ড. রিজওয়ানুল ইসলামের সাক্ষাৎকার
ড. রিজওয়ানুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নিয়োগ খাতের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অতিথি বক্তা ও ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। উন্নয়ন অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বই লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন। বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান সংকট, শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত মজুরি হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাসহ নানা বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
মুজাহিদুল ইসলাম

স্ট্রিম: আপনার গবেষণায় দেখিয়েছেন প্রবৃদ্ধি হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মসংস্থান বাড়ে না। গত দুই দশকের উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার ক্রমশ কমছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হারের এই ক্রমাবনতিকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
রিজওয়ানুল ইসলাম: অনেক বছর ধরেই বিষয়টি নিয়ে আমি গবেষণা করছি। গবেষণায় দেখেছি যে কর্মসংস্থানের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রাথমিক শর্ত হলেও সেটা যথেষ্ট নয়। কী হারে কর্মসংস্থান বাড়বে তা নির্ভর করে প্রবৃদ্ধির ধরনের ওপর। অর্থাৎ কোন কোন খাতে প্রবৃদ্ধি বেশি হচ্ছে আর সে খাতগুলো উচ্চ হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক কি না।
বাংলাদেশের জন্য দুই দশকের বেশি সময়ের উপাত্ত আমরা বিশ্লেষণ করেছি। তাতে দেখা যায় যে ২০১০ সালের পর থেকে প্রবৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট হওয়া কর্মসংস্থানের পরিমান ও বৃদ্ধির হার ক্রমেই কমছে। ২০০০ থেকে ২০১০ সময়কালে প্রতি ১ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি থেকে কর্মসংস্থান বাড়তো তার অর্ধেক, অর্থাৎ ০.৫ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৬ সময়ে সেটা কমে ০.৩-এর নিচে নেমে যায়। তার পরেও এই সংখ্যাটি ০.৪-এর নিচেই রয়ে গিয়েছে। কিছুটা অতিরঞ্জনের সম্ভাবনা স্বীকার করলেও একদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে আর অন্যদিকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমেছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর পনেরো থেকে সতেরো লক্ষ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৬-১৭ এই এক বছরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় তেরো লক্ষ। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালে তা কমে মাত্র পাঁচ লক্ষতে দাঁড়ায়। আর তার পরের বছর কমেছে নয় লক্ষ। এই সংখ্যাগুলো থেকে বোঝা যায় যে প্রবৃদ্ধির সাথে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্পর্ক সরল রেখার মতো নয়।
স্ট্রিম: আর্থার লুইসের মডেল অনুযায়ী উদ্বৃত্ত শ্রম কৃষি থেকে শিল্পে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হওয়ায় শ্রমশক্তি উল্টো কৃষিমুখী হচ্ছে। প্রকৃত মজুরিও কমছে। তাহলে কি আমাদের কাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি কার্যত থমকে গেছে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ আর্থার লুইসের যে তত্ত্বটির কথা আপনি বললেন সেটি হচ্ছে এরকম যে, যেসব দেশে উদ্বৃত্ত শ্রম আছে সেসব দেশে আধুনিক খাতে, বিশেষ করে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়লে প্রকৃত মজুরি না বাড়িয়েই শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া যায়। কারণ কৃষিতে অনেক উদ্বৃত্ত শ্রম থাকে। সেখান থেকে একটা অংশ শিল্পে স্থানান্তরিত হতে পারে। কৃষির উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হওয়ার পর শিল্পখাতে শ্রমিকের মজুরি বাড়াতে হয়।
বাংলাদেশেও এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অংশ কমার বদলে বাড়ছে। এমনকি মোট সংখ্যাও বাড়ছে। অর্থাৎ শিল্প ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অনেকই আবার কৃষিমুখী হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, প্রকৃত মজুরিও কমছে। সুতরাং দেখা যায় লুইসের বর্ণনা করা কাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়া থমকে দাঁড়িয়েছে।
স্ট্রিম: ২০১৬-১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের প্রধান শিল্প তৈরি পোশাকে কর্মসংস্থান কমছে। শ্রম-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার কি আমাদের এই অকাল শিল্পায়ন-হ্রাসের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: বাংলাদেশে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের অংশ বেড়ে ১৪.৪২ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। আমার সে সময়কার লেখায় বলেছিলাম যে ড্যানি রদডরিকের প্রিম্যাচিউর ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু এর পরের উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। এটি বিশেষ করে ঘটছে দেশের প্রধান শিল্প তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে। এই খাতে কেন কর্মসংস্থান তেমনভাবে বাড়ছে না সেটি একটি গবেষনার বিষয়। বড় আকারের কারখানাগুলোতে শ্রম সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যায়। তবে খাতটিতে সামগ্রিকভাবে কী হচ্ছে সে বিষয়ে উপাত্তভিত্তিক বিশ্লেষণ করা দরকার।
স্ট্রিম: দেশে মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপের পাশাপাশি শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি ধারাবাহিকভাবে কমছে। মজুরি হ্রাসের এই প্রবণতা কি আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় ধরনের কোনো চাহিদা সংকট তৈরি করছে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: প্রকৃত মজুরির ওপর নির্ভর করে শ্রমিকের আয়, যা তার জীবনযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির জন্যও এর গুরুত্ব আছে। কারণ পণ্য এবং সেবার চাহিদা মানুষের আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আর বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে বৈদেশিক চাহিদার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদাও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি সঞ্চার করতে পারে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে। তার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের অন্যান্যদের আয়ও মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে এক ধরনের চাহিদা সংকট সৃষ্টি হতেই পারে।
স্ট্রিম: অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দেশে যেকোনো মূল্যে 'কাজের সুযোগ' তৈরি করাই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই প্রেক্ষাপটে অধিকার, সুরক্ষা ও সংলাপের মতো উপাদানগুলো বাদ দিয়ে কি ভালো মানের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব?
রিজওয়ানুল ইসলাম: শোভন কাজের চারটি স্তম্ভ আছে: কর্মসংস্থান, শ্রমিকের/কর্মীর অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, এবং সামাজিক সংলাপের। এই সংলাপ অর্থ কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনার সুযোগ। কেউ কেউ বলে থাকেন যে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে কাজের সুযোগই সীমাবদ্ধ, সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত কর্মসংস্থানকে। কথাটি একেবারে ভিত্তিহীন তা বলব না। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য যদি হয় ভালো মানের কাজ তাহলে বিষয়টিকে দেখতে হবে একটি সামগ্রিক কাঠামোতে। সেখান একটি টেবিলের কথা ভাবা যেতে পারে যা চারটি পায়ার ওপর দাঁড়ায়। তার কোনো একটি বা দুটি বাদ দিলে টেবিল দাঁড়াতে পারে না। শোভন কাজের ধারনাটি সেরকমই। গোড়ার কথা কর্মসংস্থান হলেও অন্য দিকগুলোর কথা ভুললে চলবে না।
স্ট্রিম: অনানুষ্ঠানিক খাতকে সাধারণত 'সমস্যা' হিসেবে দেখা হলেও এটি বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের এই খাতকে আসলে কোন দৃষ্টিতে দেখা উচিত?
রিজওয়ানুল ইসলাম: বাংলাদেশে এখনো মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। বহুদিন ধরে এ অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন দেখছি না। আর শিগগির তেমন পরিবর্তন হবে বলেও মনে করার বিশেষ কারণ নেই। সে অবস্থায় এই খাতকে কীভাবে দেখা হবে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মনে রাখতে হবে যে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না বলেই অনানুষ্ঠানিক খাতে বাড়ছে। আর জীবিকার জন্য এ ধরনের কর্মসংস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং নীতিমালা প্রণয়নে আমাদেরকে দুই ফ্রন্টে কাজ করতে হবে। একদিকে সুষ্ঠু নীতিমালার মাধ্যমে শিল্প ও সেবা খাতের আনুষ্ঠানিক অংশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতের অবস্থা কীভাবে উন্নত করা যায় সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সেখানে নিয়োজিতদের আয় বাড়ে এবং কাজের গুণগত মান ও পরিবেশ ভালো হয়।
স্ট্রিম: দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দেশে 'ফ্যামিলি কার্ড'-এর মতো লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করা কতটা চ্যালেঞ্জিং? এর ব্যয় ও ঝুঁকি কি সুবিধার চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: সামাজিক সুরক্ষার জন্য নগদ দেওয়া আর তার জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা একটি ভালো ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এই কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে এর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। আর সেখানে রয়েছে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, ঠিকভাবে উপকারভোগী চিহ্নিত করা যাতে যারা যোগ্য তারা সবাই সাহায্য পেতে পারে আর যারা যোগ্য নয় তারা এতে অন্তর্ভুক্ত না হয়। এটা নিশ্চিত করবার জন্য সঠিক উপাত্ত যেমন দরকার তেমনি প্রক্রিয়াটিকে রাজনীতিমুক্ত রাখাও জরুরি।
দ্বিতীয়ত, সঠিক প্রাপকের হাতে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য দরকার প্রশাসনিক দক্ষতা এবং তাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজ করতে পারলে একদিকে যেমন নৈপুণ্য বাড়ানো যাবে অন্যদিকে দুর্নীতির সম্ভাবনাও কমানো যাবে।
তৃতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর মধ্যে দরিদ্রদের জন্য যেসব কর্মসূচি রয়েছে তাদের কোনোকোনোটির উপকারভোগী হয়ত নতুন কর্মসূচি তে অন্তর্ভুক্ত হবেন। সেক্ষেত্রে আগেরগুলো চালু রাখা হবে না কি নতুনটির সাথে একীভূত করে একটি সমন্বিত কার্জকর্ম চালু করা যায় সেটি দেখা দরকার।
চতুর্থত, নতুন কর্মসূচির জন্য কত অর্থের প্রয়োজন হবে এবং জাতীয় বাজেটে তার প্রভাব কী হতে পারে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায় যে সম্পূর্ণ কর্মসূচির জন্য বাজেটের শতকরা তিন শতাংশ লাগবে। পরিমানটি তেমন বিশাল মনে না হলেও কম নয়।
পঞ্চমত, সামাজিক সুরক্ষার জন্য হলেও এ ধরনের কর্মসূচিকে উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করা যায় কি না তা ভাবা যেতে পারে। কোনো কোনো দেশে এটি করা হয় এবং ভালো ফল পাওয়া গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নগদ সহায়তার সাথে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের সেবার সংযোগ ঘটাতে পারলে একদিকে স্বল্পমেয়াদী সহায়তা যেমন দেওয়া হবে তেমনি দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখা যাবে।
স্ট্রিম: সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে সরাসরি নগদ হস্তান্তর প্রায়ই পণ্য-ভিত্তিক ভর্তুকির চেয়ে বেশি কার্যকর। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের বদলে ডিজিটাল ক্যাশ ট্রান্সফারের মডেল কি বাংলাদেশে কার্যকর হতে পারে? বিকাশের মতো বিদ্যমান অবকাঠামো এটিকে কতটা সহজ করতে পারে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: নগদ সহায়তা এবং পণ্য সহায়তার তুলনামূলক সুবিধা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে ঠিকই। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। ফ্যামিলি কার্ড ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে নগদ সহায়তা সঠিক উপকারভোগীর হাতে ঠিকমত পৌঁছাতে পারলে সামাজিক সুরক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির ফলে নগদের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই কমতে থাকবে। সুতরাং এটিকে মূল্যস্ফীতির সাথে প্রতিনিয়ত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ করবার ব্যবস্থা রাখতে হবে। সেদিক থেকে দেখলে পণ্য সহায়তার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ডকে কি বৃহত্তর 'সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো'-এর অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব?
রিজওয়ানুল ইসলাম: ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দিতে পারলে তা অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পণ্যের সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ মূলত রাজনৈতিক দর-কষাকষির ওপর নির্ভরশীল। এর সাথে উৎপাদনশীলতা বা মূল্যস্ফীতির কোনো স্বয়ংক্রিয় সম্পর্ক নেই। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় মজুরি নির্ধারণের কার্যকর মডেল কোন দেশগুলোতে দেখা যায়?
রিজওয়ানুল ইসলাম: ন্যুনতম মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতির ভালো উদাহরণ পাওয়া যায় পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশ (যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন) এবং যুক্তরাজ্য থেকে। তবে উন্নয়নশীল বিশ্বেও ভালো উদাহরণ পাওয়া যায়। সে প্রসঙ্গে ভারত, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার কথা উল্লেখ করা যায়। এই দেশগুলোতে ত্রিপক্ষীয়– অর্থাৎ সরকার, মালিক এবং শ্রমিক এই তিন পক্ষের সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমে ন্যুনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চালু আছে। তাছাড়া প্রতি দু বছরে মজুরি হালনাগাদের ব্যবস্থাও আছে।
স্ট্রিম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের প্রভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কি কর্মসংস্থান কমবে, নাকি নতুন সুযোগ তৈরি হবে? এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
রিজওয়ানুল ইসলাম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য স্বল্প মেয়াদের বা কোনো বিশেষ খাতের ওপর দৃষ্টি সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘ মেয়াদের কথা ভাবতে হবে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এর কারণ এই যে কোনো কোনো খাতে এটি ব্যবহার করা হলে সেখানে কিছু কাজ করার জন্য মানুষের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। তবে সেই সঙ্গে নতুন ধরনের কাজ সৃষ্টি হয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্ঠি হতে পারে। তাছাড়া অর্থনীতির সব খাতেই সমানভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ হবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে মেককিনজি কোম্পানি এক জরিপে দেখেছে যে পরের তিন বছরে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ কোম্পানি চাকরি কমে যাওয়ার কথা বলছে। আমাজন কোম্পানি বলছে তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাঁটাই করলেও সার্বিকভাবে কর্মী নিয়োগ করতেই থাকবে। সুইজারল্যান্ডের নীতিনির্ধারকগণ ২০২৫ সালে বলেছেন যে বেকারত্বের সামান্য বাড়লেও সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে হয়নি। মোদ্দা কথা হচ্ছে এই যে মানবসভ্যতার ইতিহাস প্রযুক্তিগত উন্নতির ইতিহাস। কিন্তু তার ফলে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান কমেনি বরং বেড়েছে।
বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায় যে শতকরা ৮৫ ভাগই এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। বাকি অংশের অতি অল্পসংখ্যক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের সুযোগ হবে। তার ফলে কিছু চাকরি হয়ত থাকবে না। কিন্তু নতুন ধরনের চাকরি সৃষ্টি হবে – যদিও তাদের জন্য অন্য ধরনের যোগ্যতা এবং দক্ষতার প্রয়োজন হবে। সুতরাং এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হবে শ্রমবাজারে সে ধরনের যোগ্যতা/দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী সরবরাহের ব্যবস্থা করা।
স্ট্রিম: রেমিট্যান্স অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হলেও, বিপুল সংখ্যক কর্মীর বিদেশযাত্রা কি আমাদের দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে? বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য আনা যায়?
রিজওয়ানুল ইসলাম: বাংলাদেশ থেকে কাজের জন্য অভিবাসন আসলে নেতিবাচক অবস্থা থেকে শুরু হয়েছে। দেশে যথেষ্ট পরিমানে কাজ পাওয়া যায় না বলেই মানুষ বিদেশে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য আয় বেশি হবে সে আশায়ও যায়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকি নিয়েও মানুষ বিদেশে যেতে যায়। এরকম অবস্থায় দক্ষ মানবসম্পদ হারানোর নেতিবাচক প্রভাব তেমন প্রযোজ্য নয়। আমি বরং অন্য কিছু সমস্যাকে বড় মনে করি। সে কথায় আসবার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার।
নেতিবাচক অবস্থা থেকে সৃষ্টি হলেও অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থ এখন আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে দেশে থেকে যাওয়া পরিবারের ভরণপোষণ এবং অন্যান্য খরচের জন্য ব্যবহার হয় বিদেশ থেকে আসা অর্থ। অন্যদিকে সে অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার আকারে আসে বলে দেশের সামষ্ঠিক অর্থনীতিতে তার ভূমিকা হয়ে উঠেছে অপরিহার্য।
আমার মতে মূল সমস্যাগুলো হলো উচ্চ ব্যয়, ঝুঁকি, অন্যায় আচরণ, প্রতারণা ও শোষণ। দক্ষিন এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের অভিবাসী কর্মীদের অনেক বেশি খরচ করতে হয়। তাছাড়া অনেক সময় তারা দুদিক থেকেই (নিজের এবং যে দেশে যায় সেখানে) অন্যায় আচরণের শিকার হন। আর এটি বেশি হয় স্বল্পশিক্ষিত অদক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রে। অনেকদিন ধরে বলা হলেও বিদেশে কর্মী পাঠানোর জন্য তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হলেও অবস্থার তেমন হেরফের হয়নি।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বিদেশে কর্মসংস্থান এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর সাথে জড়িত সমস্যাগুলো এত গুরুতর যে সবদিক আমলে নিয়ে একটি সমন্বিত কর্মকৌশল গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে নীতি বাস্তবায়নের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতাকে মূলত প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও ক্ষমতার কাঠামোর ফল হিসেবে দেখা হয়। নতুন সরকারের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা কি দেখছেন?
রিজওয়ানুল ইসলাম: বাংলাদেশে নীতিমালা বাস্তবায়নের দুর্বলতা অবশ্যই একটি বড় সমস্যা। কিন্তু নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয়, কারণ শক্তিশালী গোষ্ঠিগুলো সেখানেই প্রভাব বিস্তার করে, যার ফলে নীতি কাঠামোই হয়ে যায় বিকৃত। প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াতে সরকার ও এসব গোষ্ঠির মধ্যে একটি “বন্দোবস্ত” কাজ করে। আর তাতে বলি হয় প্রকৃত উন্নয়ন। সম্প্রতি নির্বাচিত সংসদের সদস্যদের অর্থনৈতিক, পেশাগত ও সামাজিক পটভূমির দিকে তাকালে ক্ষমতার কাঠামোতে আগের তুলনায় তেমন বড় কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। সুতরাং যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরী হচ্ছে সেখানে খেলোয়ার বদল ছাড়া খেলার নিয়মকানুন বদলের কোনো সম্ভাবনা আছে কি না তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
স্ট্রিম: সরকার বদল হলেই অতীত মূল্যায়ন না করে পূর্ববর্তী সামাজিক কর্মসূচি বাতিলের একটি প্রবণতা আমাদের দেশে রয়েছে। নতুন ফ্যামিলি কার্ড বা অন্যান্য কর্মসূচির ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কোনো উদ্যোগ কি এবার দেখা যাচ্ছে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে নতুন সরকার এসে আগের সরকারের প্রায় সব কর্মসূচি বাতিল করে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু বর্তমান সরকার সে পথেই হাঁটবে এটি বলা যায় না কারণ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে যে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো চালু থাকবে। এর অবশ্য বিভিন্ন দিক রয়েছে। একদিকে এর যৌক্তিকতা রয়েছে কারণ কোনো কোনো কর্মসূচি (যেমন ভিজিডি, ভিজিএফ) থেকে সীমিত হলেও দরিদ্ররা উপকৃত হয়েছেন। সম্পূর্ণ নতুন এবং নগদ-ভিত্তিক সহায়তায় যাওয়ার আগে সেগুলোকে বাদ দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অন্যদিকে যুগপত্ভাবে সব কর্মসূচি চালু রাখার ফলে সরকারি বাজেটের ওপর চাপ বেড়ে যাবে। পুরনো এবং নতুন মিলিয়ে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারলে দর্তিদ্র শ্রেনীর জন্য যেমন ভালো হবে তেমনি সরকারের বাজেটের ওপর চাপ কমানো সহজ হবে।
স্ট্রিম: আপনি দীর্ঘদিন আইএলও-তে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন দেশের শ্রম ও উন্নয়ন নীতি কাছ থেকে দেখেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে- যেখানে একটি নতুন সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে — আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে জরুরি কিন্তু সবচেয়ে কম আলোচিত যে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার, সেটি কী?
রিজওয়ানুল ইসলাম: এখন কম আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর কথা বলতে গেলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে নতুন সরকারের পটভূমিতে। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকেই ঘটেছে উত্তরণ এবং পেয়েছি নতুন সরকার। কিন্তু বৈষম্যের কথা এখন আর বেশি শোনা যায় না। তবে এই প্রসঙ্গটির আলোচনায় আমি দুটি বিষয় আনব। প্রথমত, বৈষম্য শুধু চাকরির ক্ষেত্রে নয়, অর্থনীতি ও সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও— যেমন ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ, গ্রাম-শহর ইত্যাদি ক্ষেত্রে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে অসাম্য রয়েছে সেটিকেও গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। আয়ের বন্টনে অসাম্য বেড়ে এখন অনেক উঁচু পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে রয়েছে সুযোগের অসাম্য - যেমন ভালো মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে।
এই বহুমাত্রিক অসাম্য ও বৈষম্য কমানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে নতুন ধাঁচে সাজাতে না পারলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে না। আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি নীতিমালা প্রণয়নে আগের মতো গোষ্ঠী তোষণের রীতিই চালু থাকবে না কি সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে। গোষ্ঠীতোষণ ব্যবস্থায় নীতিমালা হয় ভ্রান্ত ও দুর্বল; ফল হয় অসম উন্নয়ন।
স্ট্রিম: ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কেমন আশা করছেন?
রিজওয়ানুল ইসলাম: আমি সবসময়ই আশাবাদী। আশা করছি সঠিক দিকে পরিবর্তনের। আশা করি আশাহত হব না।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
রিজওয়ানুল ইসলাম: ধন্যবাদ ঢাকা স্ট্রিমকেও।

ড. রিজওয়ানুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নিয়োগ খাতের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অতিথি বক্তা ও ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। উন্নয়ন অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বই লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন। বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান সংকট, শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত মজুরি হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাসহ নানা বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
স্ট্রিম: আপনার গবেষণায় দেখিয়েছেন প্রবৃদ্ধি হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মসংস্থান বাড়ে না। গত দুই দশকের উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার ক্রমশ কমছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হারের এই ক্রমাবনতিকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
রিজওয়ানুল ইসলাম: অনেক বছর ধরেই বিষয়টি নিয়ে আমি গবেষণা করছি। গবেষণায় দেখেছি যে কর্মসংস্থানের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রাথমিক শর্ত হলেও সেটা যথেষ্ট নয়। কী হারে কর্মসংস্থান বাড়বে তা নির্ভর করে প্রবৃদ্ধির ধরনের ওপর। অর্থাৎ কোন কোন খাতে প্রবৃদ্ধি বেশি হচ্ছে আর সে খাতগুলো উচ্চ হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক কি না।
বাংলাদেশের জন্য দুই দশকের বেশি সময়ের উপাত্ত আমরা বিশ্লেষণ করেছি। তাতে দেখা যায় যে ২০১০ সালের পর থেকে প্রবৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট হওয়া কর্মসংস্থানের পরিমান ও বৃদ্ধির হার ক্রমেই কমছে। ২০০০ থেকে ২০১০ সময়কালে প্রতি ১ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি থেকে কর্মসংস্থান বাড়তো তার অর্ধেক, অর্থাৎ ০.৫ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৬ সময়ে সেটা কমে ০.৩-এর নিচে নেমে যায়। তার পরেও এই সংখ্যাটি ০.৪-এর নিচেই রয়ে গিয়েছে। কিছুটা অতিরঞ্জনের সম্ভাবনা স্বীকার করলেও একদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে আর অন্যদিকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমেছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর পনেরো থেকে সতেরো লক্ষ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৬-১৭ এই এক বছরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় তেরো লক্ষ। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালে তা কমে মাত্র পাঁচ লক্ষতে দাঁড়ায়। আর তার পরের বছর কমেছে নয় লক্ষ। এই সংখ্যাগুলো থেকে বোঝা যায় যে প্রবৃদ্ধির সাথে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্পর্ক সরল রেখার মতো নয়।
স্ট্রিম: আর্থার লুইসের মডেল অনুযায়ী উদ্বৃত্ত শ্রম কৃষি থেকে শিল্পে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হওয়ায় শ্রমশক্তি উল্টো কৃষিমুখী হচ্ছে। প্রকৃত মজুরিও কমছে। তাহলে কি আমাদের কাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি কার্যত থমকে গেছে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ আর্থার লুইসের যে তত্ত্বটির কথা আপনি বললেন সেটি হচ্ছে এরকম যে, যেসব দেশে উদ্বৃত্ত শ্রম আছে সেসব দেশে আধুনিক খাতে, বিশেষ করে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়লে প্রকৃত মজুরি না বাড়িয়েই শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া যায়। কারণ কৃষিতে অনেক উদ্বৃত্ত শ্রম থাকে। সেখান থেকে একটা অংশ শিল্পে স্থানান্তরিত হতে পারে। কৃষির উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হওয়ার পর শিল্পখাতে শ্রমিকের মজুরি বাড়াতে হয়।
বাংলাদেশেও এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অংশ কমার বদলে বাড়ছে। এমনকি মোট সংখ্যাও বাড়ছে। অর্থাৎ শিল্প ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অনেকই আবার কৃষিমুখী হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, প্রকৃত মজুরিও কমছে। সুতরাং দেখা যায় লুইসের বর্ণনা করা কাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়া থমকে দাঁড়িয়েছে।
স্ট্রিম: ২০১৬-১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের প্রধান শিল্প তৈরি পোশাকে কর্মসংস্থান কমছে। শ্রম-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার কি আমাদের এই অকাল শিল্পায়ন-হ্রাসের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: বাংলাদেশে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের অংশ বেড়ে ১৪.৪২ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। আমার সে সময়কার লেখায় বলেছিলাম যে ড্যানি রদডরিকের প্রিম্যাচিউর ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু এর পরের উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। এটি বিশেষ করে ঘটছে দেশের প্রধান শিল্প তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে। এই খাতে কেন কর্মসংস্থান তেমনভাবে বাড়ছে না সেটি একটি গবেষনার বিষয়। বড় আকারের কারখানাগুলোতে শ্রম সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যায়। তবে খাতটিতে সামগ্রিকভাবে কী হচ্ছে সে বিষয়ে উপাত্তভিত্তিক বিশ্লেষণ করা দরকার।
স্ট্রিম: দেশে মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপের পাশাপাশি শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি ধারাবাহিকভাবে কমছে। মজুরি হ্রাসের এই প্রবণতা কি আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় ধরনের কোনো চাহিদা সংকট তৈরি করছে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: প্রকৃত মজুরির ওপর নির্ভর করে শ্রমিকের আয়, যা তার জীবনযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির জন্যও এর গুরুত্ব আছে। কারণ পণ্য এবং সেবার চাহিদা মানুষের আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আর বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে বৈদেশিক চাহিদার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদাও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি সঞ্চার করতে পারে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে। তার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের অন্যান্যদের আয়ও মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে এক ধরনের চাহিদা সংকট সৃষ্টি হতেই পারে।
স্ট্রিম: অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দেশে যেকোনো মূল্যে 'কাজের সুযোগ' তৈরি করাই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই প্রেক্ষাপটে অধিকার, সুরক্ষা ও সংলাপের মতো উপাদানগুলো বাদ দিয়ে কি ভালো মানের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব?
রিজওয়ানুল ইসলাম: শোভন কাজের চারটি স্তম্ভ আছে: কর্মসংস্থান, শ্রমিকের/কর্মীর অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, এবং সামাজিক সংলাপের। এই সংলাপ অর্থ কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনার সুযোগ। কেউ কেউ বলে থাকেন যে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে কাজের সুযোগই সীমাবদ্ধ, সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত কর্মসংস্থানকে। কথাটি একেবারে ভিত্তিহীন তা বলব না। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য যদি হয় ভালো মানের কাজ তাহলে বিষয়টিকে দেখতে হবে একটি সামগ্রিক কাঠামোতে। সেখান একটি টেবিলের কথা ভাবা যেতে পারে যা চারটি পায়ার ওপর দাঁড়ায়। তার কোনো একটি বা দুটি বাদ দিলে টেবিল দাঁড়াতে পারে না। শোভন কাজের ধারনাটি সেরকমই। গোড়ার কথা কর্মসংস্থান হলেও অন্য দিকগুলোর কথা ভুললে চলবে না।
স্ট্রিম: অনানুষ্ঠানিক খাতকে সাধারণত 'সমস্যা' হিসেবে দেখা হলেও এটি বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের এই খাতকে আসলে কোন দৃষ্টিতে দেখা উচিত?
রিজওয়ানুল ইসলাম: বাংলাদেশে এখনো মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। বহুদিন ধরে এ অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন দেখছি না। আর শিগগির তেমন পরিবর্তন হবে বলেও মনে করার বিশেষ কারণ নেই। সে অবস্থায় এই খাতকে কীভাবে দেখা হবে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মনে রাখতে হবে যে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না বলেই অনানুষ্ঠানিক খাতে বাড়ছে। আর জীবিকার জন্য এ ধরনের কর্মসংস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং নীতিমালা প্রণয়নে আমাদেরকে দুই ফ্রন্টে কাজ করতে হবে। একদিকে সুষ্ঠু নীতিমালার মাধ্যমে শিল্প ও সেবা খাতের আনুষ্ঠানিক অংশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতের অবস্থা কীভাবে উন্নত করা যায় সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সেখানে নিয়োজিতদের আয় বাড়ে এবং কাজের গুণগত মান ও পরিবেশ ভালো হয়।
স্ট্রিম: দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দেশে 'ফ্যামিলি কার্ড'-এর মতো লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করা কতটা চ্যালেঞ্জিং? এর ব্যয় ও ঝুঁকি কি সুবিধার চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: সামাজিক সুরক্ষার জন্য নগদ দেওয়া আর তার জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা একটি ভালো ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এই কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে এর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। আর সেখানে রয়েছে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, ঠিকভাবে উপকারভোগী চিহ্নিত করা যাতে যারা যোগ্য তারা সবাই সাহায্য পেতে পারে আর যারা যোগ্য নয় তারা এতে অন্তর্ভুক্ত না হয়। এটা নিশ্চিত করবার জন্য সঠিক উপাত্ত যেমন দরকার তেমনি প্রক্রিয়াটিকে রাজনীতিমুক্ত রাখাও জরুরি।
দ্বিতীয়ত, সঠিক প্রাপকের হাতে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য দরকার প্রশাসনিক দক্ষতা এবং তাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজ করতে পারলে একদিকে যেমন নৈপুণ্য বাড়ানো যাবে অন্যদিকে দুর্নীতির সম্ভাবনাও কমানো যাবে।
তৃতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর মধ্যে দরিদ্রদের জন্য যেসব কর্মসূচি রয়েছে তাদের কোনোকোনোটির উপকারভোগী হয়ত নতুন কর্মসূচি তে অন্তর্ভুক্ত হবেন। সেক্ষেত্রে আগেরগুলো চালু রাখা হবে না কি নতুনটির সাথে একীভূত করে একটি সমন্বিত কার্জকর্ম চালু করা যায় সেটি দেখা দরকার।
চতুর্থত, নতুন কর্মসূচির জন্য কত অর্থের প্রয়োজন হবে এবং জাতীয় বাজেটে তার প্রভাব কী হতে পারে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায় যে সম্পূর্ণ কর্মসূচির জন্য বাজেটের শতকরা তিন শতাংশ লাগবে। পরিমানটি তেমন বিশাল মনে না হলেও কম নয়।
পঞ্চমত, সামাজিক সুরক্ষার জন্য হলেও এ ধরনের কর্মসূচিকে উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করা যায় কি না তা ভাবা যেতে পারে। কোনো কোনো দেশে এটি করা হয় এবং ভালো ফল পাওয়া গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নগদ সহায়তার সাথে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের সেবার সংযোগ ঘটাতে পারলে একদিকে স্বল্পমেয়াদী সহায়তা যেমন দেওয়া হবে তেমনি দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখা যাবে।
স্ট্রিম: সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে সরাসরি নগদ হস্তান্তর প্রায়ই পণ্য-ভিত্তিক ভর্তুকির চেয়ে বেশি কার্যকর। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের বদলে ডিজিটাল ক্যাশ ট্রান্সফারের মডেল কি বাংলাদেশে কার্যকর হতে পারে? বিকাশের মতো বিদ্যমান অবকাঠামো এটিকে কতটা সহজ করতে পারে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: নগদ সহায়তা এবং পণ্য সহায়তার তুলনামূলক সুবিধা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে ঠিকই। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। ফ্যামিলি কার্ড ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে নগদ সহায়তা সঠিক উপকারভোগীর হাতে ঠিকমত পৌঁছাতে পারলে সামাজিক সুরক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির ফলে নগদের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই কমতে থাকবে। সুতরাং এটিকে মূল্যস্ফীতির সাথে প্রতিনিয়ত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ করবার ব্যবস্থা রাখতে হবে। সেদিক থেকে দেখলে পণ্য সহায়তার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ডকে কি বৃহত্তর 'সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো'-এর অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব?
রিজওয়ানুল ইসলাম: ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দিতে পারলে তা অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পণ্যের সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ মূলত রাজনৈতিক দর-কষাকষির ওপর নির্ভরশীল। এর সাথে উৎপাদনশীলতা বা মূল্যস্ফীতির কোনো স্বয়ংক্রিয় সম্পর্ক নেই। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় মজুরি নির্ধারণের কার্যকর মডেল কোন দেশগুলোতে দেখা যায়?
রিজওয়ানুল ইসলাম: ন্যুনতম মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতির ভালো উদাহরণ পাওয়া যায় পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশ (যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন) এবং যুক্তরাজ্য থেকে। তবে উন্নয়নশীল বিশ্বেও ভালো উদাহরণ পাওয়া যায়। সে প্রসঙ্গে ভারত, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার কথা উল্লেখ করা যায়। এই দেশগুলোতে ত্রিপক্ষীয়– অর্থাৎ সরকার, মালিক এবং শ্রমিক এই তিন পক্ষের সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমে ন্যুনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চালু আছে। তাছাড়া প্রতি দু বছরে মজুরি হালনাগাদের ব্যবস্থাও আছে।
স্ট্রিম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের প্রভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কি কর্মসংস্থান কমবে, নাকি নতুন সুযোগ তৈরি হবে? এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
রিজওয়ানুল ইসলাম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য স্বল্প মেয়াদের বা কোনো বিশেষ খাতের ওপর দৃষ্টি সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘ মেয়াদের কথা ভাবতে হবে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এর কারণ এই যে কোনো কোনো খাতে এটি ব্যবহার করা হলে সেখানে কিছু কাজ করার জন্য মানুষের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। তবে সেই সঙ্গে নতুন ধরনের কাজ সৃষ্টি হয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্ঠি হতে পারে। তাছাড়া অর্থনীতির সব খাতেই সমানভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ হবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে মেককিনজি কোম্পানি এক জরিপে দেখেছে যে পরের তিন বছরে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ কোম্পানি চাকরি কমে যাওয়ার কথা বলছে। আমাজন কোম্পানি বলছে তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাঁটাই করলেও সার্বিকভাবে কর্মী নিয়োগ করতেই থাকবে। সুইজারল্যান্ডের নীতিনির্ধারকগণ ২০২৫ সালে বলেছেন যে বেকারত্বের সামান্য বাড়লেও সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে হয়নি। মোদ্দা কথা হচ্ছে এই যে মানবসভ্যতার ইতিহাস প্রযুক্তিগত উন্নতির ইতিহাস। কিন্তু তার ফলে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান কমেনি বরং বেড়েছে।
বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায় যে শতকরা ৮৫ ভাগই এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। বাকি অংশের অতি অল্পসংখ্যক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের সুযোগ হবে। তার ফলে কিছু চাকরি হয়ত থাকবে না। কিন্তু নতুন ধরনের চাকরি সৃষ্টি হবে – যদিও তাদের জন্য অন্য ধরনের যোগ্যতা এবং দক্ষতার প্রয়োজন হবে। সুতরাং এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হবে শ্রমবাজারে সে ধরনের যোগ্যতা/দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী সরবরাহের ব্যবস্থা করা।
স্ট্রিম: রেমিট্যান্স অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হলেও, বিপুল সংখ্যক কর্মীর বিদেশযাত্রা কি আমাদের দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে? বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য আনা যায়?
রিজওয়ানুল ইসলাম: বাংলাদেশ থেকে কাজের জন্য অভিবাসন আসলে নেতিবাচক অবস্থা থেকে শুরু হয়েছে। দেশে যথেষ্ট পরিমানে কাজ পাওয়া যায় না বলেই মানুষ বিদেশে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য আয় বেশি হবে সে আশায়ও যায়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকি নিয়েও মানুষ বিদেশে যেতে যায়। এরকম অবস্থায় দক্ষ মানবসম্পদ হারানোর নেতিবাচক প্রভাব তেমন প্রযোজ্য নয়। আমি বরং অন্য কিছু সমস্যাকে বড় মনে করি। সে কথায় আসবার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার।
নেতিবাচক অবস্থা থেকে সৃষ্টি হলেও অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থ এখন আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে দেশে থেকে যাওয়া পরিবারের ভরণপোষণ এবং অন্যান্য খরচের জন্য ব্যবহার হয় বিদেশ থেকে আসা অর্থ। অন্যদিকে সে অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার আকারে আসে বলে দেশের সামষ্ঠিক অর্থনীতিতে তার ভূমিকা হয়ে উঠেছে অপরিহার্য।
আমার মতে মূল সমস্যাগুলো হলো উচ্চ ব্যয়, ঝুঁকি, অন্যায় আচরণ, প্রতারণা ও শোষণ। দক্ষিন এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের অভিবাসী কর্মীদের অনেক বেশি খরচ করতে হয়। তাছাড়া অনেক সময় তারা দুদিক থেকেই (নিজের এবং যে দেশে যায় সেখানে) অন্যায় আচরণের শিকার হন। আর এটি বেশি হয় স্বল্পশিক্ষিত অদক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রে। অনেকদিন ধরে বলা হলেও বিদেশে কর্মী পাঠানোর জন্য তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হলেও অবস্থার তেমন হেরফের হয়নি।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বিদেশে কর্মসংস্থান এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর সাথে জড়িত সমস্যাগুলো এত গুরুতর যে সবদিক আমলে নিয়ে একটি সমন্বিত কর্মকৌশল গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে নীতি বাস্তবায়নের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতাকে মূলত প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও ক্ষমতার কাঠামোর ফল হিসেবে দেখা হয়। নতুন সরকারের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা কি দেখছেন?
রিজওয়ানুল ইসলাম: বাংলাদেশে নীতিমালা বাস্তবায়নের দুর্বলতা অবশ্যই একটি বড় সমস্যা। কিন্তু নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয়, কারণ শক্তিশালী গোষ্ঠিগুলো সেখানেই প্রভাব বিস্তার করে, যার ফলে নীতি কাঠামোই হয়ে যায় বিকৃত। প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াতে সরকার ও এসব গোষ্ঠির মধ্যে একটি “বন্দোবস্ত” কাজ করে। আর তাতে বলি হয় প্রকৃত উন্নয়ন। সম্প্রতি নির্বাচিত সংসদের সদস্যদের অর্থনৈতিক, পেশাগত ও সামাজিক পটভূমির দিকে তাকালে ক্ষমতার কাঠামোতে আগের তুলনায় তেমন বড় কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। সুতরাং যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরী হচ্ছে সেখানে খেলোয়ার বদল ছাড়া খেলার নিয়মকানুন বদলের কোনো সম্ভাবনা আছে কি না তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
স্ট্রিম: সরকার বদল হলেই অতীত মূল্যায়ন না করে পূর্ববর্তী সামাজিক কর্মসূচি বাতিলের একটি প্রবণতা আমাদের দেশে রয়েছে। নতুন ফ্যামিলি কার্ড বা অন্যান্য কর্মসূচির ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কোনো উদ্যোগ কি এবার দেখা যাচ্ছে?
রিজওয়ানুল ইসলাম: অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে নতুন সরকার এসে আগের সরকারের প্রায় সব কর্মসূচি বাতিল করে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু বর্তমান সরকার সে পথেই হাঁটবে এটি বলা যায় না কারণ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে যে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো চালু থাকবে। এর অবশ্য বিভিন্ন দিক রয়েছে। একদিকে এর যৌক্তিকতা রয়েছে কারণ কোনো কোনো কর্মসূচি (যেমন ভিজিডি, ভিজিএফ) থেকে সীমিত হলেও দরিদ্ররা উপকৃত হয়েছেন। সম্পূর্ণ নতুন এবং নগদ-ভিত্তিক সহায়তায় যাওয়ার আগে সেগুলোকে বাদ দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অন্যদিকে যুগপত্ভাবে সব কর্মসূচি চালু রাখার ফলে সরকারি বাজেটের ওপর চাপ বেড়ে যাবে। পুরনো এবং নতুন মিলিয়ে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারলে দর্তিদ্র শ্রেনীর জন্য যেমন ভালো হবে তেমনি সরকারের বাজেটের ওপর চাপ কমানো সহজ হবে।
স্ট্রিম: আপনি দীর্ঘদিন আইএলও-তে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন দেশের শ্রম ও উন্নয়ন নীতি কাছ থেকে দেখেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে- যেখানে একটি নতুন সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে — আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে জরুরি কিন্তু সবচেয়ে কম আলোচিত যে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার, সেটি কী?
রিজওয়ানুল ইসলাম: এখন কম আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর কথা বলতে গেলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে নতুন সরকারের পটভূমিতে। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকেই ঘটেছে উত্তরণ এবং পেয়েছি নতুন সরকার। কিন্তু বৈষম্যের কথা এখন আর বেশি শোনা যায় না। তবে এই প্রসঙ্গটির আলোচনায় আমি দুটি বিষয় আনব। প্রথমত, বৈষম্য শুধু চাকরির ক্ষেত্রে নয়, অর্থনীতি ও সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও— যেমন ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ, গ্রাম-শহর ইত্যাদি ক্ষেত্রে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে অসাম্য রয়েছে সেটিকেও গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। আয়ের বন্টনে অসাম্য বেড়ে এখন অনেক উঁচু পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে রয়েছে সুযোগের অসাম্য - যেমন ভালো মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে।
এই বহুমাত্রিক অসাম্য ও বৈষম্য কমানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে নতুন ধাঁচে সাজাতে না পারলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে না। আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি নীতিমালা প্রণয়নে আগের মতো গোষ্ঠী তোষণের রীতিই চালু থাকবে না কি সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে। গোষ্ঠীতোষণ ব্যবস্থায় নীতিমালা হয় ভ্রান্ত ও দুর্বল; ফল হয় অসম উন্নয়ন।
স্ট্রিম: ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কেমন আশা করছেন?
রিজওয়ানুল ইসলাম: আমি সবসময়ই আশাবাদী। আশা করছি সঠিক দিকে পরিবর্তনের। আশা করি আশাহত হব না।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
রিজওয়ানুল ইসলাম: ধন্যবাদ ঢাকা স্ট্রিমকেও।

বিল পাসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের ঘটনাটি কেবল হতাশাজনক নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে বড় অশনিসংকেত। ড. ইউনূস সরকারের যে অল্প কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল, তার মধ্যে ছিল এ অধ্যাদেশগুলো।
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূলভিত্তি। স্বাধীনতার পর থেকেই কৃষি আমাদের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা করে আত্মনির্ভরতার দিকে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার যে গল্প, তার কেন্দ্রে
৫ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ঘোষিত দুই সপ্তাহের বিরতির মধ্যেই ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনাগুলো অনুষ্ঠিত হলো। এই সংঘাত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হয়ে দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিত
৭ ঘণ্টা আগে
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে বর্তমান সরকারের একটি উদ্যোগ। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যেক শিক্ষকের হাতে একটি করে ট্যাব পৌঁছে দেওয়া, যাতে তারা আধুনিক ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করতে পারেন।
৮ ঘণ্টা আগে