গ্রন্থাগারে ঢুকে মারধরে রাকসুর আম্মার ও শিবিরের ভূমিকায় ক্ষোভ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের ভেতরে মারধরের ঘটনা ঘটে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রক্টর দপ্তর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধর নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এই ঘটনায় রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার এবং ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণের ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার দুপুরে প্রক্টর দপ্তরে একটি বৈঠক বসে। প্রক্টরের উপস্থিতিতে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আনাসকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে মারধর করেন রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির। পরে রাকসু কার্যালয়ে হামলার পাল্টা অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভেতরের পাঠকক্ষে ঢুকে আনাস ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বাধা দিলে তাদেরও হুমকিধমকি দেওয়া হয়।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, আম্মারের হাতে বেলচা। তিনি আনাসকে উদ্দেশ্য করে বলছেন– ‘তোরে একবারে পুঁইতা ফেলব’। আরেক ভিডিওতে পাঠকক্ষের ভেতরে বড় লাঠি দিয়ে শিক্ষার্থীকে পেটাচ্ছেন আম্মার।

পরে আহত শিক্ষার্থীদের প্রক্টর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করলে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়ে বাঁশ দিয়ে সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানকে আবার আহত করা হয়। একপর্যায়ে রাকসু ও শিবিরের দাবির মুখে আনাস এবং মাহমুদুলকে জুলাই-পরবর্তী ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম’ মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

এ ব্যাপারে সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, ছেলেটিকে পুলিশের হাতে তুলে দিন। পুলিশ তাঁকে নিয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর জোহা চত্বরে ছেড়ে দেয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই সে ফিরে এসে আমার ওপর হামলা চালায়। আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে বিচার কোথায়?’

তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির একপর্যায়ে আমরা বাধ্য হয়ে তাঁকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে গিয়ে প্রতিরোধ করি। গত দুই বছর ধরে ছাত্রলীগ-সংক্রান্ত বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ফল আজকের পরিস্থিতি।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসে অতীতে নানা সহিংসতা হলেও প্রক্টর ও শিক্ষকের উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে এভাবে শিক্ষার্থী পেটানোর নজির নেই। ২০১৪ সালে বর্ধিত ফি ও সান্ধ্য কোর্স বাতিলের আন্দোলনে পুলিশ-ছাত্রলীগের ধাওয়ার মুখে শতাধিক শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারে আশ্রয় নিলে শিক্ষকেরা মানবঢাল হয়ে তাদের নিরাপদে বের করে এনেছিলেন।

সেই আন্দোলনের স্মৃতি স্মরণ করে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের রক্ষায় শিক্ষকেরা মানবঢাল তৈরি করেছিলেন। অথচ চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই তারা মার খাচ্ছে, এটি লজ্জার।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন এই ঘটনাকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির চরম অবমাননা’ অভিহিত করে বলেন, ‘প্রশাসনের উপস্থিতিতে গ্রন্থাগারে ঢুকে এভাবে মারধর করেছে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি রাকসু ও শিবির। এটি ভীষণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির অবমাননা। এই হামলার চেয়ে জঘণ্য ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।’

ঘটনাটিকে ‘মব সন্ত্রাস’ অ্যাখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন কঠোর বিচারের দাবি জানিয়েছে। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থীর ওপর শারীরিক আঘাত বা আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। একজন শিক্ষার্থীকে চড়-থাপ্পড় মারার পর তাঁর ওপর মব ভায়োলেন্স চালানো হয়েছে। একজন নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে আম্মারের দায়িত্ববোধ আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল।

ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, রাকসু নির্বাচনে সালাউদ্দিন আম্মার শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁরা তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন আম্মার।

তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের সময় আম্মারের ছাত্রশিবির-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় শিক্ষার্থীদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। শিবির সরাসরি করতে চায় না– এমন বিভিন্ন বিতর্কিত কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাগুলোতে সালাউদ্দিন আম্মারকে সামনে আনা হয়, যাতে সংগঠনের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন থাকে।

শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আম্মার এই ক্যাম্পাসে যত অপকর্ম করে আসছে এবং এখনো করছে, তা একজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে কোনোভাবেই করতে পারেন না। এমনকি মঙ্গলবার ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থীদের ওপর যে হামলা করেছে, সেজন্য তাঁর এখন জেলে থাকার কথা। আমরা প্রশাসনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত