জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

এএফপির প্রতিবেদন

বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে অপতথ্যের বন্যা, নেপথ্যে ‘ভারত’ ও এআই

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে প্রতিবেশী দেশ ভারতের অপতথ্য ও এআই-প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ফ্রান্সের সংবাদসংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। হাসিনা বর্তমানে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকারের আশ্রয়ে ভারতে অবস্থান করছেন।

বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে অপতথ্য এতটাই বেড়েছে যে, এসব কন্টেন্ট ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ককে ফোন করে এই বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে বর্তমানে অপতথ্যের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।’ ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘এই অপপ্রচার বিদেশি গণমাধ্যম এবং স্থানীয় উৎস—উভয় দিক থেকেই ছড়ানো হচ্ছে।’

এই অপপ্রচারের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত হামলার দাবি। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অমুসলিম। গত কয়েক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হিন্দু জেনোসাইড’ (হিন্দু গণহত্যা) হ্যাশট্যাগের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। তবে গত জানুয়ারিতে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ ঘটনা সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় বিদ্বেষের আওতায় পড়ে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তারা এক্স প্ল্যাটফর্মে অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার অ্যাকাউন্ট থেকে ৭ লাখেরও বেশি পোস্ট ট্র্যাক বা শনাক্ত করেছে, যেখানে ‘হিন্দু গণহত্যার’ মিথ্যা দাবি করা হয়েছে। সংস্থার প্রধান রকিব নায়েক বলেন, ‘আমরা অনলাইনে সমন্বিতভাবে চালানো ভারতীয় অপতথ্য ট্র্যাক করেছি, যেখানে বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বড় আকারের সহিংসতার মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই কন্টেন্টগুলোর ৯০ শতাংশেরও বেশি সরাসরি ভারত থেকে পোস্ট করা। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কগুলোও এর সঙ্গে যুক্ত।’

বার্তা সংস্থা এএফপির ফ্যাক্ট চেক টিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত এআই দিয়ে বানানো ভিডিও চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে হাজার হাজার বার শেয়ার হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এক হাত হারানো এক নারী বিএনপিকে ভোট না দেওয়ার জন্য ভোটারদের আহ্বান করছেন। আরেকটি এআই-জেনারেটেড ভিডিওতে এক হিন্দু নারী অভিযোগ করছেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বলা হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে, অন্যথায় তাদের নাকি ভারতে নির্বাসিত করা হবে।

ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো বড় প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া এসব এআই ভিডিওর খুব কম ক্ষেত্রেই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি’ এই সতর্কবার্তা বা ‘ডিসক্লেইমার’ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হাসিনার শাসনামলের দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর বর্তমান সময়ে এই অপতথ্যের স্রোত আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ঢাকা-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ডিজিটালি রাইট’-এর প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘অন্যান্য সময়ের তুলনায় আমরা এখন বিশাল পরিমাণ ভুয়া তথ্য লক্ষ্ করছি। বিনামূল্যে পাওয়া এআই টুলগুলো দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও জটিল ভুয়া ভিজ্যুয়াল তৈরি করা এখন অনেক বেশি সহজ হয়ে গেছে।’

উদাহরণস্বরূপ, অন্য একটি এআই ভিডিওতে দেখা গেছে বাংলাদেশিরা শেখ হাসিনার প্রশংসা করছেন। অথচ হাসিনা বর্তমানে একজন পলাতক আসামি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

অপপ্রচারের এই রেশ খেলার জগতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। হিন্দু উগ্রবাদীদের বিরোধিতার জেরে বাংলাদেশি ফাস্ট বোলার মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে তাঁর আইপিএল ক্লাব। এই ঘটনা পরবর্তী সময়ে দুই দেশের জাতীয় পর্যায়ে গড়ায় এবং ফলাফলস্বরূপ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিপুল অপপ্রচারের প্রবাহ ভারত থেকে এলেও তা সে দেশের সরকার সরাসরি পরিচালনা করছে—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বারবার হামলার একটি প্যাটার্ন লক্ষ করেছে। তবে তারা আরও জোর দিয়ে বলেছে, ‘আমরা সবসময় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নির্ভরযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে আমাদের পূর্বের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছি।’

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, তাঁরা অপতথ্য ঠেকাতে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার সাথে সমন্বয় করে কাজ করছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণে একটি স্থায়ী ইউনিট গঠন করেছেন। মল্লিক বলেন, ‘আমাদের টিম যদি কোনো কনটেন্টকে ক্ষতিকারক এবং বিভ্রান্তিকর হিসেবে শনাক্ত করে, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেটিকে ভুয়া তথ্য হিসেবে ঘোষণা করি। যদিও অনলাইন তথ্যের যে বিপুল প্রবাহ, তাতে তাল মিলিয়ে চলাটা খুব কঠিন।’

সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন তুলি সতর্ক করে বলেন, এআই দিয়ে তৈরি করা ছবি ও ভিডিও বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহরের ৮০ শতাংশ এবং গ্রামীণ এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন থাকলেও প্রযুক্তিগত সচেতনতা এখনো অত্যন্ত সীমিত। তিনি আরও বলেন, ‘এআই দিয়ে বানানো এসব ভিডিও ভোটের ক্ষেত্রে নাগরিকদের বিভ্রান্ত করবে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত