বন্যার ধকল ও কৃষির সংকট: ঘুরে দাঁড়াতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও সম্মিলিত উদ্যোগ

ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম
ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৯: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

চলতি বছরও আমরা দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বড় আকারের বন্যার সাক্ষী হলাম। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাশাপাশি সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ এবং উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের মতো জেলাগুলোও বন্যা ও জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি এবং উজানের ঢলে সৃষ্ট এই বন্যা জনজীবনের পাশাপাশি আমাদের কৃষিখাতে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক।

পত্রিকার সংবাদ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রাথমিক তথ্যমতে, এবারের বন্যায় প্রায় ১৬টি জেলায় ১ লাখ ৮ হাজার হেক্টর কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫ লাখ কৃষক। এই বিপুল পরিমাণ জমিতে থাকা আউশ ধান, আমনের বীজতলা, সদ্য রোপণ করা ধানের চারা এবং গ্রীষ্মকালীন সবজি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। একসময় বাংলাদেশে মূলত শীতকালেই সবজির আবাদ বেশি হতো, কিন্তু বর্তমানে গ্রীষ্মকালেও সবজির বড় একটি অংশ উৎপাদিত হয়। এবারের বন্যায় এই গ্রীষ্মকালীন সবজি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া অতিবৃষ্টি ও প্লাবনের কারণে বিভিন্ন জেলার মৎস্য খামারগুলো ভেসে গেছে, ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে প্রাণিসম্পদ খাতেও।

কৃষিতে এই ক্ষতির মাত্রা কেবল একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। কিছুদিন আগেই হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের মোট চালের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে হাওরের বোরো ধান থেকে। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই এবার আমন মৌসুমে আঘাত হানল বন্যা। মনে রাখা প্রয়োজন, আমাদের মোট চাল উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে আমন থেকে। এখন আমনের বীজতলা এবং সদ্য রোপণ করা চারা যদি এভাবে নষ্ট হয়ে যায়, তবে চূড়ান্ত উৎপাদনে তার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর তীব্রতা হয়তো সামনে আরও বাড়বে। তাই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নয়, বরং প্রকৃতির আচরণের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েই আমাদের কৃষিকে বাঁচাতে হবে।

জাতীয় পর্যায়ে চালের উৎপাদন কমলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেবে। আর এই ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারকে আমদানির দিকে ঝুঁকতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমদানি বাড়ালে তা সরাসরি আমাদের ট্রেজারি মানি বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ ফেলবে। ডলারের ওপর এই বাড়তি চাপ আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে (ম্যাক্রো-ইকোনমি) নানামুখী জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই কৃষির এই ক্ষতি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

তবে আশার কথা হলো, শত দুর্যোগেও বাংলাদেশের মানুষ হার মানতে জানে না। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন একবার বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, “বাংলাদেশ ইজ আওয়ার বেস্ট টিচার ইন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাডাপটেশন।” অর্থাৎ জলবায়ু অভিযোজনে আমরা অন্যদের সামনে শিক্ষকের মতো। প্রকৃতির রোষানলে পড়ে আমাদের কৃষকরা বারবার সর্বস্বান্ত হলেও, তারা আবার শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য সাহস রাখেন। এখন প্রয়োজন সেই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সঠিক ও সময়োপযোগী সহায়তা।

দুর্যোগ পরবর্তী করণীয় হিসেবে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়গুলোর তাৎক্ষণিক কিছু উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় ‘কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি’ নামে সরকারের একটি থোক বরাদ্দ রয়েছে। এই তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা অথবা বীজ ও সারের মতো উপকরণ সরবরাহ করা প্রয়োজন। অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় নিজেদের উদ্যোগে আমনের বীজতলা তৈরি করছে, যাতে পানি নেমে যাওয়ার পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে চারা বিতরণ করা যায়। একইভাবে মৎস্য চাষিদের ক্ষতিপূরণ এবং গবাদিপশুর জন্য জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ও গোখাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে কেবল তাৎক্ষণিক পুনর্বাসন দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বা 'ক্লাইমেট এডাপ্টেশন' এর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত, আমাদের 'আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম' বা আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ভারত ও চীনের মতো উজানের দেশগুলোতে যখন ভারী বৃষ্টিপাত হয়, তখন সেই পানি নদীপথে আমাদের দেশে নেমে আসে। পরিবেশ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যদি এই পূর্বাভাস আরও নিখুঁতভাবে ও দ্রুততম সময়ে প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, তবে তারা ফসল কাটা বা গবাদিপশু সরানোর আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রকৃতির রোষানলে পড়ে আমাদের কৃষকরা বারবার সর্বস্বান্ত হলেও, তারা আবার শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য সাহস রাখেন। এখন প্রয়োজন সেই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সঠিক ও সময়োপযোগী সহায়তা।

দ্বিতীয়ত, কৃষি গবেষণায় জোর দিতে হবে। আকস্মিক বন্যা বা পাহাড়ি ঢল যেহেতু প্রকৃতির খেয়াল, একে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তাই আমাদের এমন ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা 'শর্ট ডিউরেশন' বা স্বল্প মেয়াদি। অর্থাৎ, বন্যা আসার আগেই কৃষক যাতে ফসল ঘরে তুলতে পারেন। পাশাপাশি 'ফ্লাড টলারেন্ট' বা বন্যা-সহিষ্ণু জাতের বিস্তার ঘটাতে হবে, যা কয়েকদিন পানির নিচে তলিয়ে থাকলেও পানি নেমে যাওয়ার পর নষ্ট না হয়ে পুনরায় বেড়ে উঠতে পারে।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—কমিউনিটি পার্টিসিপেশন বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ। আমি চীনসহ বিভিন্ন দেশে দেখেছি, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার কখনো একলা কাজ করে না। সেখানে স্থানীয় কমিউনিটি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করে। আমাদের দেশেও দুর্যোগ মোকাবিলায় ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগণ, স্বেচ্ছাসেবক এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সুসমন্বয় প্রয়োজন।

বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর তীব্রতা হয়তো সামনে আরও বাড়বে। তাই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নয়, বরং প্রকৃতির আচরণের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েই আমাদের কৃষিকে বাঁচাতে হবে। কৃষকের ঘাম আর শ্রমে টিকে থাকা এই কৃষিখাতই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। সঠিক সময়ে বীজ, সার ও চারা দিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে, বন্যার বিপুল ক্ষতি কাটিয়ে আমরা নিশ্চয়ই আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারব।

  • ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত