৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী/ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির সামনে তিন বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ১০
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবার ভিন্ন বাস্তবতায় ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর দলটির সামনে দেখা দিয়েছে তিনটি বড় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ।

ক্ষমতার বাইরে থেকে সরকারের সমালোচনা করা, আন্দোলন গড়ে তোলা ও জনমত সংগঠিত করার বিষয়গুলো সাধারণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনীতি ও প্রশাসন সামলানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরীক্ষা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, জনগণের আস্থা ধরে রেখে কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা দেখানো। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার বাস্তবতায় সংগঠন পুনর্গঠনের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তৃতীয়ত, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে প্রতিপক্ষ মোকাবিলার পাশাপাশি আগামী দিনের দলীয় নেতৃত্ব তৈরি করা।

জনআস্থা ধরে রাখার পরীক্ষা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম মনে করেন, বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ায় দলটির রাজনৈতিক ভূমিকা বদলে গেছে। এখন দল ও সরকার—দুটি অবস্থানের দায়িত্ব ও বাস্তবতা আলাদাভাবে সামলাতে হবে।

তার মতে, সরকার পরিচালনায় বিএনপি গৃহীত উদ্যোগের সাফল্য বা ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব দিয়ে। দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি না হলে আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রশাসনের মধ্যেও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব ও আনুগত্যের বাস্তবতা রয়েছে। ফলে নতুন সরকারের নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে শুধু সরকার তাদের নীতিগুলো নিয়ে প্রচার চালালেই জনআস্থা তৈরির জন্য যথেষ্ট হবে না, দৃশ্যমান বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।’ কোথায় অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, তা আগেই চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও জনআস্থা ধরে রাখাকে দলের জন্য বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিএনপি জনগণের আস্থার জায়গায় পৌঁছেছে। এখন সেই আস্থা বহাল রাখার পাশাপাশি দল ও সরকার—দুই ক্ষেত্রেই সক্ষমতার পরিচয় দিতে হবে।

সেলিমা রহমানের ভাষায়, ‘জনগণ বিএনপির ওপর যে আস্থা রেখেছে, সেটি ধরে রাখাই আমাদের দায়িত্ব।’ তার মতে, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সমস্যা রয়েছে। এগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকারকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

সংগঠন পুনর্গঠন, নাকি ক্ষমতার চাপ?

ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক দলের ভেতরে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ওঠে, তা হলো—দল ও সরকারের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে। আন্দোলনের সময়ে রাজনৈতিক দলের মূল শক্তি থাকে রাজপথ। কিন্তু সরকারে আসার পর একই সংগঠনকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়।

একই সঙ্গে পদ-পদবি, দায়িত্ব ও প্রভাবকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব বাড়ার আশঙ্কাও থাকে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আকরামুল হাসান মিন্টু বলেন, ‘দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি। এ কারণে সরকার গঠনের পরপরই সাংগঠনিক কাজে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এখন দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন, জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠন ও জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতিও চলছে।’

মিন্টুর মতে, পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে সক্রিয় থাকতে না পারলেও আদর্শগত দিক থেকে দলের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে।

তবে পুনর্গঠনের সবচেয়ে কঠিন দিক হতে পারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। দায়িত্ব বণ্টনে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে তৃণমূলে অসন্তোষ বাড়তে পারে।

এই চ্যালেঞ্জের প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে তৎপরতা বাড়ছে। কিন্তু গ্রুপিং, স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবার ও গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতির মধ্যে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা সহজ হবে না।

বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘তৃণমূলে গ্রুপিং বেশ সক্রিয়। স্থানীয় নির্বাচনে দলের বাইরের বিভিন্ন প্রভাবও কাজ করে। এসব বাস্তবতা সামাল দিয়ে একক প্রার্থী নির্ধারণ ও দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।’

তবে সেলিমা রহমান বিষয়টিকে বড় কোনো সাংগঠনিক সংকট হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, বড় রাজনৈতিক দলে পদ বা নির্বাচনে একাধিক নেতার আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক।

প্রতিপক্ষের রাজনীতি ও নতুন নেতৃত্ব

পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিকে এখন একাধিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পুরনো দলগুলোর পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও তরুণদের পরিবর্তিত প্রত্যাশাও বিএনপির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

ড. সাইফুল ইসলামের মতে, সরকারে থেকে তো আর বিরোধী রাজনীতির ভাষায় প্রতিপক্ষ মোকাবিলা করা যাবে না। বিএনপিকে এমন একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে হবে, যা একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মূলধারার সংবাদমাধ্যম কিংবা সরাসরি জনসংযোগ—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। তবে রাজনৈতিক বয়ানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবে কী কাজ হচ্ছে, সেটি তুলে ধরা। সরকার কার্যকরভাবে কাজ করলে এবং মানুষ তার সুফল পেলে সেটিই বিএনপির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠবে।

এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রশ্নও। বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বের বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে তৃণমূল ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে উঠে আসে। ফলে আগামী দিনের রাজনীতির জন্য নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াটি কতটা কার্যকর হবে, সেটিও দলের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সেলিমা রহমান মনে করেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্বাচন ও সরকার গঠনের ব্যস্ততার পর এখন সংগঠনকে আগামী দিনের জন্য নতুনভাবে প্রস্তুত করার সময় এসেছে।

এদিকে আকরামুল হাসান মিন্টুর মতে, ছাত্রজীবন থেকেই দলের আদর্শ ধারণ করে রাজনীতি শুরু করেছেন, এমন নেতাদের জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার সুযোগ আরও বাড়ানো উচিত। এছাড়া কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন প্রজন্মের নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলাও প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পার করা বিএনপির সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকা নয়। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা জনসমর্থনকে রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্যে রূপ দেওয়া, সংগঠনের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও ভবিষ্যতের জন্য নতুন নেতৃত্ব তৈরি—এই তিন পরীক্ষায় বিএনপি কতটা সফল হয়, আগামী দিনের রাজনীতিতে দলটির অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করবে তার ওপর।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত