এনসিপির ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ নাকি পুরনোদের আশ্রয়স্থল

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র নেতৃত্বের হাত ধরে এনসিপির যাত্রা শুরু হয়। ছবি: এআই

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শুরু থেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রচলিত রাজনীতির প্রথা ভেঙে একটি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ তৈরির। তবে দলটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে পুরোনো ও বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতাদের দলে ভেড়ানোর হিড়িক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন, এনসিপি কি সত্যিই নতুন কোনো পথ দেখাচ্ছে, নাকি এটি সুবিধাবঞ্চিত পুরোনো রাজনীতিকদের জন্য নতুন এক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হচ্ছে?

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র নেতৃত্বের হাত ধরে এনসিপির যাত্রা শুরু হয়। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলটি চমক দেখায়। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য গড়ে ৬টি আসন নিয়ে সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে তারা। এই সাফল্যের পর আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে মনোযোগী হয়েছে দলটি। আর এই সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এখন বিভিন্ন দল থেকে নেতাকর্মী ভেড়াচ্ছে এনসিপি।

সম্প্রতি এনসিপিতে যুক্ত হয়েছেন এবি পার্টি, আপ বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের নেতাকর্মীরা। এমনকি আওয়ামী লীগের ‘নির্দোষ’ নেতাকর্মীদের জন্যও দরজা খোলা রাখার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘ছাত্রদল হোক, ছাত্রশিবির হোক, ছাত্র অধিকার পরিষদ এমনকি ছাত্রলীগ হোক—কার সাবেক পরিচয় এটি আমাদের কাছে মুখ্য নয়। ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িত নন এমন যে কেউ আমাদের সাথে আসতে পারবেন।’

তবে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে গত ২৪ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারের যোগদান। এছাড়া শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল ফ্লোরা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি ও অ্যাক্টিভিস্ট মহিউদ্দিন রনিও দলটিতে যোগ দিয়েছেন।

দলটির শীর্ষ নেতা ও উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এই যোগদানকে দেখছেন সাংগঠনিক পরিপক্কতা হিসেবে। তাঁর মতে, মাঠের অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের ছাড়া শক্তিশালী কাঠামো তৈরি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ক্ষমতার অপব্যবহার—এই বিষয়গুলো থেকে যদি কেউ নিজেকে দূরে রেখে এনসিপির সাথে রাজনীতি করতে চান, তাঁর জন্য দরজা সবসময় খোলা থাকবে।’

সারজিস আলম আরও জানান, এনসিপি বর্তমানে একটি ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে নতুন ও অভিজ্ঞদের সংমিশ্রণে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে।

নতুন বন্দোবস্ত মানেই কি শুধু নতুন লোক

পুরোনোদের দলে নেওয়া প্রসঙ্গে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব তাহসিন রিয়াজ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত মানে এই নয় যে রাজনীতিতে শুধু নতুন মুখ থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘নতুন বন্দোবস্ত মানে হলো কাঠামোগত পরিবর্তন। বিচার বিভাগের জবাবদিহি, নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয়তা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। যা আমরা বিগত ৫৪-৫৫ বছরে দেখিনি।’

ইসহাক সরকারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁকে নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো মূলত বিএনপির নিচু স্তরের রাজনীতি থেকে আসা এবং তা প্রমাণিত নয়। তাহসিন রিয়াজ প্রশ্ন তোলেন, ‘যিনি ১৬-১৭ বছর বিরোধী রাজনীতি করে মামলার শিকার হয়েছেন, তাঁর জুলাই অভ্যুত্থানের কমিটমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর।’

তবে তিনি এও নিশ্চিত করেছেন যে, আওয়ামী লীগ বা অন্য দল থেকে যারাই আসবে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই ‘জুলাই অবস্থান’ এবং ‘ফৌজদারি রেকর্ড’ কঠোরভাবে স্ক্রিনিং করা হবে।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

এনসিপির এই কৌশলকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স ম আলী রেজা মনে করেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া অন্য দলের নেতাদের পদ দেওয়া এনসিপির নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি বলেন, ‘মনোনয়নের লোভে যখন অন্য দল থেকে মানুষ আসবে, তখন তো সেই পুরোনো বন্দোবস্তই থেকে গেল। এখানে নতুনত্ব কিছু দেখছি না। মানুষের মধ্যে ধারণা হচ্ছে, এনসিপি কেবল ক্ষমতা কেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক বলয় তৈরির চেষ্টা করছে।’

একই সুরে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম সেলিমও। তিনি বলেন, ‘অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ছাত্ররা একটি স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে থাকবে বলে জনগণ আশা করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার মোহ তাদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে ম্লান করে দিচ্ছে। পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে ভেড়ালে দল শক্তিশালী হয় না, বরং ভেতরে ভাঙন ধরে।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, এনসিপির এই কৌশল ভবিষ্যতে তাদের জন্য ‘বুমেরাং’ হয়ে উঠতে পারে।

সম্পর্কিত