জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

শেষ মুহূর্তে প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচার

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

শেষ দিনে তারেক রহমান ও শফিকুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা। ছবি: সংগৃহীত

আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট । ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে অর্থাৎ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মন জয় করতে আজ শেষ দিনও রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যস্ত সময় পার করেছে দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বেশিরভাগ নেতা-ই শেষদিনের প্রচারণা চালিয়েছে রাজধানী ঢাকায়।

প্রচারণার শেষ দিনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকার ৮টি আসনে ম্যারাথন নির্বাচনী জনসভা করেন। বনানী, কলাবাগান, পীর জঙ্গী মাজার, বাসাবো, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, ধুপখোলা এবং লালবাগে অনুষ্ঠিত এসব সভায় তিনি ধানের শীষের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং ভোট চান দলীয় প্রতীকে।

এদিন, বেলা ১টার দিকে কলাবাগান ক্রীড়াচক্র মাঠের জনসভায় যোগ দেন তারেক রহমান। ঢাকা-১০ আসনের অন্তর্গত এই আসনের জনসভায় তিনি বলেন, ‘নকল ব্যালট ও সিল তৈরির ঘটনা সামনে এসেছে। আমরা সতর্ক থাকলে বাংলাদেশকে কেউ থামাতে পারবে না। এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে রবি সাহেবকে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার জলাবদ্ধতা, ধানমন্ডি লেকের সমস্যা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ সব সমস্যার সমাধানে আমি তার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করব। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি ছাড়া আর কোনো দলের কাছে দেশ পরিচালনার সেই অভিজ্ঞতা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেই।’

বিগত সরকারের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ‘গত ১৬ বছরে বহু মেগা প্রকল্প হয়েছে, আর মেগা প্রকল্প মানেই মেগা দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ নেই, ডাক্তার নেই; স্কুল-কলেজ ভেঙে পড়ছে, রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে গেছে। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু রাজনৈতিক অধিকার নয়, একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এসেছে। এই নির্বাচন জুলাইয়ের শহীদদের, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতদের এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন।’

এদিকে, আজ মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে রিকশা মার্কার সমর্থনে ১১ দলীয় জোটের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা-১৩ আসনের এই জনসভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও জোটের প্রার্থী মামুনুল হকের সমর্থনই ছিল জনসভার কারণ। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম।

সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মুহাম্মদপুর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম হটস্পট ছিল। মুহাম্মদপুরবাসী, এখানকার ছাত্র-তরুণরা রাজপথে নেমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে যেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আবারও রাজপথে নেমে ভোটকেন্দ্র পাহারা দিয়ে মামুনুল হককে রিকশা মার্কায় জয়ী করে ১১ দলের বিজয় সুনিশ্চিত করবে ইনশাআল্লাহ।’

এসময় নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এত দিন যা করেছেন, করেছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যদি কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করার পরিকল্পনা থাকে, ফ্যাসিস্ট আমলের নির্বাচন কমিশনের যেই পরিণতি হয়েছিল তার থেকেও করুণ পরিণত হবে এই কমিশনের।’

এদিকে, আজ বিকেলে ঢাকা–১৫ আসনের আগারগাঁও তালতলা এলাকায় একটি নির্বাচনী গণমিছিলে নেতৃত্ব দেন শফিকুর রহমান। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন জামায়াত আমির। তার ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে একযোগে প্রচার করা হয়।

অন্যদিকে, সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার ভাষণও বাংলাদেশ টেলিভিশন বাংলাদেশ বেতারে একযোগে প্রচার করা হয়।

বড় দলগুলোর দীর্ঘদিনের প্রচারণা ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মাঝে আশাবাদ লক্ষ্য করা গেছে। মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠের সমাবেশে উপস্থিত হন সরকারি কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) নাজমুল হোসেন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা আশাবাদী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। এই আসনে মামুনুল হক জিতবে বলে আমার বিশ্বাস। নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে এক পক্ষ ঝামেলা করতে এলে অন্য পক্ষও ছাড় দেবে না। উভয় পক্ষই মাঠে সমান অবস্থানে থাকবে বলে মনে হচ্ছে।’

এদিকে কলাবাগান ক্রীড়াচক্র মাঠে বিএনপির জনসভায় অংশ নেওয়া স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল আমীন স্ট্রিমকে বলেন, ‘ইলেকশন সুষ্ঠু হলে অবশ্যই বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের কোন ঝামেলা হওয়ার আশঙ্কা নেই বরং নির্বাচন সময়মতো ও শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হবে।’

প্রচারণার ১৮ দিন: আলোচিত যত ঘটনা

গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর থেকে ভোটের মাঠ ছিল নানা নাটকীয়তায় পূর্ণ। ২২ জানুয়ারি থেকেই প্রত্যেক দল ও জোট সর্বশক্তি দিয়ে মাঠের প্রচারণায় নামে। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘১২ তারিখ ধানের শীষে ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু হবে। যাদের একাত্তরেই দেখেছি, তাদের নতুন করে দেখার কিছু নেই’—যা জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল।

এদিকে, একই দিনে জামায়াত ইসলামীকে কেন্দ্র করে এক আলোচিত ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের একটি বিষয় উঠে আসে। প্রতিবেদনে ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে এক কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, ‘বাংলাদেশ ইসলামিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং জামায়াত নির্বাচনে ভালো করবে।’ এই প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আধিপত্যবাদ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

জুলাই সনদে ‘হ্যাঁ’ ভোটের ডাক বিএনপির

৩০ জানুয়ারি রংপুরে এক জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি জুলাই সনদের সমর্থনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির ‘হ্যা’ ভোটে প্রচারণা চালানোর প্রথম দিন ছিল সেটি।

জামায়াত আমিরের টুইট ও ‘আইডি হ্যাক’ বিতর্ক

প্রচারণার মাঝপথে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ‘এক্স’ অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে একটি বিতর্কিত পোস্ট করা হয়। পরবর্তীতে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, আইডিটি হ্যাক হয়েছিল। তবে বিএনপি এ বিষয়টি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায়।

বরিশালের সমাবেশে তারেক রহমান নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘নতুন এক জালেমের আবির্ভাব হয়েছে, যারা নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথা বলে আবার ধরা পড়লে হ্যাকের নাটক সাজায়।’

জামায়াত আমিরের ডিবেটের ডাক

৬ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে পাবলিক প্ল্যাটফর্মে ওপেন ডিবেট করার জন্য জন্য আমন্ত্রণ জানান জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এই আমন্ত্রণ জানান তিনি। পোস্টের শুরুতে তারেক রহমানকে ‘প্রিয়’ ও ‘মাননীয়’ সম্বোধন করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আপনি (তারেক রহমান) এখন আপনার পরিকল্পনা শুরু করেছেন, আমি আপনাকে সরাসরি আলোচনার জন্য একটি পাবলিক প্ল্যাটফর্মে আমার সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, যেখানে আমরা জাতির সামনে আমাদের নিজ নিজ ইশতেহার উপস্থাপন করতে পারি এবং জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে পারি।’

এদিকে, ইসির রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫-এর ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা তাদের মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনের তিন সপ্তাহ সময়ের পূর্বে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে পারবেন না। আর ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচনী প্রচারণা সমাপ্ত করতে হবে।

আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রচার-প্রচারণা বন্ধ হবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায়, ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে।

আগামী বৃহস্পতিবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ২৯৯ সংসদীয় আসনে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে সংসদ নির্বাচন বাতিল করেছে ইসি। এ কারণে এই আসন বাদে ২৯৯ সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এবার নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচনে মোট প্রার্থী দুই হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দলটির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯১ প্রার্থী। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৮ প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ১৯৮ প্রার্থী।

অন্যদিকে, এনসিপি শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ৩২ প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত