বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে এনবিআরের কড়াকড়ি, তবু মাঠপর্যায়ে বড় বরাদ্দ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশীয় রপ্তানি শিল্পকে সহায়তায় আমদানিকৃত কাঁচামালে বন্ড বা শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় সরকার। তবে এই সুবিধার অপব্যবহার রোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কঠোর নজরদারির নির্দেশ দিলেও মাঠপর্যায়ে বড় অঙ্কের আমদানির প্রাপ্যতা অনুমোদনের চিত্র দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে আমদানিকৃত কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ‘সেলফ-অ্যাডহেসিভ পিভিসি’ এবং ‘পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার’ আমদানির ক্ষেত্রে এই অনিয়মের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই প্রেক্ষিতে এনবিআর কঠোর নজরদারি ও তদন্তের নির্দেশ দিলেও মাঠপর্যায়ে বড় অঙ্কের আমদানির প্রাপ্যতা বা এনটাইটেলমেন্ট অনুমোদনের তথ্য পাওয়া গেছে।

স্ট্রিমের হাতে আসা দুটি সরকারি নথি বিশ্লেষণ করে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে এনবিআরের উদ্বেগ এবং মাঠপর্যায়ের ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। এনবিআরের রপ্তানি ও বন্ড শাখার দ্বিতীয় সচিব সুরাইয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত এক পত্রে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ওয়্যারহাউস লাইসেন্সধারী কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় ‘সেলফ-অ্যাডহেসিভ পিভিসি’ বা ‘পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার’ আমদানির জন্য প্রাপ্যতা গ্রহণ করছে। এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, এই ধরনের প্রাপ্যতা প্রদান যথাযথ নয়। কারণ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এই কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি না করে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে।

অনিয়ম রোধ ও রাজস্ব সুরক্ষায় এনবিআর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটগুলোকে (ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম) জরুরি ভিত্তিতে চারটি তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিগত তিন বছরে কোন প্রতিষ্ঠানকে কী পরিমাণ পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার আমদানির প্রাপ্যতা দেওয়া হয়েছে, কোন ‘বিল অব এন্ট্রি’র মাধ্যমে এগুলো আমদানি করা হয়েছে এবং কোন ইউপি (ইউটিলাইজেশন পারমিশন) ও ইউডির (ইউটিলাইজেশন ডিক্লেয়ারেশন) বিপরীতে পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এ ছাড়া রপ্তানির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন বা ‘রিলিজেবল ফরেক্স’ এর তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

এনবিআর যখন পিভিসি ফ্লেক্স আমদানির প্রাপ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তখন মাঠপর্যায়ে বড় আকারের বরাদ্দ অনুমোদনের চিত্র দেখা গেছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) এর একটি অফিস আদেশে। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও উপ-কমিশনার পুরবী সাহা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ‘মেসার্স ইউএজিএম বিডি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির বর্ধিত প্রাপ্যতা দেওয়া হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, মেসার্স ইউএজিএম বিডি লিমিটেডকে পেট ফিল্ম, পিভিসি ফ্লেক্স, হিট ট্রান্সফার ফিল্ম এবং পিভিসি ও পিপি শিট আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগামী ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বমোট ৬৯০ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানির বর্ধিত প্রাপ্যতা অনুমোদন দিয়েছে বন্ড কমিশনারেট।

নথি দুটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদিকে এনবিআর পিভিসি ফ্লেক্স আমদানির যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের বন্ড কমিশনারেট থেকে একটি একক প্রতিষ্ঠানকেই প্রায় ৬৯০ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। আইনগতভাবে বৈধ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল পাওয়ার অধিকার থাকলেও এনবিআরের নির্দেশিত কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া মেনে এই বিশাল বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এনবিআর কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব সুরক্ষায় বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। এনবিআরের কড়া নজরদারির নির্দেশনার পর মাঠপর্যায়ে অনুমোদিত এই ধরনের বড় বরাদ্দের বিপরীতে শতভাগ রপ্তানি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করা হবে। অন্যথায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় আসা এসব পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি হলে তা বৈধ আমদানিকারকদের অসম প্রতিযোগিতায় ফেলবে এবং সরকার বিপুল রাজস্ব হারাবে।

এ বিষয়ে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা বলেন, কোম্পানিগুলো পূর্বের বছরের প্রাপ্যতা অনুযায়ী যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করে, সেই পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করতে পারে কি না তা অডিট করা হয়। যদি দেখা যায় আমদানির চেয়ে রপ্তানি কম, তবে প্রাপ্যতা কমিয়ে দেওয়া হয়। অন্যথায় অনেক সময় তা বাড়ানো হয়। এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে মামলা বা অনিয়মের প্রমাণ থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত