প্রযুক্তির পরিবর্তন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপটে মূলধারার গণমাধ্যম আজ অস্তিত্ব সংকটে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেলের অভাবে সাংবাদিকতায় নৈতিক অবক্ষয় ও তথ্য-নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম জনস্বার্থের বদলে মালিকপক্ষের রাজনৈতিক বা করপোরেট স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এসব বিষয়ে কার্যকর সংস্কার আনতে কাজ করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। সম্প্রতি এ বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের মুখোমুখি হন কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ ।
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম: আপনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রদান করেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে আপনি বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের গণমাধ্যমের সম্ভাবনা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে যদি বলতেন?
কামাল আহমেদ: গণমাধ্যমের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ এখন সারা দুনিয়াতেই প্রায় একই রকম বলতে হবে। কারণ এখানে ব্যাপকভাবে প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং রূপান্তর ঘটেছে। গণমাধ্যম সাধারণত যেভাবে পরিচালিত হতো সেখানে ছন্দপতন ঘটেছে। নতুন আবির্ভাব ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের। অন্যান্য যে সমস্ত প্লাটফর্ম - গণমাধ্যম বলতে স্বাভাবিকভাবে আমরা যেগুলোকে চিনতাম, সেটায় বড় ধরনের পরিবর্তন আরোপিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের জন্য সবাই প্রস্তুত ছিল না। এই পরিবর্তন এখন আরোপিত হয়েছে। যারা খবরের কাগজ ছাপতেন তাদেরকে এখন অনলাইনে টেলিভিশনের মতো প্রোডাকশন এবং একই জিনিস করতে হচ্ছে। আবার যারা টেলিভিশন করতেন, তাদেরকে এখন টেলিভিশনের বাইরেও অনলাইনে নানা রকম প্রোডাক্ট, কনটেন্ট দিতে হচ্ছে। আর অনলাইনে যারা কার্যক্রম শুরু করেছেন, মাল্টিমিডিয়া পোর্টাল, তারা মাল্টিমিডিয়া পোর্টাল হিসেবে চালাচ্ছেন।
সুতরাং এখন সব দিকেই দেখা যাচ্ছে যে একটা পরিবর্তন এবং রূপান্তর চলেছে। এই রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ সবাই সমানভাবে নিতে পারছে না। আর এর সাথে জড়িত আছে ব্যবসায়িক দিকটাও। বাস্তবতা হলো যেকোনো একটা প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে হলে তাকে আয় করতে হবে এবং সেই আয় যদি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মতো যথেষ্ট না হয় বা পর্যাপ্ত না হয় তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান টিকবে না। তো গণমাধ্যমের এই রূপান্তরের মধ্যে ব্যবসার জন্যে সেটা সফল মডেল হচ্ছে কিনা তা একটা গুরুতর প্রশ্ন এবং দেখা যাচ্ছে যে অনেকেই টেকসই ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করাতে পারছেন না। সে কারণে সাংঘাতিক রকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন এবং এই প্রতিকূলতায় এখনো সবাই সড়গড় হয়ে ওঠেননি যে সেটা কিভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব।
স্ট্রিম: বর্তমান সময়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সংবাদমাধ্যম আত্মপ্রকাশ করছে। একদিকে যেমন মিডিয়া হাউজগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে, অন্যদিকে নতুন প্রতিষ্ঠানের এই আগমনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
কামাল আহমেদ: এটাকে আমি তুলনা করতে চাই একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির সঙ্গে। কোলাহল বাড়ছে কিন্তু গুণগত বিতর্ক, একেবারে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া… গণমাধ্যমের এই যে প্রাথমিক কাজটা সেখানে কিন্তু অধিকাংশই ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ সংবাদমাধ্যমের কাজ কী? সাংবাদিকের কাজ কী? - সঠিক তথ্য যাচাই করা, যা ঘটছে হুবহু সে কথাটাই বলে দেওয়া। আর যদি মতামত প্রকাশের প্রশ্ন থাকে তাহলে সেই মতামতের পক্ষে, বিপক্ষে অথবা নিউট্রাল, এই সব ধরনের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করা, সেই মতামতগুলোকে ফেয়ারলি রিপ্রেজেন্ট করা, খুব ন্যায়সঙ্গতভাবে, কারো প্রতি অন্যায় নয়। ভারসাম্য বজায় রেখে যথাযথভাবে সেটা প্রতিফলিত করা। সেই কাজটা করার ক্ষেত্রে এখন কী ঘটছে? সেই কাজটা করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ব্যর্থ হচ্ছে এবং সেই ব্যর্থতার মুখে চ্যালেঞ্জ হিসেবে অনেকে এগিয়ে আসছেন যে আমরা নতুন একটা প্রতিষ্ঠান করছি, আমরা এই জায়গাটা পূরণ করব। যে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে সেই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য আমরা আসছি। কিন্তু যখন আসছেন তখন তিনি তার যোগ্যতা, সামর্থ্য, সক্ষমতা সেটা নিয়ে আসছেন কিনা সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সেই সক্ষমতা আর্থিক সক্ষমতা, সেই সক্ষমতা পেশাগত পেশাদারিত্বের সক্ষমতা, সেই সক্ষমতা জনগণের প্রতি কমিটমেন্টের সক্ষমতা।
আপনি বলুন, সাংবাদিকতা বা এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান কেন চলবে? কেন তৈরি করা হবে? এটা জনস্বার্থ রক্ষার জন্য করবে, জনস্বার্থকে প্রমোট করার জন্য করবে, পাবলিক ইন্টারেস্টকে সার্ভ করার জন্য। সেখানে পাবলিক ইন্টারেস্ট সার্ভ করার চাইতে অনেকেই কিন্তু করছেন তার ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি নানা ধরনের স্বার্থ আদায় করার জন্য এবং সেই স্বার্থ আদায় করার লক্ষ্যেই কিন্তু একের পর এক নতুন মিডিয়া আসছে। তারা সবাই বলছেন আমরা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য বা সেটাকে প্রমোট করার জন্য আমরা মিডিয়া করছি, কিন্তু কার্যত সেটা হচ্ছে না। এখন মার্কেটে বা বাজারে শত শত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সবাই তারস্বরে চিৎকার করছেন। এতে কী হচ্ছে? কোলাহল তৈরি হচ্ছে। একজনের কথা আরেকজন শুনছে না, কেউ কারো কথা শুনছে না। পাঠক, দর্শক, শ্রোতা কোনোটাই গ্রহণ করতে পারছে না। টেলিভিশনের দর্শক পড়ে আছে। সংবাদপত্রের পাঠক কমে যাচ্ছে। অনলাইন পোর্টালে আপনি অনেক পরিশ্রম করে একটা ভিডিও কনটেন্ট প্রডিউস করছেন, দেখা যাচ্ছে একটা ভিডিও কনটেন্ট প্রডিউস করার জন্য লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু তার ভিউ পঞ্চাশ জন, সত্তর জন, পাঁচশ জন, এক হাজারও নয়। তাহলে কী হচ্ছে? এই কোলাহল এটা একটা নৈরাজ্য তৈরি করেছে। মানুষ উপকৃত হচ্ছে না, প্রকৃত তথ্য পাচ্ছে না, প্রকৃত ব্যাকগ্রাউন্ড, ইতিহাস কিংবা যে পরিপ্রেক্ষিত সেগুলোর কোনো কিছুই পাচ্ছে না। এই নৈরাজ্য থেকে যদি গণমাধ্যমকে রক্ষা করা না যায় তাহলে ভবিষ্যৎ আরো কঠিন, আরো খারাপ হবে।
স্ট্রিম: বর্তমান সময়ে 'নিউ মিডিয়া' বা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন ফেসবুক, ইউটিউব) সাধারণ মানুষকে তথ্য প্রদানের ক্ষমতা দিয়েছে। এই ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলো কি মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য বড় ধরনের কোনো হুমকি বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে?
কামাল আহমেদ: বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো। এই বিগটেক কোম্পানিগুলো তারা তাদের ব্যবসাতেই সবচাইতে বেশি নজর দিচ্ছে। যে আইটেম সবচাইতে বেশি মানুষ দেখবে, যেই কনটেন্টটা, সেই কনটেন্টটাকে অ্যালগরিদমের কারসাজির মাধ্যমে বেশি প্রমোট করছে এবং তাদের রেভিনিউ জেনারেশন হচ্ছে তার মধ্য দিয়ে। সেই রেভিনিউ জেনারেশনের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা করছে মেটা, এক্স যেটা সাবেক টুইটার ছিল, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, এ ধরনের অন্যান্য প্লাটফর্ম কেউ বাদ নেই কিন্তু। এবং তখন দেখা যাচ্ছে যে এরা জনস্বার্থ, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন, এগুলোর কোনো কিছুকেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের অঙ্গীকার আছে যে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কোন তথ্য বা কোন কনটেন্ট তারা প্রকাশ করতে দেবে না। কিন্তু শিশুদের পর্নোগ্রাফিতে নিয়োগ করার অজস্র কনটেন্টও তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রচার হচ্ছে। একইভাবে সহিংসতায় উস্কানি দেওয়া, এটা কোনোভাবে বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করা, সমাজে বৈষম্য বাড়ানো, বিভাজন তৈরি, এই ধরনের কোনো কনটেন্ট তাদের না দেওয়ার কথা, তারা অঙ্গীকার করেছে এ ধরনের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমাদের সাম্প্রতিককালের অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন জায়গায় যে সেই ধরনের কনটেন্ট তারা বন্ধ করছে না বরং প্রমোট করছে।
মিয়ানমারে আমরা দেখেছি যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের ভূমিকা ফেসবুক রেখেছিল, এক্স রেখেছিল এবং ফেসবুকের মেটা কোম্পানি এখন আদালতে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে এই অভিযোগে। আমরা গাজার ঘটনার ক্ষেত্রে দেখেছি, এক্সে কী পরিমাণে গণহত্যাকে জাস্টিফাই করার জন্য, নৃশংসতাকে স্বাভাবিকীকরণের জন্য, গ্রহণযোগ্য করার জন্য কী ধরনের কনটেন্ট ঐখানে প্রচার হয়েছে। এগুলো তো ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বহীনতা, তারা ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে কী হচ্ছে? তথ্যবিকৃতি, অপতথ্য, অর্ধসত্য, মিথ্যা এবং সত্যের মিশ্রণ, এই ধরনের নানান জিনিস ছড়িয়ে পড়ছে খুব দ্রুততার সাথে এবং তাতে সমাজে নৈরাজ্যের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই নৈরাজ্যের ঝুঁকির থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে সরকারগুলোকে এবং আন্তর্জাতিকভাবে উদ্যোগ দরকার, বহুজাতিক উদ্যোগ দরকার। যেই উদ্যোগ দিয়ে এটা ঠেকানো যাবে। এটা কেবল গণমাধ্যম কিছুই করতে পারবে না। গণমাধ্যম শুধু এই ত্রুটিগুলো তুলে ধরতে পারে এবং এই ত্রুটিগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করতে পারে, সেটাও আমরা করছি না। আমরা বরং উল্টো করছি বাংলাদেশে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন একজন ইনফ্লুয়েন্সার, সো কলড সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার, যাদের অজস্র ভক্ত আছে, পীরের ভক্তের মতন, তো সেই পীর সাহেব একটা বানী দিলেন সেটা সত্য কি মিথ্যা যাচাই না করে বিশ্বাস করে তার পেছনে ছোটা শুরু করলো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই ঘটনা ঘটছে, একের পর এক ঘটছে এবং সেটাতে সহিংসতাও হয়েছে। কিন্তু সেই পীরদের বক্তব্য যেটা সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রচার হয়েছে সেটাই আবার খবর হিসেবে খবরের কাগজ ছাপছে এবং দ্রুততম সময়ে অনলাইন পোর্টালে প্রকাশ করছে। এটাতো সাংবাদিকতা না। তা আমরা যদি সঠিকভাবে সাংবাদিকতা না করি তাহলে ঐ সোশ্যাল মিডিয়ার যে আগ্রাসন সেই আগ্রাসন মোকাবেলা তো দূরের কথা, সেই আগ্রাসনের সহযোগী হচ্ছি আমরা এবং এটা কোনোভাবেই মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য ভালো নয়, কাম্য নয় এবং এটা বন্ধ না করা গেলে ভবিষ্যতে বিপদ আরো বাড়বে।
স্ট্রিম: অনেক সময় বলা হয়, 'মানুষ যা দেখতে চায় আমরা তাই দেখাই'। বর্তমান সময়ে ভিউ বা জনপ্রিয়তার এই ইঁদুর দৌড়ে গণমাধ্যমগুলো অনেক সময় খণ্ডিত বা আকর্ষণীয় তথ্য পরিবেশন করে। গণমাধ্যমের কি উচিত শুধু দর্শক চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া, নাকি ভালো কনটেন্টের মাধ্যমে নিজস্ব পাঠক বা দর্শক শ্রেণি গড়ে তোলা?
কামাল আহমেদ: আমি আমার পাঠক শ্রেণী তৈরি করব কিনা সেটা পরের প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, আমি যখন একাট গণমাধ্যম কিংবা সংবাদ প্রতিষ্ঠান করছি, তখন আমার নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে যে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, খণ্ডিত তথ্য নয়। কেউ একজন একটা বক্তব্য দিল, আমি তার মধ্যে একটা লাইন যেটা ভাইরাল হবে কেবল সেইটাকেই ফটোকোর্ড করে প্রচার করব, এটা সাংবাদিকতা নয়। আপনি সামগ্রিক তথ্য, পুরো তথ্যটা তুলে ধরবেন, এটা আপনার দায়িত্ব। আনবায়াসড, আনফিল্টারড, অবজেক্টিভ তথ্য, এটা তুলে ধরার অঙ্গীকার করেই আপনি গণমাধ্যম হন, সাংবাদিকতা করেন। সেই সাংবাদিকতা যদি আপনি না করেন তাহলে আপনার দায়িত্বে আপনি ব্যর্থ হচ্ছেন। আমরা এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই পথেই হাঁটছি। অতএব ভাইরাল হওয়া যদি কারো লক্ষ্য হয় সেটা ভুল পথে পরিচালনার, পরিচালিত হওয়ার পদক্ষেপ এবং আমি সরাসরি বলবো যে- সেটা ভুল, সেটা ক্ষতিকারক, সেটা সাংবাদিকতার জন্যও আত্মঘাতী।
স্ট্রিম: কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি সংবাদমাধ্যমের আর্থিক টিকে থাকাটাও জরুরি। জনপ্রিয় বা ভাইরাল কনটেন্ট না দিলে যদি আয় না হয়, তবে সেই আর্থিক সংকটের মুখে নীতি-নৈতিকতা রক্ষা করা কি আদৌ সম্ভব?
কামাল আহমেদ: সেজন্যেই বললাম যে আমাদের একটা ব্যবসায়িক মডেল, টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজন। কিন্তু সেই ব্যবসায়িক গণমাধ্যম ব্যবসায়িক টেকসই গণমাধ্যম করার জন্যে আমি অসততার আশ্রয় নিতে পারি না। আমি যদি অনৈতিকতার আশ্রয় নেই তাহলে তো পর্নোগ্রাফির ব্যবসা করাই ভালো। তাহলে আমি সাংবাদিকতার ব্যবসা করছি কেন? আমি তো সাংবাদিকতার জন্য যে ‘স্যাক্রোস্যাঙ্কটিটি’ যে নৈতিকভাবে খুব উঁচু দরের অবস্থানে অবস্থান করি বলে দাবি করি, সেই অবস্থান তো তাহলে যৌক্তিক না। তো আমাদেরকে সেই তফাৎটা বুঝতে হবে। সাংবাদিকতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার এই দুইটা যে এক জিনিস নয়, এটা আমাদেরকে বুঝতে হবে। জনপ্রিয়তা অর্জন আর সঠিক তথ্য তুলে ধরা এই দুইটা এক জিনিস নয়। এটা আমাদেরকে বুঝতে হবে। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে দেওয়া, কাউকে ন্যায্যভাবে তার কথা বলতে দেওয়ার অধিকারটা সম্মান দেখিয়ে সেই কথা যথাযথভাবে প্রচার করা আর তার বিপরীতে বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরা কিংবা অপপ্রচার করা কিংবা তাকে ম্যালাইন করা, অপমান করা, অপদস্থ করা সামাজিক মাধ্যমে, এটা সাংবাদিকতা না। এই দুই এর পার্থক্যগুলো আমাদেরকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।
স্ট্রিম: নৈরাজ্য বা অপতথ্য রোধে আপনার পরামর্শ কী? এখানে রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে কি কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
কামাল আহমেদ: অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন থাকবে এখানে। যদিও ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি আমি ব্যবহার করতে চাই না, নিয়ন্ত্রণ কথাটি হয়তো নেতিবাচক অর্থেই গ্রহণ করা হবে, কিন্তু যেটা করার কথা সেটা হল- সরকারের দায়িত্ব পালন। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের একটা দায়িত্ব আছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা, নাগরিকদের কল্যাণ এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের কল্যাণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাগরিকদের সম্ভাব্য যেকোনো ক্ষতি বা হুমকির থেকে রক্ষার দায়িত্ব, এটাতো রাষ্ট্রের। তো এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যদি কোনো ক্ষতি হয়, ক্ষতিকর কনটেন্ট যায় সেই ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রচার বন্ধ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। উস্কানি দেওয়ার বন্ধ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমার উপরে হামলা হলে, অন্যায়ভাবে যদি কেউ আমাকে আক্রমণ করতে আসে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেটা থেকে আমাকে নিরাপত্তা দেওয়া। সাথে সাথে মোকাবেলা বা ঠেকাতে না পারলেও আমার ওপর বা কোনো নাগরিকের ওপর অন্যায় হয়ে বা হামলা হলে তদন্ত করে অপরাধীর বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
ঠিক একইভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার যে সোশ্যাল স্ফেয়ার, সামাজিক ক্ষেত্র, চারণভূমি, সেখানে একটা নিয়ম-নীতি প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব, নিয়ম-নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের। যারা নিয়ম-নীতি মানবে না তাদের জবাবদিহি আদায় করার দায়িত্ব সরকারের এবং সেই কারণেই বিগ কোম্পানিজ, এই যে মেটা কিংবা এক্স, ইউরোপের দেশগুলোতে কত বিলিয়ন ডলার এদেরকে জরিমানা দিতে হয়েছে এবং এখন কি নিয়ম মানতে হচ্ছে, এগুলো একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন। আমাদের সরকারকে সেই পথে যেতে হবে। ঐসব দেশে কেউ বলবে না ঐ উন্নত দেশের উন্নত গণতন্ত্রে যে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে সরকার পলিসি গ্রহণ করে, কঠোর পলিসি গ্রহণ করে জনগণের মত প্রকাশের অধিকারকে ক্ষুন্ন করেছে। মোটেও নয়। জনগণের মত প্রকাশের অধিকার অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা এটা স্যাক্রোস্যাঙ্কট, এটা পবিত্র, এখানে হাত দেওয়া যাবে না। কিন্তু আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে আমি উস্কানি দেওয়ার স্বাধীনতা পাবো, আমি কারো মানহানি করার স্বাধীনতা পাবো, আমি কাউকে হেনস্থা করার স্বাধীনতা পাবো, এটা তা নয়। সুতরাং এই ফারাকটা আমাদের বুঝতে হবে এবং সরকারকে এই ফারাকটা কার্যকর করতে হবে। সেটা নীতিমালা অধীনে এবং আইন কার্যকর করার মাধ্যমে।
স্ট্রিম: বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের গণমাধ্যম কি এই ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে তার ঐতিহাসিক ও নৈতিক ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে পারছে?
কামাল আহমেদ: এটা মানুষ দেখছে। আপনি গত পনেরো বছরের বা সতেরো বছরের ইতিহাস বা তারও আগের পঁচিশ বছরের ইতিহাস দেখুন। আমি তো আমাদের কমিশনের যে রিপোর্ট আমরা দিয়েছি সেই কমিশনের রিপোর্টে, প্রতিবেদনে চুয়ান্ন বছরের বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পথপরিক্রমা সেটা পর্যালোচনা করেছি। কোন সময় গণমাধ্যম কি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে কি পারেনি, তার একটা মূল্যায়ন সেখানে আছে এবং সেগুলো এভিডেন্স ভিত্তিক, সাক্ষ্যভিত্তিক, প্রমাণ ভিত্তিক মূল্যায়ন। বাংলাদেশে চুয়ান্ন বছরের মধ্যে কখনোই মিডিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা পায় নাই। কয়েকটা বছর আপেক্ষিকভাবে ভালো স্বাধীনতা পেয়েছিল। সেটা হচ্ছে একানব্বই থেকে চুরানব্বই সাল। চুরানব্বই এর পরে আবার নয়। এই যে, তার পরের দিনগুলোতে যে ক্রমানতি ঘটেছে, আস্তে আস্তে খারাপ হতে শুরু করেছে এবং দুই হাজার নয় এর পরে চরমভাবে খারাপ হতে শুরু করেছে হয়েছে, এটা তো ধারাবাহিকভাবে সবসময় খারাপ হয়েছে। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। পরিস্থিতি বদলেছে মানে সবাই এখন কথা বলছে। কিন্তু একটা নীতি তো থাকা দরকার। সরকার থেকে রেগুলেট করার বা একটা তদারকির তো ব্যাপার থাকে। নীতিটা মানা হচ্ছে কিনা, নীতি কার্যকর হচ্ছে কিনা সেই দিকে তো খেয়াল দেবে, সেটা খেয়াল রাখছে বলে মনে হয় না।
অন্তত সরকারের দিক থেকে যেটা আমরা আশা করেছিলাম যে আমরা কমিশনের তরফ থেকে যেই সমস্ত সুপারিশমালা দিয়েছি এবং আশু বাস্তবায়নযোগ্য বলে যেগুলো চিহ্নিত করে দিয়েছি, সেগুলোর ক্ষেত্রে অন্তত সরকার খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি অনেকটাই পরিবর্তন ঘটতো, কিন্তু সেক্ষেত্রে কিছু হয়নি। সুতরাং আমি বলব সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের চিত্র, হ্যাঁ পাল্টেছে, আমরা যা খুশি তাই বলতে পারছি, কিন্তু যা খুশি তাই বলতে পারাটা দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক না, দায়িত্বশীলতারও পরিচয় রাখার একটা প্রশ্ন আছে। আইন-শৃঙ্খলার সহায়ক, মানে আইন-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা, আইনের মধ্যে থাকার একটা বাধ্যবাধকতার প্রশ্নও আছে। সেটা কিন্তু আমরা করছি না।
স্ট্রিম: আপনারা কমিশনের পক্ষ থেকে অনেকগুলো স্বল্পমেয়াদি ও ‘আশু’বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ দিয়েছিলেন। যেমন—পত্রিকার প্রচার সংখ্যার বিভ্রান্তি দূর করা কিংবা বিজ্ঞাপনের হার নির্ধারণ। এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারের বাধা কোথায় বলে আপনি মনে করেন?
কামাল আহমেদ: সরকার করতে পারে নাই তার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে আমলাতন্ত্র। আমলারা তাদের ক্ষমতা খর্ব করতে চান না, ক্ষমতা ছাড়তে চান না। এমন কোনো কিছুই তারা মানবেন না যেটাতে তাদের ক্ষমতা খর্ব হয়। এখন বিজ্ঞাপনের জন্য তাদের কাছেই তদবির করতে হয় এবং সেখানে টাকা-পয়সার লেনদেন হয় অথবা টেলিফোন যায় অথবা কোন না কোন কিছু যায়। সুতরাং সেটা তারা হারাতে চান না, তাই তাদের দিক থেকে সংস্কারের কোনো আগ্রহ নেই। দ্বিতীয় আরেকটা কারণ হচ্ছে গত পনেরো বছর যেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চিত হয়েছে বলে ক্ষোভ আছে, ক্ষুব্ধ আছেন, তারা এখন সুযোগ নিতে চান যে আমাদের পনেরো বছর আমরা কিছুই পাই নাই, এখন তো আমাদের পেতে হবে। আমাদের পনেরো বছরের লোকসান তো কাটাতে হবে। সুতরাং তারাও ধমক ধামক দিয়ে কিন্তু অনেক জায়গায় অনেক কিছু করছেন। যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য আমরা যেই পদ্ধতির কথা বলেছিলাম সেই পদ্ধতি অনুসরণের জন্য যেই উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়ার দরকার ছিল সেই উদ্যোগ নেওয়ার মতন দায়িত্ব নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি সরকারের পক্ষ থেকে। তথ্য উপদেষ্টাও ব্যক্তিগতভাবে কতটুকু চেষ্টা করেছেন বা করেননি সেটা তার কাছেই জিজ্ঞেস করতে হবে।
কিন্তু আমরা একটা গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা দিয়েছিলাম যে সিভিল সোসাইটিকে ইনভলভ করেন, অংশীজন যারা সংবাদপত্রের মালিক, প্রকাশক, যারা বিজ্ঞাপন দেয়, বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান, এদের প্রতিনিধিত্বের সমন্বয়ে ইন্সপেকশনের ব্যবস্থা করেন, তদারকির ব্যবস্থা করেন, যাচাইয়ের ব্যবস্থা করেন। তারা যাচাই করে দেখবে যে কার সার্কুলেশন কত, প্রকৃত সংখ্যাটা দেখানো হচ্ছে কিনা। আমরা আরো বলেছিলাম যে সরকার জাতীয় রাজস্ব, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে সমস্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, সংবাদপত্রগুলোকে প্রতিবছর তো অ্যানুয়াল রিটার্ন দিতে হয় তাদের রেভিনিউ কত আর্ন হচ্ছে না হচ্ছে এবং রেভিনিউ এর ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন ছাড়াও পত্রিকা বিক্রির সংখ্যা দেখাতে তো হয় যে কত বিক্রি হয়েছে, সেখানে তো তারা মিথ্যাচার করবেন না নিশ্চয়ই। কেউ যদি এক লাখ পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি নিশ্চয়ই পাঁচ লাখ পত্রিকা দেখাবেন না কারণ তাহলে তার কর বাড়বে। সুতরাং আমরা বলেছিলাম যে যেই ট্যাক্স রিটার্ন দেওয়া হয় সেই ট্যাক্স রিটার্নও ভেরিফাই করবে এই যাচাই কমিটি। এগুলো মেলালে পরে আপনার একটা সঠিক চিত্র পাওয়া যেত। কিন্তু সরকার সেই কমিটিটা গঠন করতে পারেনি এখনো পর্যন্ত। আমি জানিনা যে আগামী যে সময়টুকু আছে সেই তার মধ্যে এটা সম্ভব হবে কিনা। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যে এইখানে একেবারে ভয়াবহ রকমের অনাচার চলছে। এখন পর্যন্ত সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের যে সরকারি হিসাব, নথিপত্রে যে কোন কাগজ কত কপি চলে, সেগুলোর টোটাল যদি যোগ দেওয়া হয় তাহলে ঢাকা শহরে আজকে যে শিশু জন্মগ্রহণ করছেন তারও একটা পত্রিকা কেনার কথা। কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না। অথচ আমরা দেখেছি হকার্স অ্যাসোসিয়েশন থেকে যাচাই করে দেখেছি তারা কত পত্রিকা বিক্রি করেন। ঢাকা শহরে সব মিলিয়ে দশ লক্ষ পত্রিকাও চলে না।
স্ট্রিম: একটি গণমাধ্যম যখন নিজেই মিথ্যা প্রচার সংখ্যা বা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেই প্রতিষ্ঠান সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে ‘সত্য’ প্রকাশের নৈতিক সাহস বা অধিকার কতটুকু রাখে?
কামাল আহমেদ: গণমাধ্যমের সেই নৈতিক অধিকার তো নেই আসলে। সত্যি কথা হলো তাই। নৈতিক অবস্থান তারা অনেক আগেই হারিয়েছে এবং যেই কারণে এত কম্প্রোমাইজ করে, যেই কারণে ধমক ধামক পেলেই নুইয়ে পড়ে। কারণ তারা তাদের দুর্বলতার কথা জানে। আমরা সেই দুর্বলতাগুলো কাটানোর জন্যে কতগুলো কথা বলেছিলাম যে ব্যবসা সফল হওয়া যায় কিভাবে, টেকসই ব্যবসায়ী, ব্যবসায়িক মডেল কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, কিন্তু সেদিকে তো সরকার এখনো আগায়নি। গণমাধ্যমের যে অংশীজন যারা, মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, ইউনিয়নগুলো, কেউ তো সেভাবে সোচ্চার হয়নি যে এইভাবে এইভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করেন। তারা যদি সোচ্চার হতো তাহলে হয়তো কিছু পরিবর্তন আমরা দেখতে পেতাম। এখন সেই পরিবর্তন আমরা দেখছি না। যেই কারণে বলব যে নৈতিক অবস্থানের দিক থেকে আমরা সত্যিই খুব দুর্বল অবস্থানে আছি।
এই যে টেলিভিশনগুলো যেই সম্প্রচারের মানে দর্শক সংখ্যা দেখায়, এই দর্শক সংখ্যা তো সঠিক নয়, সত্য নয়। তো এই দর্শক সংখ্যা নির্ধারণের যে একটা গ্রহণযোগ্য টিআরপি পদ্ধতি সেই টিআরপি পদ্ধতি করার জন্যেও আমরা সুপারিশ দিয়েছিলাম, সেই সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি কিছু। সুতরাং এখন সবই চলছে অনুমানের উপর। আর সুযোগটা নিচ্ছে কারা? সুযোগ নিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। বিজ্ঞাপন তো সব চলে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর এখানে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আপনার যে যতটা পারে ছাড় দিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপছে। যেই বিজ্ঞাপনের জন্য এক লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা, সেই বিজ্ঞাপন বিশ হাজার টাকায় ছাপতেও লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লোকজন। বা টেলিভিশনে আট হাজার টাকা, সেখানে তিন হাজার টাকায় মিনিট এয়ারটাইম বিক্রির জন্য প্রতিযোগিতা চলে। এটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় তারাই অংশগ্রহণ করছে যারা অন্য কোনোভাবে এই ক্ষতিটা পুষিয়ে নেবে। সেই অন্য কোনোভাবে ক্ষতিটা পুষিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যেমন, আমি টেলিভিশনের মালিক, আগামী নির্বাচনে আমাকে নমিনেশন দেন, অথবা আমাকে অমুক ব্যবসার লাইসেন্স দেন।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে প্রায় ৯০ শতাংশ গণমাধ্যমই লোকসানে চলছে বলে ধারণা করা হয়। বছরের পর বছর লোকসান দিয়েও এই মিডিয়া হাউজগুলো কেন টিকে থাকছে? এর পেছনে মালিকপক্ষ বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্য বা রাজনৈতিক স্বার্থ আসলে কী?
কামাল আহমেদ: স্বার্থ ওটাই, যা আমি বললাম। যে একটা হাউজ তাদের অন্তত ছয়টা মিডিয়া আছে। তাদের বাৎসরিক ক্ষতির পরিমাণ পঁচিশ কোটি টাকা। এটা তারা সর্বশেষ যে হিসাব রেজিস্টার জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে জমা দিয়েছিল সেটার হিসাব। মানে তা তিন বছর আগের, এখনকার না। বছরে পঁচিশ কোটি টাকা খরচ। তারপরে এই কয়েক বছরের হিসাব ধরেন, তাদের একটা প্রতিষ্ঠানও তো বন্ধ হয়নি, সব প্রতিষ্ঠান চলছে। কেন এই ক্ষতি তারা কেন পোষণ করছেন? কেন এই ক্ষতি মেনে নিচ্ছেন? সব জনস্বার্থে? এত বড় জনসেবক তারা, জনদরদী? এবং তখন তো তারা দাবি করবেন যে যেহেতু আমি জনদরদী অতএব আমাকে সংসদে যেতে দেন। তারপরে বলবে আমাকে মন্ত্রী করেন। এবং ক্ষমতায় বসে তাদের যে সাম্রাজ্য সেই সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটাবেন। এটাই তো হচ্ছে।
স্ট্রিম: সাংবাদিকতা ও সংবাদের মানের কথা যদি বলি, আগে আমরা যে মানের সাংবাদিকতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা দেখতাম, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে কি সংবাদের সেই গুণগত মান বেড়েছে, নাকি আরও অবক্ষয় ঘটেছে বলে মনে করেন?
কামাল আহমেদ: আমি একটু আগেই উদাহরণ দিয়েছি যে ফেসবুকের স্ট্যাটাস কিংবা ইউটিউব এর একটা বক্তব্য সেটার সত্য মিথ্যা যাচাই না করে তার ভক্তরা, পীরের ভক্তরা যেহেতু সে নিউজটা পড়ে কিংবা টিভিটা দেখে, ভিডিওটা দেখে, সেই কারণে সেই পীরের বক্তব্য সেটা সত্য হোক, মিথ্যা হোক, অপপ্রচার হোক, সাথে সাথে খবর হচ্ছে, খবরের কাগজে ছাপছে। যারা ছাপছে তারা তো সাংবাদিক। তারা কোন বিবেচনায় ঐ খবরটা ছাপে? সাংবাদিকতার কোন পাঠ্যসূচিতে তারা এই পাঠটা পেয়েছেন যে আমি সত্য যাচাই না করেই ঐ দাবিটা ছেপে দিতে পারব? কিন্তু তারা প্রতিদিন তা করছেন। এর থেকে তো বোঝা যায় যে সাংবাদিকতার মান কোথায় এসে ঠেকেছে এবং সম্পাদনার মানও কোথায় এসে ঠেকেছে।
সুতরাং সংবাদপত্রে একটা বড় ধরনের মানের সংস্কার দরকার। সম্পাদকের যোগ্যতা, সাংবাদিকের যোগ্যতা, প্রকাশকের যোগ্যতা, এগুলো সবকিছু একটা মান, ন্যূনতম মান ঠিক করা দরকার। সেটা পূর্ণ না হলে কোনোভাবেই সেটাকে সংবাদ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বা সাংবাদিকতা হিসেবে গণ্য করার কারণ নেই। অন্তত সরকারিভাবে তাদেরকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোন কারণ নেই। সরকার যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দেয়, এই যে নিউজপ্রিন্ট শুল্ক ছাড়া, শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করতে পারে, সেই সুযোগ পাবে না। টেলিভিশনের সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রেও হয়তো শুল্কে কিছু ছাড় থাকতে পারে কিংবা আয়করের ক্ষেত্রে ছাড় থাকতে পারে, ছাড় নেই যদিও এখনো। কিন্তু নানান ক্ষেত্রে নানান ধরনের সরকারি পলিসিতে তাদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকতে পারে, আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার, এই যে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড সাংবাদিকদের, সেগুলো দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা যে সুবিধা পায়, সেসব সুবিধা তো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যদি না হয় সেটা, স্বীকৃত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, তাহলে তো তাদের পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আর স্বীকৃত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হতে হলে এই নিয়ম-নীতিগুলো যে সাংবাদিকতার মান, সম্পাদকের যোগ্যতা, প্রকাশকের যোগ্যতা, এই শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। যারা পূরণ করবে না তারা এই স্বীকৃতি পাবে না, এই সুযোগগুলো পাবে না। তারা থাকতে পারে, কত কর্পোরেট হাউজের কর্পোরেট পাবলিকেশনস আছে না? বুলেটিন। অমুক কর্পোরেটের প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনাল বুলেটিন। বুলেটিন বের করবে, সেটা তো সংবাদপত্র না।
স্ট্রিম: ইন্টারনেটের প্রসার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার এই দাপটে পুরো বিশ্বের গণমাধ্যমই আজ অস্তিত্ব সংকটে। বর্তমানের এই নৈরাজ্য বা ‘কোলাহল’ আমাদের কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কি তবে একদিন প্রকৃত গণমাধ্যমহীন কোনো সমাজে পরিণত হব?
কামাল আহমেদ: আমি গোড়াতেই যেই আলোচনার সূত্রপাত করলাম বা যেখানে আমি বললাম যে এখন যেটা হচ্ছে সেটা হলো ক্যাওস, কোলাহল, ক্যাকোফনি। এখান থেকে একটা না একটা সময় বেরিয়ে আসতে হবে। সেই বেরিয়ে আসার আগে একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের হচ্ছে। আমরা সেই অভিজ্ঞতার পর্যায়ে আছি। আমি জানিনা এটা আরো কত খারাপের দিকে যাবে। এটা ভবিষ্যৎবাণী করা খুবই কঠিন। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে সঠিক সাংবাদিকতার গুরুত্ব সবাই উপলব্ধি করতে বাধ্য এবং তখন আবার সাংবাদিকতা তার মর্যাদাটা ফিরে পাবে। যারা প্রকৃত সাংবাদিকতা করবে, সৎ সাংবাদিকতা করবে, নিষ্ঠার সাথে সাংবাদিকতা করবে, তারা ঠিকই আবারও সমাদৃত হবে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
স্ট্রিম: অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
কামাল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
শ্রুতিলিখন: মুজাহিদুল ইসলাম

প্রযুক্তির পরিবর্তন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপটে মূলধারার গণমাধ্যম আজ অস্তিত্ব সংকটে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেলের অভাবে সাংবাদিকতায় নৈতিক অবক্ষয় ও তথ্য-নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম জনস্বার্থের বদলে মালিকপক্ষের রাজনৈতিক বা করপোরেট স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এসব বিষয়ে কার্যকর সংস্কার আনতে কাজ করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। সম্প্রতি এ বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের মুখোমুখি হন কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ ।
স্ট্রিম: আপনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রদান করেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে আপনি বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের গণমাধ্যমের সম্ভাবনা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে যদি বলতেন?
কামাল আহমেদ: গণমাধ্যমের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ এখন সারা দুনিয়াতেই প্রায় একই রকম বলতে হবে। কারণ এখানে ব্যাপকভাবে প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং রূপান্তর ঘটেছে। গণমাধ্যম সাধারণত যেভাবে পরিচালিত হতো সেখানে ছন্দপতন ঘটেছে। নতুন আবির্ভাব ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের। অন্যান্য যে সমস্ত প্লাটফর্ম - গণমাধ্যম বলতে স্বাভাবিকভাবে আমরা যেগুলোকে চিনতাম, সেটায় বড় ধরনের পরিবর্তন আরোপিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের জন্য সবাই প্রস্তুত ছিল না। এই পরিবর্তন এখন আরোপিত হয়েছে। যারা খবরের কাগজ ছাপতেন তাদেরকে এখন অনলাইনে টেলিভিশনের মতো প্রোডাকশন এবং একই জিনিস করতে হচ্ছে। আবার যারা টেলিভিশন করতেন, তাদেরকে এখন টেলিভিশনের বাইরেও অনলাইনে নানা রকম প্রোডাক্ট, কনটেন্ট দিতে হচ্ছে। আর অনলাইনে যারা কার্যক্রম শুরু করেছেন, মাল্টিমিডিয়া পোর্টাল, তারা মাল্টিমিডিয়া পোর্টাল হিসেবে চালাচ্ছেন।
সুতরাং এখন সব দিকেই দেখা যাচ্ছে যে একটা পরিবর্তন এবং রূপান্তর চলেছে। এই রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ সবাই সমানভাবে নিতে পারছে না। আর এর সাথে জড়িত আছে ব্যবসায়িক দিকটাও। বাস্তবতা হলো যেকোনো একটা প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে হলে তাকে আয় করতে হবে এবং সেই আয় যদি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মতো যথেষ্ট না হয় বা পর্যাপ্ত না হয় তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান টিকবে না। তো গণমাধ্যমের এই রূপান্তরের মধ্যে ব্যবসার জন্যে সেটা সফল মডেল হচ্ছে কিনা তা একটা গুরুতর প্রশ্ন এবং দেখা যাচ্ছে যে অনেকেই টেকসই ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করাতে পারছেন না। সে কারণে সাংঘাতিক রকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন এবং এই প্রতিকূলতায় এখনো সবাই সড়গড় হয়ে ওঠেননি যে সেটা কিভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব।
স্ট্রিম: বর্তমান সময়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সংবাদমাধ্যম আত্মপ্রকাশ করছে। একদিকে যেমন মিডিয়া হাউজগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে, অন্যদিকে নতুন প্রতিষ্ঠানের এই আগমনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
কামাল আহমেদ: এটাকে আমি তুলনা করতে চাই একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির সঙ্গে। কোলাহল বাড়ছে কিন্তু গুণগত বিতর্ক, একেবারে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া… গণমাধ্যমের এই যে প্রাথমিক কাজটা সেখানে কিন্তু অধিকাংশই ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ সংবাদমাধ্যমের কাজ কী? সাংবাদিকের কাজ কী? - সঠিক তথ্য যাচাই করা, যা ঘটছে হুবহু সে কথাটাই বলে দেওয়া। আর যদি মতামত প্রকাশের প্রশ্ন থাকে তাহলে সেই মতামতের পক্ষে, বিপক্ষে অথবা নিউট্রাল, এই সব ধরনের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করা, সেই মতামতগুলোকে ফেয়ারলি রিপ্রেজেন্ট করা, খুব ন্যায়সঙ্গতভাবে, কারো প্রতি অন্যায় নয়। ভারসাম্য বজায় রেখে যথাযথভাবে সেটা প্রতিফলিত করা। সেই কাজটা করার ক্ষেত্রে এখন কী ঘটছে? সেই কাজটা করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ব্যর্থ হচ্ছে এবং সেই ব্যর্থতার মুখে চ্যালেঞ্জ হিসেবে অনেকে এগিয়ে আসছেন যে আমরা নতুন একটা প্রতিষ্ঠান করছি, আমরা এই জায়গাটা পূরণ করব। যে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে সেই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য আমরা আসছি। কিন্তু যখন আসছেন তখন তিনি তার যোগ্যতা, সামর্থ্য, সক্ষমতা সেটা নিয়ে আসছেন কিনা সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সেই সক্ষমতা আর্থিক সক্ষমতা, সেই সক্ষমতা পেশাগত পেশাদারিত্বের সক্ষমতা, সেই সক্ষমতা জনগণের প্রতি কমিটমেন্টের সক্ষমতা।
আপনি বলুন, সাংবাদিকতা বা এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান কেন চলবে? কেন তৈরি করা হবে? এটা জনস্বার্থ রক্ষার জন্য করবে, জনস্বার্থকে প্রমোট করার জন্য করবে, পাবলিক ইন্টারেস্টকে সার্ভ করার জন্য। সেখানে পাবলিক ইন্টারেস্ট সার্ভ করার চাইতে অনেকেই কিন্তু করছেন তার ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি নানা ধরনের স্বার্থ আদায় করার জন্য এবং সেই স্বার্থ আদায় করার লক্ষ্যেই কিন্তু একের পর এক নতুন মিডিয়া আসছে। তারা সবাই বলছেন আমরা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য বা সেটাকে প্রমোট করার জন্য আমরা মিডিয়া করছি, কিন্তু কার্যত সেটা হচ্ছে না। এখন মার্কেটে বা বাজারে শত শত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সবাই তারস্বরে চিৎকার করছেন। এতে কী হচ্ছে? কোলাহল তৈরি হচ্ছে। একজনের কথা আরেকজন শুনছে না, কেউ কারো কথা শুনছে না। পাঠক, দর্শক, শ্রোতা কোনোটাই গ্রহণ করতে পারছে না। টেলিভিশনের দর্শক পড়ে আছে। সংবাদপত্রের পাঠক কমে যাচ্ছে। অনলাইন পোর্টালে আপনি অনেক পরিশ্রম করে একটা ভিডিও কনটেন্ট প্রডিউস করছেন, দেখা যাচ্ছে একটা ভিডিও কনটেন্ট প্রডিউস করার জন্য লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু তার ভিউ পঞ্চাশ জন, সত্তর জন, পাঁচশ জন, এক হাজারও নয়। তাহলে কী হচ্ছে? এই কোলাহল এটা একটা নৈরাজ্য তৈরি করেছে। মানুষ উপকৃত হচ্ছে না, প্রকৃত তথ্য পাচ্ছে না, প্রকৃত ব্যাকগ্রাউন্ড, ইতিহাস কিংবা যে পরিপ্রেক্ষিত সেগুলোর কোনো কিছুই পাচ্ছে না। এই নৈরাজ্য থেকে যদি গণমাধ্যমকে রক্ষা করা না যায় তাহলে ভবিষ্যৎ আরো কঠিন, আরো খারাপ হবে।
স্ট্রিম: বর্তমান সময়ে 'নিউ মিডিয়া' বা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন ফেসবুক, ইউটিউব) সাধারণ মানুষকে তথ্য প্রদানের ক্ষমতা দিয়েছে। এই ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলো কি মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য বড় ধরনের কোনো হুমকি বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে?
কামাল আহমেদ: বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো। এই বিগটেক কোম্পানিগুলো তারা তাদের ব্যবসাতেই সবচাইতে বেশি নজর দিচ্ছে। যে আইটেম সবচাইতে বেশি মানুষ দেখবে, যেই কনটেন্টটা, সেই কনটেন্টটাকে অ্যালগরিদমের কারসাজির মাধ্যমে বেশি প্রমোট করছে এবং তাদের রেভিনিউ জেনারেশন হচ্ছে তার মধ্য দিয়ে। সেই রেভিনিউ জেনারেশনের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা করছে মেটা, এক্স যেটা সাবেক টুইটার ছিল, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, এ ধরনের অন্যান্য প্লাটফর্ম কেউ বাদ নেই কিন্তু। এবং তখন দেখা যাচ্ছে যে এরা জনস্বার্থ, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন, এগুলোর কোনো কিছুকেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের অঙ্গীকার আছে যে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কোন তথ্য বা কোন কনটেন্ট তারা প্রকাশ করতে দেবে না। কিন্তু শিশুদের পর্নোগ্রাফিতে নিয়োগ করার অজস্র কনটেন্টও তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রচার হচ্ছে। একইভাবে সহিংসতায় উস্কানি দেওয়া, এটা কোনোভাবে বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করা, সমাজে বৈষম্য বাড়ানো, বিভাজন তৈরি, এই ধরনের কোনো কনটেন্ট তাদের না দেওয়ার কথা, তারা অঙ্গীকার করেছে এ ধরনের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমাদের সাম্প্রতিককালের অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন জায়গায় যে সেই ধরনের কনটেন্ট তারা বন্ধ করছে না বরং প্রমোট করছে।
মিয়ানমারে আমরা দেখেছি যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের ভূমিকা ফেসবুক রেখেছিল, এক্স রেখেছিল এবং ফেসবুকের মেটা কোম্পানি এখন আদালতে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে এই অভিযোগে। আমরা গাজার ঘটনার ক্ষেত্রে দেখেছি, এক্সে কী পরিমাণে গণহত্যাকে জাস্টিফাই করার জন্য, নৃশংসতাকে স্বাভাবিকীকরণের জন্য, গ্রহণযোগ্য করার জন্য কী ধরনের কনটেন্ট ঐখানে প্রচার হয়েছে। এগুলো তো ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বহীনতা, তারা ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে কী হচ্ছে? তথ্যবিকৃতি, অপতথ্য, অর্ধসত্য, মিথ্যা এবং সত্যের মিশ্রণ, এই ধরনের নানান জিনিস ছড়িয়ে পড়ছে খুব দ্রুততার সাথে এবং তাতে সমাজে নৈরাজ্যের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই নৈরাজ্যের ঝুঁকির থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে সরকারগুলোকে এবং আন্তর্জাতিকভাবে উদ্যোগ দরকার, বহুজাতিক উদ্যোগ দরকার। যেই উদ্যোগ দিয়ে এটা ঠেকানো যাবে। এটা কেবল গণমাধ্যম কিছুই করতে পারবে না। গণমাধ্যম শুধু এই ত্রুটিগুলো তুলে ধরতে পারে এবং এই ত্রুটিগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করতে পারে, সেটাও আমরা করছি না। আমরা বরং উল্টো করছি বাংলাদেশে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন একজন ইনফ্লুয়েন্সার, সো কলড সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার, যাদের অজস্র ভক্ত আছে, পীরের ভক্তের মতন, তো সেই পীর সাহেব একটা বানী দিলেন সেটা সত্য কি মিথ্যা যাচাই না করে বিশ্বাস করে তার পেছনে ছোটা শুরু করলো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই ঘটনা ঘটছে, একের পর এক ঘটছে এবং সেটাতে সহিংসতাও হয়েছে। কিন্তু সেই পীরদের বক্তব্য যেটা সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রচার হয়েছে সেটাই আবার খবর হিসেবে খবরের কাগজ ছাপছে এবং দ্রুততম সময়ে অনলাইন পোর্টালে প্রকাশ করছে। এটাতো সাংবাদিকতা না। তা আমরা যদি সঠিকভাবে সাংবাদিকতা না করি তাহলে ঐ সোশ্যাল মিডিয়ার যে আগ্রাসন সেই আগ্রাসন মোকাবেলা তো দূরের কথা, সেই আগ্রাসনের সহযোগী হচ্ছি আমরা এবং এটা কোনোভাবেই মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য ভালো নয়, কাম্য নয় এবং এটা বন্ধ না করা গেলে ভবিষ্যতে বিপদ আরো বাড়বে।
স্ট্রিম: অনেক সময় বলা হয়, 'মানুষ যা দেখতে চায় আমরা তাই দেখাই'। বর্তমান সময়ে ভিউ বা জনপ্রিয়তার এই ইঁদুর দৌড়ে গণমাধ্যমগুলো অনেক সময় খণ্ডিত বা আকর্ষণীয় তথ্য পরিবেশন করে। গণমাধ্যমের কি উচিত শুধু দর্শক চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া, নাকি ভালো কনটেন্টের মাধ্যমে নিজস্ব পাঠক বা দর্শক শ্রেণি গড়ে তোলা?
কামাল আহমেদ: আমি আমার পাঠক শ্রেণী তৈরি করব কিনা সেটা পরের প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, আমি যখন একাট গণমাধ্যম কিংবা সংবাদ প্রতিষ্ঠান করছি, তখন আমার নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে যে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, খণ্ডিত তথ্য নয়। কেউ একজন একটা বক্তব্য দিল, আমি তার মধ্যে একটা লাইন যেটা ভাইরাল হবে কেবল সেইটাকেই ফটোকোর্ড করে প্রচার করব, এটা সাংবাদিকতা নয়। আপনি সামগ্রিক তথ্য, পুরো তথ্যটা তুলে ধরবেন, এটা আপনার দায়িত্ব। আনবায়াসড, আনফিল্টারড, অবজেক্টিভ তথ্য, এটা তুলে ধরার অঙ্গীকার করেই আপনি গণমাধ্যম হন, সাংবাদিকতা করেন। সেই সাংবাদিকতা যদি আপনি না করেন তাহলে আপনার দায়িত্বে আপনি ব্যর্থ হচ্ছেন। আমরা এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই পথেই হাঁটছি। অতএব ভাইরাল হওয়া যদি কারো লক্ষ্য হয় সেটা ভুল পথে পরিচালনার, পরিচালিত হওয়ার পদক্ষেপ এবং আমি সরাসরি বলবো যে- সেটা ভুল, সেটা ক্ষতিকারক, সেটা সাংবাদিকতার জন্যও আত্মঘাতী।
স্ট্রিম: কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি সংবাদমাধ্যমের আর্থিক টিকে থাকাটাও জরুরি। জনপ্রিয় বা ভাইরাল কনটেন্ট না দিলে যদি আয় না হয়, তবে সেই আর্থিক সংকটের মুখে নীতি-নৈতিকতা রক্ষা করা কি আদৌ সম্ভব?
কামাল আহমেদ: সেজন্যেই বললাম যে আমাদের একটা ব্যবসায়িক মডেল, টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজন। কিন্তু সেই ব্যবসায়িক গণমাধ্যম ব্যবসায়িক টেকসই গণমাধ্যম করার জন্যে আমি অসততার আশ্রয় নিতে পারি না। আমি যদি অনৈতিকতার আশ্রয় নেই তাহলে তো পর্নোগ্রাফির ব্যবসা করাই ভালো। তাহলে আমি সাংবাদিকতার ব্যবসা করছি কেন? আমি তো সাংবাদিকতার জন্য যে ‘স্যাক্রোস্যাঙ্কটিটি’ যে নৈতিকভাবে খুব উঁচু দরের অবস্থানে অবস্থান করি বলে দাবি করি, সেই অবস্থান তো তাহলে যৌক্তিক না। তো আমাদেরকে সেই তফাৎটা বুঝতে হবে। সাংবাদিকতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার এই দুইটা যে এক জিনিস নয়, এটা আমাদেরকে বুঝতে হবে। জনপ্রিয়তা অর্জন আর সঠিক তথ্য তুলে ধরা এই দুইটা এক জিনিস নয়। এটা আমাদেরকে বুঝতে হবে। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে দেওয়া, কাউকে ন্যায্যভাবে তার কথা বলতে দেওয়ার অধিকারটা সম্মান দেখিয়ে সেই কথা যথাযথভাবে প্রচার করা আর তার বিপরীতে বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরা কিংবা অপপ্রচার করা কিংবা তাকে ম্যালাইন করা, অপমান করা, অপদস্থ করা সামাজিক মাধ্যমে, এটা সাংবাদিকতা না। এই দুই এর পার্থক্যগুলো আমাদেরকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।
স্ট্রিম: নৈরাজ্য বা অপতথ্য রোধে আপনার পরামর্শ কী? এখানে রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে কি কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
কামাল আহমেদ: অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন থাকবে এখানে। যদিও ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি আমি ব্যবহার করতে চাই না, নিয়ন্ত্রণ কথাটি হয়তো নেতিবাচক অর্থেই গ্রহণ করা হবে, কিন্তু যেটা করার কথা সেটা হল- সরকারের দায়িত্ব পালন। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের একটা দায়িত্ব আছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা, নাগরিকদের কল্যাণ এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের কল্যাণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাগরিকদের সম্ভাব্য যেকোনো ক্ষতি বা হুমকির থেকে রক্ষার দায়িত্ব, এটাতো রাষ্ট্রের। তো এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যদি কোনো ক্ষতি হয়, ক্ষতিকর কনটেন্ট যায় সেই ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রচার বন্ধ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। উস্কানি দেওয়ার বন্ধ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমার উপরে হামলা হলে, অন্যায়ভাবে যদি কেউ আমাকে আক্রমণ করতে আসে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেটা থেকে আমাকে নিরাপত্তা দেওয়া। সাথে সাথে মোকাবেলা বা ঠেকাতে না পারলেও আমার ওপর বা কোনো নাগরিকের ওপর অন্যায় হয়ে বা হামলা হলে তদন্ত করে অপরাধীর বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
ঠিক একইভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার যে সোশ্যাল স্ফেয়ার, সামাজিক ক্ষেত্র, চারণভূমি, সেখানে একটা নিয়ম-নীতি প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব, নিয়ম-নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের। যারা নিয়ম-নীতি মানবে না তাদের জবাবদিহি আদায় করার দায়িত্ব সরকারের এবং সেই কারণেই বিগ কোম্পানিজ, এই যে মেটা কিংবা এক্স, ইউরোপের দেশগুলোতে কত বিলিয়ন ডলার এদেরকে জরিমানা দিতে হয়েছে এবং এখন কি নিয়ম মানতে হচ্ছে, এগুলো একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন। আমাদের সরকারকে সেই পথে যেতে হবে। ঐসব দেশে কেউ বলবে না ঐ উন্নত দেশের উন্নত গণতন্ত্রে যে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে সরকার পলিসি গ্রহণ করে, কঠোর পলিসি গ্রহণ করে জনগণের মত প্রকাশের অধিকারকে ক্ষুন্ন করেছে। মোটেও নয়। জনগণের মত প্রকাশের অধিকার অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা এটা স্যাক্রোস্যাঙ্কট, এটা পবিত্র, এখানে হাত দেওয়া যাবে না। কিন্তু আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে আমি উস্কানি দেওয়ার স্বাধীনতা পাবো, আমি কারো মানহানি করার স্বাধীনতা পাবো, আমি কাউকে হেনস্থা করার স্বাধীনতা পাবো, এটা তা নয়। সুতরাং এই ফারাকটা আমাদের বুঝতে হবে এবং সরকারকে এই ফারাকটা কার্যকর করতে হবে। সেটা নীতিমালা অধীনে এবং আইন কার্যকর করার মাধ্যমে।
স্ট্রিম: বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের গণমাধ্যম কি এই ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে তার ঐতিহাসিক ও নৈতিক ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে পারছে?
কামাল আহমেদ: এটা মানুষ দেখছে। আপনি গত পনেরো বছরের বা সতেরো বছরের ইতিহাস বা তারও আগের পঁচিশ বছরের ইতিহাস দেখুন। আমি তো আমাদের কমিশনের যে রিপোর্ট আমরা দিয়েছি সেই কমিশনের রিপোর্টে, প্রতিবেদনে চুয়ান্ন বছরের বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পথপরিক্রমা সেটা পর্যালোচনা করেছি। কোন সময় গণমাধ্যম কি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে কি পারেনি, তার একটা মূল্যায়ন সেখানে আছে এবং সেগুলো এভিডেন্স ভিত্তিক, সাক্ষ্যভিত্তিক, প্রমাণ ভিত্তিক মূল্যায়ন। বাংলাদেশে চুয়ান্ন বছরের মধ্যে কখনোই মিডিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা পায় নাই। কয়েকটা বছর আপেক্ষিকভাবে ভালো স্বাধীনতা পেয়েছিল। সেটা হচ্ছে একানব্বই থেকে চুরানব্বই সাল। চুরানব্বই এর পরে আবার নয়। এই যে, তার পরের দিনগুলোতে যে ক্রমানতি ঘটেছে, আস্তে আস্তে খারাপ হতে শুরু করেছে এবং দুই হাজার নয় এর পরে চরমভাবে খারাপ হতে শুরু করেছে হয়েছে, এটা তো ধারাবাহিকভাবে সবসময় খারাপ হয়েছে। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। পরিস্থিতি বদলেছে মানে সবাই এখন কথা বলছে। কিন্তু একটা নীতি তো থাকা দরকার। সরকার থেকে রেগুলেট করার বা একটা তদারকির তো ব্যাপার থাকে। নীতিটা মানা হচ্ছে কিনা, নীতি কার্যকর হচ্ছে কিনা সেই দিকে তো খেয়াল দেবে, সেটা খেয়াল রাখছে বলে মনে হয় না।
অন্তত সরকারের দিক থেকে যেটা আমরা আশা করেছিলাম যে আমরা কমিশনের তরফ থেকে যেই সমস্ত সুপারিশমালা দিয়েছি এবং আশু বাস্তবায়নযোগ্য বলে যেগুলো চিহ্নিত করে দিয়েছি, সেগুলোর ক্ষেত্রে অন্তত সরকার খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি অনেকটাই পরিবর্তন ঘটতো, কিন্তু সেক্ষেত্রে কিছু হয়নি। সুতরাং আমি বলব সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের চিত্র, হ্যাঁ পাল্টেছে, আমরা যা খুশি তাই বলতে পারছি, কিন্তু যা খুশি তাই বলতে পারাটা দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক না, দায়িত্বশীলতারও পরিচয় রাখার একটা প্রশ্ন আছে। আইন-শৃঙ্খলার সহায়ক, মানে আইন-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা, আইনের মধ্যে থাকার একটা বাধ্যবাধকতার প্রশ্নও আছে। সেটা কিন্তু আমরা করছি না।
স্ট্রিম: আপনারা কমিশনের পক্ষ থেকে অনেকগুলো স্বল্পমেয়াদি ও ‘আশু’বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ দিয়েছিলেন। যেমন—পত্রিকার প্রচার সংখ্যার বিভ্রান্তি দূর করা কিংবা বিজ্ঞাপনের হার নির্ধারণ। এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারের বাধা কোথায় বলে আপনি মনে করেন?
কামাল আহমেদ: সরকার করতে পারে নাই তার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে আমলাতন্ত্র। আমলারা তাদের ক্ষমতা খর্ব করতে চান না, ক্ষমতা ছাড়তে চান না। এমন কোনো কিছুই তারা মানবেন না যেটাতে তাদের ক্ষমতা খর্ব হয়। এখন বিজ্ঞাপনের জন্য তাদের কাছেই তদবির করতে হয় এবং সেখানে টাকা-পয়সার লেনদেন হয় অথবা টেলিফোন যায় অথবা কোন না কোন কিছু যায়। সুতরাং সেটা তারা হারাতে চান না, তাই তাদের দিক থেকে সংস্কারের কোনো আগ্রহ নেই। দ্বিতীয় আরেকটা কারণ হচ্ছে গত পনেরো বছর যেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চিত হয়েছে বলে ক্ষোভ আছে, ক্ষুব্ধ আছেন, তারা এখন সুযোগ নিতে চান যে আমাদের পনেরো বছর আমরা কিছুই পাই নাই, এখন তো আমাদের পেতে হবে। আমাদের পনেরো বছরের লোকসান তো কাটাতে হবে। সুতরাং তারাও ধমক ধামক দিয়ে কিন্তু অনেক জায়গায় অনেক কিছু করছেন। যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য আমরা যেই পদ্ধতির কথা বলেছিলাম সেই পদ্ধতি অনুসরণের জন্য যেই উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়ার দরকার ছিল সেই উদ্যোগ নেওয়ার মতন দায়িত্ব নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি সরকারের পক্ষ থেকে। তথ্য উপদেষ্টাও ব্যক্তিগতভাবে কতটুকু চেষ্টা করেছেন বা করেননি সেটা তার কাছেই জিজ্ঞেস করতে হবে।
কিন্তু আমরা একটা গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা দিয়েছিলাম যে সিভিল সোসাইটিকে ইনভলভ করেন, অংশীজন যারা সংবাদপত্রের মালিক, প্রকাশক, যারা বিজ্ঞাপন দেয়, বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান, এদের প্রতিনিধিত্বের সমন্বয়ে ইন্সপেকশনের ব্যবস্থা করেন, তদারকির ব্যবস্থা করেন, যাচাইয়ের ব্যবস্থা করেন। তারা যাচাই করে দেখবে যে কার সার্কুলেশন কত, প্রকৃত সংখ্যাটা দেখানো হচ্ছে কিনা। আমরা আরো বলেছিলাম যে সরকার জাতীয় রাজস্ব, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে সমস্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, সংবাদপত্রগুলোকে প্রতিবছর তো অ্যানুয়াল রিটার্ন দিতে হয় তাদের রেভিনিউ কত আর্ন হচ্ছে না হচ্ছে এবং রেভিনিউ এর ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন ছাড়াও পত্রিকা বিক্রির সংখ্যা দেখাতে তো হয় যে কত বিক্রি হয়েছে, সেখানে তো তারা মিথ্যাচার করবেন না নিশ্চয়ই। কেউ যদি এক লাখ পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি নিশ্চয়ই পাঁচ লাখ পত্রিকা দেখাবেন না কারণ তাহলে তার কর বাড়বে। সুতরাং আমরা বলেছিলাম যে যেই ট্যাক্স রিটার্ন দেওয়া হয় সেই ট্যাক্স রিটার্নও ভেরিফাই করবে এই যাচাই কমিটি। এগুলো মেলালে পরে আপনার একটা সঠিক চিত্র পাওয়া যেত। কিন্তু সরকার সেই কমিটিটা গঠন করতে পারেনি এখনো পর্যন্ত। আমি জানিনা যে আগামী যে সময়টুকু আছে সেই তার মধ্যে এটা সম্ভব হবে কিনা। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যে এইখানে একেবারে ভয়াবহ রকমের অনাচার চলছে। এখন পর্যন্ত সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের যে সরকারি হিসাব, নথিপত্রে যে কোন কাগজ কত কপি চলে, সেগুলোর টোটাল যদি যোগ দেওয়া হয় তাহলে ঢাকা শহরে আজকে যে শিশু জন্মগ্রহণ করছেন তারও একটা পত্রিকা কেনার কথা। কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না। অথচ আমরা দেখেছি হকার্স অ্যাসোসিয়েশন থেকে যাচাই করে দেখেছি তারা কত পত্রিকা বিক্রি করেন। ঢাকা শহরে সব মিলিয়ে দশ লক্ষ পত্রিকাও চলে না।
স্ট্রিম: একটি গণমাধ্যম যখন নিজেই মিথ্যা প্রচার সংখ্যা বা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেই প্রতিষ্ঠান সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে ‘সত্য’ প্রকাশের নৈতিক সাহস বা অধিকার কতটুকু রাখে?
কামাল আহমেদ: গণমাধ্যমের সেই নৈতিক অধিকার তো নেই আসলে। সত্যি কথা হলো তাই। নৈতিক অবস্থান তারা অনেক আগেই হারিয়েছে এবং যেই কারণে এত কম্প্রোমাইজ করে, যেই কারণে ধমক ধামক পেলেই নুইয়ে পড়ে। কারণ তারা তাদের দুর্বলতার কথা জানে। আমরা সেই দুর্বলতাগুলো কাটানোর জন্যে কতগুলো কথা বলেছিলাম যে ব্যবসা সফল হওয়া যায় কিভাবে, টেকসই ব্যবসায়ী, ব্যবসায়িক মডেল কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, কিন্তু সেদিকে তো সরকার এখনো আগায়নি। গণমাধ্যমের যে অংশীজন যারা, মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, ইউনিয়নগুলো, কেউ তো সেভাবে সোচ্চার হয়নি যে এইভাবে এইভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করেন। তারা যদি সোচ্চার হতো তাহলে হয়তো কিছু পরিবর্তন আমরা দেখতে পেতাম। এখন সেই পরিবর্তন আমরা দেখছি না। যেই কারণে বলব যে নৈতিক অবস্থানের দিক থেকে আমরা সত্যিই খুব দুর্বল অবস্থানে আছি।
এই যে টেলিভিশনগুলো যেই সম্প্রচারের মানে দর্শক সংখ্যা দেখায়, এই দর্শক সংখ্যা তো সঠিক নয়, সত্য নয়। তো এই দর্শক সংখ্যা নির্ধারণের যে একটা গ্রহণযোগ্য টিআরপি পদ্ধতি সেই টিআরপি পদ্ধতি করার জন্যেও আমরা সুপারিশ দিয়েছিলাম, সেই সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি কিছু। সুতরাং এখন সবই চলছে অনুমানের উপর। আর সুযোগটা নিচ্ছে কারা? সুযোগ নিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। বিজ্ঞাপন তো সব চলে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর এখানে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আপনার যে যতটা পারে ছাড় দিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপছে। যেই বিজ্ঞাপনের জন্য এক লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা, সেই বিজ্ঞাপন বিশ হাজার টাকায় ছাপতেও লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লোকজন। বা টেলিভিশনে আট হাজার টাকা, সেখানে তিন হাজার টাকায় মিনিট এয়ারটাইম বিক্রির জন্য প্রতিযোগিতা চলে। এটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় তারাই অংশগ্রহণ করছে যারা অন্য কোনোভাবে এই ক্ষতিটা পুষিয়ে নেবে। সেই অন্য কোনোভাবে ক্ষতিটা পুষিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যেমন, আমি টেলিভিশনের মালিক, আগামী নির্বাচনে আমাকে নমিনেশন দেন, অথবা আমাকে অমুক ব্যবসার লাইসেন্স দেন।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে প্রায় ৯০ শতাংশ গণমাধ্যমই লোকসানে চলছে বলে ধারণা করা হয়। বছরের পর বছর লোকসান দিয়েও এই মিডিয়া হাউজগুলো কেন টিকে থাকছে? এর পেছনে মালিকপক্ষ বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্য বা রাজনৈতিক স্বার্থ আসলে কী?
কামাল আহমেদ: স্বার্থ ওটাই, যা আমি বললাম। যে একটা হাউজ তাদের অন্তত ছয়টা মিডিয়া আছে। তাদের বাৎসরিক ক্ষতির পরিমাণ পঁচিশ কোটি টাকা। এটা তারা সর্বশেষ যে হিসাব রেজিস্টার জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে জমা দিয়েছিল সেটার হিসাব। মানে তা তিন বছর আগের, এখনকার না। বছরে পঁচিশ কোটি টাকা খরচ। তারপরে এই কয়েক বছরের হিসাব ধরেন, তাদের একটা প্রতিষ্ঠানও তো বন্ধ হয়নি, সব প্রতিষ্ঠান চলছে। কেন এই ক্ষতি তারা কেন পোষণ করছেন? কেন এই ক্ষতি মেনে নিচ্ছেন? সব জনস্বার্থে? এত বড় জনসেবক তারা, জনদরদী? এবং তখন তো তারা দাবি করবেন যে যেহেতু আমি জনদরদী অতএব আমাকে সংসদে যেতে দেন। তারপরে বলবে আমাকে মন্ত্রী করেন। এবং ক্ষমতায় বসে তাদের যে সাম্রাজ্য সেই সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটাবেন। এটাই তো হচ্ছে।
স্ট্রিম: সাংবাদিকতা ও সংবাদের মানের কথা যদি বলি, আগে আমরা যে মানের সাংবাদিকতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা দেখতাম, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে কি সংবাদের সেই গুণগত মান বেড়েছে, নাকি আরও অবক্ষয় ঘটেছে বলে মনে করেন?
কামাল আহমেদ: আমি একটু আগেই উদাহরণ দিয়েছি যে ফেসবুকের স্ট্যাটাস কিংবা ইউটিউব এর একটা বক্তব্য সেটার সত্য মিথ্যা যাচাই না করে তার ভক্তরা, পীরের ভক্তরা যেহেতু সে নিউজটা পড়ে কিংবা টিভিটা দেখে, ভিডিওটা দেখে, সেই কারণে সেই পীরের বক্তব্য সেটা সত্য হোক, মিথ্যা হোক, অপপ্রচার হোক, সাথে সাথে খবর হচ্ছে, খবরের কাগজে ছাপছে। যারা ছাপছে তারা তো সাংবাদিক। তারা কোন বিবেচনায় ঐ খবরটা ছাপে? সাংবাদিকতার কোন পাঠ্যসূচিতে তারা এই পাঠটা পেয়েছেন যে আমি সত্য যাচাই না করেই ঐ দাবিটা ছেপে দিতে পারব? কিন্তু তারা প্রতিদিন তা করছেন। এর থেকে তো বোঝা যায় যে সাংবাদিকতার মান কোথায় এসে ঠেকেছে এবং সম্পাদনার মানও কোথায় এসে ঠেকেছে।
সুতরাং সংবাদপত্রে একটা বড় ধরনের মানের সংস্কার দরকার। সম্পাদকের যোগ্যতা, সাংবাদিকের যোগ্যতা, প্রকাশকের যোগ্যতা, এগুলো সবকিছু একটা মান, ন্যূনতম মান ঠিক করা দরকার। সেটা পূর্ণ না হলে কোনোভাবেই সেটাকে সংবাদ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বা সাংবাদিকতা হিসেবে গণ্য করার কারণ নেই। অন্তত সরকারিভাবে তাদেরকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোন কারণ নেই। সরকার যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দেয়, এই যে নিউজপ্রিন্ট শুল্ক ছাড়া, শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করতে পারে, সেই সুযোগ পাবে না। টেলিভিশনের সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রেও হয়তো শুল্কে কিছু ছাড় থাকতে পারে কিংবা আয়করের ক্ষেত্রে ছাড় থাকতে পারে, ছাড় নেই যদিও এখনো। কিন্তু নানান ক্ষেত্রে নানান ধরনের সরকারি পলিসিতে তাদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকতে পারে, আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার, এই যে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড সাংবাদিকদের, সেগুলো দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা যে সুবিধা পায়, সেসব সুবিধা তো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যদি না হয় সেটা, স্বীকৃত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, তাহলে তো তাদের পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আর স্বীকৃত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হতে হলে এই নিয়ম-নীতিগুলো যে সাংবাদিকতার মান, সম্পাদকের যোগ্যতা, প্রকাশকের যোগ্যতা, এই শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। যারা পূরণ করবে না তারা এই স্বীকৃতি পাবে না, এই সুযোগগুলো পাবে না। তারা থাকতে পারে, কত কর্পোরেট হাউজের কর্পোরেট পাবলিকেশনস আছে না? বুলেটিন। অমুক কর্পোরেটের প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনাল বুলেটিন। বুলেটিন বের করবে, সেটা তো সংবাদপত্র না।
স্ট্রিম: ইন্টারনেটের প্রসার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার এই দাপটে পুরো বিশ্বের গণমাধ্যমই আজ অস্তিত্ব সংকটে। বর্তমানের এই নৈরাজ্য বা ‘কোলাহল’ আমাদের কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কি তবে একদিন প্রকৃত গণমাধ্যমহীন কোনো সমাজে পরিণত হব?
কামাল আহমেদ: আমি গোড়াতেই যেই আলোচনার সূত্রপাত করলাম বা যেখানে আমি বললাম যে এখন যেটা হচ্ছে সেটা হলো ক্যাওস, কোলাহল, ক্যাকোফনি। এখান থেকে একটা না একটা সময় বেরিয়ে আসতে হবে। সেই বেরিয়ে আসার আগে একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের হচ্ছে। আমরা সেই অভিজ্ঞতার পর্যায়ে আছি। আমি জানিনা এটা আরো কত খারাপের দিকে যাবে। এটা ভবিষ্যৎবাণী করা খুবই কঠিন। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে সঠিক সাংবাদিকতার গুরুত্ব সবাই উপলব্ধি করতে বাধ্য এবং তখন আবার সাংবাদিকতা তার মর্যাদাটা ফিরে পাবে। যারা প্রকৃত সাংবাদিকতা করবে, সৎ সাংবাদিকতা করবে, নিষ্ঠার সাথে সাংবাদিকতা করবে, তারা ঠিকই আবারও সমাদৃত হবে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
স্ট্রিম: অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
কামাল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
শ্রুতিলিখন: মুজাহিদুল ইসলাম

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দ্রুত অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
৬ ঘণ্টা আগে
স্বাধীন বাংলাদেশে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান–পতন আমরা দেখেছি। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণে পরিমিতিবোধ বজায় রাখার ধারাবাহিকতা যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার নাম আলাদাভাবে আলোচনায় আসে।
১৯ ঘণ্টা আগে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ দীর্ঘ সময় সুন্দরবনের বাঘ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণা করছেন। সম্প্রতি সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ফাঁদে বাঘ আটকে পড়ার ঘটনা এবং বাঘের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে তিনি স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন।
২ দিন আগে
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক’ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা বিশ্ব উল্লাসে মেতেছে। তাদের দাবি, অত্যাচারী শাসকের পতন ঘটিয়ে ‘গণতন্ত্র’ উদ্ধার করা হয়েছে।
৩ দিন আগে