঙ্গবন্ধু-ভক্ত হলে আমার অসুবিধা কী? আমার তো এমন সৎ ও দক্ষ লোকই দরকার।"
কিন্তু এরপর বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই প্রশাসনকে চরমভাবে দলীয়করণ করেছে। এক সরকার যাকে বাদ দিয়েছে বা বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছে, পরের সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে সব বকেয়াসহ এক লাফে সচিব বানিয়ে দিয়েছে। 'জনতার মঞ্চ' বা 'উত্তরা ষড়যন্ত্র'—এসবের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রকে বিভক্ত করা হয়েছে। এভাবে দল পুষতে গিয়ে অদক্ষ লোকদের প্রশাসনে বসানো হয়েছে। বর্তমান সরকারেও এমন কিছু লোক রয়েছেন, যাদের সুনাম বা অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়।
আমলাতন্ত্র দুর্বল হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ার মান কমিয়ে দেওয়া। জিয়াউর রহমানের সময়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও মেধাভিত্তিক। তখন ১৬০০ নম্বরের লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা হতো, যার মধ্যে ১০০ নম্বরের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষাও ছিল। এছাড়া তিন ঘণ্টার দুটি দীর্ঘ রচনা (বাংলা ও ইংরেজি) লিখতে হতো। ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের নম্বর মিলিয়ে মোট ২২০০ নম্বরের ওপর মেধা যাচাই হতো। পরবর্তীতে এই সিলেবাস কাটছাঁট করে ১০০০ নম্বরে নামিয়ে আনা হয় এবং পাস নম্বর ৫০% থেকে কমিয়ে ৪৫% করা হয়। এতেই মেধাবীদের ছেঁকে আনার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
প্রশাসনকে ঠিক করতে হলে তিনটি কাজ করতে হবে:
প্রথমত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সেই পুরোনো কঠোর সিলেবাস ফিরিয়ে এনে নিখাদ মেধার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনে দলীয়করণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। কার কী রাজনৈতিক পরিচয় তা না দেখে, পারফরম্যান্স বা যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
তৃতীয়ত, 'হায়ার অ্যান্ড ফায়ার' নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কেউ দায়িত্বে অবহেলা বা গলদ করলে সাথে সাথে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
আগে সিভিল সার্ভিসের একটা শক্ত অবস্থান ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে ক্যাবিনেট মিটিংয়ে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হলেই আমরা (আমলারা) উঠে চলে আসতাম। আর এখন আমলাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে সুযোগ দেওয়া হয়, যার ফলে পুলিশের ওসি পর্যন্ত দলীয় স্লোগান দেয়! এটা বন্ধ হতে হবে। রাজনীতি করবেন রাজনীতিকরা, আর আমলাতন্ত্রের একমাত্র দায়িত্ব হবে সরকারের নীতি সুচারুরূপে বাস্তবায়ন করা।
স্ট্রিম: দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনে অনেক আমলা ও সচিব দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন...
বদিউর রহমান: ‘পলিটিক্যাল মাস্টার’ (রাজনৈতিক শাসক) এবং ‘ব্যুরোক্রেট সার্ভেন্ট’ (আমলা)—এই দুজনের কাজের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত নেবেন রাজনীতিকরা, আর তা বাস্তবায়ন করবেন আমলারা। বাস্তবায়নের সময় কোনো অসংগতি দেখলে আমলারা তা রাজনীতিকদের জানাবেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়ভার রাজনীতিকদেরই।
মন্ত্রীরা নিজেদের সুবিধার জন্য আমলাদের দলীয়করণ করবেন কেন? একটি প্রাসঙ্গিক গল্প বলি—এক রাজা তার পোষা বানরকে আদর করে কোলে বসিয়ে খাওয়াতেন, কিন্তু খাওয়া শেষে বেত দিয়ে দুটি বাড়ি দিতেন, যাতে বানর তার নিজের জায়গা মনে রাখে। একদিন উজিরের কথায় রাজা বেত মারা বন্ধ করে দিলেন। এর কয়েকদিন পর দেখা গেল, বানর কোল থেকে আর নামে না, একপর্যায়ে সে রাজার মাথায় গিয়ে উঠেছে! এর মানে হলো, রাজনীতিকদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে শাসকের ভূমিকাতেই থাকতে হবে, আর আমলাদের থাকতে হবে সেবকের ভূমিকায়।
মন্ত্রী যদি দুর্বল হন বা আমলাদের সাথে টেন্ডার, ঘুষ বা অবৈধ কাজের ভাগাভাগি করেন, তবে আমলারা তো সুযোগ নেবেনই। তাই মন্ত্রীকে ফাইলের সব নিয়মকানুন না জানলেও, আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নেতৃত্বগুণ, দক্ষতা ও শক্ত মানসিকতা থাকতে হবে।
স্ট্রিম: বাজেটের পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার কথা হচ্ছে। কেউ বলছেন এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আবার সরকারি চাকরিজীবীরা বলছেন এটি অনেকদিন ধরে আটকে আছে। অনেকের মতে, বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
বদিউর রহমান: বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে পে-স্কেল দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। তবে বড় প্রশ্ন হলো, সরকার তো এটি দেবে, কিন্তু বেসরকারি খাতের কী হবে? বেসরকারি খাতের চাকরিদাতারা কি এই বাড়তি ব্যয়ের সাথে খাপ খাওয়াতে পারবেন?
তবে ‘বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে’—এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। দুর্নীতি মানুষের মজ্জাগত সমস্যা। এই সরকারের আমলেও আমি দেখেছি, এক সচিব খুব সাধারণ একটি কাজের জন্য লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। দুর্নীতিবাজকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বা বেতন বাড়িয়ে ভালো করা যায় না; তাকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হয়।
কিন্তু আমাদের সিস্টেমে দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। যারা বিদেশি বন্ধুদের দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননার স্বর্ণ আত্মসাৎ করেছে বা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে চাকরি করেছে, তাদের কি চাকরি গেছে? কয়েকদিন আগে ৩৬ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ দেওয়া হলো। এটি তো কোনো শাস্তি হলো না! কারণ তারা সব আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও পেনশন পাবেন। অপরাধ করলে তদন্ত করে চাকরিচ্যুত করতে হবে। ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ নীতি কঠোরভাবে কার্যকর না থাকলে প্রশাসন কখনোই ঠিক হবে না।
স্ট্রিম: দুর্নীতির এই ব্যাপকতার পেছনে আপনি মূল কারণ হিসেবে কী দেখছেন?
বদিউর রহমান: হালে বেনজীর, সাইফুজ্জামান, এনবিআরের মতিউর বা কাস্টমসের একাধিক কর্মকর্তার দুর্নীতির খবর সামনে এসেছে। কিন্তু তাদের কয়জনের সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করেছে? দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশন, পিএসসি বা রাজস্ব বোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি সরকার দলীয় প্রভাবমুক্ত, সৎ ও দক্ষ লোক বসাতে পারবে? যদি পারে, তবেই সুফল মিলবে।
মূলত তিনটি কারণে আমাদের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর হচ্ছে না:
প্রথমত, মানুষের ব্যক্তিগত বিবেক বা ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব। মানুষের লোভ ও সম্পদের মোহ প্রকট আকার ধারণ করেছে।
দ্বিতীয়ত, দুর্বল আইনি ও বিচার ব্যবস্থা। আমাদের বিচারব্যবস্থা আস্থাহীনতায় ভুগছে। আইনের ফাঁকফোকরে দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছে। দেখা যায়, এক সরকারের আমলে যার ফাঁসির আদেশ হয়, সরকার বদলালে আরেক বিচারক তাকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেন।
তৃতীয়ত, সামাজিক প্রতিরোধের অভাব। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হতো, আলেম সমাজ তাদের বাড়িতে দাওয়াত খেতেন না। আর এখন উল্টো চিত্র; দুর্নীতিবাজদের কাছেই মানুষ বেশি যায়, কারণ তারা বেশি টাকা খরচ করতে পারে।
এই কালোটাকা দিয়ে তারা ১০-২০ কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন কেনে এবং এমপি-মন্ত্রী হয়। সমাজে জাতে ওঠার জন্য তারা টিভি চ্যানেল, পত্রিকা বা বিশ্ববিদ্যালয় খোলে। লক্ষ্মীপুরের পাপুল বা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মতো লোক, যারা রাজনীতির মাঠে কোনোদিন ঘাম ঝরায়নি, তারা কীভাবে এমপি হয়? কারণ এখন মনোনয়ন কেনাবেচা হয়। সংসদে এখন ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই ব্যবসায়ী। যারা রাজপথে জেল-জুলুম খেটেছে, সেই ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এভাবে কেনাবেচার পর্যায়ে চলে যায় এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তবে রাষ্ট্রের বাকি সব অঙ্গ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পচে যাবে। কারণ, দিন শেষে রাজনীতিকরাই আমাদের শেষ ভরসা। রাজনৈতিক কাঠামো সৎ ও পরিচ্ছন্ন না হলে সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব।
স্ট্রিম: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেখানে আপনার কিছু সুপারিশ ছিল, কিন্তু আমলাদের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত না হয়ে পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়। এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
বদিউর রহমান: যেকোনো সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের তা ধারণ করার সক্ষমতা থাকতে হয়। শুধু সে সময়ই নয়, এর আগেও এ. টি. এম. শামসুল হকের নেতৃত্বে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চমৎকার সব সুপারিশ অবহেলিত হয়েছে। এর মূল কারণ হলো, আমাদের রাজনীতিকরা আমলাতন্ত্রকে তার পেশাদারি নিয়মে চলতে দেন না; বরং চরমভাবে দলীয়করণ করেন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধার বদলে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
প্রশাসনকে মেরিট বা মেধাভিত্তিক করতে হলে উপসচিব, যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য পিএসসির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল সচিব পদটি সরকার নিজের সিদ্ধান্তে নিয়োগ দিতে পারে। একবার বিসিএস দিয়ে চাকরিতে ঢুকেই কেবল সিনিয়রিটির ভিত্তিতে আজীবন পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে, যোগ্যতার ভিত্তিতে 'হায়ার অ্যান্ড ফায়ার' পদ্ধতি চালু করতে হবে।
আগে কীভাবে নিয়মকানুনকে ব্যবহার করে দলীয়করণ করা হতো, তার একটি উদাহরণ দিই। একসময় পদোন্নতির জন্য ১০০ নম্বরের একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ঠিক করা হলো—যার মধ্যে ১০ বছরের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন) ৬০% এবং ভাইভাতে ৪০% নম্বর। দেখা যেত, একজন অত্যন্ত মেধাবী কর্মকর্তা ১০ বছর ধরে এসিআরে 'আউটস্ট্যান্ডিং' (৯০%) পেয়ে এখানে ৫৪ নম্বর পেলেন। কিন্তু তাকে আটকানোর জন্য ৪০ নম্বরের ভাইভাতে দেওয়া হলো মাত্র ২০। ফলে মোট ৭৪ পেয়ে তিনি পদোন্নতি থেকে বাদ পড়লেন (পাস নম্বর ছিল ৭৫)। অন্যদিকে, দলীয় আনুগত্য থাকা একজন মাঝারি মানের কর্মকর্তা এসিআরে গড়ে ৬০% পেয়ে এখানে পেলেন ৩৬। কিন্তু তাকে পাস করানোর জন্য ভাইভাতে ৪০-এর মধ্যে ৩৯ দিয়ে দেওয়া হলো! এভাবে হিসাব মিলিয়ে অযোগ্যদের উপরে আনা হয়েছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশোধের খেলা। এক সরকার ক্ষমতায় এসে বিরোধী আমলে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে রাখে। এরপর সরকার বদল হলে, নতুন সরকার এসে সেই বঞ্চিতদের সব বকেয়াসহ ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে একলাফে সচিব বানিয়ে দেয়। এই খেলা চলতেই থাকে।
স্ট্রিম: এতে তো জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে...
বদিউর রহমান: শুধু অর্থের অপচয় নয়; একজন অপদার্থকে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসালে সে তো মানসম্মত সেবা দিতে পারে না। ফলে সাধারণ জনগণ ও সরকার উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অচলায়তন ভাঙতে একটি শক্ত উদ্যোগ দরকার। আমি মনে করি, তারেক রহমান যদি রাজনৈতিকভাবে তার মায়ের চেয়ে তার বাবার (জিয়াউর রহমান) প্রশাসনিক নীতি বেশি অনুসরণ করেন, তবে তিনি বেশি সফল হবেন।
রাজনীতিকরা যদি আমলাদের দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করতে চান, তবে আমেরিকার 'স্পয়েলস সিস্টেম'-এর মতো সরকার বদলের সাথে সাথে দলীয় লোকদের দিয়ে প্রশাসন চালানোর পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। যদি দেখেন দলীয় লোক দিয়ে সচিবালয় চালানো সম্ভব নয়, তবে আমলাতন্ত্রকে নিজস্ব নিয়মে পেশাদারিত্বের সাথে চলতে দিতে হবে।
এমপিদের বিনা শুল্কে গাড়ি দেওয়ার মতো অনৈতিক সুবিধা বন্ধ করতে হবে। এই যে এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তাদের গণহারে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে—এটি বন্ধ হওয়া উচিত। আজ যাদের অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে, রেজিম চেঞ্জ হলে তারা আবার ফিরে এসে আগের জায়গায় বসবেন, আর আজকের সুবিধাভোগীদের সরাবেন। এভাবে চলতে থাকলে প্রশাসন কখনো স্থিতিশীল হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে একটি সুষ্ঠু চর্চা ও ঐকমত্য গড়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি।
স্ট্রিম: এবার একটু রাজনীতি প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে চান। এর আগে আগস্টেও একই কথা বলেছিলেন। এ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
বদিউর রহমান: এতে এত অসুবিধা কীসের? শেখ হাসিনা যদি দেশে আসতে চান, আসুন না! তার যদি ফাঁসির মুখোমুখি হওয়ার সাহস থাকে, তবে তিনি আসতেই পারেন। গতকাল অন্য কয়েকটি টিভিতেও আমাকে একই প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমি বলেছি—আই ডু ওয়েলকাম। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুসের মতো তিনি যদি আবার চেষ্টা করতে চান, করুক।
তবে সমস্যা হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায়। বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে, ঠিক যেমন তারা একসময় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। এখন জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি এক হয়ে তাদের 'কমন শত্রু' আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে চাইছে। শেখ হাসিনা যদি সত্যিই ফিরে আসেন, তবে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, অথবা অনেকেই সুযোগ বুঝে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে পারে।
সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরতে ২১ বছর লেগেছিল। এবার টানা ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তাদের কত বছর লাগবে, তা হয়তো ঐকিক নিয়মে মেলানো যাবে না। কিন্তু রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, জোর করে দমিয়ে রাখা যায় না।
আমি কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই; এমনকি জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তেরও আমি বিরোধিতা করেছিলাম। আমি বলি, কাউকে নিষিদ্ধ না করে সবাইকে ভোটের মাঠে নামতে দিন, জনগণ যাকে খুশি তাকে ভোট দিক। এই যে ভিপি নুর বা জোনায়েদ সাকির মতো নেতারা বড় বড় বক্তব্য দিচ্ছেন, তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে ভোটে আসতে দিন না! শুধু নিজের দলের লোক দিয়ে দেশ চালালে আর অন্য সব কিছু 'উইডআউট' করে দিলে কাজ হবে না। আপনি নিজের দলকে শক্তিশালী করুন, কর্মীদের নেতৃত্ব বিকশিত করুন, প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত রাখুন—দেখবেন সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক হয়ে যাবে। ক্ষমতায় এসেই যদি পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ছক কষতে শুরু করেন, তবে যা হওয়ার তাই হবে।
স্ট্রিম: সম্প্রতি আদালতের রায়ের পর কেউ কেউ বলছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবারও ফিরে আসছে এবং আগামী নির্বাচন এর অধীনেই হবে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে আগের জটিলতাগুলো তো রয়েই গেল। এই জটিলতা কে মেটাবে?
বদিউর রহমান: আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনোই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পছন্দ করি না। একটি রাজনৈতিক দল যদি পাঁচ বছর দেশ চালাতে পারে, তবে তারা নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে না কেন? এখানেই আমাদের ট্র্যাজেডি। এর মানে হলো, রাজনৈতিক সরকারের ওপর আমাদের আস্থা নেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কেন প্রশ্নবিদ্ধ হলো? কারণ, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া শুরুতে এটি চাননি; তাকে আন্দোলন করে এটি মানতে বাধ্য করা হয়েছিল। আবার আওয়ামী লীগও প্রথমবার (১৯৯৬ সালে) এবং ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ক্ষমতায় আসার পর ভয় পেয়ে গেল। তারা ভাবল, এই ব্যবস্থা থাকলে পরেরবার হয়তো তারা বাদ পড়তে পারে। এ কারণেই তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর আয়োজন করে ক্ষমতায় টিকে ছিল।
রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়াটাই পৃথিবীর নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশে দলীয় সরকার কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন দেয় না। হাবিবুল আউয়াল, নূরুল হুদা বা রকিবউদ্দীন কমিশন—যেই আসুক না কেন, সরকার সবসময় নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রভাব খাটায়। ডিসিদের (জেলা প্রশাসক) রিটার্নিং অফিসার বানিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এই সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হলো, জেলা প্রশাসকদের বাদ দিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার পেছনেও রাজনীতিবিদরাই দায়ী। বিএনপি আমলে কে. এম. হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করার জন্য বিচারপতির অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, যাত্রাতেই গলদ ছিল! আবার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তিন জোটের রূপরেখাও পরে কেউ মানেনি। বারবার সামরিক শাসন এসেছে এবং এরশাদ বা জিয়ার মতো সামরিক শাসকরা যখন দল গঠন করেছেন, তখন এই রাজনীতিবিদরাই তাদের দলে যোগ দিয়ে সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়েছেন। রাজনীতিবিদেরা সৎ না হলে কোনো ব্যবস্থাই কাজে আসবে না।
স্ট্রিম: তাহলে কি আমাদের রাজনীতি কখনোই ঠিক হবে না?
বদিউর রহমান: কেন হবে না? কিন্তু সত্যি কথা বললে অনেকেই মন খারাপ করেন। এই যেমন ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপির হাফিজ সাহেব, মান্নান ভূঁইয়া বা সাইফুর রহমানরা সংস্কারপন্থী হয়ে খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার চেষ্টা করেছিলেন। মান্নান ভূঁইয়া মারা যাওয়ার পর খালেদা জিয়া একটি শোকবার্তাও দেননি, যা তাদের ভেতরের কোন্দল প্রমাণ করে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগেও তোফায়েল, সুরঞ্জিত, রাজ্জাক এবং আমু—এই চারজন 'স্টার' হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তাদের এমনভাবে কোণঠাসা করলেন যে, তারা 'স্টার র্যাটস' বা ইঁদুর হয়ে গেলেন!
কর্ণেল অলির মতো লোক, যিনি জিয়ার খুব কাছের ছিলেন, তিনিও এখন কোথায়? দল বদলাচ্ছেন কেন? যতক্ষণ রাজনীতিতে এই পচনশীল অবস্থা, অসহিষ্ণুতা এবং পরিবারতন্ত্র থাকবে, ততক্ষণ কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে যদি গণতান্ত্রিক চর্চা শুরু হয়, তবে দেশের সার্বিক অবস্থাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যাবে।
স্ট্রিম: আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কি কোনো আশা আছে? আমরা ৭১, ৯১ এবং ২০২৪-এ রক্ত দিয়েছি, কিন্তু আজও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি...
বদিউর রহমান: অবশ্যই আশা আছে, তবে এটি সময়ের ব্যাপার। যেসব দেশ একসময় জলদস্যু বা ডাকাতদের দ্বারা শাসিত হতো, তারাও তো এখন সভ্য হয়েছে। তাদের ১০০-২০০ বছর লেগেছে, আর আমাদের তো মাত্র ৫৫ বছর হলো।
আমরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছি না কারণ আমরা সবসময় অতীতকে অস্বীকার করতে চাই। এখনকার ২৪-এর যোদ্ধারা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে বা তাদের পূর্বসূরিদের অবদানকে অস্বীকার করতে চান। মীর জাফরের নামেও যদি কোনো রাস্তা থাকে, তা থাকতে দেওয়া উচিত; কারণ সেটি ইতিহাসের অংশ।
অধ্যাপক ইউনূসের সরকারের সময়ে যে প্রতিহিংসা ও সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে অন্তত ৫-৭ বছর লাগবে। তারেক রহমান ও ইউনূসের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কেমন হবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে আমাদের আশাবাদী থাকতে হবে। দেশ তো আমাদেরই, তাই আশা ছাড়লে চলবে না।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
বদিউর রহমান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
.png)
.png)

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজনের প্রায় দু’জন স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে অক্ষম। সংখ্যায় বললে, প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ। এটা ছোট পরিসংখ্যান নয়; একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল পাকিস্তান আমাদের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে।
১৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি একটি প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে—কোনো সংসদ সদস্য গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগে নিজ রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত হলে কি তাঁর সংসদ সদস্যপদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে?
১৮ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রভাবশালী তত্ত্ববিদ জন জে মিয়ারশাইমারের অফেনসিভ রিয়ালিজম ব্যাখ্যা করে কেন দীর্ঘ ও সতর্ক কূটনৈতিক আলোচনার পরও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পাদিত অনেক চুক্তি শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে।
১৮ ঘণ্টা আগে
আমার ব্যবসাকে যদি হিসাব রাখতে হয়, ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হয়, নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হয় এবং সরকারের কাছে তার আর্থিক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে সরকার কেন আমাকে একই মাত্রার জবাবদিহি দেবে না?
২০ ঘণ্টা আগে