জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

এ কে এনামুল হকের সাক্ষাৎকার

ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতার চেয়ে এখন গ্রাহকের ‘গোপনীয়তা’ রক্ষা বেশি জরুরি

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক। এর আগে তিনি ছিলেন ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ ক্যাম্পাসের ডেপুটি ভাইস চ্যান্সেলর। এছাড়া তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাজার ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৩২
এ কে এনামুল হক। স্ট্রিম ছবি

স্ট্রিম: অনেকেই অভিযোগ করেন যে রাজনীতিতে গুণগত মান কমে গেছে এবং সৎ মানুষেরা রাজনীতিতে আসতে চান না। দীর্ঘদিনের এই চর্চা বা মেধাবীদের রাজনীতি বিমুখতার কারণ ও প্রভাবকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

এ কে এনামুল হক: আমরা বহুদিন ধরে রাজনীতিকে দেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় মনে করছি এবং মেধাবী ও ভালো ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। এটি আমাদের সামাজিক চেতনার অভাব। অথচ বাস্তবতা হলো, রাজনীতি দেশের অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অংশ। আমরা যখন মেধাবীদের বলছি যে তোমার রাজনীতি করার দরকার নেই, তখন রাজনীতিতে তারাই যোগ দিচ্ছে—যারা লোভী এবং যারা রাজনীতিকে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে দেখে। তাদের কাছে দেশ গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে গত ১৫ বছর শুধু নয়, গত ৪০-৫০ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, সময়ের সাথে সাথে রাজনীতি মেধাবী ও ভালো মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। একসময় সৎ ও ভালো মানুষ রাজনীতি করতেন, এখন তাঁরা সরে গেছেন। সুতরাং, এটি আমাদের সামাজিক চেতনা ও চিন্তার দৈন্য। আমি মনে করি, এদিকে নজর দেওয়া উচিত। মানুষের বোঝা উচিত যে রাজনীতি খারাপ কিছু নয়, এটি সবার জন্য। সবার রাজনীতি সচেতন হওয়া উচিত। যখন ভালো মানুষ রাজনীতিতে আসবে, তখনই রাজনীতি সুন্দর হবে। অন্যথায়, এই অসুন্দর রাজনীতির চর্চা চলতেই থাকবে।

স্ট্রিম: বিগত দেড় দশকে আমরা দেখেছি ব্যবসায়ীরা সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন এবং সংসদে তাদের আধিপত্য বেড়েছে। রাজনীতি ও অর্থনীতির এই যে 'নেক্সাস' বা ব্যবসায়ীদের রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার প্রবণতা—এটি দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে আপনি মনে করেন?

এ কে এনামুল হক: রাজনীতি যদি জনগণের পৃষ্ঠপোষকতা না করে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা করে, কিংবা রাজনীতি যদি কেবল ব্যবসায়ীদের সহায়তা করে—তবে গত ১৫-১৬ বছরে আমরা যা দেখেছি তা হলো, ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ হয়ে গেছেন। একসময় সংসদে ৬০-৭০ শতাংশ এমপি ছিলেন মূলত রাজনীতিবিদ, যাঁরা হয়তো পার্টটাইম ব্যবসা করতেন। এখন মূলত ব্যবসায়ীরাই এমপি হন। এই যে নেক্সাস তৈরি হয়েছে, একেই পশ্চিমাদের ভাষায় ‘অলিগার্ক’ বলা যায়। অনেকে একে ‘লুম্পেন রাজনীতি’ও বলেন। আমার মতে, এই গোষ্ঠীটিই এখন উঠে এসেছে। তবে ভালো দিক হলো, ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্নভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ফলে তাঁরা হয়তো বুঝতে পারবেন যে, দীর্ঘমেয়াদে নিরপেক্ষ থাকাই শ্রেয়। তাঁরা যদি নিরপেক্ষ থেকে চিন্তা করেন যে, ‘আমি কোনো দলের নই, আমি দেশের; আমার কোম্পানি দেশের সম্পদ’, তাহলে সুস্থ অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। আর যদি তাঁরা রাজনীতির মাধ্যমে টাকা আয়ের চিন্তা করেন, তবে অর্থনীতি বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তখন সবাই রাতারাতি কোটিপতি হতে চাইবে এবং দেশ থেকে সম্পদ বিদেশে পাচার করতে চাইবে। আমার ধারণা, রাজনীতি ও অর্থনীতির এই অশুভ খেলার মাধ্যমেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

স্ট্রিম: বলা হয়ে থাকে ১/১১-এর পর ভয় থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে। বর্তমানেও বিভিন্ন ব্যক্তির হিসাব জব্দ করা হচ্ছে। এটি কি সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন?

এ কে এনামুল হক: ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণেই এমনটা ঘটছে। সমস্যা হলো, যারা জড়িত নন, তাঁরাও এই ফাঁদে পড়ছেন অথবা আমাদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনীতি ঢুকে গেছে। তবে এটি সত্য যে, ব্যবসায়ীরা যদি দেশে স্বস্তি না পান এবং মনে করেন সরকার যেকোনো সময় তাঁদের সম্পদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে, তবে তাঁরা দেশে টাকা না রেখে বিদেশে পাচার করবেন। টাকা পাচারের ফলে দেশে মুদ্রাস্ফীতিও বাড়ে। কারণ ডলার দেশ থেকে চলে গেলেও সমপরিমাণ দেশীয় টাকা বাজারে থেকে যায়, কিন্তু তা আর ব্যাংকে জমা হয় না।

আমার মতে, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের তথ্য দেখতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া বা ওয়ারেন্ট থাকা জরুরি, যেমনটা বাড়িতে তল্লাশির ক্ষেত্রে হয়। কিন্তু বর্তমানে সামান্য লেনদেনেও কড়াকড়ি বা অটো-রিপোর্টিংয়ের কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পায়। ফলে বিশাল অংকের টাকা ব্যাংকিং খাতের বাইরে থাকছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে নতুন টাকা ছাপাতে হয়, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি অবধারিতভাবেই বেড়ে যায়। তাই ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

স্ট্রিম: টাকার বিনিময়ে ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্ট খোলার বা বন্ধ করার অভিযোগ উঠছে। এটি অর্থনীতির জন্য কতটা সুখকর?

এ কে এনামুল হক: এটি মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এর পেছনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও কিছু মানুষের অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করছে। পুলিশ বা অন্য সংস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হলে এবং নিজের টাকা ব্যবহার করতে না পারলে মানুষ ব্যাংকের ওপর আস্থা হারাবে। তারা তখন টাকা ব্যাংকে না রেখে নিজের কাছে রাখবে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতকেই ধ্বংস করবে।

ব্যাংকিং খাতে হাত দেওয়ার আগে সরকারের সতর্ক হওয়া উচিত। কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি হোক, কিন্তু বিনা দোষে টাকা আটকে রাখা বা হয়রানি করা হলে সৎ ব্যবসায়ীরাও টাকা বিদেশে পাচার করতে বাধ্য হবেন। উন্নত অর্থনীতি গড়তে হলে নিয়মকানুন বা রেগুলেশন হতে হবে ‘ন্যায্য’। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নেই বলে বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ব্যাংকের বাইরে রয়ে গেছে। অথচ বড় ব্যবসার বিকাশের জন্য ব্যাংক অপরিহার্য। তাই ব্যাংকিং খাতকে সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ করতে না পারলে দেশের বড় একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নষ্ট হবে।

স্ট্রিম: অর্থ পাচার বা ডলার বাইরে যাওয়ার পেছনে শিক্ষা বা চিকিৎসার মতো যৌক্তিক কারণও রয়েছে। এক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?

এ কে এনামুল হক: অর্থ পাচার বা দেশ থেকে ডলার চলে যাওয়ার পেছনে চিকিৎসার মতো যৌক্তিক কারণও রয়েছে। মানুষ যখন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর ভরসা করতে পারে না, তখন জীবন বাঁচাতে বিদেশে টাকা রাখতে বাধ্য হয়। এছাড়া আরেকটি বড় শ্রেণি দেশান্তরী হওয়ার মানসিকতা থেকে টাকা পাচার করে। বিশেষ করে যাদের সন্তানরা বিদেশে স্থায়ী হচ্ছে বা যারা মনে করে দেশে ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়, তারা সব সম্পদ বিক্রি করে টাকা নিয়ে যায়। দুর্নীতিগ্রস্তদের বাইরে সাধারণ মানুষও এই আস্থার সংকটের কারণে দেশ ছাড়ছে।

রাজনীতি যদি জনগণের পৃষ্ঠপোষকতা না করে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা করে, কিংবা রাজনীতি যদি কেবল ব্যবসায়ীদের সহায়তা করে—তবে গত ১৫-১৬ বছরে আমরা যা দেখেছি তা হলো, ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ হয়ে গেছেন।

বর্তমানে নতুন প্রজন্মের অনেকেও দেশে থাকতে চাইছে না। এর অন্যতম কারণ হলো আমরা তাদের সামনে দেশটাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছি। এক্ষেত্রে মিডিয়ার দায় রয়েছে। বিদেশি মিডিয়া তাদের দেশের নেতিবাচক দিক আড়াল করলেও, আমাদের মিডিয়া দেশের খারাপ দিকগুলোই বেশি প্রচার করে। এতে মানুষের মনে হতাশা বাড়ে। এছাড়া উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে যায়, যার ফলে টিউশন ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই সংকট কাটাতে হলে দেশে উন্নত চিকিৎসা ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে এ দেশেই তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ ও আনন্দদায়ক। এর জন্য প্রয়োজন একটি ‘ন্যায়পরায়ণ’ বা ‘ফেয়ার’ সমাজ ব্যবস্থা। সমাজে বৈষম্য থাকতেই পারে, কিন্তু বিচার বা সুযোগের ক্ষেত্রে তা যেন ন্যায্য হয়। আমরা যদি সমাজে এই ন্যায্যতা বা সুবিচার নিশ্চিত করতে না পারি, তবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মেধা ও অর্থ পাচার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

স্ট্রিম: বাংলাদেশের অর্থনীতির ৮০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক খাত। এ খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি?

এ কে এনামুল হক: অনানুষ্ঠানিক খাত বা ইনফরমাল ইকোনমি বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হলেও, এই খাত জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত নয়—এমন ধারণা ভুল। মূলত অবৈধ অর্থনীতি ছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতের অবদান জিডিপিতে যুক্ত হয়।

এই খাতকে জোর করে আনুষ্ঠানিক বা ফরমাল কাঠামোয় আনার চেষ্টা না করে, বরং একে সহজভাবে বাড়তে দেওয়া উচিত। যেমন, আমাদের দেশে পুরনো পত্রিকা দিয়ে প্যাকেট বানানো হয়, যা একধরনের রিসাইক্লিং। কিন্তু পশ্চিমা সংজ্ঞায় না পড়ায় ব্যাংকগুলো এসব ছোট উদ্যোক্তাকে ঋণ দিতে চায় না। ফলে তারা বড় হতে পারছে না।

সবকিছুকে ফরমাল করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে, অনানুষ্ঠানিক খাতকে অনানুষ্ঠানিক রেখেই বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের জটিলতা কমিয়ে মাইক্রোফাইন্যান্স বা ব্র্যাক ব্যাংকের মতো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে কাজে লাগানো যেতে পারে। অর্থনীতি বড় করার জন্য সব কিছুকে আনুষ্ঠানিকীকরণের প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি।

স্ট্রিম: বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি বিশ্বের বর্তমান প্রবণতার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এ কে এনামুল হক: আমাদের ওপর এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রভাব প্রবল। ইংরেজি ভাষা জানা এবং ইউরোপীয়দের শ্রেষ্ঠ ভাবার কারণে আমরা সব সময় পাশ্চাত্যের দিকে ঝুঁকে থাকি। অথচ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার হলো ‘ইস্ট’ বা পূর্ব বিশ্ব। আমাদের ভাষাগত দুর্বলতা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় চীনা, জাপানি বা কোরিয়ান ভাষার অনুপস্থিতির কারণে আমরা এই বিশাল বাজার ধরতে পারছি না। এছাড়া দেশের একটি দুর্নীতিগ্রস্ত শ্রেণি পশ্চিমা ব্যাংকগুলোকে টাকা পাচারের জন্য নিরাপদ মনে করে, যা আমাদের পশ্চিমমুখী থাকার আরেকটি কারণ।

পশ্চিমা অর্থনীতি এখন অনেকটা স্থবির এবং রক্ষণশীল। অন্যদিকে এশিয়ার অর্থনীতি দ্রুত বড় হচ্ছে। যেখানে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে, সেখানে ব্যবসা করা সহজ। আমাদের প্রতিবেশী ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং চীনও মাত্র ৬৩ কিলোমিটার দূরে। এই দুই বিশাল অর্থনীতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলে আমরা সহজেই এগিয়ে যেতে পারি। তাই এখন আমাদের দৃষ্টি পশ্চিমে নয়, পূর্বে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে ফেরানো উচিত।

স্ট্রিম: আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, বিশেষ করে ভারত ও চীনের প্রতিবেশী হওয়াটা অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ? সুইজারল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের মতো কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে আমরা কি কোনো বিশেষ মডেল দাঁড় করাতে পারি?

এ কে এনামুল হক: এ ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ড যেমন ঔপনিবেশিক শক্তি না হয়েও প্রতিবেশী বড় দেশগুলোর মাঝখানে নিজেকে ‘সেফ হ্যাভন’ বা নিরাপদ ব্যাংকিং হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, আমাদেরও তেমন কৌশল নিতে হবে। আমরা এশিয়ার ভৌগোলিক কেন্দ্রে আছি; এখান থেকে চীন, দিল্লি বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া—সবই বিমানে মাত্র দুই ঘণ্টার পথ। পশ্চিমারা এখন অভিবাসন ও জাতিগত বিষয়ে কঠোর হচ্ছে, কিন্তু পূর্বের দেশগুলো মানুষকে মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করে, যা আমাদের জন্য ইতিবাচক।

আমাদের গভীর সমুদ্রবন্দর নেই, তাই আমরা হুবহু সিঙ্গাপুরের মতো হতে পারব না। আমাদের নিজস্ব ‘কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজ’বা তুলনামূলক সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। চীন ও ভারতের বাজারে প্রবেশ করা অনেক বিদেশি কোম্পানির জন্য কঠিন ও নিয়ন্ত্রিত। আমরা তাদের প্রস্তাব দিতে পারি—‘বাংলাদেশে বসে তোমরা চীন ও ভারতে ব্যবসা করো।’ অর্থাৎ আমরা এই দুই বৃহৎ অর্থনীতির প্রবেশদ্বার বা হাব হিসেবে কাজ করতে পারি। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, এয়ার ট্রান্সপোর্টেশন বা ইন্স্যুরেন্স হাব হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলে আমরা সুইজারল্যান্ডের মতোই উন্নতি করতে পারি। গতানুগতিক চিন্তা বাদ দিয়ে আমাদের এই কৌশলগত অবস্থানকেই কাজে লাগাতে হবে।

স্ট্রিম: বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য প্রধান ‘বিপদ সংকেত’ বা বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?

এ কে এনামুল হক: প্রথম বিপদ সংকেতটি হচ্ছে বেকারত্ব, বিশেষ করে শিক্ষিতদের বেকারত্ব। শিক্ষিত লোকের কর্মসংস্থান না থাকা একটা বিশাল বিপদ। এটা বোঝা খুবই জরুরি। এটা আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকর এবং এটার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও আন্দোলন হতে থাকবে। এটি একটি বড় বিপদ সংকেত।

দ্বিতীয় বিপদ সংকেতটি এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাত। এটি বড় বিপদ কারণ, ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা ক্রমেই কমছে। বর্তমান সরকার আসার পর ব্যাংকিং খাত নিয়ে অনেক কথা বললেও মানুষের আস্থা বাড়ছে না। ব্যাংকিং খাতে আস্থা না ফিরলে আমরা কুটির শিল্প নির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হব। কারণ ব্যাংকিং খাতই হলো বড় শিল্পের অর্থায়নের মূল কৌশল। তাই এদিকে নজর না দিলে বিপদ বাড়বে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে খাতটিকে আমি বিপদ সংকেত মনে করি, সেটা হচ্ছে পরিবেশ। এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পরিবেশ যদি রক্ষা করা না হয়, তাহলে মানুষ রোগে-শোকে ভুগবে। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সচেতন হতে হবে, তবে যেনতেন বা সস্তা সমাধান দিলে হবে না। আমাদের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে গঠনমূলক সমাধান দিতে হবে। পরিবেশ রক্ষা বলতে শুধু গাছ লাগানো বোঝায় না; নদীর পানি, বাতাস—এসবই পরিবেশের অংশ। এগুলো নিয়ে চিন্তা করে নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। নীতিমালায় এমন পরিবর্তন আনতে হবে যেন মানুষ বিনিয়োগ করার আগেই বুঝতে পারে কোন কাজটি তাকে বিপদে ফেলবে আর কোনটি ফেলবে না। মানুষ কৌশল বোঝে। আমরা যদি এখনই এই চিন্তাগুলো না করি, তবে ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য বিপজ্জনক হবে।

স্ট্রিম: ধন্যবাদ আপনাকে।

এ কে এনামুল হক: ঢাকা স্ট্রিম এবং স্ট্রিমের পাঠকদেরও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত