যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নার সাক্ষাৎকার

মেধাবী তরুণেরা রাজনীতিতে না এলে দেশ অযোগ্যদের হাতে যাবে

আব্দুল মোনায়েম মুন্না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি। প্রায় চার দশক ধরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় তিনি। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াই, কারাবরণ, সংগঠন পরিচালনা—সব মিলিয়ে তিনি এখন বিএনপির অন্যতম নির্ভরযোগ্য অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুবদলের অবস্থান, তরুণদের সম্পৃক্ততা, কর্মসূচির ধরন, সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিরহাজুল শিবলী।

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬: ৫৫
আব্দুল-মোনায়েম-মুন্না। স্ট্রিম ছবি

স্ট্রিম: রাজনীতিতে কীভাবে এলেন? বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার শুরুটা কীভাবে ছিলো? বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুবদলের অগ্রাধিকার কী?

মুন্না: আমার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তখন আমরা একেবারে মাঠের কর্মী হিসেবে রাজপথে ছিলাম। অবিভক্ত মতিঝিল থানায় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। পরে কাউন্সিলের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছি। সেই সময়কার আন্দোলন ছিল খুবই তীব্র। প্রতিটি কর্মসূচিতে আমাদের অংশগ্রহণ ছিল। কোনো কর্মসূচি বাদ যায়নি। তখনকার প্রজন্ম হিসেবে আমরাই ছিলাম সেই সময়ের কর্মীশক্তি।

পরে মহানগর ছাত্রদলেও দায়িত্ব পালন করেছি। তখন অনেক নেতাকর্মী আমাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, যারা এখন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আমরা সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা পাই। আবার ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সময়ে বিরোধী দলে থেকেও রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। সেই সময় পুলিশি নির্যাতন, হামলা—সবকিছু মোকাবিলা করেছি। সাম্প্রতিক দীর্ঘ সময়েও আমরা রাজপথে ছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে চার-পাঁচবার কারাবরণ করেছি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে টানা ১১ মাস কারাগারে ছিলাম। সেখানে নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—আমাদের অগ্রাধিকার হচ্ছে সংগঠনকে শক্তিশালী করা, গণতান্ত্রিক চর্চা ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য সংগঠনকে প্রস্তুত রাখা।

স্ট্রিম: আপনার সমসাময়িক অনেকেই এখন সংসদে। আপনি কি জনপ্রতিনিধি হতে আগ্রহী, নাকি সংগঠনেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

মুন্না: নির্বাচন করার ইচ্ছা অবশ্যই আছে। আমার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৮। তবে বাস্তবতা হলো, নির্বাচনের সময় আমি সংগঠনের কাজ নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলাম। যে ধরনের নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন, সেই সুযোগটা পুরোপুরি নিতে পারিনি।

আমি সব সময় দলের সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। দল যেখানে আমাকে প্রয়োজন মনে করবে, আমি সেখানেই কাজ করব। সংগঠন এবং সরকার—দুটো আলাদা বিষয়। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হলে অনেক সময় সংগঠনের মধ্যেই থেকে কাজ করা জরুরি হয়। দল যদি মনে করে আমি আরও কিছুদিন যুবদলে কাজ করি, সেটাও আমি সাদরে গ্রহণ করব। ভবিষ্যতে সুযোগ এলে নির্বাচন করব—এই প্রত্যাশা অবশ্যই আছে।

স্ট্রিম: বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের আকৃষ্ট করার জন্য যুবদল কী পরিকল্পনা নিয়েছে?

মুন্না: আমরা সব সময় শিক্ষিত, সচেতন এবং নিরপেক্ষ তরুণদের রাজনীতিতে আসার আহ্বান জানাই। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তরুণদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

রাজনীতি এড়িয়ে চলা মানে অনেক সময় অযোগ্য নেতৃত্বকে মেনে নেওয়া। তাই তরুণদের রাজনীতিতে আসা উচিত—তবে সেটা হতে হবে ইতিবাচকভাবে। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের উদ্বিগ্ন করছে—কিছু তরুণের মধ্যে উগ্রতা, বেয়াদবি এবং অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। তারা অনেক সময় যাচাই না করে কথা বলে, সিনিয়র নেতাদের সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য করে।

আমরা এখনো ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামলাচ্ছি এবং আমাদের নেতাকর্মীদেরও সংযত থাকতে বলছি। আমরা চাই তরুণরা শালীনতা বজায় রেখে গঠনমূলক রাজনীতিতে যুক্ত হোক।

স্ট্রিম: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও উগ্রতার প্রবণতা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মুন্না: বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কিছু মানুষ যাচাই-বাছাই ছাড়া কথা বলছে, মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে, বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ তৈরি করছে। আমরা গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু মিথ্যা তথ্য বা অপপ্রচার কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

অনেক সময় দেখা যায়, যারা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নয়, তাদেরও ‘যুবদল নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এটি একটি উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার। আমরা এসবের প্রতিবাদ করি এবং ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি। আমি মনে করি, ইতিবাচক চিন্তার মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে এবং এই নেতিবাচক প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।

স্ট্রিম: সাম্প্রতিক সহিংসতা বা ‘মব কালচার’ নিয়ে আপনার অবস্থান কী?

মুন্না: আমরা যেকোনো ধরনের উগ্রতা ও সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করি। কোনো ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, আবেগের বশে বড় ধরনের সহিংসতা হয়েছে। এটি দেশের জন্য ভালো নয়। দুটো প্রথম সারির গণমাধ্যমের উপর হামলা হয়েছে। আমরা এসব ঘটনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি এবং ভবিষ্যতেও নেব। রাজনীতি মানে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং আইন মেনে চলা—এই বিষয়গুলো আমরা গুরুত্ব দিই।

স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপরত আব্দুল-মোনায়েম-মুন্না। স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপরত আব্দুল-মোনায়েম-মুন্না। স্ট্রিম ছবি

স্ট্রিম: যুবদলের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা আছে—এটি নাকি দিবসনির্ভর হয়ে পড়েছে। আপনার মন্তব্য কী?

মুন্না: এই সমালোচনা পুরোপুরি সঠিক নয়। আমাদের কার্যক্রম শুধু দিবসকেন্দ্রিক নয়। আমরা নিয়মিত সাংগঠনিক কাজ করছি, সামাজিক কাজ করছি। আমরা সেমিনার, কর্মশালা, বিভাগীয় সমাবেশ করেছি। তরুণদের নিয়ে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন করেছি। শিশুদের নিয়ে বড় পরিসরে অনুষ্ঠান করেছি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছি যেখানে প্রায় ১৫০০ অংশগ্রহণকারী ছিল। এসব উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। আমাদের কার্যক্রম বহুমাত্রিক—শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নয়।

স্ট্রিম: শিশুদের নিয়ে কার্যক্রম যুবদলের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক?

মুন্না: শিশুদের পরিবারেই তরুণরা থাকে। শিশুদের প্রতিভা বিকাশে ভূমিকা রাখলে সেটি ভবিষ্যতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই শিশুরা বড় হয়ে সংগঠনের অবদান মনে রাখবে। তাদের পরিবারও সংগঠনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করবে। এটি আমাদের সামাজিক দায়িত্বের অংশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির একটি মাধ্যম।

স্ট্রিম: সাম্প্রতিক সময়ে আপনাদের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মুন্না: আমরা কোনো ঘটনা অস্বীকার করি না। আওয়ামী লীগ যেভাবে ডিনায়াল পদ্ধতিতে ছিল আমরা কিন্তু ডিনায়াল করছি না। প্রমাণিত হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিই। অনেক সময় দেখা যায়, যাদের সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, তাদেরও ‘যুবদল নেতা’ বলা হয়। এটি বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যমূলক। আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা নিই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করি। একটি বড় সংগঠনে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকতেই পারে। তবে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।

স্ট্রিম: তরুণদের সবচেয়ে বড় সংকট বেকারত্ব। এ বিষয়ে যুবদলের ভূমিকা কী?

মুন্না: বেকারত্ব একটি বড় জাতীয় সমস্যা। আমরা এ বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করছি। কর্মসংস্থান তৈরির জন্য নতুন শ্রমবাজার খোলা, দক্ষতা উন্নয়ন—এসব বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, যাতে যুবকদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। যুবদলও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়।

স্ট্রিম: যুবদলের কর্মসূচিতে সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম কম—এমন সমালোচনার জবাব কী?

মুন্না: আমরা শুধু রাজপথের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নই। গত বছর আমরা ৪টি রাজনৈতিক বিভাগে আমরা সেমিনার, কর্মশালা, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা আয়োজন করছি। বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করছি, যাতে তরুণরা নতুন ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি পায়। আমাদের কার্যক্রমকে একপাক্ষিকভাবে দেখলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

স্ট্রিম: ৫ আগস্টের পর যুবদলের কিছু নেতিবাচক ঘটনা সামনে এসেছে। এটি কি উদ্বেগজনক?

মুন্না: যুবদল একটি বৃহৎ সংগঠন। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে—আমরা তা অস্বীকার করছি না। আওয়ামী লীগ যেভাবে ডিনায়াল পদ্ধতিতে ছিল আমরা কিন্তু ডিনায়াল করছি না, আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি বহু আগে সংগঠন ছেড়ে গেছে, কিন্তু তাকে যুবদল নেতা বলা হচ্ছে। আমরা এসব বিষয় পরিষ্কার করছি এবং আইনগতব্যবস্থা নিচ্ছি। সংগঠনকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

একটি পরিবার বা সমাজের মধ্যে দুষ্ট কেউ না কেউ থাকে। এত বড় জনসংখ্যার বাংলাদেশে স্বল্পসংখ্যক পুলিশ বা প্রশাসন জনগণের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে হিমসিম যায়। আমাদেরও কিছু দুষ্ট লোকজন অবশ্যই আছে। কিন্তু আমরা কিন্তু তাদেরকে অস্বীকার না করে কোনো নেতিবাচক ঘটনা ঘটলে তার তড়িৎ ব্যবস্থা নিচ্ছি।

স্ট্রিম: বিদেশমুখী তরুণদের জন্য আপনার বার্তা কী?

মুন্না: বিদেশে যাওয়া স্বাভাবিক—কেউ কর্মসংস্থানের জন্য, কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য যায়। এটি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, বিশেষ করে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে।

তবে বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর অনেকেই সেখানেই থেকে যায়। আমি মনে করি, সুযোগ পেলে তাদের দেশে ফিরে এসে দেশের জন্য কাজ করা উচিত। সে জন্য আমি তাদের প্রতি আহ্বান জানাই। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, বিদেশফেরত অনেক স্কলার দেশে কাজ করছেন। বর্তমান সরকারের আমলে ড. মাহাদী আমিন, ড. রেহান আসিফ আসাদ, ড. সাইমুম পারভেজ, ড. সালেহ শিবলীসহ আরও অনেকে বিদেশে ভালো অবস্থানে থেকেও দেশে এসে অবদান রাখছেন। এই ধরনের স্কলাররা বর্তমান সময়ে দেশে ফিরে আসছেন, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তরুণদের দেশের প্রতিও দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।

আমি নিজেও ৯০ দশকে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিদেশে ছিলাম। কিন্তু দেশের টানে ফিরে এসেছি। তরুণদের বলব—দেশকে ভালোবাসুন, দেশের জন্য কাজ করুন।

স্ট্রিম: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মুন্না: ধন্যবাদ স্ট্রিমকেও।

বিষয়:

যুবদল
সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত