জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেটের আড়ালে ক্ষমতার খেলা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১: ৪২
স্ট্রিম গ্রাফিক

গত ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে পুরুষদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। আসরের প্রথম দিনেই পাকিস্তান জয় পেয়েছে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। দিনের অন্য ম্যাচে আয়োজক ভারত জয় পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। আর একসময়ের শক্তিশালী দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে শেষ মুহূর্তে টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেওয়া স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন, শেষ মুহূর্তে জায়গা করে নেওয়া স্কটল্যান্ড। কেননা গত মাসেই টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশকে বিদায় করেছে আইসিসি। ওই সময় গুঞ্জন ছিল পাকিস্তানকেও হয়তো সরিয়ে দেওয়া হতে পারে।

প্রশ্ন হলো, এই দুই দেশের মিল কোথায়? মিল একটাই—তাদের ক্ষমতাধর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখন তলানিতে। দিল্লির খবরদারিতে অতিষ্ঠ হয়ে তারা রুখে দাঁড়িয়েছে। ফলস্বরূপ একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট এখন দক্ষিণ এশিয়ার অসুস্থ ভূ-রাজনীতির মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ডিসেম্বরে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলের নিলাম হয়। বিপুল অর্থের এই টুর্নামেন্টে কলকাতা নাইট রাইডার্স বাংলাদেশি বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে কিনে নেয়। কিন্তু এই ঘটনা নজর কাড়ে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সাবেক বিধায়ক সঙ্গীতা সোমের। তিনি বাংলাদেশি খেলোয়াড় কেনার ঘোর বিরোধিতা করেন। এরপর অন্য রাজনীতিকরাও তাঁর সঙ্গে সুর মেলান। কয়েক দিনের মধ্যেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআই কলকাতাকে বাধ্য করে মুস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিতে।

২০২৪ সাল থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। গণবিক্ষোভের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর থেকে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশি জনতা। ভারত সরকার সম্পর্ক ঠিক করতে চায় কিন্তু তাদের নিজেদের মিডিয়া এবং সঙ্গীতা সোমের মতো নেতারা তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

বাংলাদেশ পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাদের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরানোর দাবি তোলে। যুক্তি ছিল ভারত যদি একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা দিতে না পারে তবে পুরো দলের নিরাপত্তা কীভাবে দেবে। কিন্তু ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল সেই যুক্তি পাত্তা দেয়নি। তারা বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দিয়ে দেয়। তাদের জায়গায় র‍্যাঙ্কিংয়ে পরবর্তী সেরা দল স্কটল্যান্ডকে নেওয়া হয়।

এই সুযোগে পাকিস্তানও তাদের ব্যাট হাতে খেলার মাঠে নেমে পড়ে। তারা ভারতের সঙ্গে ম্যাচ খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। মে মাসে এক ছোট যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও বরফশীতল হয়ে পড়েছে। মজার ব্যাপার হলো দুই দেশই দাবি করে তারা সেই যুদ্ধে জিতেছে। ম্যাচ বয়কটের বাহ্যিক কারণ ছিল বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানানো। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল বড় প্রতিবেশীকে আঘাত করা। যেকোনো টুর্নামেন্টে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ সবচেয়ে বেশি দর্শক টানে। বিজ্ঞাপনের দামও সেভাবেই ঠিক করা হয়, যার বড় অংশ পায় ভারত। সরে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান ভারতের আয়ের ওপর আঘাত করতে চেয়েছিল।

দশ দিনের স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনার পর অবশেষে পর্দার আড়ালের আলোচনায় সমঝোতা হয়। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে ভারতের সঙ্গে খেলবে বলে জানিয়েছে। চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে তাদের আচরণের জন্য কোনো আর্থিক জরিমানা গুনতে হবে না। তবে তারা বিশ্বকাপ থেকে বাইরেই থাকছে।

তবে এই রেষারেষি ক্রিকেটকে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির আরও গভীরে টেনে নামিয়েছে। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ছাড়া অন্য সব দলের মতোই পাকিস্তানও আইসিসির টাকার ওপর টিকে থাকে। শুরুতে সরে দাঁড়িয়ে তাদের সরকার একটি হিসাব কষেছিল। তারা ভেবেছিল ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতৃত্বকে অস্বস্তিতে ফেলার আনন্দের কাছে আর্থিক ক্ষতি বা খেলার ক্ষতি তুচ্ছ।

কারণটাও স্পষ্ট। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড নামমাত্র স্বাধীন হলেও বাস্তবে এটি বিজেপির শাখা হিসেবে কাজ করে। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত এর প্রধান ছিলেন জয় শাহ। তিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে। অমিত শাহ আবার নরেন্দ্র মোদির ডান হাত হিসেবে পরিচিত। জয় শাহ এখন আইসিসি চালান। এদিকে পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড চালাচ্ছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

যারা দক্ষিণ এশিয়ার এই অকার্যকর সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করেন তাঁরা সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন। দশকের পর দশক ধরে চলা যুদ্ধ, অভ্যুত্থান আর সন্ত্রাসবাদের ওপর এখানে চেপে বসেছে শতাব্দী-প্রাচীন ধর্মীয় ও ভাষাগত ক্ষোভ। ফলে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি ক্রমশ এমন এক খেলায় পরিণত হচ্ছে যেখানে শেষ পর্যন্ত সবারই পরাজয় ঘটে। একে বলা হয় ‘নেগেটিভ সাম গেম’।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত