এম হুমায়ুন কবীরের সাক্ষাৎকার
এম হুমায়ুন কবীর সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজেস ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি। কাজ করেছেন কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে। সেপ্টেম্বর-২০১০ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সচিব পদে অবসর গ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান, বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার আন্তঃসীমান্ত প্রভাব, সীমান্ত হত্যা, গঙ্গা ও তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এবং বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদুল ইসলাম।
মুজাহিদুল ইসলাম

স্ট্রিম: পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি বিজেপি সরকার গঠন করেছে। এই বিজয়কে আপনি কীভাবে দেখছেন? বাংলাদেশের ওপর কি এর কোনো প্রভাব পড়বে?
এম হুমায়ুন কবীর: পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সেখানে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, এরপর ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট। তারপর থেকে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস শাসন করেছে। এখন বিজেপি সরকার গঠন করেছে, যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় গুণগত পরিবর্তন। কংগ্রেস বা বামফ্রন্টের শাসনামলে রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকলেও গুণগত পরিবর্তন খুব বেশি ছিল না। মমতা ব্যানার্জির সময়কালকে আমি সিপিএম থেকে বিজেপিতে উত্তরণের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময় বলে মনে করি।
বিজেপি যেসব বিষয় নিয়ে রাজনীতি করছে, তাতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে বলে আমার ধারণা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ ও পাঞ্জাবে ব্যাপক মানুষের স্থানান্তর হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে যখন রাজনীতি হয়, তখন তার মধ্যে একটি বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা দেখেছি, 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' ইস্যু তুলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ আমাদের সীমান্তবর্তী রাজ্য এবং তাদের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক যোগাযোগ রয়েছে, তাই এসব বিষয়ে রাজনীতি হলে তার আন্তঃসীমান্ত প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, অতি-সাম্প্রদায়িক বা উগ্র অবস্থান কখনোই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। কোরবানির সময় গরু জবাইয়ে বিধিনিষেধ দেওয়ায় উল্টো হিন্দু খামারিরাই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিজেপি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান চাঙ্গা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাই তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে—বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটন খাতে বাংলাদেশিদের মাধ্যমে সেখানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সীমান্তে নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বা উত্তেজনা জিইয়ে রাখলে এই অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত হলে তা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
স্ট্রিম: সম্প্রতি সীমান্তে তিনজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে অনেককে তাড়িয়ে দেওয়া বা সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর হামলার মতো খবর আসছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত?
এম হুমায়ুন কবীর: আমাদের দিক থেকে এসব ঘটনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য আমরা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করি। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরাও বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশে আমরা যেমন এটি রক্ষার চেষ্টা করছি। ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতেও তা থাকা বাঞ্ছনীয়। যেকোনো উসকানিমূলক বক্তব্য প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের জন্য কখনোই সহায়ক নয়।
স্ট্রিম: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। ভারতের দিক থেকেও বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আগামীতে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো সংকট তৈরি করবে কি?
এম হুমায়ুন কবীর: দুই দেশের মনোভাবের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের সক্রিয় হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের কারণেই মূলত বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতে এখন যে বাংলাদেশবিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করা হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। ভারত তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজনে এটি করছে।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা একটি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প তৈরি করবে। উত্তেজনা যেদিক থেকেই আসুক, তা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়। রাজনীতির মাঠে উত্তেজনাকর বক্তব্য বা অতিকথন থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারকদের সবসময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হয়। বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে, তাই তাদেরও বাস্তবসম্মত পথে চলতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক শুধু পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক নয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক মূলত নয়াদিল্লি থেকে নির্ধারিত হয়। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দিল্লি নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছে যে, বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইলেও কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলাদেশ-নীতির বাইরে গিয়ে সম্পর্কে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারবে বলে আমি মনে করি না।
স্ট্রিম: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে ফেরত চাওয়া নিয়ে দিল্লির সঙ্গে যে টানাপোড়েন চলছে, সেটি কীভাবে দেখছেন?
এম হুমায়ুন কবীর: দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সবসময় বহুমাত্রিক হয়। একটি নির্দিষ্ট উপাদানের জন্য সামগ্রিক সম্পর্ক আটকে বা থেমে থাকবে, এমনটা আমার মনে হয় না।
স্ট্রিম: গঙ্গা ব্যারেজ বা পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এটি কি ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা পানি বণ্টন বিরোধ মেটাতে সাহায্য করবে, নাকি নতুন কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে?
এম হুমায়ুন কবীর: এখনই নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পানি ধরে রাখার জন্য একটি ব্যারেজ নির্মাণের কথা ছিল, কিন্তু গত ৩০ বছরে তা হয়নি। এখন সরকার এটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিচ্ছেন। ড. আইনুন নিশাতের মতো অনেকে এটি সমর্থন করছেন। আবার অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না করে ব্যারেজ করলে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে কি না।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমার ব্যক্তিগত মত হলো, দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পানির হিস্যা নিশ্চিত করার পর ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি সামনে আনা বেশি যৌক্তিক হতো। এখন এটি আলোচনার একটি নতুন উপাদান হিসেবে যুক্ত হয়ে গেল। আমরা যদি শুধুমাত্র পুরনো চুক্তিটি আরও ৩০ বছরের জন্য নবায়নের চেষ্টা করতাম, তবে আলোচনাটি হয়তো অনেক সহজে শেষ করা যেত। এখন ব্যারেজ ইস্যু যুক্ত হওয়ায় নতুন করে জটিল আলোচনার প্রয়োজন দেখা দেবে।
স্ট্রিম: গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ তো এ বছর ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে...
এম হুমায়ুন কবীর: ডিসেম্বরেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ইতোমধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমার ধারণা, আগামী কয়েক মাস এ নিয়ে অত্যন্ত নিবিড় আলোচনা প্রয়োজন হবে। ভারতে এটি নিয়ে অনেকদিন ধরে আলোচনা হলেও, আমাদের এখানে মাত্র শুরু হয়েছে। যেহেতু গত ৩০ বছর এই চুক্তিটি উভয় দেশের জন্যই ফলপ্রসূ ছিল, তাই এর মেয়াদ বাড়ানোর দিকেই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত। তবে এখন চুক্তি নবায়ন এবং নতুন ব্যারেজ—এই দুটি বিষয় নিয়েই আমাদের একসাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
স্ট্রিম: এর মাঝখানে আবার তিস্তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের ফলে তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে কী হতে পারে?
এম হুমায়ুন কবীর: মমতা ব্যানার্জি মূলত উত্তরবঙ্গের ভোটের রাজনীতির কারণেই তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। সেই ভোটের রাজনীতি এখনো বিদ্যমান। তাই বিজেপি বা কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এই মুহূর্তে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে আসবে কি না, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। তবে ২০১১ সালে যেহেতু আমরা একটি চুক্তির কাঠামোতে পৌঁছাতে পেরেছিলাম, তাই ভারত সরকার রাজি হলে এটি দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত।
স্ট্রিম: পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পূর্বপুরুষও বরিশালের। এই বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করা কি সহজ হবে?
এম হুমায়ুন কবীর: যদিও বিজেপি একসময় পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার ইঙ্গিত দিয়েছিল, তবে বর্তমান বাস্তবতায় এর সম্ভাবনা আমি খুব একটা দেখছি না। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় ধরনের সামাজিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এনআরসি করে লোকজনকে বের করে দেওয়ার যে প্রসঙ্গটি উঠছে, তা এই মুহূর্তে আমার কাছে বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না।
স্ট্রিম: ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা বারবার ‘ন্যায্যতা’ বা সমতাভিত্তিক সম্পর্কের কথা বলি। এই ন্যায্যতার সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
এম হুমায়ুন কবীর: আমরা এখন 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' বা আত্মমর্যাদা ও সমতাভিত্তিক সম্পর্কের কথা বলছি। আমরা প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে আস্থার এবং মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক চাই। আয়তনে ভারত বড় হলেও দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা সমতাভিত্তিক আচরণ প্রত্যাশা করি।
সম্পর্কের ন্যায্যতার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের কোনো হস্তক্ষেপ আমরা চাই না; ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ রাস্তায় নেমে এটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের প্রাপ্য। তৃতীয়ত, সীমান্তে মানুষ হত্যা বা লোক ঠেলে দেওয়ার মতো নেতিবাচক কাজ বন্ধ করতে হবে। অবৈধ পারাপারের ক্ষেত্রে বর্ডার গাইডলাইন্স অনুসরণ করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সর্বোপরি, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। এই সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে।
স্ট্রিম: সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ভারত বারবার দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না কেন?
এম হুমায়ুন কবীর: এটি মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। সরকারপ্রধান বা শীর্ষ পর্যায়ে যখন আলোচনা হয়, তখন 'সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে' বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেটির বাস্তবায়ন দেখা যায় না। সীমান্তে মানুষ হত্যা করা বা জোর করে লোক পুশ-ইন করা কখনোই সুসম্পর্ক বা সদিচ্ছার পরিচায়ক হতে পারে না। এই ধরনের সমস্যা সমাধানে ভারতের দিক থেকে রাজনৈতিকভাবে খুব সক্রিয় কোনো উদ্যোগ আমরা সেভাবে দেখিনি।
তবে এখানে আরেকটি দিক আছে। আমাদের সীমান্তের দুই পাশের অঞ্চলগুলোই অর্থনৈতিকভাবে বেশ অনুন্নত। জীবিকার তাগিদেই মূলত মানুষ সীমান্ত পারাপার হয়। দুই দেশ মিলে যদি এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে মনোযোগী হয়, তবে সীমান্তকেন্দ্রিক এই জটিলতা ও মানবিক সংকটগুলো অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
স্ট্রিম: সীমান্তে যারা মারা যায় তারা বেশিরভাগই সামান্য টাকার বিনিময়ে কাজ করা বাহক। মূল চোরাকারবারিদের কিছু হয় না। এই অবস্থায় সীমান্তে যৌথ অর্থনৈতিক জোন করা কি কোনো সমাধান হতে পারে?
এম হুমায়ুন কবীর: এটি অবশ্যই চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। আগেই বলেছি, মানুষ মূলত অর্থনৈতিক অভাবেই এসবের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সীমান্তে কৃষিকাজ ছাড়া আর কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। কৃষিকাজ না থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে চোরাচালান বা মাদক পাচারের মতো বেআইনি কাজের সাথে যুক্ত হয়, আর এর সূত্র ধরেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটে। তাই কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য সদিচ্ছার সাথে আইনের প্রয়োগ যেমন দরকার, তেমনি এই অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করাটাও জরুরি। এটি সমস্যার সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
স্ট্রিম: চোরাচালান একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়। অথচ দোষ এককভাবে বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের কূটনৈতিক প্রতিবাদগুলো কতটা কার্যকর বা কোনো ঘাটতি রয়েছে কি?
এম হুমায়ুন কবীর: আমরা আমাদের কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ঢাকা-দিল্লি শীর্ষ পর্যায়ে সবসময় বলা হয় যে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু ওপর মহলের এই নির্দেশনাগুলো মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে পৌঁছায় না বলেই এমন ঘটনা ঘটে। আপনি যদি বলেন আমাদের কূটনীতি আরেকটু বলিষ্ঠ হতে পারে কি না—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারে। তবে বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে গিয়ে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কে যাতে উল্টো প্রভাব না পড়ে, সেদিকেও সচেতন থাকতে হবে। আমাদের নৈতিক ও আইনগত অবস্থান বজায় রেখেই দৃঢ়তার সাথে বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।
স্ট্রিম: দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় যেহেতু সীমান্ত হত্যার সমাধান হচ্ছে না, আমরা কি বিষয়টি জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামে তুলতে পারি?
এম হুমায়ুন কবীর: আমরা চাইলে আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তুলতেই পারি; যেমনটি আমরা সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়েছিলাম। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেকোনো অভিযোগ তুলতে গেলে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ (ডকুমেন্টেশন) প্রয়োজন হয়। শুধু মুখে বললেই হবে না, পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। এই প্রমাণের জায়গায় আমরা কতটা শক্তিশালী বা প্রস্তুত, তা যাচাই করেই আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়ার বিষয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।
স্ট্রিম: তাহলে ডকুমেন্টেশনের জন্য কি সরকারি-বেসরকারিভাবে আগে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
এম হুমায়ুন কবীর: অবশ্যই। আমি কলকাতায় কাজ করার সুবাদে দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মী রয়েছেন যারা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেন। ফেলানী হত্যার কাছাকাছি সময়ে, পশ্চিমবঙ্গে এক বাংলাদেশিকে সীমান্ত পার হওয়ার পর অমানবিক নির্যাতনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেখানকার মানবাধিকার কর্মীরাই ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছিলেন, যা পরে আমাদের সাহায্য করেছিল। অর্থাৎ, সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে ভারতের ভেতরেও অনেক কর্মী ও সংগঠন কাজ করছে। তাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ কতটা আছে বা আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করি কি না, সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাওয়ার আগে এই ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের দিকে সরকারি-বেসরকারিভাবে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
স্ট্রিম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এম হুমায়ুন কবীর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

এম হুমায়ুন কবীর সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজেস ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি। কাজ করেছেন কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে। সেপ্টেম্বর-২০১০ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সচিব পদে অবসর গ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান, বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার আন্তঃসীমান্ত প্রভাব, সীমান্ত হত্যা, গঙ্গা ও তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এবং বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদুল ইসলাম।
স্ট্রিম: পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি বিজেপি সরকার গঠন করেছে। এই বিজয়কে আপনি কীভাবে দেখছেন? বাংলাদেশের ওপর কি এর কোনো প্রভাব পড়বে?
এম হুমায়ুন কবীর: পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সেখানে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, এরপর ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট। তারপর থেকে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস শাসন করেছে। এখন বিজেপি সরকার গঠন করেছে, যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় গুণগত পরিবর্তন। কংগ্রেস বা বামফ্রন্টের শাসনামলে রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকলেও গুণগত পরিবর্তন খুব বেশি ছিল না। মমতা ব্যানার্জির সময়কালকে আমি সিপিএম থেকে বিজেপিতে উত্তরণের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময় বলে মনে করি।
বিজেপি যেসব বিষয় নিয়ে রাজনীতি করছে, তাতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে বলে আমার ধারণা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ ও পাঞ্জাবে ব্যাপক মানুষের স্থানান্তর হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে যখন রাজনীতি হয়, তখন তার মধ্যে একটি বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা দেখেছি, 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' ইস্যু তুলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ আমাদের সীমান্তবর্তী রাজ্য এবং তাদের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক যোগাযোগ রয়েছে, তাই এসব বিষয়ে রাজনীতি হলে তার আন্তঃসীমান্ত প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, অতি-সাম্প্রদায়িক বা উগ্র অবস্থান কখনোই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। কোরবানির সময় গরু জবাইয়ে বিধিনিষেধ দেওয়ায় উল্টো হিন্দু খামারিরাই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিজেপি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান চাঙ্গা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাই তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে—বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটন খাতে বাংলাদেশিদের মাধ্যমে সেখানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সীমান্তে নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বা উত্তেজনা জিইয়ে রাখলে এই অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত হলে তা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
স্ট্রিম: সম্প্রতি সীমান্তে তিনজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে অনেককে তাড়িয়ে দেওয়া বা সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর হামলার মতো খবর আসছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত?
এম হুমায়ুন কবীর: আমাদের দিক থেকে এসব ঘটনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য আমরা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করি। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরাও বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশে আমরা যেমন এটি রক্ষার চেষ্টা করছি। ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতেও তা থাকা বাঞ্ছনীয়। যেকোনো উসকানিমূলক বক্তব্য প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের জন্য কখনোই সহায়ক নয়।
স্ট্রিম: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। ভারতের দিক থেকেও বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আগামীতে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো সংকট তৈরি করবে কি?
এম হুমায়ুন কবীর: দুই দেশের মনোভাবের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের সক্রিয় হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের কারণেই মূলত বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতে এখন যে বাংলাদেশবিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করা হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। ভারত তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজনে এটি করছে।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা একটি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প তৈরি করবে। উত্তেজনা যেদিক থেকেই আসুক, তা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়। রাজনীতির মাঠে উত্তেজনাকর বক্তব্য বা অতিকথন থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারকদের সবসময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হয়। বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে, তাই তাদেরও বাস্তবসম্মত পথে চলতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক শুধু পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক নয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক মূলত নয়াদিল্লি থেকে নির্ধারিত হয়। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দিল্লি নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছে যে, বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইলেও কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলাদেশ-নীতির বাইরে গিয়ে সম্পর্কে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারবে বলে আমি মনে করি না।
স্ট্রিম: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে ফেরত চাওয়া নিয়ে দিল্লির সঙ্গে যে টানাপোড়েন চলছে, সেটি কীভাবে দেখছেন?
এম হুমায়ুন কবীর: দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সবসময় বহুমাত্রিক হয়। একটি নির্দিষ্ট উপাদানের জন্য সামগ্রিক সম্পর্ক আটকে বা থেমে থাকবে, এমনটা আমার মনে হয় না।
স্ট্রিম: গঙ্গা ব্যারেজ বা পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এটি কি ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা পানি বণ্টন বিরোধ মেটাতে সাহায্য করবে, নাকি নতুন কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে?
এম হুমায়ুন কবীর: এখনই নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পানি ধরে রাখার জন্য একটি ব্যারেজ নির্মাণের কথা ছিল, কিন্তু গত ৩০ বছরে তা হয়নি। এখন সরকার এটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিচ্ছেন। ড. আইনুন নিশাতের মতো অনেকে এটি সমর্থন করছেন। আবার অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না করে ব্যারেজ করলে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে কি না।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমার ব্যক্তিগত মত হলো, দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পানির হিস্যা নিশ্চিত করার পর ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি সামনে আনা বেশি যৌক্তিক হতো। এখন এটি আলোচনার একটি নতুন উপাদান হিসেবে যুক্ত হয়ে গেল। আমরা যদি শুধুমাত্র পুরনো চুক্তিটি আরও ৩০ বছরের জন্য নবায়নের চেষ্টা করতাম, তবে আলোচনাটি হয়তো অনেক সহজে শেষ করা যেত। এখন ব্যারেজ ইস্যু যুক্ত হওয়ায় নতুন করে জটিল আলোচনার প্রয়োজন দেখা দেবে।
স্ট্রিম: গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ তো এ বছর ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে...
এম হুমায়ুন কবীর: ডিসেম্বরেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ইতোমধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমার ধারণা, আগামী কয়েক মাস এ নিয়ে অত্যন্ত নিবিড় আলোচনা প্রয়োজন হবে। ভারতে এটি নিয়ে অনেকদিন ধরে আলোচনা হলেও, আমাদের এখানে মাত্র শুরু হয়েছে। যেহেতু গত ৩০ বছর এই চুক্তিটি উভয় দেশের জন্যই ফলপ্রসূ ছিল, তাই এর মেয়াদ বাড়ানোর দিকেই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত। তবে এখন চুক্তি নবায়ন এবং নতুন ব্যারেজ—এই দুটি বিষয় নিয়েই আমাদের একসাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
স্ট্রিম: এর মাঝখানে আবার তিস্তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের ফলে তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে কী হতে পারে?
এম হুমায়ুন কবীর: মমতা ব্যানার্জি মূলত উত্তরবঙ্গের ভোটের রাজনীতির কারণেই তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। সেই ভোটের রাজনীতি এখনো বিদ্যমান। তাই বিজেপি বা কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এই মুহূর্তে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে আসবে কি না, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। তবে ২০১১ সালে যেহেতু আমরা একটি চুক্তির কাঠামোতে পৌঁছাতে পেরেছিলাম, তাই ভারত সরকার রাজি হলে এটি দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত।
স্ট্রিম: পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পূর্বপুরুষও বরিশালের। এই বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করা কি সহজ হবে?
এম হুমায়ুন কবীর: যদিও বিজেপি একসময় পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার ইঙ্গিত দিয়েছিল, তবে বর্তমান বাস্তবতায় এর সম্ভাবনা আমি খুব একটা দেখছি না। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় ধরনের সামাজিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এনআরসি করে লোকজনকে বের করে দেওয়ার যে প্রসঙ্গটি উঠছে, তা এই মুহূর্তে আমার কাছে বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না।
স্ট্রিম: ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা বারবার ‘ন্যায্যতা’ বা সমতাভিত্তিক সম্পর্কের কথা বলি। এই ন্যায্যতার সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
এম হুমায়ুন কবীর: আমরা এখন 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' বা আত্মমর্যাদা ও সমতাভিত্তিক সম্পর্কের কথা বলছি। আমরা প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে আস্থার এবং মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক চাই। আয়তনে ভারত বড় হলেও দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা সমতাভিত্তিক আচরণ প্রত্যাশা করি।
সম্পর্কের ন্যায্যতার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের কোনো হস্তক্ষেপ আমরা চাই না; ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ রাস্তায় নেমে এটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের প্রাপ্য। তৃতীয়ত, সীমান্তে মানুষ হত্যা বা লোক ঠেলে দেওয়ার মতো নেতিবাচক কাজ বন্ধ করতে হবে। অবৈধ পারাপারের ক্ষেত্রে বর্ডার গাইডলাইন্স অনুসরণ করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সর্বোপরি, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। এই সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে।
স্ট্রিম: সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ভারত বারবার দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না কেন?
এম হুমায়ুন কবীর: এটি মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। সরকারপ্রধান বা শীর্ষ পর্যায়ে যখন আলোচনা হয়, তখন 'সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে' বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেটির বাস্তবায়ন দেখা যায় না। সীমান্তে মানুষ হত্যা করা বা জোর করে লোক পুশ-ইন করা কখনোই সুসম্পর্ক বা সদিচ্ছার পরিচায়ক হতে পারে না। এই ধরনের সমস্যা সমাধানে ভারতের দিক থেকে রাজনৈতিকভাবে খুব সক্রিয় কোনো উদ্যোগ আমরা সেভাবে দেখিনি।
তবে এখানে আরেকটি দিক আছে। আমাদের সীমান্তের দুই পাশের অঞ্চলগুলোই অর্থনৈতিকভাবে বেশ অনুন্নত। জীবিকার তাগিদেই মূলত মানুষ সীমান্ত পারাপার হয়। দুই দেশ মিলে যদি এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে মনোযোগী হয়, তবে সীমান্তকেন্দ্রিক এই জটিলতা ও মানবিক সংকটগুলো অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
স্ট্রিম: সীমান্তে যারা মারা যায় তারা বেশিরভাগই সামান্য টাকার বিনিময়ে কাজ করা বাহক। মূল চোরাকারবারিদের কিছু হয় না। এই অবস্থায় সীমান্তে যৌথ অর্থনৈতিক জোন করা কি কোনো সমাধান হতে পারে?
এম হুমায়ুন কবীর: এটি অবশ্যই চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। আগেই বলেছি, মানুষ মূলত অর্থনৈতিক অভাবেই এসবের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সীমান্তে কৃষিকাজ ছাড়া আর কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। কৃষিকাজ না থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে চোরাচালান বা মাদক পাচারের মতো বেআইনি কাজের সাথে যুক্ত হয়, আর এর সূত্র ধরেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটে। তাই কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য সদিচ্ছার সাথে আইনের প্রয়োগ যেমন দরকার, তেমনি এই অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করাটাও জরুরি। এটি সমস্যার সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
স্ট্রিম: চোরাচালান একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়। অথচ দোষ এককভাবে বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের কূটনৈতিক প্রতিবাদগুলো কতটা কার্যকর বা কোনো ঘাটতি রয়েছে কি?
এম হুমায়ুন কবীর: আমরা আমাদের কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ঢাকা-দিল্লি শীর্ষ পর্যায়ে সবসময় বলা হয় যে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু ওপর মহলের এই নির্দেশনাগুলো মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে পৌঁছায় না বলেই এমন ঘটনা ঘটে। আপনি যদি বলেন আমাদের কূটনীতি আরেকটু বলিষ্ঠ হতে পারে কি না—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারে। তবে বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে গিয়ে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কে যাতে উল্টো প্রভাব না পড়ে, সেদিকেও সচেতন থাকতে হবে। আমাদের নৈতিক ও আইনগত অবস্থান বজায় রেখেই দৃঢ়তার সাথে বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।
স্ট্রিম: দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় যেহেতু সীমান্ত হত্যার সমাধান হচ্ছে না, আমরা কি বিষয়টি জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামে তুলতে পারি?
এম হুমায়ুন কবীর: আমরা চাইলে আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তুলতেই পারি; যেমনটি আমরা সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়েছিলাম। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেকোনো অভিযোগ তুলতে গেলে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ (ডকুমেন্টেশন) প্রয়োজন হয়। শুধু মুখে বললেই হবে না, পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। এই প্রমাণের জায়গায় আমরা কতটা শক্তিশালী বা প্রস্তুত, তা যাচাই করেই আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়ার বিষয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।
স্ট্রিম: তাহলে ডকুমেন্টেশনের জন্য কি সরকারি-বেসরকারিভাবে আগে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
এম হুমায়ুন কবীর: অবশ্যই। আমি কলকাতায় কাজ করার সুবাদে দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মী রয়েছেন যারা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেন। ফেলানী হত্যার কাছাকাছি সময়ে, পশ্চিমবঙ্গে এক বাংলাদেশিকে সীমান্ত পার হওয়ার পর অমানবিক নির্যাতনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেখানকার মানবাধিকার কর্মীরাই ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছিলেন, যা পরে আমাদের সাহায্য করেছিল। অর্থাৎ, সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে ভারতের ভেতরেও অনেক কর্মী ও সংগঠন কাজ করছে। তাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ কতটা আছে বা আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করি কি না, সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাওয়ার আগে এই ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের দিকে সরকারি-বেসরকারিভাবে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
স্ট্রিম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এম হুমায়ুন কবীর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘ তিন দশক ধরে বাংলাদেশের বুকে সমান্তরাল ও স্বৈরতান্ত্রিক অপরাধ সাম্রাজ্যের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ভৌগোলিক দুর্গমতা, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে ঢাল বানিয়ে ‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজ কল্যাণ সমিতি’র আড়ালে এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল নিজস্ব প্রশাসন,
১ ঘণ্টা আগে
রাজধানীর পল্লবীর কালশী এলাকার বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি নতুন কোনো দৃষ্টান্ত নয়। কিছুদিন আগেই গুলশানের বস্তিতেও একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আমরা দেখেছি। ঢাকা শহরে বারবার আগুন লাগার এই পুনরাবৃত্তি আমাদের সামনে বেশ কিছু পুরোনো ও অমীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে তুলে ধরছে।
২১ ঘণ্টা আগে
বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেন বাংলাদেশিরা। অথচ এই অর্থ দেশে থাকলে একটি গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো সম্ভব। দেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট, চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসা ব্যয়, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ও আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা
১ দিন আগে
গত সাত দিনের সংবাদপত্রের পাতা উল্টে দেখুন। এমন একটি দিনও কি গেছে, যেদিন শিশু বা নারী ধর্ষণের খবর আপনার চোখে পড়েনি? উত্তরটা অবধারিতভাবেই ‘না’। দেশে যখন ধর্ষণের এক ভয়াবহ মহামারি চলছে, তখন মেহেরপুরের একটি খবর আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
১ দিন আগে