জনপ্রত্যাশা পূরণের বাজেট দেওয়া হচ্ছে: অর্থমন্ত্রী

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ২৩: ০২
ইআরএফ আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তৃতা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

বিগত দিনে শেয়ারবাজারকে ক্যাসিনোতে পরিণত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর। তিনি বলেন, গতানুগতিক নয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনগণের প্রত্যাশা পূরণকে জোর দেওয়া হচ্ছে। বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় নিয়ে আসাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।

মঙ্গলবার (২ জুন) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এবারের বাজেট হবে দেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ঘরে অর্থনীতির সুফল পৌঁছে দেওয়ার।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারগুলোর কাছ থেকে আমরা একটি ভঙ্গুর ও নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক-দেড় মাসের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করা অত্যন্ত কঠিন। দেশের সব সূচক যেখানে নিম্নগামী, সেখানে অর্থনীতিকে সচল করতে নলকূপে ওপর থেকে পানি ঢালার মতো আমাদের অর্থনীতিতে পুঁজি ও বড় বাজেটের জোগান দিতে হচ্ছে, যাতে দেশের উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানকে পুনরুজ্জীবিত করা যায়।

অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্র কেবল ভোটের জন্য নয়, অর্থনীতিতেও সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জিডিপি শুধু বড় শিল্পকারখানা বা শিপিং সেক্টর থেকে আসে না। গ্রামীণ নারী, কামার-কুমার, তাঁতি, শীতলপাটি শিল্পী থেকে শুরু করে আমাদের থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা যা আয় করছেন, তাও জিডিপির অংশ। এই ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ও প্রান্তিক উৎপাদকদের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ ও প্রণোদনা রাখা হয়েছে। বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোর অংশীদারত্বে উন্নত প্রযুক্তি, ঋণ ও অ্যামাজন-ইবের মতো গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে তাদের পণ্য বিপণনের ব্যবস্থা করা হবে।

আমির খসরু বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি ডিজিটাল পদ্ধতিতে অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করা হচ্ছে। এছাড়া মানুষের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় কমানোর জন্য এনজিও এবং বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে সারা দেশে একটি যুগান্তকারী ‘ইউনিভার্সাল প্রাইমারি হেলথকেয়ার’ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি বলেন, আমরা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) পুনর্গঠন করতে যাচ্ছি। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর ঋণের চাপ কমবে এবং বন্ড ও ক্যাপিটাল মার্কেটের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পথ সুগম হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজার ও আইএফসি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ব্যাংকিং খাতের আন্ডার-ক্যাপিটাল ও লুটপাটের সংকট দূর করে ডেপোজিটরদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।

তিনি বলেন, আমরা টোটাল ডিরেগুলেশন বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণমুক্ত অর্থনীতির দিকে যাচ্ছি। লাইসেন্স, পাসপোর্ট বা বিদ্যুৎ বিলের মতো সব ধরনের সরকারি অনুমোদনের জন্য একটি সিংগেল ফোকাল পয়েন্ট থাকবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো দপ্তর রেসপন্স না করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারমিশন কার্যকর হয়ে যাবে। সরকার ব্যবসার পথে বাধা হবে না, বরং সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করবে।

মন্ত্রী জানান, গাড়ি শিল্পকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে দেশের মানুষ আগামীতে মাত্র ৩০-৩২ লাখ টাকায় উন্নতমানের গাড়ি কিনতে পারবে। তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রজেক্টের দৈনিক অগ্রগতি ড্যাশবোর্ডে দৃশ্যমান থাকবে এবং কোনো বিলম্ব হলে জবাবদিহি করতে হবে।

আমির খসরু বলেন, এখন থেকে যেকোনো নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে চারটি কঠোর মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১. ভ্যালু ফর মানি (অর্থের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা) ২. রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগের বিপরীতে লাভ) ৩. জব ক্রিয়েশন (কর্মসংস্থান সৃষ্টি) এবং ৪. এনভায়রনমেন্টাল কনসিডারেশন (পরিবেশ রক্ষা)। ইতোমধ্যে বিগত সরকারের নেওয়া অকার্যকর প্রকল্পগুলো স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্প এই মানদণ্ড পূরণ করবে না, সেগুলো বাতিল বা পুনর্নির্ধারণ করা হবে।

সেমিনারে ইআরএফ প্রেসিডেন্ট দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, বিটিএমএ প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল প্রমুখ।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত