নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল হলেও কাটেনি মূল্যস্ফীতির চাপ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

মূল্যস্ফীতি। স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশে চালসহ নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে বলে জাতীয় সংসদে দাবি করেছেন খাদ্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তবে সরকারি পরিসংখ্যান ও বাজারের চিত্র বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের অস্বস্তি এখনো কাটেনি।

গত শনিবার সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনার সময় প্রতিমন্ত্রী চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার অভিযোগ নাকচ করে দেন।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও নিয়মিত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৬০টি কৃষিপণ্যের উৎসে কর কমানোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য কমে আসবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটের লক্ষ্য একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।

সরকারের এই পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক হলেও অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির উচ্চ চাপ এখনো বিদ্যমান।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এপ্রিলে এই হার ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশে পৌঁছায়। গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

বাজারের চিত্র
বাজারে বড় ধরনের নতুন মূল্যবৃদ্ধি না হলেও অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। রবিবার (২৮ জুন) রাজধানীর কারওয়ান বাজারের চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চালের দাম না বাড়লেও এখনো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিই আছে। মোটা চাল প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৬০ টাকায় এবং চিকন চাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে পোলাওয়ের চালের দাম বেড়েছে। ‘ঢাকা রাইস এজেন্সি’র মালিক সায়েম বলেন, ‘সরকার পোলাওয়ের চালের রপ্তানি খুলে দেওয়ায় দাম বেড়েছে। গত মাসেও পোলাওয়ের চালের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, যা এখন ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় উঠেছে।’ উল্লেখ্য, গত মাসের মাঝামাঝি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২১১টি প্রতিষ্ঠানকে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেয়।

‘বরিশাল রাইস এজেন্সি’র মালিক জামালউদ্দিন বলেন, ‘সাধারণ চালের দাম তেমন একটা বাড়েনি। দু-একটি চালে বস্তাপ্রতি ১০-২০ টাকা বেড়েছে, যা নগণ্য।’ অন্যদিকে কাঁচা মরিচের দাম গত সপ্তাহের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। গত সপ্তাহে মরিচের কেজি ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, যা আজ বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় উঠেছে।

তবে কমেছে মুরগি ও আলুর দাম। গত এপ্রিলে সোনালি মুরগির দাম প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। কোরবানির ঈদের আগে তা ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় নামলেও পরে আবার ৪০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। আজ কারওয়ান বাজারে সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩২০ টাকায় এবং ব্রয়লার মুরগি ১৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আলুর দামও ৬০-৬৫ টাকা থেকে কমে ২০-২৫ টাকায় নেমেছে। সবজি ও মাছসহ অন্যান্য খাদ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।

বাজেটে প্রদত্ত সুবিধা
নতুন বাজেটে কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যয় কমাতে ৬০টি পণ্যের উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, চিনি ও লবণ উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে সার, বীজ ও কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার পর বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ও পরামর্শ
বাজেটের আকার অনেক বড় হওয়ায় সরকারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ নিতে হতে পারে। উৎপাদনশীলতা না বাড়লে এই সরকারি ব্যয় মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সরকারের বড় ব্যয় পরিকল্পনা উৎপাদনশীলতা না বাড়ালে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বিচক্ষণ মুদ্রানীতি ছাড়া মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।’

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজার নতুন করে অস্থির না হওয়ায় সরকারের দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। তবে এই স্থিতিশীলতা এমন এক সময়ে এসেছে যখন মূল্যস্ফীতি অনেক দিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। কর সুবিধা কার্যকর করার পাশাপাশি শক্তিশালী বাজার তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত