জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

‎ইমাম গাজ্জালীর দৃষ্টিতে রোজার তিন স্তর

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৫৮
ছবি: সংগৃহীত

রমজান শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাস নয়। এটি আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল। বাহ্যিকভাবে রোজা মানে দিনের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার ও দাম্পত্য চাহিদা থেকে বিরত থাকা। কিন্তু ইসলামের আধ্যাত্মিক ধারায় রোজার তাৎপর্য এর চেয়েও অনেক গভীর।

‎‎প্রখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইমাম গাজ্জালী মানুষের অবস্থা ও আধ্যাত্মিক অবস্থান অনুসারে রোজাকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন। তাঁর এই বিশ্লেষণ রোজার প্রকৃত লক্ষ্যকে বুঝতে আমাদের গভীরভাবে সহায়তা করে।

‎‎ইমাম গাজ্জালীর মতে, মানুষের অবস্থা ভেদে রোজা তিন প্রকার— ‎১. সাধারণ মানুষের রোজা। ‎২. বিশেষ বান্দাদের রোজা। ‎৩. আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের রোজা।

‎‎প্রথম স্তর: সাধারণ মানুষের রোজা

‎‎সাধারণ মানুষের রোজা হলো খানাপিনা ও যৌনচাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দিনের নির্দিষ্ট সময়ে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ না করা এবং দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা। অধিকাংশ মানুষের রোজা সাধারণত এই স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে।

‎‎দ্বিতীয় স্তর: বিশেষ বান্দাদের রোজা

‎‎আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের রোজা কেবল খাবার ও পানাহার থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা নিজেদের চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও গুনাহ থেকে সংযত রাখেন।

‎‎অশালীন কিছু দেখা, মিথ্যা বলা, গুজব ছড়ানো, পরনিন্দা করা কিংবা নিষিদ্ধ বিষয় শোনা—এসব থেকেও তারা নিজেদের দূরে রাখেন। তাদের কাছে রোজা শুধু শরীরের নয়, বরং সমগ্র সত্তার এক সংযমের অনুশীলন।

‎‎তৃতীয় স্তর: নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের রোজা

‎‎সবচেয়ে উচ্চ স্তরের রোজা হলো আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের রোজা। এ অবস্থায় মানুষ দুনিয়ার সব চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে একাগ্রচিত্তে মহান রবের স্মরণে নিমগ্ন থাকে।

‎‎তাদের হৃদয় এমনভাবে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট থাকে যে, অন্তরে দুনিয়াবী কোনো চিন্তা উদয় হলেও তারা মনে করেন যেন তাদের রোজার পূর্ণতা ক্ষুণ্ণ হয়ে গেছে।

‎‎নিশ্চয়ই আল্লাহর অতি নৈকট্যের এই স্তরে পৌঁছা বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। যদিও এ পর্যায়ে পৌঁছা সবার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে দ্বিতীয় স্তর—অর্থাৎ আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের পর্যায়ে পৌঁছার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানেরই কর্তব্য।

‎‎ইমাম গাজ্জালী বলেন, আল্লাহর বিশেষ বান্দাগণ রোজার ক্ষেত্রে ছয়টি বিষয়ে বিশেষ যত্নবান থাকেন।

‎‎প্রথম: দৃষ্টির হেফাজত

‎অশালীন সবকিছু থেকে চোখ সংযত রাখা এবং এমন বস্তু থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন করে।

‎‎দ্বিতীয়: জবানের হেফাজত

‎অনর্থক গল্প, মিথ্যা, গুজব, পরনিন্দা ও ঝগড়াপূর্ণ কথাবার্তা থেকে জিহ্বাকে সংযত রাখা। বরং জবানকে আল্লাহর জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত রাখা।

‎‎তৃতীয়: কানের হেফাজত

‎অপ্রয়োজনীয় গল্প-গুজব কিংবা নিষিদ্ধ বিষয় শোনা থেকেও বিরত থাকা। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে যা বলা হারাম, তা শোনাও হারাম।

‎‎চতুর্থ: অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হেফাজত

‎হাত-পা বা অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কোনো গুনাহের কাজে লিপ্ত না হওয়া। বিশেষ করে ইফতারের খাবারে কোনো হারামের মিশ্রণ না রাখা।

‎‎পঞ্চম: খাদ্যে সংযম

‎হালাল খাবার গ্রহণ করা এবং ইফতার বা রাতে অতিরিক্ত ভোজন থেকে বিরত থাকা। যেন খাদ্য প্রস্তুতি ও ভোজনের চিন্তায় রমজানের মূল্যবান সময় নষ্ট না হয়।

‎‎ষষ্ঠ: ভয় ও আশার মধ্যে থাকা

‎প্রতিটি রোজা শেষ করার পর বান্দা যেন ভীত ও আশাবাদী থাকে—তার রোজা আল্লাহ কবুল করেছেন কি না, সেই ভাবনায়।

‎‎রমজান আমাদের কাছে শুধু একটি মাস নয়; এটি এক মহাসুযোগ—নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার। সাধারণ রোজাদার থেকে অন্তত ‘বিশেষ বান্দা’ হওয়ার চেষ্টা করার। সবার পক্ষে আল্লাহর অতি নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে; তবে চোঁখ, কান, জবানের হেফাজত করে আল্লাহর বিশেষ বান্দার স্তরে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা তো আমরা করতে পারি।

‎‎রমজানের বিদায়ের আগেই আমাদের নিজেদেরকেই প্রশ্ন করা দরকার—আমার রোজা কি কেবল ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল? নাকি ইমাম গাজ্জালীর বর্ণিত উচ্চতর স্তরের দিকে অন্তত এক ধাপ হলেও আমি এগোতে পেরেছি?

  • মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা

সম্পর্কিত