বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অপরিশোধিত তেল বা ‘ক্রুড অয়েল’-এর কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক শিল্পায়ন, পরিবহনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশগুলোকে তাকিয়ে থাকতে হয় এই ব্ল্যাক গোল্ডের দিকে। ‘ওয়ার্ল্ডস টপ এক্সপোর্টস’-এর ২০২৪ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট আমদানিকৃত তেলের সিংহভাগই কিনে নিচ্ছে মাত্র ৫টি দেশ। অবাক করা বিষয় হলো, এই শীর্ষ ৫টি দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট তেল আমদানির ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং এই তালিকায় এশিয়ার দেশগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যায়।
চীন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন তাদের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। বিশাল শিল্প খাত আর পরিবহন ব্যবস্থার চাহিদা মেটাতে তাদের বিপুল পরিমাণ তেল বাইরে থেকে কিনতে হয়। ২০২৪ সালে চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করেছে। আর্থিক মূল্যে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ৩২৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বের মোট আমদানিকৃত তেলের ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে আগের বছরের তুলনায় তাদের আমদানি ব্যয় সামান্য কমেছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে এই হ্রাসের হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের বিশাল অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক। দেশটির অর্থনীতির আকার এতই বিশাল যে, নিজেদের উৎপাদন দিয়েও তাদের চাহিদা মেটে না। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এতে দেশটির খরচ হয়েছে ১৭৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্ববাজারে তাদের আমদানির শেয়ার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ।
ভারত
দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ভারত তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ভারতের জ্বালানি খাতের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। ২০২৪ সালে দেশটি ১৪৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তেল আমদানি করেছে, যা বিশ্ববাজারের ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। ভারতের অর্থনীতির চাকা যত ঘুরছে, জ্বালানির চাহিদাও তত বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, তাদের আমদানি ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
দক্ষিণ কোরিয়া
তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে এশিয়ার আরেক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির নিজস্ব কোনো তেলের খনি নেই, কিন্তু তাদের রয়েছে বিশাল রিফাইনারি শিল্প। তাই শতভাগ আমদানির ওপর ভিত্তি করেই তারা চলে। ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ৮৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তেল আমদানি করেছে, যা বৈশ্বিক আমদানির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে তাদের আমদানির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমেছে।
জাপান
পঞ্চম স্থানে রয়েছে প্রযুক্তি ও শিল্পে উন্নত দেশ জাপান। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য তারা পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে জাপান ৭১ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তেল আমদানি করেছে। বিশ্ববাজারে তাদের শেয়ার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে জাপানেই আমদানির সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। ২০২৩ সালের তুলনায় তাদের আমদানি ব্যয় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
২০২৪ সালের এই পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, তেল আমদানির বিশ্ববাজার এখন মূলত এশিয়ার দেশগুলোর দখলে। শীর্ষ ৫টি দেশের মধ্যে ৪টিই এশিয়ার । এই ৫টি দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের শক্তিশালী অবস্থানকেই প্রকাশ করছে।