আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

আর কেবল ক’দিনের অপেক্ষা। তারপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নতুন সংসদ। নতুন সাংসদ। নতুন সরকার। নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেই নবযাত্রাকে বরণের প্রস্তুতির মাঝে হঠাৎই জন্ম নিল এক অনভিপ্রেত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক জটিলতা—নবনির্বাচিত সাংসদদের শপথ পড়াবেন কে? আর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে সংবিধানসম্মত পথে সেই শপথই বা কীভাবে সম্পন্ন হবে?
বাংলাদেশে সাংসদদের শপথের মূল ভিত্তি বা আইন হল সংবিধান। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৭ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, শপথ ছাড়া কোনো নির্বাচিত ব্যক্তি সংসদ-সদস্য হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করতে পারবে না। শপথ এখানে আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সাংবিধানিক প্রবেশদ্বার।
বিষয়টিকে আরও সুস্পষ্ঠ ও সুদৃঢ় করতে অনুচ্ছেদ ৬৭(১) (ক)-এ বলা হয়েছে: নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে নব্বই দিনের মধ্যে নতুন সংসদ সদস্যদের তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে শপথগ্রহণ ও শপথপত্রে (ঘোষণাপত্র) স্বাক্ষর করতে হবে। অন্যথা সংসদীয় আসন শূন্য বলে বিবেচিত হবে। অবশ্য যুক্তি সঙ্গত কারণ ও স্পীকারের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে নব্বই দিনের পরেও শপথ নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন—সে প্রশ্নের উত্তর রয়েছে অনুচ্ছেদ ১৪৮-এ। সাধারণ অবস্থায় দায়িত্বটি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের। কিংবা তাদের মনোনীত ব্যক্তির। কিন্তু সংবিধান বাস্তববাদী। সে জানে, সব সময় ‘সাধারণ অবস্থা’ বজায় থাকে না।
এই কারণেই অনুচ্ছেদ ১৪৮(২ক) যুক্ত করা হয়েছে—যা বলে, নির্ধারিত ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গ্যাজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াতে ব্যর্থ হলে বা অনিচ্ছুক হলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
সিইসির মাধ্যমে শপথ পড়ানোর এই বিকল্প ব্যবস্থা কোন সাংবিধানিক ফাঁকফোকর নয়; এটি একটি সচেতন সাংবিধানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। তা হল—স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সাংবিধানিকভাবে পদে থাকলেও, কার্যত সেই দায়িত্ব পালনের অবস্থায় নেই।
সংবিধান অনুযায়ী আগের সংসদের স্পিকার সাধারণভাবে শপথ পাঠ করান। স্পীকার না থাকলে বা না পারলে ডেপুটি স্পীকার ওই দায়িত্ব পালন করবেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে আছেন। তিনি পদত্যাগ করেননি। অবশ্য আইন উপদেষ্টা দাবী করেছেন, তিনি পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদ বলছে, স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন। অর্থাৎ আগের সংসদের স্পীকার-ডেপুটি স্পীকার পদত্যাগ করুক বা না করুক, সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদমতে তারা এখনও তাদের পদে বহাল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কাউকে দিয়ে শপথ পড়াতে আগ্রহী নয়। একই ভাবে তারাও এই দায়িত্ব পালনে আগ্রহী কিনা ,তাও সুস্পষ্ঠ নয়। সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— বিকল্প তাহলে কে?
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, বিগত সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানোর সুযোগ নেই। কারণ, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের একজন নিখোঁজ। আরেকজন জেলে আছেন। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা আছে। এই অবস্থায় তাদের দ্বারা শপথের সুযোগ আছে বলে মনে করি না। আইনে আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার যদি শপথ পরিচালনা করতে না পারেন, তাহলে প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ পাঠ করাবেন।
উদাহরণ হিসেবে আইন উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি রাজি থাকলে তিনিও শপথ পরিচালনা করতে পারেন। এ ছাড়া নির্বাচিতদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ না হলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারও (সিইসি) শপথ পরিচালনা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। সরকার নির্বাচনের পর যত দ্রুত সম্ভব শপথের ব্যবস্থা করতে চায়।
শপথ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধানের ১৪৮ (২ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকার বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি শপথ পরিচালনায় ব্যর্থ হলে, তিন দিন পর থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পাঠ করাবেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা পায়নি। উল্টো গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি ।
সংবিধানে এমন সুযোগ না থাকলেও কেন উপদেষ্টা পরিষদের এ সিদ্ধান্ত– এমন প্রশ্নে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা অভ্যুত্থানের সরকার। এরপরও সংবিধান সমুন্নত রাখার চেষ্টা করছি (সমকাল, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।
এখানে একটি ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে—সিইসি কর্তৃক শপথ পড়ানো যেন ‘ব্যতিক্রমী’ বা ‘অস্বাভাবিক’ কিছু। বাস্তবে এটি সংবিধানের ভেতরেই লেখা একটি স্বাভাবিক বিকল্প।
সংবিধান কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেয়। যখন একটি প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন অন্য প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে—এটাই সাংবিধানিক ভারসাম্য।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে,উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনার দ্বারা শপথ পড়ানোই সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ, কম বিতর্কিত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিরাপদ পথ।
এই সংকটে আরেকটি প্রস্তাব ঘুরে ফিরে আসছে—রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে শপথ পড়ানো।
শুনতে আকর্ষণীয় হলেও এখানে একটি মৌলিক ঝুঁকি রয়েছে। বিচার বিভাগের শক্তি তার নীরবতায়, নিরপেক্ষতায় এবং রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা থেকে দূরত্বে।
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে বিচারপতিরা সাধারণত সংসদের শপথপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকেন না। সংসদ তার সংকট নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সামলায়—বিচার বিভাগ শেষ আশ্রয়, প্রথম নয়।
এখানে উন্নত গণতন্ত্র ও প্রতিবেশী দেশগগুলো কীভাবে শপথ পরিচালনা করে—সেটা তুলনামূলকভাবে তুলে ধরা হলো।
ভারত: ভারতে নির্বাচন শেষে প্রো-টেম স্পিকার মনোনীত হন; যিনি এমপিদের শপথ পড়ান এবং প্রথম অধিবেশনের দায়িত্ব পালন করেন। প্রো-টেম স্পিকার সাধারণত আইন পরিষদের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি দ্বারা ঐ দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ভারতীয় সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদ বলছে, নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তির কাছে শপথ গ্রহণ করতে হবে।
পাকিস্তান: পাকিস্তানে নির্বাচন শেষে সাধারণভাবে পার্লামেন্ট পরিষদের সর্বাধিক বয়সী বা সম্মানীয় এমপি-কে স্পিকারের সাময়িক দায়িত্বে আনা হয়। তিনি অধিবেশনের প্রথম সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং নতুন সংসদ-সসদস্যদের শপথ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরে সংসদের স্থায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।
যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্যের এমপিরা পার্লামেন্টারি ওথ এক্ট অনুযায়ী শপথ নেন ।
যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসে নতুন সদস্যরা স্পিকার বা প্রতিনিধি নেতৃত্বের কাছে শপথ নেন। শপথ না নিলে তারা বক্তব্য দিতে বা ভোট দিতে পারে না।
শ্রীলঙ্কা: এখানে স্পিকারের নেতৃত্বে শপথ-গ্রহণ হয়ে থাকে। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপদেষ্টা বা সিনিয়র সাংসদই দায়িত্ব পালন করেন।
নেপাল: নেপালে নির্বাচন শেষে সিনিয়র বা মনোনীত সদস্য শপথ-গ্রহণে নেতৃত্ব দেন। অবশ্য বিধিসম্মতভাবে বিকল্প ব্যবস্থাও থাকে।
ভুটান: ভুটানে রাজা বা রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি ও সংসদীয় কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পালন করেন।
শপথ মানে কেবল কিছু শব্দের উচ্চারণ নয়। এটি মানে তিনটি প্রতিশ্রুতি—সংবিধানের প্রতি আনুগত্য। জনগণের প্রতিনিধিত্বের দায় ও ক্ষমতার সীমা মেনে চলার অঙ্গীকার
যদি শপথপ্রক্রিয়া নিজেই বিতর্কিত হয়, তাহলে সেই সংসদের নৈতিক ভিত্তি হয় খুবই দুর্বল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের শপথ-গ্রহণ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন—কে শপথ পড়াবেন—এই সীমায় আটকে নেই। এটি এক অর্থে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতা এবং গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরীক্ষা।
গণতন্ত্রে নির্বাচন জনগণের রায় প্রকাশ করে। কিন্তু শপথ সেই রায়কে আইনগত ও নৈতিক বৈধতা দেয়। ফলে শপথের মুহূর্তে যদি অনিশ্চয়তা বা দ্বিধা দেখা দেয়, তা শুধু সংসদের নয়—রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

আর কেবল ক’দিনের অপেক্ষা। তারপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নতুন সংসদ। নতুন সাংসদ। নতুন সরকার। নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেই নবযাত্রাকে বরণের প্রস্তুতির মাঝে হঠাৎই জন্ম নিল এক অনভিপ্রেত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক জটিলতা—নবনির্বাচিত সাংসদদের শপথ পড়াবেন কে? আর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে সংবিধানসম্মত পথে সেই শপথই বা কীভাবে সম্পন্ন হবে?
বাংলাদেশে সাংসদদের শপথের মূল ভিত্তি বা আইন হল সংবিধান। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৭ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, শপথ ছাড়া কোনো নির্বাচিত ব্যক্তি সংসদ-সদস্য হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করতে পারবে না। শপথ এখানে আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সাংবিধানিক প্রবেশদ্বার।
বিষয়টিকে আরও সুস্পষ্ঠ ও সুদৃঢ় করতে অনুচ্ছেদ ৬৭(১) (ক)-এ বলা হয়েছে: নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে নব্বই দিনের মধ্যে নতুন সংসদ সদস্যদের তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে শপথগ্রহণ ও শপথপত্রে (ঘোষণাপত্র) স্বাক্ষর করতে হবে। অন্যথা সংসদীয় আসন শূন্য বলে বিবেচিত হবে। অবশ্য যুক্তি সঙ্গত কারণ ও স্পীকারের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে নব্বই দিনের পরেও শপথ নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন—সে প্রশ্নের উত্তর রয়েছে অনুচ্ছেদ ১৪৮-এ। সাধারণ অবস্থায় দায়িত্বটি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের। কিংবা তাদের মনোনীত ব্যক্তির। কিন্তু সংবিধান বাস্তববাদী। সে জানে, সব সময় ‘সাধারণ অবস্থা’ বজায় থাকে না।
এই কারণেই অনুচ্ছেদ ১৪৮(২ক) যুক্ত করা হয়েছে—যা বলে, নির্ধারিত ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গ্যাজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াতে ব্যর্থ হলে বা অনিচ্ছুক হলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
সিইসির মাধ্যমে শপথ পড়ানোর এই বিকল্প ব্যবস্থা কোন সাংবিধানিক ফাঁকফোকর নয়; এটি একটি সচেতন সাংবিধানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। তা হল—স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সাংবিধানিকভাবে পদে থাকলেও, কার্যত সেই দায়িত্ব পালনের অবস্থায় নেই।
সংবিধান অনুযায়ী আগের সংসদের স্পিকার সাধারণভাবে শপথ পাঠ করান। স্পীকার না থাকলে বা না পারলে ডেপুটি স্পীকার ওই দায়িত্ব পালন করবেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে আছেন। তিনি পদত্যাগ করেননি। অবশ্য আইন উপদেষ্টা দাবী করেছেন, তিনি পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদ বলছে, স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন। অর্থাৎ আগের সংসদের স্পীকার-ডেপুটি স্পীকার পদত্যাগ করুক বা না করুক, সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদমতে তারা এখনও তাদের পদে বহাল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কাউকে দিয়ে শপথ পড়াতে আগ্রহী নয়। একই ভাবে তারাও এই দায়িত্ব পালনে আগ্রহী কিনা ,তাও সুস্পষ্ঠ নয়। সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— বিকল্প তাহলে কে?
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, বিগত সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানোর সুযোগ নেই। কারণ, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের একজন নিখোঁজ। আরেকজন জেলে আছেন। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা আছে। এই অবস্থায় তাদের দ্বারা শপথের সুযোগ আছে বলে মনে করি না। আইনে আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার যদি শপথ পরিচালনা করতে না পারেন, তাহলে প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ পাঠ করাবেন।
উদাহরণ হিসেবে আইন উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি রাজি থাকলে তিনিও শপথ পরিচালনা করতে পারেন। এ ছাড়া নির্বাচিতদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ না হলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারও (সিইসি) শপথ পরিচালনা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। সরকার নির্বাচনের পর যত দ্রুত সম্ভব শপথের ব্যবস্থা করতে চায়।
শপথ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধানের ১৪৮ (২ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকার বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি শপথ পরিচালনায় ব্যর্থ হলে, তিন দিন পর থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পাঠ করাবেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা পায়নি। উল্টো গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি ।
সংবিধানে এমন সুযোগ না থাকলেও কেন উপদেষ্টা পরিষদের এ সিদ্ধান্ত– এমন প্রশ্নে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা অভ্যুত্থানের সরকার। এরপরও সংবিধান সমুন্নত রাখার চেষ্টা করছি (সমকাল, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।
এখানে একটি ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে—সিইসি কর্তৃক শপথ পড়ানো যেন ‘ব্যতিক্রমী’ বা ‘অস্বাভাবিক’ কিছু। বাস্তবে এটি সংবিধানের ভেতরেই লেখা একটি স্বাভাবিক বিকল্প।
সংবিধান কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেয়। যখন একটি প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন অন্য প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে—এটাই সাংবিধানিক ভারসাম্য।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে,উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনার দ্বারা শপথ পড়ানোই সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ, কম বিতর্কিত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিরাপদ পথ।
এই সংকটে আরেকটি প্রস্তাব ঘুরে ফিরে আসছে—রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে শপথ পড়ানো।
শুনতে আকর্ষণীয় হলেও এখানে একটি মৌলিক ঝুঁকি রয়েছে। বিচার বিভাগের শক্তি তার নীরবতায়, নিরপেক্ষতায় এবং রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা থেকে দূরত্বে।
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে বিচারপতিরা সাধারণত সংসদের শপথপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকেন না। সংসদ তার সংকট নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সামলায়—বিচার বিভাগ শেষ আশ্রয়, প্রথম নয়।
এখানে উন্নত গণতন্ত্র ও প্রতিবেশী দেশগগুলো কীভাবে শপথ পরিচালনা করে—সেটা তুলনামূলকভাবে তুলে ধরা হলো।
ভারত: ভারতে নির্বাচন শেষে প্রো-টেম স্পিকার মনোনীত হন; যিনি এমপিদের শপথ পড়ান এবং প্রথম অধিবেশনের দায়িত্ব পালন করেন। প্রো-টেম স্পিকার সাধারণত আইন পরিষদের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি দ্বারা ঐ দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ভারতীয় সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদ বলছে, নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তির কাছে শপথ গ্রহণ করতে হবে।
পাকিস্তান: পাকিস্তানে নির্বাচন শেষে সাধারণভাবে পার্লামেন্ট পরিষদের সর্বাধিক বয়সী বা সম্মানীয় এমপি-কে স্পিকারের সাময়িক দায়িত্বে আনা হয়। তিনি অধিবেশনের প্রথম সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং নতুন সংসদ-সসদস্যদের শপথ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরে সংসদের স্থায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।
যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্যের এমপিরা পার্লামেন্টারি ওথ এক্ট অনুযায়ী শপথ নেন ।
যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসে নতুন সদস্যরা স্পিকার বা প্রতিনিধি নেতৃত্বের কাছে শপথ নেন। শপথ না নিলে তারা বক্তব্য দিতে বা ভোট দিতে পারে না।
শ্রীলঙ্কা: এখানে স্পিকারের নেতৃত্বে শপথ-গ্রহণ হয়ে থাকে। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপদেষ্টা বা সিনিয়র সাংসদই দায়িত্ব পালন করেন।
নেপাল: নেপালে নির্বাচন শেষে সিনিয়র বা মনোনীত সদস্য শপথ-গ্রহণে নেতৃত্ব দেন। অবশ্য বিধিসম্মতভাবে বিকল্প ব্যবস্থাও থাকে।
ভুটান: ভুটানে রাজা বা রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি ও সংসদীয় কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পালন করেন।
শপথ মানে কেবল কিছু শব্দের উচ্চারণ নয়। এটি মানে তিনটি প্রতিশ্রুতি—সংবিধানের প্রতি আনুগত্য। জনগণের প্রতিনিধিত্বের দায় ও ক্ষমতার সীমা মেনে চলার অঙ্গীকার
যদি শপথপ্রক্রিয়া নিজেই বিতর্কিত হয়, তাহলে সেই সংসদের নৈতিক ভিত্তি হয় খুবই দুর্বল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের শপথ-গ্রহণ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন—কে শপথ পড়াবেন—এই সীমায় আটকে নেই। এটি এক অর্থে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতা এবং গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরীক্ষা।
গণতন্ত্রে নির্বাচন জনগণের রায় প্রকাশ করে। কিন্তু শপথ সেই রায়কে আইনগত ও নৈতিক বৈধতা দেয়। ফলে শপথের মুহূর্তে যদি অনিশ্চয়তা বা দ্বিধা দেখা দেয়, তা শুধু সংসদের নয়—রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের নথি সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ঘটনার এক সপ্তাহও পার হয়নি। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
৫ ঘণ্টা আগে
বগুড়া কেবল একটি জেলা নয়—এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি সম্ভাবনার প্রতীক। এখানে উৎপাদন আছে, শ্রম আছে, বাজার আছে—অভাব কেবল সমন্বিত অবকাঠামো ও নীতিগত সাহসের। যদি ইপিজেড, এগ্রো-প্রসেসিং জোন ও আঞ্চলিক কার্গো বিমানবন্দর বাস্তবায়িত হয়, তবে উত্তরাঞ্চল একটি শক্তিশালী কৃষি-রপ্তানি করিডরে পরিণত হতে পারে।
৫ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন জাল টাকার নীরব বিষক্রিয়ায় জর্জরিত। টাকা শুধু কেনাবেচার মাধ্যমই নয়; মানুষের ঘাম, রাষ্ট্রের আস্থা এবং বাজারের ভারসাম্যের চিহ্ন। যখন সেই চিহ্নকে আঘাত করে নকল নোট, তখন আঘাতটা শুধু টাকার ব্যাপার থাকে না, সমাজের বিশ্বাস আর নিরাপত্তাও মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ে।
১০ ঘণ্টা আগে
নির্বাচনী ইশতেহার রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়, বরং অনেকটা ভোটারদের সঙ্গে দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের লিখিত চুক্তি।
১ দিন আগে