leadT1ad

বগুড়ার হাট কীভাবে হয়ে উঠতে পারে বৈদেশিক বাজার

মো. তানজিল হোসেন
মো. তানজিল হোসেন

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮: ৫৯
এআই জেনারেটেড ছবি

ভোরের আলো ফোটার আগেই মহাস্থানগড়-এর ঐতিহ্যবাহী হাট প্রাণ ফিরে পায়। প্রায় দুই শতকের ইতিহাস বহনকারী এই বাজার কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির স্পন্দন। নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধা থেকে প্রতিদিন ট্রাকভর্তি সবজি এখানে আসে। বাঁধাকপি, ফুলকপি, আলু, কলা, মিষ্টি কুমড়া, মরিচসহ প্রায় ৩৬ প্রকারের সবজি এই আড়তে লেনদেন হয়। এখান থেকেই এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়, এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হয়।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ২৫,৫০০ হেক্টর উর্বর কৃষিজমি রয়েছে। বেলে দোঁআশ মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদন সম্ভব। কৃষকের পরিশ্রমে মাঠ ভরে ওঠে সবুজ ফসলে। কিন্তু এই প্রাচুর্যের মাঝেও এক নির্মম বাস্তবতা রয়েছে—ঢাকায় যে বাঁধাকপি ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়, শিবগঞ্জে সেই একই পণ্য মৌসুমে ১ টাকাতেও বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তা কেবল উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; ন্যায্য বাজার ও মূল্য সংরক্ষণের ওপরও নির্ভর করে। কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য না পান, তবে খাদ্য নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকে না। এ বাস্তবতা বৈশ্বিক ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের লক্ষ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার এই পরিস্থিতির মূল কারণ বাজার ও অবকাঠামোগত বৈষম্য। উৎপাদন বেশি, কিন্তু সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দ্রুত পরিবহনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অতিরিক্ত সরবরাহের চাপে স্থানীয় বাজারে মূল্য ধস নামে। কৃষক বাধ্য হন কম দামে বিক্রি করতে।

চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত কাঁচা সবজি পরিবহনে প্রতি কেজিতে ১০–২০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়। পথে হয়রানি, দীর্ঘ যানজট ও অনিয়ন্ত্রিত লজিস্টিক ব্যবস্থার কারণে সময় বেশি লাগে। পচনশীল পণ্য হওয়ায় ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। এতে কৃষকের আয় কমে যায়, আর সম্ভাব্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও নষ্ট হয়।

এই সংকট কেবল মূল্য সংকট নয়; এটি কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির সংকট। যখন কৃষি লাভজনক থাকে না, তখন গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়, তরুণ প্রজন্ম বিকল্প পেশার সন্ধানে শহরমুখী হয়। ফলে শোভন কাজ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়।

এই সংকটের পেছনে রয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা যেমন উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের ঘাটতি, কোল্ড স্টোরেজ ও এগ্রো-প্রসেসিং অবকাঠামোর অভাব, রপ্তানি-সংযুক্ত লজিস্টিক নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ও কৃষি ও শিল্পনীতির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (বেপজা)-এর অধীনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইপিজেড স্থাপিত হলেও উত্তরবঙ্গ এখনও শিল্প অবকাঠামোর দিক থেকে পিছিয়ে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে সরাসরি সংযোগ গড়ে ওঠেনি।

বগুড়া কেবল একটি জেলা নয়—এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি সম্ভাবনার প্রতীক। এখানে উৎপাদন আছে, শ্রম আছে, বাজার আছে—অভাব কেবল সমন্বিত অবকাঠামো ও নীতিগত সাহসের। যদি ইপিজেড, এগ্রো-প্রসেসিং জোন ও আঞ্চলিক কার্গো বিমানবন্দর বাস্তবায়িত হয়, তবে উত্তরাঞ্চল একটি শক্তিশালী কৃষি-রপ্তানি করিডরে পরিণত হতে পারে।

কৃষকরা মূলত কাঁচামাল বিক্রি করেন; ভ্যালু অ্যাডিশন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থানীয়ভাবে হয় না। এতে আয়ের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী বা অন্য অঞ্চলের শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে। এই অবকাঠামোগত বৈষম্য শিল্প, উদ্ভাবন ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা।

বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে কয়েকটি ঝুঁকি সামনে আসবে। প্রথমত, কৃষক লাভজনক মূল্য না পেলে উৎপাদন কমাতে পারেন। দ্বিতীয়ত, তরুণ প্রজন্ম কৃষি পেশা থেকে সরে যেতে পারে। তৃতীয়ত, উর্বর জমি অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। এবং চতুর্থত, আঞ্চলিক বৈষম্য আরও গভীর হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। উচ্চ তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরার প্রবণতা কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। যদি কৃষকের আয় কম থাকে, তবে তারা আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, উন্নত বীজ বা জল সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন না। ফলে কৃষি খাত জলবায়ু ঝুঁকির সামনে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

অতএব, বর্তমান বাজার ব্যর্থতা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতা—উভয়কেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই সংকটের সমাধান সম্ভব—যদি আমরা সমন্বিত ও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করি। তার একটি হতে পারে বগুড়ায় ইপিজেড স্থাপন। এতে করে রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে উঠবে, স্থানীয় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত হবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। বগুড়ায় স্থাপিত ইপিজেড উত্তরাঞ্চলে টেকসই শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি করতে সতায়ক হবে।

পাশাপাশি এগ্রো-প্রসেসিং জোন প্রতিষ্ঠা উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। গ্রেডিং, প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ ও ভ্যালু অ্যাডিশন সুবিধা গড়ে উঠলে খাদ্য অপচয় কমবে এবং কৃষিপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন।

বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে দরকার কার্গো-সুবিধাসম্পন্ন আঞ্চলিক বিমানবন্দর। এর মাধ্যমে পচনশীল পণ্য দ্রুত বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সামগ্রিকভাবে বিমানবন্দর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা বাড়াবে। অনুমান করা যায় এতে করে আঞ্চলিক অর্থনীতিও গতিশীল হবে।

প্রয়োজন লজিস্টিক সংস্কার ও সবুজ পরিবহন ব্যবস্থা। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, নির্দিষ্ট রপ্তানি করিডর এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে সময় ও খরচ কমানো সম্ভব। এতে কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং একটি জলবায়ু সহনশীল কৃষি-শিল্প ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে উঠবে।

বগুড়া কেবল একটি জেলা নয়—এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি সম্ভাবনার প্রতীক। এখানে উৎপাদন আছে, শ্রম আছে, বাজার আছে—অভাব কেবল সমন্বিত অবকাঠামো ও নীতিগত সাহসের। যদি ইপিজেড, এগ্রো-প্রসেসিং জোন ও আঞ্চলিক কার্গো বিমানবন্দর বাস্তবায়িত হয়, তবে উত্তরাঞ্চল একটি শক্তিশালী কৃষি-রপ্তানি করিডরে পরিণত হতে পারে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে উঠবে।

উত্তরাঞ্চলের মাটিতে সম্ভাবনার ঘাটতি নেই—এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আজকের উদ্যোগই আগামী দিনের সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।

  • মো. তানজিল হোসেন: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত