জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বোমাছাড়া যুদ্ধ: নির্বাচনের আগে বিদেশের অপপ্রচার যেভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পরীক্ষার মুখে ফেলছে

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৪৫
এআই জেনারেটেড ছবি

ঢাকার এক ডিসেম্বরের সন্ধ্যা। রাজপথে তখন এক নিহত যুবনেতার জন্য শোকাতুর মানুষের ভিড়। রাজপথের সেই কোলাহল থেকে অনেক দূরে পর্দার আড়ালে চলছিল অন্য এক নাটক। টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব টকশো আর এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপগুলোতে সেই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল হরেক রকমের ব্যাখ্যা। সব সীমানা ছাড়িয়ে সেসব দাবি একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল। কেউ দায় চাপাচ্ছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ওপর, কেউ আবার একে দেখছিল উগ্রবাদের উত্থান হিসেবে। আবার কারও কারও ভাষ্য ছিল—বিদেশি প্রভাবে বাংলাদেশ বিশৃঙ্খলার অতলে তলিয়ে যাচ্ছে।

এই দাবিগুলোর একটিও তখন পর্যন্ত যাচাই করা হয়নি। অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কোটি কোটি মানুষের কাছে সেসব বয়ানই হয়ে উঠল ধ্রুব রাজনৈতিক ‘সত্য’।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশ প্রথম জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ আজ তীব্র এক তথ্য-যুদ্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। এই লড়াই শুধু দেশের ভেতরের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিদেশি এবং বিদেশ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ ভাবনাকে নিজেদের ছাঁচে ঢেলে সাজাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ইউরোপীয় গবেষকরা এই বিষয়টিকে বলছেন ‘ফরেন ইনফরমেশন ম্যানিপুলেশন অ্যান্ড ইন্টারফারেন্স’ বা বিদেশি তথ্য কারসাজি ও হস্তক্ষেপ। অন্যদিকে উত্তর আমেরিকার পণ্ডিতরা একে ‘বিদেশি বৈরী বয়ান’ হিসেবে অভিহিত করছেন। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে এটিই এখন অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রূপান্তরের পথে দেশ, অস্থির তথ্যপ্রবাহের বিশ্ব

২০২৬ সালের নির্বাচনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। এ এক গভীর অনিশ্চয়তার মুহূর্ত। এক নজিরবিহীন ছাত্র-অভ্যুত্থান আর রাজনৈতিক ডামাডোল আওয়ামী লীগের টানা এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কারামুক্ত হয়েছেন বিরোধী নেতারা। আর জনমানসে আবারও ফিরে এসেছে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের প্রত্যাশা।

কিন্তু এই উত্তরণ পর্বটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন দেশজুড়ে বিদ্যমান তীব্র মেরুকরণ, অমীমাংসিত ক্ষোভ এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নাটকীয় পরিবর্তন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের শীতলতা যেমন স্পষ্ট, তেমনি পাকিস্তান ও চীনও বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের রসায়ন নতুন করে মেলাচ্ছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন প্রবাসী এক গোষ্ঠী গভীর মনোযোগ দিয়ে সব দেখছেন। তারা বিরামহীনভাবে অনলাইনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে চলেছেন।

ঠিক একই সময়ে, বাংলাদেশের তথ্য আদান-প্রদানের পরিবেশ দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়েও দ্রুত বদলে গেছে। এখন দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭ কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে। এদের মধ্যে শুধু ফেসবুকই ব্যবহার করেন ৬ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে ফেসবুক ও ইউটিউব এখন রাজনৈতিক আলোচনার প্রধান চারণভূমি। টেলিভিশন এখনো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদের উৎস হিসেবে টিকে থাকলেও, সাংবাদিকতার ওপর মানুষের সামগ্রিক আস্থা বেশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে সেগুলো দলীয়করণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমের মালিকানা গুটিকতক প্রভাবশালীর হাতে কুক্ষিগত। এইসব মিলিয়ে এই আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

অবারিত ইন্টারনেটের সুবিধা, তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা, সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থার অভাব এবং রাজনীতি নিয়ে মানুষের তীব্র আবেগ—এই সবকিছু মিলেমিশে অপপ্রচারের এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

সাধারণ ভুল তথ্য আর বিদেশি তথ্য কারসাজির মধ্যে পার্থক্য কোথায়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভুল তথ্য ছড়ানো কোনো নতুন বিষয় নয়। গুজব, প্রোপাগান্ডা আর চটকদার খবর নির্বাচনের সময় বরাবরই দেখা যায়। কিন্তু সাধারণ অপপ্রচারের চেয়ে 'ফিমি' (ফরেইন ইনফর্মেশন ম্যানিপুলেশন এন্ড ইন্টারফেরেন্স) বা ‘বিদেশি তথ্য কারসাজি’র পার্থক্যটা হলো এর সমন্বয়, উদ্দেশ্য এবং উৎসের মধ্যে।

‘ফিমি’ বলতে বোঝায় বিদেশি কোনো শক্তি বা বিদেশ-সংশ্লিষ্ট কোনো মহলের সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদী চেষ্টা। এর লক্ষ্য হলো প্রতারণামূলক বা ধ্বংসাত্মক উপায়ে অন্য কোনো দেশের তথ্যপ্রবাহকে প্রভাবিত করা। একটি সুসংগঠিত ‘আচরণ’। কে বলছে, কীভাবে বলছে এবং কোন উদ্দেশ্যে বলছে, সেটিই এখানে মুখ্য।

সাধারণত 'ফিমি'-র বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—দেশের বাইরে থেকে থেকে অর্থের জোগান বা তথ্য সরবরাহ করা, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পরিকল্পিতভাবে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, নকল বা পরিচয়হীন আইডি ও পেজ ব্যবহার করা, কোনো বিশেষ বয়ানকে স্থানীয় বা মূলধারার গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা ও সুনির্দিষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন—যেমন নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেওয়া বা সামাজিক বিভেদ উসকে দেওয়া।

এই বিদেশি অপপ্রচারগুলো খুব সুনিপুণভাবে দেশীয় বিতর্কের সঙ্গে মিশে যায়। দেখা যায়, কোন একাট বিভ্রান্তিকর দাবি প্রথমে কোনো বিদেশি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হলো। এরপর সেটি কোনো বাংলাদেশি নিউজ পোর্টালে জায়গা করে নিল আর শেষমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ভাইরাল হয়ে গেল। বারবার ঘুরেফিরে আসার ফলে তথ্যের মূল উৎসটি একসময় সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে চলে যায়।

বয়ানের রণক্ষেত্র

কানাডা সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ইলেকশন ইন্টিগ্রিটি টাস্ক ফোর্স সিচুয়েশন রুম’-এর গবেষকরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ নথিভুক্ত করেছেন। সেখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে কীভাবে বিদেশি প্রভাব বাস্তবে কাজ করে।

ভারত-ঘেঁষা একটি বয়ান বাংলাদেশকে এমনভাবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে যেন দেশটি চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে এবং এর পেছনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার মদদ রয়েছে। কোনো যাচাইকৃত তথ্য বা সরকারি নিশ্চিতকরণ ছাড়াই বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে উগ্রবাদী মিলিশিয়া, জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ এবং আসন্ন বিশৃঙ্খলার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। এই দাবিগুর উৎস সাধারণত নামহীন বা অখ্যাত কোনো মাধ্যম। পরে দলীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দাবানলের মতো সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা যায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। তখন চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে বাংলাদেশ পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি আরবের সমন্বয়ে গঠিত একটি সামরিক জোটে যোগ দিতে যাচ্ছে। একে বলা হচ্ছিল ‘ইসলামিক ন্যাটো’। এই সংবাদের সূত্রপাত ছিল পাকিস্তান-ভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যম। সেখানে কূটনৈতিক সফর এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির কিছু কাল্পনিক খসড়াকে প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এই খবর দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে।

এমনকি বাংলাদেশের কিছু সংবাদপত্রেও এই জোট গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে খবর ছাপা হয়। ফেসবুক ও ইউটিউব কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা কী একে ‘মুসলিম উম্মাহর বিজয়’, কেউবা ‘এক ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রকাশ্যে এই খবর অস্বীকার করার আগেই কোটি কোটি মানুষের কাছে এই বিভ্রান্তিকর বার্তাটি পৌঁছে যায়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন দেশের আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। সেটা সমস্যা নয়। সমস্যা ছিল জল্পনা-কল্পনাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করে নির্বাচনের আগমুহূর্তে ভূ-রাজনৈতিক আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া।

২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল কত ভোট পড়ল বা কে কয়টি আসন পেল, তা দিয়ে বিচার করা হবে না। বাংলাদেশের আসল পরীক্ষা হবে অন্য জায়গায়—দেশটি এই বিরামহীন তথ্য-যুদ্ধের মুখেও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা বা জনমত বজায় রাখতে পারে কি না।

আরেকটি নিয়মিত বয়ান তৈরি করা হচ্ছে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় বার্তা সংস্থাগুলো নামহীন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করছে যে, ভারতের প্রভাব কমানোর জন্য চীন ও পাকিস্তান গোপনে জামায়াতকে সমর্থন দিচ্ছে। এই খবরগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং প্রবাসী প্ল্যাটফর্মগুলোতে এমনভাবে প্রচার করা হয় যে মনে হয় বাংলাদেশের নির্বাচন বিদেশ থেকেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুবনেতা শরীফ ওসমান হাদি নিহ্য হন। সেই হত্যাকাণ্ড ভারত ও পাকিস্তান-কেন্দ্রিক পাল্টাপাল্টি বয়ানের একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকেই এই হত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাচাইহীন সব ছবি ও দাবি। এর কিছুদিন পরেই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া সেই উত্তেজনার জেরে একদল মানুষ প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আগুন লাগায়। তাদের অভিযোগ ছিল—এই পত্রিকাগুলো বিদেশি স্বার্থ হাসিল করছে।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন ছক দেখা গেছে। ছকটি এরকম—বিদেশ থেকে তৈরি হওয়া বয়ান বাংলাদেশের তথ্যপ্রবাহে ঢুকে পড়ে, পরে সেই বয়ান দেশীয় মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরও বড় আকার ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত রাজপথে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।

নেপথ্যে কারা

বাংলাদেশকে ঘিরে এসব বৈরী বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরিকারিরা সবাই একই ঘরানার নয়। এর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী করাও বেশ জটিল কাজ। তবে গবেষকরা এই প্রক্রিয়ায় বারবার ফিরে আসা কয়েকটি পক্ষকে চিহ্নিত করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছে ভারতের কিছু বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদ সংস্থা। তারা নিয়মিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে অতিরঞ্জিত বা কাল্পনিক খবর প্রচার করে। অন্যদিকে রয়েছে পাকিস্তান-ভিত্তিক কিছু ডিজিটাল পোর্টাল এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক। এরা আবার ভিন্ন এক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরার চেষ্টা করে। এছাড়া রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলের এক বিশাল জাল। এরা নিজেরা কোনো তথ্য তৈরি না করলেও সেগুলো ছড়িয়ে দিতে ‘অ্যামপ্লিফায়ার’ বা শব্দবর্ধক হিসেবে কাজ করে।

এই পক্ষগুলোর মধ্যে মতাদর্শগত মিল নেই। কিন্তু তাদের কাজের ধরনে অদ্ভুত মিল রয়েছে। যেমন—নামহীন সূত্রের ওপর নির্ভর করা, একই খবর দ্রুত বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া, একই ছাঁচে তৈরি বয়ান বারবার আওড়ানো আর রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মুহূর্তগুলো বেছে নেওয়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হঠাৎ করে তৈরি হওয়া অজস্র নতুন অ্যাকাউন্ট থেকে একই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে পোস্ট দেওয়া, প্রায় একই সময়ে সেগুলো শেয়ার করা এবং পুরনো ছবি বা ভিডিও নতুন করে প্রচার করা—এগুলো কোনো স্বাভাবিক জনমতের প্রতিফলন নয়। এসব হচ্ছে সুপরিকল্পিত প্রচারণার লক্ষণ।

নির্বাচনের সময় কেন এই ঝুঁকি বেশি

নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই নয়। এটি একইসঙ্গে বিশ্বাসের লড়াই। একটি নির্বাচনকে তখনই বৈধ বলা যায় যখন ভোটাররা বিশ্বাস করেন যে তাদের প্রতিটি ভোটের দাম আছে। তারা এই আস্থাও ন্রাখেন যে নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ। সর্বোপরি ভোটারদের এই বিশ্বাস থাকতে হয় যে নির্বাচনের ফলাফল জনগণের সামষ্টিক পছন্দেরই প্রতিফলন।

বিদেশি তথ্য কারসাজি এই ভিত্তিমূলগুলোকেই দুর্বল করে দেয়।

বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল, বিদেশি শক্তির পুতুল বা সহিংসতার দ্বারপ্রান্তে থাকা একটি দেশ হিসেবে বারবার তুলে ধরার মাধ্যমে ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের অনাগ্রহ তৈরি করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবৈধ বা বিদেশি মদদপুষ্ট হিসেবে প্রচার করে তারা নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। আবার সংখ্যালঘু অধিকার বা ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে সাম্প্রদায়িক ভয় ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিক বিভেদকে আরও উসকে দেওয়া হয়। এর ফলে দাঙ্গা বা বড় ধরনের অশান্তির ঝুঁকি বাড়ে।

দুর্ভাগ্যবশত, এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো বেশ সীমিত। পরিকল্পিত ডিজিটাল হুমকি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তথ্যের বিশাল জোয়ারের তুলনায় ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও নগণ্য। এমনকি অনেক মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও আলাদা কোনো ভেরিফিকেশন ডেস্ক নেই। এসবের ফলে কোনো একটি বিভ্রান্তিকর দাবি যে গতিতে ছড়িয়ে পড়ে, তার সংশোধনী বা আসল সত্যটি ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারে না।

বিভ্রান্তির চরম মূল্য

বিদেশি তথ্য কারসাজির বিপদগুলো ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে। বিচ্ছিন্ন কোনো খবর হয়তো সময়ের সাথে হারিয়ে যায়। কিন্তু তার রেশ থেকে যায় অনেকদিন।

যখন নাগরিকরা অনবরত শুনতে থাকেন যে নির্বাচন মানেই কারচুপি, সরকার মানেই বিদেশের হাতের পুতুল অথবা সহিংসতা এড়ানো অসম্ভব—তখন তাদের মনে এক গভীর নেতিবাচকতা বাসা বাঁধে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তখন সাধারণ প্রতিদ্বন্দ্বীর জায়গায় হয়ে ওঠে একে অপরের চরম শত্রু। সাংবাদিকদের ওপর তকমা পড়ে ‘দেশদ্রোহী’র। এক সময় সামান্য গুজবও দাবানলের মতো জ্বলে ওঠার বারুদ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ এর আগেও এমন পরিস্থিতি দেখেছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বানোয়াট তথ্য অতীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ সহিংসতা উসকে দিয়েছিল। তবে এবারের পার্থক্য হলো তথ্যের ব্যাপকতা, এর তীব্র গতি এবং সীমানা ছাড়িয়ে আসা প্রভাব।

নির্বাচন-পূর্ববর্তী এই তথ্যপ্রবাহ পর্যবেক্ষণকারী বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন সুসংগঠিত অপপ্রচার অভিযানের চেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে আছে। দেশ এখন বিদেশি এবং বিদেশ-ঘেঁষা বিভিন্ন বয়ানের এক জটিল জালে আটকে গেছে। এসব বয়ান একদিকে দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুর্বলতাকে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে দেশের তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণকে পুঁজি করে পুরো পরিবেশকে অস্থির করে তুলছে।

উত্তরণের উপায় কী

বিদেশি এই তথ্য-যুদ্ধ বা অপপ্রচার মোকাবিলার কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। তবে গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা কয়েকটি জরুরি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন।

প্রথমত, আগাম শনাক্তকরণ ও স্বচ্ছতা। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা যেতে পারে। এতে কোনো বিভ্রান্তিকর বয়ান জনমনে গেঁথে যাওয়ার আগেই তারা সেটি শনাক্ত করেতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, সংবাদকক্ষে যাচাই-বাছাইয়ের সংস্কৃতি। গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূত্রের সত্যতা যাচাই করা, নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো দাবি প্রচার না করা এবং স্রেফ ‘ক্লিক’ বা ‘ভিউ’ পাওয়ার আশায় চটকদার খবর পরিবেশন থেকে বিরত থাকলে বিদেশি অপপ্রচারের সুযোগ কমে আসবে।

তৃতীয়ত, তথ্য সচেতনতা বা মিডিয়া লিটারেসি। সাধারণ মানুষ গোয়েন্দা বিশ্লেষক হওয়ার দরকার নেই। তবে কোনো খবর কীভাবে ছড়াচ্ছে আর কেন কিছু খবর মানুষের মনে ভয় ধরানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে—মানুষের সেটুকু বোঝার ক্ষমতা থাকলে সমাজে এক ধরনের প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি হবে।

পরিশেষে, প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়। নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজ এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে তথ্যের স্বচ্ছতাকে নির্বাচনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

ব্যালটের চেয়েও বড় পরীক্ষা

২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল কত ভোট পড়ল বা কে কয়টি আসন পেল, তা দিয়ে বিচার করা হবে না। বাংলাদেশের আসল পরীক্ষা হবে অন্য জায়গায়—দেশটি এই বিরামহীন তথ্য-যুদ্ধের মুখেও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা বা জনমত বজায় রাখতে পারে কি না।

বিদেশি তথ্য কারসাজি কোনো স্লোগান বা পতাকা নিয়ে হাজির হয় না। এটি আসে সংশয়, উদ্বেগ, বিশ্লেষণ কিংবা নিছক ‘প্রশ্ন করার’ ছদ্মবেশে। এটি মানুষের অনিশ্চয়তা, অবিশ্বাস আর আবেগকে পুঁজি করে। আর একে যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে ভোটের সংখ্যা না পাল্টেও তা একটি দেশের গণতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচন কেবল নেতৃত্ব নির্বাচনের লড়াই নয়। এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে রক্ষার একটি পরীক্ষা।

  • মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ এবং ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের সাবেক ফুলব্রাইট হুবার্ট এইচ. হামফ্রে ফেলো। তিনি নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা স্ট্রিম-এর জন্য লেখেন।
Ad 300x250

সম্পর্কিত