জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী ব্যবসায়ী নেতারা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

ডিসিসিআই লোগো। ছবি: সংগৃহীত

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমানে চাপের মুখে বাংলাদেশ। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী ব্যবসায়ী নেতারা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

‘কারেন্ট স্টেট অ্যান্ড ফিউচার আউটলুক অব বাংলাদেশ ইকোনমি: প্রাইভেট সেক্টর পার্সপেকটিভ (জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৫)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা, বিভিন্ন খাতের পারফরম্যান্স এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।

মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় প্রবৃদ্ধি ধীর

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। দেশীয় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবেই এই ধীরগতি দেখা গেছে।

মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে এলেও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল কঠোর মুদ্রানীতি নয়, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা ও বাজারের অসঙ্গতি দূর করাও জরুরি।

বেসরকারি বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা

দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার ১৬ শতাংশের বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। তবে নীতিগত অস্থিরতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মুদ্রার অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ডিসিসিআই মনে করে, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

খাতভিত্তিক পারফরম্যান্স

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প ১৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যদিও প্রবৃদ্ধি খুব বেশি নয়। বাজার বৈচিত্র্যের সীমাবদ্ধতা ও উচ্চমূল্যের পণ্যের স্বল্পতা এ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে রপ্তানি হয়েছে ৬০৯ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলার। তবে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে এ খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে।

অন্যদিকে ওষুধ শিল্পে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এই খাতে রপ্তানি বেড়ে ১১৮ দশমিক ৮১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৫ অর্থবছরে আইটি ও আইটিইএস খাতের রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৬৩০ মিলিয়ন ডলার, যা গত কয়েক বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে বেড়েছে।

কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জ

দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৫ শতাংশ কৃষি খাতে হলেও শ্রমিক সংকট ও সীমিত যান্ত্রিকীকরণের কারণে জিডিপিতে এই খাতের অবদান কমছে।

এ ছাড়া ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অবস্থাও দুর্বল। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই খাতে ঋণ বিতরণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। উদ্যোক্তারা মনে করেন, সহজ শর্তে ঋণ ও নীতিগত সহায়তা না বাড়ালে ক্ষুদ্র শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

জ্বালানি ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের জ্বালানির ৯৮ শতাংশের বেশি এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

অন্যদিকে দেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, যা উন্নত দেশের তুলনায় অনেক বেশি এবং ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি

বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছে। এটি উন্নয়নের বড় অর্জন হলেও এতে কিছু বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনায় আশাবাদ

বর্তমানের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ব্যবসায়ী নেতারা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। বৃহৎ শ্রমশক্তি, ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন এবং দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতি দেশটির প্রবৃদ্ধির বড় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতের সংস্কার, সুশাসন জোরদার এবং রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণকে জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের নতুন পর্যায়ে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নই হবে নীতিনির্ধারকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সম্পর্কিত