leadT1ad

সাক্ষাৎকারে মো. নাসির খান

বিদেশি বিনিয়োগ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা হয়রানি

‘জেনিস গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি)-এর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ-এরও সদস্য। দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ, রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণে বিরাজমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লাইসেন্স ও কর হয়রানি এবং শিল্প খাতের বর্তমান সংকট নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০২৬, ১৬: ৩৩
হয়রানি বিদেশি বিনিয়োগ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা। স্ট্রিম গ্রাফিক

স্ট্রিম: বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও ভিয়েতনাম বা সমসাময়িক দেশগুলোর তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের এই ধীরগতির কারণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জগুলো আসলে কোথায়?

মো. নাসির খান: আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন করেছেন। তৈরি পোশাক খাত বাদ দিলে বাংলাদেশে আরও অন্তত ১০টি বড় সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে। এর মধ্যে চামড়া, চামড়াজাত ও নন-লেদার পাদুকা, ব্যাগ, প্লাস্টিক, ফার্নিচার, ওষুধ, কৃষিপণ্য, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ উল্লেখযোগ্য। এই প্রতিটি খাতেই আমাদের ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু মূলত চারটি বড় বাধার কারণে আমরা এগোতে পারছি না। এককথায় বলতে গেলে সেই বড় বাধাগুলো হলো- লাইসেন্সিং ও নবায়ন জটিলতা, বন্ড ও কাস্টমসের মাত্রাতিরিক্ত নজরদারি, এনবিআর ও ট্যাক্স হয়রানি এবং বায়িং হাউস বা ট্রেডিং কোম্পানির রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা।

একটি ব্যবসা শুরু করতে আমাদের দেশে ৩০ থেকে ৩৫টি লাইসেন্স দরকার হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রতি বছর এগুলো নবায়ন করা। দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্রের কারণে এই নবায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীদের প্রচুর সময়, শ্রম ও উদ্যম নষ্ট হয়। গত ৫০ বছরে কোনো সরকার এদিকে নজর দেয়নি। অথচ সরকারের সদিচ্ছা থাকলে খুব সহজেই এটি সমাধান করা সম্ভব। ৩৫টি লাইসেন্সের বদলে মাত্র ৫টি বেসিক লাইসেন্স দেওয়া উচিত, যার মেয়াদ হবে কারখানা চালু থাকা পর্যন্ত। কারখানা বন্ধ করার সময় শুধু ঘোষণা দিয়ে দিলেই হবে। উন্নত দেশগুলোতে এমন নিয়মই চালু আছে। কিন্তু আমাদের এখানে জিরো টলারেন্সের নামে বছর বছর হয়রানি করা হয়। লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় আমরা বিদেশি ক্রেতাদের অডিটে ফেইল করি, ফলে বড় ক্রেতারা আসতে চান না।

স্ট্রিম: আপনি লাইসেন্সিং জটিলতার কথা বলছিলেন। কিন্তু রপ্তানির ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানি একটি বড় বিষয়। বন্ড বা কাস্টমসের দিক থেকে ব্যবসায়ীরা কি প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন?

মো. নাসির খান: এখানেই আমাদের দ্বিতীয় বাধাটি তৈরি হয়েছে। বন্ডের মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। আমরা কতটুকু কাঁচামাল আনছি, কোন অর্ডারে কতটুকু ব্যবহার করছি—তার প্রতিনিয়ত হিসাব দিতে হয়। বন্ড কমিশনারেটের এই চোর-পুলিশ খেলার কারণে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ।

সরকার এখন আবার নতুন নিয়ম করেছে—আমদানির জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। এমনিতেই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো রুগ্ন অবস্থায় আছে, তার ওপর ব্যাংক গ্যারান্টির জন্য ব্যবসায়ীদের টাকা আটকে থাকছে এবং ব্যাংককে বাড়তি চার্জ দিতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আনছে, আর সরকার ব্যবসায়ীদের চোর মনে করে ব্যাংক গ্যারান্টির ফাঁদে ফেলছে। অথচ সমাধানটা খুব সহজ। সরকার শুধু 'ভ্যালু এডিশন' বা মূল্য সংযোজন নির্ধারণ করে দিতে পারে। যেমন—আমি ১০০ টাকার কাঁচামাল আমদানি করলে, ১২০ টাকার পণ্য রপ্তানি করছি কি না, শুধু সেটা দেখলেই তো হয়।

আমাদের তৃতীয় বড় বাধা— এনবিআর ও ট্যাক্স হয়রানি। আমাদের দেশে প্রায় ৮ কোটি মানুষের কর দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও রিটার্ন জমা দেয় মাত্র ৪০-৫০ হাজার প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি। যারা নিয়মিত কর দেয়, এনবিআর তাদেরকেই 'সহজ শিকার' মনে করে বারবার হয়রানি করে। পাঁচ বছরের অডিটের নামে নোটিশ দিয়ে অযৌক্তিক ট্যাক্স চাপিয়ে দেওয়া হয়। এরপর কর কর্মকর্তারা সেটা সমাধানের জন্য সরাসরি ঘুষ দাবি করেন।

এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোর্টে যেতে হলেও ব্যবসায়ীদের ২০% টাকা আগে জমা দিতে হয়। ৫-৬ বছর আইনি লড়াইয়ের পর যখন প্রমাণিত হয় যে ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট ভুল ছিল, প্রতিষ্ঠান ততদিনে আর্থিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। অথচ যে কর্মকর্তা ভুয়া মামলা দিয়ে হয়রানি করলো, তার কোনো শাস্তি হয় না। ভুয়া মামলা দেওয়ার জন্য কর কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় না আনা পর্যন্ত এই হয়রানি বন্ধ হবে না। আর ডিজিটাল বা অনলাইনের নামে যা হচ্ছে, তা একধরনের প্রহসন। অনলাইনে সাবমিট করার পরও আবার হার্ডকপি জমা দিতে হয়।

স্ট্রিম: কর হয়রানির এই চিত্রটি সত্যিই হতাশাজনক। আপনি শুরুতে চারটি মূল বাধার কথা বলেছিলেন, যার তিনটি আমরা জানলাম। সর্বশেষ বা চতুর্থ বাধা হিসেবে আপনি কোন বিষয়টিকে চিহ্নিত করবেন?

মো. নাসির খান: চতুর্থ বাধাটি হলো— বায়িং হাউস বা ট্রেডিং কোম্পানির রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা। ৯০-এর দশকের আগে তরুণেরা ছোট ছোট বায়িং হাউস দিয়ে ব্যবসা শুরু করত এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের পর নিজেরাই কারখানার মালিক হতো। আমি নিজেও ১৯৮৮ সালে বায়িং হাউস দিয়ে জাপানে রপ্তানি শুরু করেছিলাম। কিন্তু সরকার আইন করে ট্রেডিং বা বায়িং হাউসগুলোর রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। বলা হয়েছে, কেবল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানই রপ্তানি করতে পারবে। বিশ্বের কোনো সভ্য দেশে এমন আইন নেই। উৎপাদন এবং মার্কেটিং—দুটো সম্পূর্ণ আলাদা দক্ষতা। আমাকে যদি কারখানায় উৎপাদনও দেখতে হয়, আবার ক্রেতা খুঁজতে সারা বিশ্বে দৌড়াতে হয়, তাহলে আমি প্রোডাকশনে সময় দেব কীভাবে? এই অদ্ভুত নিয়মের কারণে ব্যবসায়ীরা কারখানায় সময় দেওয়ার বদলে সারা বছর মার্কেটিংয়ে দৌড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্ট্রিম: সরকার কেন ট্রেডিং বা বায়িং হাউসগুলোকে রপ্তানির সুযোগ দিচ্ছে না? এটা কি আমাদের রপ্তানি খাতকে আরও প্রসারিত করতে সহায়ক হতো না?

মো. নাসির খান: এর সঠিক ব্যাখ্যা সরকারই ভালো দিতে পারবে। তবে রপ্তানি বাড়াতে চাইলে সবার জন্যই এই সুযোগ উন্মুক্ত থাকা উচিত। এখনকার তরুণরা ঘরে বসে কেবল একটি ল্যাপটপ বা মোবাইল দিয়েই ব্যবসা করতে পারে। আমি যখন জাপানে ব্যবসা শুরু করি, তখন আমার ছোট অ্যাপার্টমেন্টটাই ছিল আমার অফিস; পুঁজি বলতে ছিল শুধু একটা ল্যান্ডফোন, ফ্যাক্স মেশিন আর টাইপরাইটার।

উন্নত বিশ্বে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি রপ্তানি করে না। তাদের বিভিন্ন এজেন্ট বা রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকে, যারা কমিশনের ভিত্তিতে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে। এতে কারখানার কোনো বাড়তি খরচ হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে নিয়ম করা হয়েছে—কেবল উৎপাদনকারীই রপ্তানি করতে পারবে। সরকার যুক্তি দেয় যে, উৎপাদনকারীদের ইনসেনটিভ (প্রণোদনা) দেওয়া হয়। অথচ নিয়মটা এমন হওয়া উচিত যে, বন্দর দিয়ে যার নামে পণ্যটি রপ্তানি হবে এবং যার নামে পিআরসি (প্রসিডস রিয়ালাইজেশন সার্টিফিকেট) আসবে, সে-ই প্রণোদনা পাবে। আমলারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই এসব অবাস্তব আইন তৈরি করে রেখেছেন।

স্ট্রিম: বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই আসার ক্ষেত্রেও কি এই আইনগুলো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

মো. নাসির খান: অবশ্যই। আমরা জুতা শিল্পের প্রসারে 'বাংলাদেশ শু সিটি' নামে একটি প্রকল্প করেছিলাম, যেখানে জমি ও রেডি বিল্ডিং আমরাই দিচ্ছিলাম যাতে বিদেশিরা শুধু মেশিন এনে কাজ শুরু করতে পারে। কিন্তু বিদেশিরা যখন দেখল এখানে ৩৫টি লাইসেন্স লাগে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের কোনো নিশ্চয়তা নেই, তখন তারা পিছিয়ে গেল।

এর পাশাপাশি রয়েছে ভিসার চরম হয়রানি। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী এখানে এসে কাজ গোছাতে তিন-চার মাস সময় লাগতেই পারে। কিন্তু নিয়ম করে রাখা হয়েছে, তিন মাসের বেশি থাকলে ৫ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে অথবা ই-ভিসা নিতে হবে। অথচ ফ্যাক্টরিই হলো না, সে ই-ভিসা পাবে কীভাবে? বিদেশিদের জন্য ১০০ পৃষ্ঠার ভিসার গাইডলাইন বানিয়ে রাখা হয়েছে, যা পড়লে যে কেউ ভয় পেয়ে পালাবে। বর্তমানে দেশে নতুন কোনো এফডিআই আসছে না। বাটা বা বিএটি-র মতো পুরোনো কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ করছে, আর সরকার সেটাকেই নতুন এফডিআই হিসেবে দেখিয়ে জনগণকে ধোঁকা দিচ্ছে।

স্ট্রিম: বাংলাদেশের চামড়া শিল্প একসময় তৈরি পোশাকের পরেই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত ছিল। গত ৫৫ বছরে আমরা এতটা পিছিয়ে পড়লাম কেন?

মো. নাসির খান: লেদার সেক্টরে ভ্যালু এডিশন বা মূল্য সংযোজন প্রায় ৮০%। একসময় বিশ্ববাজারে ফ্রেঞ্চ কাফ-এর (ছোট গরুর চামড়া) পরেই বাংলাদেশের চামড়ার কদর ছিল। আমাদের গরুর আকার ছোট হওয়ায় চামড়ার গ্রেইন ছিল অত্যন্ত ঘন ও মজবুত। জাপানি ক্রেতারা আমাদের চামড়া দেখে অবাক হয়ে যেত।

কিন্তু এখন চামড়ার দাম এত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এর কোনো কদর নেই। একটি চামড়ার দাম যদি ১০ হাজার টাকা হতো, তবে মানুষ গরুর যত্ন নিতো, চামড়া সাবধানে ছাড়াতো। এখন ৩০০-৪০০ টাকা দাম হওয়ায় কসাইরা চামড়ার দিকে নজর না দিয়ে মাংস বেশি বের করার জন্য চামড়া কেটে ফেলছে।

এর পেছনে একটা বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রও ছিল। একটি বন্ধু রাষ্ট্রকে খুশি করতে পলিসি করে আমাদের লেদার সেক্টরকে ধ্বংস করা হয়েছে। যেদিন হাজারীবাগে গ্যাসের লাইন কাটা হলো, সেদিনই ভারতের বনগাঁওয়ে লেদার ইন্ডাস্ট্রি উদ্বোধন করা হলো। বুড়িগঙ্গা বাঁচানোর কথা বলে কারখানাগুলো সাভারে নেওয়া হলো, অথচ সেখানে কোনো প্রস্তুত অবকাঠামো ছিল না। ২০০ কোটি টাকার সেন্ট্রাল ইটিপি-র বাজেট দুর্নীতির মাধ্যমে ১২০০ কোটিতে দাঁড়াল, কিন্তু আজও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে, মালিকদের নিজেদের ইটিপি বানানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ ৭ বছর আইনি লড়াইয়ের পর যখন অনুমতি মিলল, ততদিনে কারখানাগুলো রুগ্ন হয়ে পড়েছে, ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং ব্যাংক ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার নিজের হাতে এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে গলা টিপে হত্যা করেছে।

এবারের কোরবানির ঈদে প্রায় ৪০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়েছে। আগামী বছর অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে। এর মূল কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের চামড়ার কোনো চাহিদা নেই। সারাবিশ্ব জানে আমাদের ইটিপি নেই এবং এলডব্লিউজি সার্টিফিকেট নেই। আগে বিদেশি ক্রেতারা কিছুটা ছাড় দিত, আমরা অন্য দেশের চামড়ার সাথে লোকাল চামড়া মিশিয়ে রপ্তানি করতে পারতাম। কিন্তু এখন তারা অত্যন্ত কঠোর। তারা এখন বারকোড দিয়ে চামড়ার উৎস খোঁজে। আগামী বছর এই নিয়ম আরও কড়াকড়ি হবে। তখন হয়তো চামড়া বিক্রি তো দূরের কথা, উল্টো পকেটের টাকা খরচ করে বর্জ্য হিসেবে চামড়া ফেলে দিয়ে আসতে হবে।

স্ট্রিম: চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বার্ষিক ১২ বিলিয়ন ডলার আয়ের যে কথা বলা হচ্ছে, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিল্পের পক্ষ থেকে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপগুলো কী হতে পারে?

মো. নাসির খান: চামড়া, চামড়ার জুতা, সিনথেটিক জুতা এবং ব্যাগ ও বেল্ট—এই চারটি খাতের প্রতিটিতে ৫ বিলিয়ন ডলার করে রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এর জন্য বিশাল কোনো আইনের প্রয়োজন নেই, কেবল সরকারের সদিচ্ছা আর এক্সিকিউটিভ অর্ডারই যথেষ্ট। প্রধান তিনটি পদক্ষেপ হতে পারে:

প্রথমত, আমলাতন্ত্রের সংস্কার; আমাদের দেশে আমলারা বছর বছর মন্ত্রণালয় পরিবর্তন করেন। আজ যিনি মৎস্য মন্ত্রণালয়ে, কাল তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চলে যান। অন্যদিকে মন্ত্রীরা আসেন রাজনীতির মাঠ থেকে, যাদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো জ্ঞানই নেই। জাপানের 'মেইটি'র মতো আমাদেরও আমলাদের নির্দিষ্ট খাতে স্থায়ী করতে হবে, যেন তারা সেই খাতের বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, লাইসেন্সিং প্রথা বাতিল করা। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এতগুলো লাইসেন্সের কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা শ্রমিকদের ঠিকমতো বেতন দিচ্ছি কি না, কারখানার পরিবেশ ঠিক আছে কি না—তা বিদেশি ক্রেতাদের নিজস্ব কমপ্লায়েন্স অডিটররাই (যেমন: বিএসসিআই) কঠোরভাবে তদারকি করে। বায়ারের দেশের আইন মানলেই যেখানে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ সরকারের অহেতুক লাইসেন্সিং কেবল দুর্নীতি ও হয়রানিই বাড়ায়। এগুলো এসআরও জারি করে বাতিল করতে হবে।

তৃতীয়ত, 'ভ্যালু এডিশন' বা মূল্য সংযোজন পদ্ধতি চালু করা। বন্ডের জটিলতা বাদ দিয়ে ভ্যালু এডিশন পদ্ধতি চালু করতে হবে। এটি করা হলে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাচার বন্ধ হবে। বর্তমানে ব্যাংকে শতকোটি টাকার লিমিট থাকলে কাঁচামাল আমদানির নামে ওভার-ইনভয়েসিং করে অনায়াসেই টাকা পাচার করা সম্ভব। ভ্যালু এডিশন সিস্টেমে উৎপাদিত পণ্যের প্রকৃত হিসাব রাখলে সরকার লাভবান হবে, হয়রানি কমবে এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবে।

স্ট্রিম: বন্ড সিস্টেমটা কেন বন্ধ করতে বলছেন? তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রে তো একসময় বন্ড সিস্টেম বা ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

মো. নাসির খান: একসময় তো অ্যানালগ ফোনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু এখন তো আর তার ব্যবহার নেই। এখন তো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির প্রয়োজনই নেই, কারণ এর চেয়ে সহজ সিস্টেম চলে এসেছে। আমরা এখন ডিএ (ডকুমেন্টারি একসেপট্যান্স) বা চুক্তির বিপরীতে সরাসরি মাল আনতে পারি। বন্ড সিস্টেমের মূল উদ্দেশ্য ছিল, আমদানিকৃত কাঁচামাল যেন স্থানীয় বাজারে বিক্রি না হয়ে রপ্তানি হয়, তা নিশ্চিত করা। আমি মনে করি, বন্ডের বদলে শুধুমাত্র 'ভ্যালু এডিশন' বা মূল্য সংযোজন পদ্ধতি চালু করলেই এই উদ্দেশ্য পূরণ হয়।

বর্তমানে বন্ডের যে নিয়ম, তাতে কয়টা জুতার ফিতা বা কয়টা ওয়াশার আমদানি করলাম, তার হিসাব গুনে গুনে বন্ড কর্মকর্তাদের বোঝাতে হয়। তাদের ১৫-২০ পৃষ্ঠার ইউপি (ইউটিলাইজেশন পারমিশন) রিপোর্ট দিতে হয়। এই জটিল হিসাব তারা বুঝুক বা না বুঝুক, ঘুষের বান্ডিল ভারী হলেই তাদের কাছে সব ঠিক।

এই অযৌক্তিক নজরদারির কারণে ব্যবসায়ীদের সময়, টাকা ও মেধা সব কিছু সরকারি কর্মকর্তাদের পেছনেই নষ্ট হচ্ছে। ফলে উৎপাদনে বা ক্রেতা খোঁজার কাজে মনোযোগ দেওয়ার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। এর চেয়ে ভ্যালু এডিশন পদ্ধতি অনেক সহজ। এনবিআরের 'অ্যাসাইকুডা' সিস্টেমে খুব সহজেই দেখা যায় আমি কত টাকার মাল আনলাম আর ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে দেখা যায় কত টাকার মাল রপ্তানি করলাম। এই সহজ পদ্ধতি রেখে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার কোনো মানে হয় না। যারা হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করে, তারা এই ব্যবস্থায় স্মার্ট বলে বিবেচিত হয়, আর আমরা যারা সৎভাবে ব্যবসা করে ২-৫ সেন্ট লাভের জন্য দিনরাত লড়াই করি, তারা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হই।

স্ট্রিম: চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ভিয়েতনাম, ভারত ও ইথিওপিয়ার তুলনায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

মো. নাসির খান: ভিয়েতনাম আমাদের অনেক পরে শিল্পায়ন শুরু করেছে। আমরা ৯০-এর দশক থেকেই জুতা রপ্তানি শুরু করেছিলাম এবং তখন আমাদের রপ্তানি আয় ছিল ১ বিলিয়ন ডলার। আজও আমরা সেই ১ বিলিয়নেই আটকে আছি। অন্যদিকে, ২০০০ সালের পর যাত্রা শুরু করে ভিয়েতনাম এখন বছরে ৪০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করছে, যেখানে তাদের জনসংখ্যা মাত্র ৭ কোটি। আর আমরা ১৮ কোটি মানুষ জোড়াতালি দিয়ে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করছি, যার আবার বড় অংশই কাঁচামাল আমদানির খরচ।

ভিয়েতনামের এগিয়ে যাওয়ার মূল কারণ তাদের সহজ পলিসি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না থাকা। আপনি ইন্টারনেটে খুঁজলেই ভিয়েতনামে ব্যবসা করার নিয়মকানুন পরিষ্কারভাবে পেয়ে যাবেন। আর আমাদের দেশের আইন এতই অস্পষ্ট যে, বিনিয়োগকারীরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যান। আমরা একসময় ভিয়েতনামের চেয়ে ভালো অবস্থায় ছিলাম, আর এখন আমাদের তুলনা করা হয় নেপাল, ভুটান বা আফগানিস্তানের সাথে। এই পরিস্থিতির কারণে তরুণ প্রজন্ম বা আমাদের সন্তানেরাও আর ব্যবসায় আসতে চাইছে না।

স্ট্রিম: ব্যবসায়ীরা কতটা রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হন? এর প্রভাব কেমন?

মো. নাসির খান: রাজনৈতিক হয়রানি আমাদের দেশে ব্যবসাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক লীগ বা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা এসে চাঁদাবাজি করে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা লাইসেন্স ফি-এর নামে বিশাল অংকের টাকা আদায় করেন। একটি কারখানার আয়তন যদি ১ লাখ স্কয়ার ফিট হয়, তবে প্রতি স্কয়ার ফিটে ৬ টাকা করে ট্রেড লাইসেন্স ফি দিতে হয়, যা প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। এর বাইরে হোল্ডিং ট্যাক্সও দিতে হয়। এতগুলো ধাপে শোষণ করলে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকবে কীভাবে?

আর এনবিআরের কথা তো বলাই বাহুল্য। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময় যে সহজ সিস্টেমগুলো ছিল, এনবিআর টাকা কামানোর ধান্দায় সেগুলোকে জটিল করে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, এখন ইন্ডাস্ট্রি চালানোই দুরূহ হয়ে পড়েছে।

স্ট্রিম: উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ রপ্তানি করতে পারবে না—এই নিয়মটি আমাদের কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে?

মো. নাসির খান: সরকার এই নিয়ম করেছে যাতে কেবল উৎপাদনকারীই প্রণোদনা বা ইনসেনটিভ পায়। কিন্তু এই নিয়মটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। উৎপাদক এবং ট্রেডারের মধ্যে তো নিজস্ব চুক্তি থাকতে পারে। যে মালটি বন্দর দিয়ে রপ্তানি হবে, সে-ই প্রণোদনা পাক, তাতে তো সরকারের কোনো ক্ষতি নেই।

ট্রেডিং বা বায়িং হাউসগুলো উন্মুক্ত থাকলে হাজার হাজার তরুণ ঘরে বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কেটিং করত। তারা ২০ জোড়া, ৫০ জোড়া জুতার অর্ডার পেলেও দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হতো। ভারতে বা ভিয়েতনামে ঠিক এই কাজটিই হয়। ইউরোপ বা আমেরিকার ছোট বুটিক শপগুলো অনলাইনে ভারতের কোনো ট্রেডারের কাছ থেকে ২০ জোড়া জুতা অর্ডার করে কুরিয়ারে আনিয়ে নেয়। ভারত বা ভিয়েতনাম এই ছোট ছোট রপ্তানিকে উৎসাহিত করে, কারণ দিনশেষে টাকাটা তাদের দেশেই ঢুকছে। আর আমরা আইন করে এই সম্ভাবনাকে হত্যা করছি।

স্ট্রিম: চীন কীভাবে এত দ্রুত রপ্তানিতে এগিয়ে গেল?

মো. নাসির খান: চীনের এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ তাদের সহজ ও উন্মুক্ত রপ্তানি পলিসি। চীন থেকে যখন বাংলাদেশে পণ্য আমদানি হয়, তখন অনেক সময় 'আন্ডার-ইনভয়েসিং' করা হয়। যেমন, ২০ হাজার ডলারের এক কন্টেইনার পণ্য তারা ইনভয়েসে হয়তো দেখাল মাত্র ২ হাজার ডলার। চীনের সরকার খুব ভালো করেই জানে যে মালের প্রকৃত দাম অনেক বেশি। কিন্তু তারা এটা আটকায় না। কারণ তারা জানে, বাকি ১৮ হাজার ডলার কোনো না কোনোভাবে তাদের দেশেই ঢুকবে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো পণ্যটি যেন দেশ থেকে বের হয়ে বিশ্ববাজার দখল করে।

আর আমাদের দেশে কাস্টমস কর্মকর্তারা ইনভয়েস ভ্যালু বা মালের ওজন নিয়ে প্রতিনিয়ত দরকষাকষি করে। তারা ঘুষের বিনিময়ে আন্ডার-ইনভয়েসিং মেনে নেয়, যা দেশের রাজস্বের চরম ক্ষতি করছে। ভিয়েতনাম বা চীন তাদের ব্যবসায়ীদের ওপর সরকারের নজরদারি শিথিল করে কেবল রপ্তানি ও বিশ্ববাজার দখলের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। আমাদেরও উচিত অপ্রয়োজনীয় আইনকানুন ও হয়রানি বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সহজ ও উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।

স্ট্রিম: ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতার কথা বলছিলেন। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ছে এবং এর সমাধান কোথায়?

মো. নাসির খান: আমাদের সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশই এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রিটেইলার জাপানি ব্র্যান্ড 'ইউনিক্লো' বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করেছিল। কিন্তু তারা এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছে। কারণ তারা আমাদের দেশের এই রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতি, চুরি ও পদে পদে বাধা দেওয়াকে মেনে নিতে পারেনি।

বাংলাদেশের ব্যবসাক্ষেত্র এখন ক্যান্সারের শেষ ধাপে উপনীত। একে বাঁচাতে হলে এখনই কড়া 'কেমোথেরাপি' অর্থাৎ ব্যাপক ও কঠোর সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে আমরা যে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করতে যাচ্ছি তা কোনো কাজেই আসবে না।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত