leadT1ad

ইরানের লড়াই কি আরব বিশ্বেরও অস্তিত্বের লড়াই

লেখা:
লেখা:
ডেভিড হার্স্ট

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ০৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের নথি সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ঘটনার এক সপ্তাহও পার হয়নি। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের আশঙ্কা এখন আর কোনো অলীক কল্পনা নয়, বরং তা এখন নির্মম বাস্তব। এই টানটান উত্তেজনায় পুরো অঞ্চল যেন এখন একটা ধারালো ছুরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

এই অনুভূতি আমাদের খুব পরিচিত। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের বিশাল বিমানবাহী রণতরী ও তার সহযোগী বহর (স্ট্রাইক গ্রুপ) ইরানের নাগালের মধ্যে এসে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ও বি-৫২ বোমারু বিমান পাঠানো হয়েছে জর্ডান এবং কাতারে। ইসরায়েলের চ্যানেল-১৩ খবর দিয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একটি উচ্চ আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা (থাড) মধ্যপ্রাচ্যে এসে পৌঁছানোর কথা।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো বসে নেই। তারা নিজেদের কাজ জোরেশোরে চালিয়ে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যম ইসরায়েল হায়োম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাজ্য ইরানে সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীকে সব ধরনের সহায়তা দেবে। তারা রসদ সরবরাহ করবে এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে।

গাজার শাসনব্যবস্থা তদারকির জন্য গঠিত শান্তি বোর্ডের যাত্রা শুরু। ছবি: সংগৃহীত
গাজার শাসনব্যবস্থা তদারকির জন্য গঠিত শান্তি বোর্ডের যাত্রা শুরু। ছবি: সংগৃহীত

এই খবরের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিবৃতি দিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক হামলা চালানোর জন্য তাদের আকাশপথ, ভূখণ্ড বা পানিসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তারা আরও বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপে তারা কোনো ধরনের সহায়তা বা লজিস্টিক সমর্থনও দেবে না।

তবে ইরান এই আশ্বাসে কান দিচ্ছে না। তেহরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এরই মধ্যে আমিরাতকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, আমিরাত ইতোমধ্যেই অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তাঁদের মতে, আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটলে ইরান তাদের জবাব শুধু ইসরায়েল বা মার্কিন ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না। প্রতিশোধের আগুন ছড়িয়ে পড়বে আরও দূরে।

গত বছর এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন, ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে নোংরা যুদ্ধ চালাচ্ছে এবং তাতে আজারবাইজান ও ইউএইকে ব্যবহার করছে। ওই আমাকে কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘আমরা নিশ্চিত যে এই যুদ্ধের আরেকটি পর্যায় আসছে। তবে এবার ইরান অপ্রস্তুত থাকবে না বা কেবল আত্মরক্ষার চেষ্টা করবে না। এবার ইরান পাল্টা আক্রমণ চালাবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমিরাতকে এর জন্য বড় মূল্য দিতে হবে। পরের বার যখন আমরা আক্রান্ত হব, তখন সেই যুদ্ধের আঁচ পুরো উপসাগরীয় এলাকা এবং আশপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।’

খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করার ছক

গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে হামলা চালিয়েছিল। সেই ১২ দিনের সেই যুদ্ধে তেহরানকে এক রকম বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল, ওমানে হতে যাওয়া আলোচনার আগে ইসরায়েল কোনো হামলা করবে না।

সেই সময়ে হোয়াইট হাউস দাবি করেছিল, তাদের হামলার উদ্দেশ্য ইরানে সরকার পরিবর্তন করা নয়। তবে ওই হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও পরমাণু বিজ্ঞানীরা লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। এ ছাড়া ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সেন্ট্রিফিউজগুলো মাটির গভীরে যেসব বাঙ্কারে রাখা ছিল, সেগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছিল।

কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন ইরানে সরকার পরিবর্তন হোক। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করলে সংঘাত বাড়বে না, বরং সংঘাতের ইতি ঘটবে। তবে হোয়াইট হাউস তখন সেই মতের সঙ্গে একমত ছিল না। এক্সিওস নামে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, খামেনিকে হত্যা করার ব্যাপারে নেতানিয়াহুর যতটা আগ্রহ ছিল, ট্রাম্পের ততটা ছিল না। এক মার্কিন কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, ‘আপনার পরিচিত আয়াতুল্লাহ ভালো, নাকি অপরিচিত আয়াতুল্লাহ ভালো—এটা ভেবে দেখা দরকার।’

শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ার অঙ্গীকার ইরানের। ছবি: সংগৃহীত
শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ার অঙ্গীকার ইরানের। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু এবার সেই দ্বিধা বা সংকোচ আর নেই। এবার খামেনিই হবেন আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

ইরানে সম্প্রতি চলা বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। ঠিক কত মানুষ মারা গেছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ইরান সরকার গত সপ্তাহে দাবি করেছে, নিহতের সংখ্যা ৩ হাজারের কিছু বেশি। অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারের কাছাকাছি।

ইরানি রিয়ালের মানপতন ও অর্থনৈতিক সংকটের অসন্তোষ থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে রাস্তায় নামেন। প্রথমে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থাকলেও ধীরে ধীরে এই বিক্ষোভে নানান শ্রেণি-পেশার ইরানিরা যোগ দেন।

কয়েক বছর আগে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২২ বছর বয়সী কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনিকে ইরানের নৈতিকতা পুলিশ পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে আটক করেছিল। পরে পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়।

ইরানের মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী মানুষ অর্থনৈতিক স্থবিরতায় সত্যিই ক্ষুব্ধ। কিন্তু এর মানে এই নয়, পশ্চিমা বা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই আগুনে ঘি ঢালছে না। জনগণের ক্ষোভ এবং বিদেশি উস্কানি—এই দুই বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়, বরং সমান্তরালভাবে চলতে পারে।

সর্বোচ্চ চাপের নীতি

ইরানের আজকের এই গভীর অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে দুটি কারণ আছে। একটি হলো তাদের নিজেদের অব্যবস্থাপনা। আর অন্যটি হলো ট্রাম্পের দেওয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে পরমাণু চুক্তি থেকে সরে গিয়ে ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ডেমোক্র্যাট বাইডেন প্রশাসনও সেই নীতি বজায় রেখেছিল।

গাজায় যেমন গণহত্যা চালানো হচ্ছে, ঠিক তেমনি ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টাও একটি দ্বিদলীয় মার্কিন নীতি। পশ্চিমারা দাবি করে, তারা ইরানি জনগণের মঙ্গলের কথা ভাবে। কিন্তু তাদের এই নীতির প্রথম এবং প্রধান শিকার সেই সাধারণ ইরানি জনগণই।

মানুষকে হতাশার চূড়ান্ত সীমায় ঠেলে দেওয়া ও তারপর সেই হতাশাকে পুরো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাত বা ‘ক্যাসাস বেলি’ হিসেবে ব্যবহার করা—এটা সিআইএ, মোসাদ বা এমআইসিক্স-এর জন্য নতুন কোনো কৌশল নয়। যেকোনো অর্থনৈতিক বিক্ষোভকে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে রূপ দেওয়ার চেষ্টাও তাদের পুরোনো খেলা। তবে এবার নিজেদের লুকানোর তেমন কোনো চেষ্টা করেনি তারা।

তুয়াইজরি লিখেছেন, আমিরাত নিজেকে ‘জায়নবাদের কোলে’ ছুড়ে দিয়েছে। তারা আরব বিশ্বে ইসরায়েলের ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশের ক্ষতি করা। তিনি একে আল্লাহ, রাসুল ও পুরো জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেছেন।

গত ২৯ ডিসেম্বর মোসাদ এক্স অ্যাকাউন্টে থেকে ইরানিদের বিক্ষোভে নামতে উৎসাহিত করা হয়। এমনকি বলা হয়, তারা সশরীরে বিক্ষোভকারীদের পাশে আছে। মোসাদ লিখেছিল, ‘সবাই একসঙ্গে রাস্তায় নামুন। সময় এসেছে। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। কেবল দূর থেকে বা মুখে নয়। আমরা মাঠেও আপনাদের সঙ্গে আছি।’

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলো বিক্ষোভের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। তারা ধ্বংসাত্মক কাজ করেছে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে হামলা চালিয়েছে যাতে সংঘর্ষ বাড়ে এবং হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

তবে ইসরায়েলের সেই কৌশল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ সরকারের পক্ষে পাল্টা সমাবেশ করেছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তার আগেই পশ্চিমা গণমাধ্যম মানুষকে বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছে, ইরানের বর্তমান সরকারকে হটানো এখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যু। তারা জোরেশোরে বলতে শুরু করেছে, ইরানের বর্তমান সরকার বিরোধী পক্ষগুলোর নেতা হতে পারেন ইরানের শেষ শাহের ৬৫ বছর বয়সী পুত্র রেজা পাহলভি।

তবে ট্রাম্প পাহলভির সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এক পডকাস্টে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পাহলভির সঙ্গে দেখা করবেন কি না। ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি তাকে দেখেছি। তাকে ভালো মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই মুহূর্তে তার সঙ্গে দেখা করাটা আমার কাছে যথাযথ মনে হচ্ছে না।’

মনের পরিবর্তন বা উল্টো হাওয়া

ইরানের সরকার পতনের চেষ্টা আগেও অনেকবার হয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেকটা আলাদা। আরব বিশ্ব এত দিন নিজেদের ইরানের লক্ষ্যবস্তু মনে করত। ইরানের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধ লড়ছিল। সুন্নি আরব দেশগুলো মনে করত ইরান তাদের ঘিরে ফেলছে। কিন্তু এখন সেই আরব বিশ্বই ইরানের দিকে ঝুঁকছে।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন বা হঠাৎ জেগে ওঠা ধর্মীয় উদারতা থেকে এমনটা ঘটছে না। আবার তেল সম্পদ রক্ষার জন্যও তারা এমন করছে না। এই মনোভাব পরিবর্তনের মূল কারণ হলো আরবদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার স্বার্থ। তারা দেখছে ইরান এখন যে লড়াই করছে, আরব দেশগুলোও একই আধিপত্য ও দখলের বিরুদ্ধে লড়ছে। তারাও ভয় পাচ্ছে, ইসরায়েল এই অঞ্চলের একচ্ছত্র সামরিক শক্তি হয়ে উঠতে চাইছে। যা অর্জনের সবচেয়ে সহজ পথ হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলা।

এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী তুরস্কের। তারা সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য আলোচনা করছে। তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিসর এখন প্রকাশ্যে সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানকে সমর্থন দিচ্ছে।

গত এক দশক ধরে রিয়াদ ছিল ইরানবিরোধী সব ষড়যন্ত্রের ঘাঁটি। ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর, অর্থাৎ হামাসের হামলার ঠিক আগের দিন পর্যন্ত সৌদি আরব ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ স্বাক্ষর করার খুব কাছে ছিল। যার মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতো।

কিন্তু আজকের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই চুক্তি এখন টেবিলের বাইরে। উল্টো সৌদি গণমাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু হয়েছে।

জায়নবাদের কোলে ঝাঁপ

সৌদি সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরাহ’ প্রকাশিত এক নিবন্ধে শিক্ষাবিদ আহমেদ বিন ওসমান আল-তুয়াইজরি পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলেন। কী লিখেছেন তা বলার আগে কেন এই ‘লেখা’ গুরুত্বপূর্ণ তা বলা প্রয়োজন। আল জাজিরাহ মূলত সৌদি সরকারের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত। আবার ওসমান আল-তুয়াইজরি নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি সহানুভূতিশীল। যে সৌদি সরকার রাজনৈতিক ইসলামের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের দমন করেছে, সেই সরকারের পত্রিকায় তাঁর কলাম ছাপা হওয়াটাই বিস্ময়।

তুয়াইজরি লিখেছেন, আমিরাত নিজেকে ‘জায়নবাদের কোলে’ ছুড়ে দিয়েছে। তারা আরব বিশ্বে ইসরায়েলের ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশের ক্ষতি করা। তিনি একে আল্লাহ, রাসুল ও পুরো জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেছেন।

তুয়াইজরির দাবি একবারে ফেলনা নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আরব আমিরাত লিবিয়াকে বিভক্ত করেছে। তারা র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সুদানে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়েছে। তিউনিসিয়াতেও তারা উইপোকার মতো ঢুকে পড়েছে।

তুয়াইজরির আরও দাবি করেছেন, ইথিওপিয়ার রেনেসাঁ বাঁধ প্রকল্পে আমিরাত সমর্থন দিচ্ছে। অথচ এই বাঁধ মিসরের পানি ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য বড় হুমকি।

এসব কথাই সত্য। কিন্তু কথাগুলো যখন সৌদি আরব থেকে আসে, তখন তা গুরুত্ব বহন করে। কারণ আরব বসন্তকে দমন করতে সৌদি আরব ও আমিরাত একসঙ্গে কাজ করেছিল।

আবুধাবি এর জবাবে ওয়াশিংটনে তাদের লবিস্টদের কাজে লাগিয়েছে। এক্সিওস-এর বারাক রাভিদ এক্সে লিখেছেন, ওই নিবন্ধটি কেবল ইসরায়েলবিরোধী নয়, ইহুদিবিদ্বেষীও। অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগও (এডিএল) এতে যোগ দিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে, সৌদি আরবে ইহুদিবিদ্বেষী ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে এবং জায়নবাদী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্য বদলাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নেতানিয়াহু যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবে নয়। এক দশকের গৃহযুদ্ধে সিরিয়া বিধ্বস্ত ছিল। আসাদ সরকারের পতন হয়েছিল তাসের ঘরের মতো। নতুন নেতা প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ না করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এক বছরের মাথায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইসরায়েলের দখলদারত্ব এবং আগ্রাসনের কারণে সিরিয়ার মানুষ এখন ক্ষুব্ধ।

এই হইচই শুরু হওয়ার পরই নিবন্ধটি ইন্টারনেট থেকে গায়েব হয়ে যায়। এডিএল দাবি করে, তাদের প্রতিবাদের কারণেই এটা সরানো হয়েছে। কিন্তু নাটক সেখানেই শেষ হয়নি। হঠাৎ করেই লেখাটি আবার আল জাজিরাহ-র ওয়েবসাইটে ফিরে আসে।

সৌদ আল-কাহতানি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মিডিয়া জার হিসেবে পরিচিত। কলম্বোস নামে একটি এক্স অ্যাকাউন্ট তাঁর হয়ে কথা বলে বলে ধারণা করা হয়। সেই অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট দেওয়া হয়: ‘আমিরাতের কিছু লোক মিথ্যা ছড়াচ্ছে যে আল-তুয়াইজরি-র নিবন্ধ মুছে ফেলা হয়েছে! আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভয়ে নাকি এটা করা হয়েছে! এটা মিথ্যা। নিবন্ধটি সেখানেই আছে এবং এই হলো তার লিঙ্ক।’

এই ঘটনা থেকে একটি সিদ্ধান্তই নেওয়া যায়। তুয়াইজরি যা বলেছেন, সেটাই সৌদি আরবের বর্তমান সরকারি অবস্থান। ইসরায়েলের নজর এড়ায়নি বিষয়টি। নেতানিয়াহু তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা কাতার ও তুরস্কের সঙ্গে সৌদির ঘনিষ্ঠতা লক্ষ্য করছি। যারা আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, তাদের উচিত শান্তির উল্টো পথে চলা মতাদর্শের সঙ্গে না থাকা।’

বিভক্তির রাজনীতি

পুরো আরব অঞ্চলে গাজা যুদ্ধের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। সামরিক দিক থেকে গাজায় হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরান পরাজিত হয়েছে। নেতানিয়াহু বারবার এই সংঘাতকে ‘পুনর্জন্মের যুদ্ধ’ অভিহিত করে বলেছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দেবেন।

ইসরায়েলের বিভাজন নীতির অংশ ছিল বাশার আল আসাদের পতনের পর সিরিয়া যেন আর কখনো সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে। আসাদের পতনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিরিয়ায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বোমাবর্ষণ করেছিলেন নেতানিয়াহু। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিরিয়ার নৌ ও বিমানবাহিনী ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর দ্রুজ সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ অঞ্চল গড়ার কথা বলে ইসরায়েলি ট্যাংক দক্ষিণ সিরিয়ায় ঢুকে পড়ে। যদিও দ্রুজরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল।

ইসরায়েল উত্তর সিরিয়ায় কুর্দিদের রক্ষার প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু আলেপ্পোতে কুর্দি এলাকায় সংঘাত শুরুর পর সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) পতন ঘটে। দামেস্ক তখন পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এসডিএফ-এর একসময়ের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কেউ তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি।

যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম বারাক অভিযোগ করেন, এসডিএফ কমান্ডার মাজলুম আব্দি ইসরায়েলকে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে টেনে আনার চেষ্টা করছেন।

মধ্যপ্রাচ্য বদলাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নেতানিয়াহু যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবে নয়। এক দশকের গৃহযুদ্ধে সিরিয়া বিধ্বস্ত ছিল। আসাদ সরকারের পতন হয়েছিল তাসের ঘরের মতো। নতুন নেতা প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ না করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এক বছরের মাথায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইসরায়েলের দখলদারত্ব এবং আগ্রাসনের কারণে সিরিয়ার মানুষ এখন ক্ষুব্ধ।

ঐক্যের পথে আরব বিশ্ব

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই এখন সিরিয়ার জাতীয় গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসাদকে সরানোর সময় শারা যে বিচক্ষণতা দেখিয়েছিলেন, এখনো তিনি সেভাবেই চলছেন। উত্তর সিরিয়ায় জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি ডিক্রি জারি করেন। কুর্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেন এবং সব কুর্দি সিরীয় নাগরিককে তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেন।

নতুন সামরিক জোট গঠনের প্রস্তুতি চলছে। ইসরায়েল একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বললেও এটি আসলে তেমন কিছু নয়। এই অঞ্চলের মধ্যম সারির মুসলিম শক্তিগুলোর উপলব্ধি থেকে তৈরি হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে ইসরায়েলকে থামাতে হলে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। ইসরায়েলকে একে একে শত্রুদের খতম করতে দেখে তারা এই শিক্ষা পেয়েছে।

এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী তুরস্কের। তারা সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য আলোচনা করছে। তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিসর এখন প্রকাশ্যে সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানকে সমর্থন দিচ্ছে।

আমিরাতের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে সৌদি আরব এখন সুদানের সোনা কেনার পরিকল্পনা করছে। এতে আবুধাবির আফ্রিকার সোনার ব্যবসায় টান পড়বে।

এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে আরব অঞ্চল বদলাচ্ছে। কিন্তু সেই বদল নেতানিয়াহুর ছক অনুযায়ী নয়।

নেতানিয়াহু একাধিক ফ্রন্টে হারের মুখে। বোমাবর্ষণ বা অনাহারে রাখার মাধ্যমে তিনি গাজা বা পশ্চিম তীর থেকে মানুষকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। নেতানিয়াহু সিরিয়াকে ভাঙতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উল্টো সিরিয়া এখন আগের চেয়েও ঐক্যবদ্ধ। সোমালিল্যান্ডে ঘাঁটি গাড়তে চেয়ে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন এবং সোমালিয়ার সরকারের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।

গাজা ইস্যুতে মিসর এবং পশ্চিম তীর ইস্যুতে জর্ডান—উভয় দেশই এখন তাঁর বিপক্ষে।

নেতানিয়াহুর হাতে এখন শেষ যে চাল বাকি আছে, তা হলো ইরানে হামলা করা। ইয়েমেন থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তাঁর প্রধান মিত্র ইউএই-ও অনেক প্রভাব হারিয়েছে।

নেতানিয়াহু যদি ইরানে হামলা করেন, তবে তিনটি পথ খোলা আছে।

প্রথমত, তিনি ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে বাকিদের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার চেষ্টা করতে পারেন। যা ইরানের বাস্তবতায় সম্ভব নয়। খামেনির পর যিনি আসবেন, তিনি হয়তো পারমাণবিক বোমা বানাতে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবেন। কারণ পরবর্তী হামলা ঠেকানোর জন্য এটিই একমাত্র পথ।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র ভেঙে পড়লে পাহলভিকে দিয়ে একটি ইসরায়েল-শাসিত এলাকা বা প্রটেক্টরেট গড়ার চেষ্টা করা হতে পারে। এটিও সম্ভব নয়। ইরানে পাহলভির সমর্থন নেই বললেই চলে। তাঁকে ক্ষমতায় বসালে তিনি বাবার চেয়েও বড় পুতুল শাসক হবেন।

তৃতীয় ও সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হলো গৃহযুদ্ধ এবং ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। এর ফলে লাখ লাখ ইরানি শরণার্থী উত্তরে ও পশ্চিমে অর্থাৎ তুরস্ক ও সৌদি আরবে পাড়ি জমাবে। এতে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।

সৌদি আরবের আধুনিকায়নের স্বপ্ন এক নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে। প্রতিবেশীদের জন্যও কোনো শান্তি থাকবে না। তুরস্ক ইতিমধ্যেই সীমান্ত রক্ষার পরিকল্পনা করেছে যাতে লাখ লাখ ইরানি শরণার্থী ঢুকতে না পারে।

ইরান সরকার এই ঘটনাগুলোকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে। এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশের উচিত, অতীতে ইরানের সঙ্গে যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, ইরানকে রক্ষা করা এবং তার সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা।

অন্য সব চালে ব্যর্থ হয়ে নেতানিয়াহু এখন ইরানে হামলার ছক কষছেন। ইরানের টিকে থাকার লড়াই এখন এই পুরো অঞ্চলের টিকে থাকার লড়াই। কোনো আরব শাসকেরই এই কথাট ভোলা উচিত হবে না।

লেখক: মিডিল ইস্ট আইয়ের প্রধান সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Ad 300x250

সম্পর্কিত