দেশের উত্তর জনপদের প্রাণ ও প্রকৃতির আধার, সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক জলাভূমি চলনবিলকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনের নির্বাচনি সমীকরণ। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনের ভোটারদের প্রধান দাবি—উন্নয়ন হোক, তবে তা চলনবিলের অস্তিত্ব ও বৈচিত্র্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ এবং কৃষি ও মৎস্য সম্পদের সুরক্ষাকেই আগামীর সংসদ সদস্যের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার প্রায় পৌনে চার লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এই বিলের ওপর নির্ভরশীল। তবে গত দেড় দশকে উন্নয়নের নামে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে অসংখ্য রাস্তা ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। নদী ও খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, নাব্যতা হ্রাস এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণে চলনবিল এখন অস্তিত্ব সংকটে। ভোটারদের মতে, ঐতিহ্যের এই বিল রক্ষা করতে না পারলে এ অঞ্চলের মৎস্য ও কৃষি অর্থনীতি ধসে পড়বে।
সিংড়ার ডাহিয়া এলাকার ভোটার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বিলের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে উন্নয়ন করার ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। নতুন করে যেন আর কোনো অপরিকল্পিত কাজ না হয়, সেটাই আমাদের চাওয়া।’
স্থানীয় জেলে সাবেদ আলী জানান, মাছ আর ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করলেই তাদের জীবন চলে যাবে। তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল রানা দাবি করেন, চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ ও নতুন উদ্যোগের জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
সিংড়া আসনে ৩ লাখ ২৭ হাজার ভোটারের মন জয়ে ব্যস্ত প্রার্থীরা চলনবিল রক্ষা ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ধানের শীষের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম আনু বলেন, ‘সিংড়ার বড় ক্ষতি হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য। আমি নির্বাচিত হলে জীববৈচিত্র্যের হুমকি হয় এমন কোনো কাজ হতে দেব না। নদী-খাল দখল, চাঁদাবাজি ও ভয়ের জনপদ হিসেবে সিংড়ার যে বদনাম হয়েছে, তা দূর করা হবে। পরিবেশ বাঁচিয়েই হবে প্রকৃত উন্নয়ন।’
এনসিপি মনোনীত প্রার্থী এস এম জার্জিস কাদির বাবু বলেন, ‘সিংড়ার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ নিয়ে আমি পরিকল্পিত পথে এগোতে চাই। চলনবিলকে হুমকিতে ফেলার মতো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। অতীতের মতো সরকারি বরাদ্দ নয়ছয় এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করাই আমার মূল লক্ষ্য।’
বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দাউদার মাহমুদ বলেন, ‘সিংড়ায় জোর করে উন্নয়ন চাপিয়ে দেওয়া হবে না। আমরা মানুষের মৌলিক চাহিদাকে প্রাধান্য দেব। এ অঞ্চলের প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধজাত পণ্য থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব। আমি মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চাই এবং চলনবিলের প্রকৃতি রক্ষায় কঠোর থাকব।’
সিংড়ার মানুষ এখন সময়ের অপেক্ষায়। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে তারা এমন একজন প্রতিনিধি বেছে নিতে চান, যিনি চলনবিলের প্রাণ ও প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে আধুনিক ও টেকসই সিংড়া বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবেন।