খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসন। এক সময় এই বদ্বীপ অঞ্চল উর্বর কৃষিভূমির জন্য পরিচিত থাকলেও গত তিন যুগ ধরে এখানকার মানুষের প্রধান অভিশাপের নাম ‘জলাবদ্ধতা’।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই অবহেলিত জনপদের ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। অতীতের জনপ্রতিনিধিরা বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এবার তারা কেবল আশ্বাসে নয়, বরং কাজে বিশ্বাসী প্রতিনিধি বেছে নিতে চান।
প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর আয়তনের দেশের অন্যতম বৃহত্তম বিল ডাকাতিয়াসহ ছোট-বড় ২৭টি বিল, ১৩৬টি খাল ও ১১টি নদী এই জনপদের জীবনরেখা। তবে নদী-খাল ভরাট, দখল, অকেজো স্লুইস গেট এবং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে ‘বছরজুড়ে’ জলাবদ্ধতা এখন এখানকার মানুষের ভাগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এই দুর্ভোগ ভয়াবহ রূপ নেয়।
উপজেলা পানি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক জিএম আমান উল্লাহ বলেন‘, ষাটের দশকে উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্পের সময় নির্মিত ৩৭টি পোল্ডার ও ২৮২টি জলকপাটের অব্যবস্থাপনা এবং ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শাখা নদীগুলো প্রবাহহীন হয়ে পড়াই এই সংকটের মূলে।’
তিনি বলেন, ‘টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) বা জোয়ারাধার বাস্তবায়ন ছাড়া এই অঞ্চলকে বাঁচানোর কোনো বিকল্প নেই।’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল কাদের খান এই পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘জলাবদ্ধতার কারণে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ এলেও মূলত লুটপাট হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি।’
খুলনা-৫ আসনে এবার মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থীর মধ্যে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলী আসগর লবী বলেন, ‘বিগত সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে কেবল অর্থ লুটপাট হয়েছে। আমি নির্বাচিত হলে এলাকার সব নদী-খাল খনন করে আগের রূপে ফিরিয়ে আনব।’
অন্যদিকে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্য থাকাকালীন এলাকায় সাড়ে তিন শ কোটি টাকার উন্নয়ন করেছি। এবার নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা নিরসনসহ ইনসাফভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে আমার মূল লক্ষ্য।’
এই আসনে অন্য দুই প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির শামিম আরা পারভীন ইয়াসমীন এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির চিত্তরঞ্জন গোলদার।
ডুমুরিয়ার এক-তৃতীয়াংশ ভোটার সনাতন ধর্মাবলম্বী। তারা প্রতিশ্রুতির চেয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বাস্তব নিরাপত্তা এবং মামলা-হয়রানি বন্ধের নিশ্চয়তা চান। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক আব্দুল কাদের খানের মতে, সংখ্যালঘুদের ভোট এবং ‘নিষ্ক্রিয়’ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট যেদিকে যাবে, জয়ের পাল্লা সেদিকেই ভারী হবে।
১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অধিকাংশ সময় এই আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। ২০০১ সালে এখানে জামায়াতের মিয়া গোলাম পরওয়ার জয়ী হয়েছিলেন এবং পরে উপ-নির্বাচনে বিএনপির আলী আসগর লবী নির্বাচিত হন। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২ হাজার ৭৯৮ জন। ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৫০টি।
ডুমুরিয়া ও ফুলতলার ভোটাররা এখন ১২ ফেব্রুয়ারির অপেক্ষায়। তাদের প্রত্যাশা, এবার এমন এক নেতা নির্বাচিত হবেন, যিনি কেবল বুলি নয় বরং বিল ডাকাতিয়ার পানি সরিয়ে এই জনপদে আবারও ফসলের হাসি ফিরিয়ে আনবেন।