চেয়ারম্যানের বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ-গাড়ি, চিকিৎসাসেবা ব্যাহত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বান্দরবান

চেয়ারম্যানের গ্যারেজে পড়ে আছে রোগী পরিহবনের গাড়ি। সংগৃহীত ছবি

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নের জরুরি সেবায় রোগী পরিবহনের জন্য রয়েছে গাড়ি, বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সোলার প্যানেল। কিন্তু হাম আক্রান্ত শিশু ও অন্য রোগীরা পাচ্ছেন না বিদ্যুৎ ও পরিবহনসেবা। কারণ, গাড়ি আছে সদর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের গ্যারেজে, আর সোলার বসেছে কুরুকপাতা ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে।

কুরুকপাতা ইউনিয়নে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারিভাবে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প চালু থাকলেও জরুরি রোগী পরিবহন ও বিদ্যুৎ সুবিধার ঘাটতিতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। দুর্গম এলাকার রোগী পরিবহনের জন্য সরকারের দেওয়া একটি ল্যান্ড ক্রুজার গাড়িটি দীর্ঘদিন উপজেলা সদরের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনের ব্যক্তিগত গ্যারেজে রেখেছেন কুরুকপাতার ইউপি চেয়ারম্যান। আর সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ইউনিয়ন নিজ বাড়িতে লাগিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, ‘গাড়িটি ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে এলজিএসপি-৩ প্রকল্পের আওতায় দুর্গম এলাকার মানুষের জরুরি সেবার জন্য দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে গাড়ির একটি চাকা নষ্ট হয়ে অকেজো অবস্থায় রয়েছে। চাকা কিনতে ২০ হাজার টাকা লাগবে। আমার বাড়িতে রাখার জায়গা না থাকায় সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনের বাসায় রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ ব্যবহার করতে চাইলে নতুন চাকা লাগিয়ে ব্যবহার করতে আমার কোনো আপত্তি নেই।’

ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া প্রায় ৫ হাজার ওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, ব্যাটারি ও আইপিএস চেয়ারম্যানের বাড়িতে স্থাপন বিষয়ে চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, ‘কুরুকপাতা ইউনিয়নে জরুরি সেবায় বিদ্যুৎতের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে ১২ শ এমপিআর (প্রায় ৫০০০ কিলোওয়াট) সমমান সোলার প্যানেল দেওয়া হয়েছিল। কুরুকপাতার ইউপির নিজস্ব ভবন না থাকায় সেগুলো আমার নিজ বাড়িতে লাগিয়ে রেখেছি। মেডিকেল টিম কিংবা যেকেউ চাইলে যেকোনো সময়ে সেটিও ব্যবহার করতে দিতে কোনো অসুবিধা নেই।’

এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, ‘ঘটনা শোনার পরই চেয়ারম্যানকে ডেকেছি। একজন গাড়ির মেকানিককে জরুরিভাবে ডেকে গ্যারেজে পাঠিয়ে যাচাই-বাছাই করেছি। মেরামতের জন্য প্রাথমিক ভাবে ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আর সোলার প্যানেলটি তার বাড়ি থেকে খুলে অস্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কাযর্লয়ে স্থাপনরর নির্দেশনা দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছি, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানা যাবে।’

অস্থায়ী মেডিকেলে চলছে হামের চিকিৎসা

সরেজমিনে দেখা যায়, কুরুকপাতা বাজারের মৈত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন ডাক্তার, তিন নার্স, এক স্বাস্থ্য সহকারী ও এক এমএমএস।

অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিরা জানান, দূর-দূরান্তের দুর্গম পাহাড়িপাড়া থেকে আসা শিশু ও সাধারণ রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে আসতে দেখা গেছে। কেউ হেঁটে, কেউ বাঁশের তৈরি অস্থায়ী স্ট্রেচারে করে রোগী নিয়ে আসছেন।

মেডিকেল ক্যাম্পের ডাক্তার মো. আমীন বলেন, ‘এই দুর্গম ইউনিয়নে হামের প্রাদুর্ভাবের খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর ২৫ এপ্রিল থেকে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প চালু করা হয়। পাশাপাশি ৬ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের এমআর, হাম ও রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।’

তিনি জানান, ২৫ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ২০৬ জন শিশু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬ জনের মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে।

চিকিৎসকরা জানান, কুরুকপাতা ইউনিয়নের বেশির ভাগ পাহাড়ি পাড়া এখনো বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে। ফলে মেডিকেল ক্যাম্পের খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চিকিৎসকেরা আরো জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তাদের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেফার করতে হচ্ছে। কিন্তু দ্রুত রোগী পরিবহনের জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি যানবাহন নেই। এতে গুরুতর রোগীদের নিয়ে তারা প্রতিকূলতায় পড়ছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্যকর্মী লিটন বিশ্বাস বলছেন, দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে হাম, নিউমোনিয়া ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের নেতারা বলেন, শুধু অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য সচল গাড়ি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা না করলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ হানিফ বলেন, আলীকদমে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ আক্রান্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত