
আমার একজন প্রিয় শিক্ষার্থী আতিক আমাকে ফোন করেছিল। তাঁর পরিচিত এক তরুণ চীনা ভাষা শিখতে চায়। কোথায় শেখা যায়, কীভাবে শুরু করা উচিত—এসব নিয়ে আমাদের কথা হচ্ছিল।
তবে ফোনালাপটি আমার কাছে অন্য একটি কারণে মনে রাখার মতো হয়ে আছে। কথার একপর্যায়ে আতিক নিজের জীবনের পরিবর্তনের কথা বলছিল। তার কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস। তখন আমার মনে হলো, একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প আরও অনেক মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
২০২০ সাল। কোভিড-১৯ মহামারিতে পুরো বিশ্ব থমকে গিয়েছিল। বাংলাদেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছিল। চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকের মধ্যেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। আবার কেউ কেউ এই সময়টাকে নিজেদের জন্য কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন।
আতিক ছিলেন তাঁদের একজন। তার বাড়ি রাজশাহীতে। কিন্তু চীনা ভাষা শেখার জন্য সে একটু ভিন্নভাবে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। তার মনে হয়েছিল, নিজের বাড়িতে থাকলে পরিচিত মানুষ, সামাজিক ব্যস্ততা ও দৈনন্দিন নানা কাজে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে। তাই সে শ্বশুরবাড়ি দিনাজপুরে থেকে নিয়মিত পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সিদ্ধান্তটি হয়তো খুব বড় কিছু মনে হবে না। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্য স্থির রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার উদাহরণ।
সাফল্যের পেছনে প্রায়ই এমন কিছু নীরব সিদ্ধান্ত থাকে, যেগুলো বাইরে থেকে দেখা যায় না। সে সময় আমি পরিচালনা করছিলাম আবাসিক চীনা ভাষা শিক্ষা কোর্স। এখানে “আবাসিক” বলতে শুধু কোনো নির্দিষ্ট স্থানে থাকা বোঝানো হয়নি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আবাসিক প্রশিক্ষণের মতো একটি নিবিড়, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং পূর্ণকালীন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা।
অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকেও সারাদিন চীনা ভাষা শেখার জন্য সময় নির্ধারণ করবে, নিয়মিত অনুশীলন করবে এবং শিক্ষকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করবে।
আতিক তিন মাসের এই কোর্সে অংশগ্রহণ করে। সপ্তাহে নির্ধারিত দিনে জুমের মাধ্যমে ক্লাস, পড়া, লেখা, শোনা ও বলার অনুশীলন—সবকিছুই ছিল এই প্রশিক্ষণের অংশ। তবে শিক্ষা শুধু নির্ধারিত ক্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও উইচ্যাটের মাধ্যমে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হতো। প্রয়োজনে অতিরিক্ত পাঠ, উচ্চারণ সংশোধন, অনুশীলন ও ব্যক্তিগত দিকনির্দেশনাও দেওয়া হতো।
আতিক অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই সুযোগ গ্রহণ করেছিল। সে নিয়মিত পড়াশোনা করত, অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করত এবং নিজের পড়া, লেখা ও বলার অনুশীলনের মাধ্যমে অগ্রগতির কথা জানাত। আমি দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে দেখেছি—ভাষা শেখার ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে নিয়মিত পরিশ্রম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আতিক সেই সত্যের একটি বাস্তব উদাহরণ।
আতিকের এই কোর্সের ফি ছিল ৩০ হাজার টাকা। বই ও শিক্ষাসামগ্রী পাঠাতে আরও প্রায় ১,৩০০ টাকা ব্যয় হয়েছিল। অর্থাৎ তার মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৩১ হাজার ৩০০ টাকা।
কোর্স শেষ করার পরপরই সে পদ্মা সেতু-সংশ্লিষ্ট একটি চীনা প্রকল্পে চাকরির সুযোগ পায়। তার প্রাথমিক বেতন ছিল মাসিক ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের বেতনেই সে কোর্সে খরচ করা অর্থের চেয়ে বেশি উপার্জন করে ফেলে।
এর আগে সে বিএসএস ডিগ্রিধারী হিসেবে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে প্রায় ১৩–১৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করত। কোভিড পরিস্থিতিতে সেই চাকরিও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু চীনা ভাষা শেখার পর তার সামনে নতুন কর্মজীবনের দরজা খুলে যায়। এরপর থেকে তাকে আর দীর্ঘ সময় বেকার থাকতে হয়নি। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে তার বেতনও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে সে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানে মাসিক প্রায় ৬৫ হাজার টাকা বেতনে কর্মরত। একটি নতুন দক্ষতা তার কর্মজীবনের গতিপথই বদলে দিয়েছে।
আতিকের সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে একটি আন্তর্জাতিক ভাষা একজন মানুষের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং কর্মজীবনের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে আমার সৌভাগ্য হয়েছে বিশ্বের ২৩টি দেশের ৩,৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষা শেখানোর সুযোগ পাওয়ার। তাঁদের মধ্যে ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থী নিবিড় আবাসিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমার কাছে চীনা ভাষা শিখেছেন।
তাঁরা এসেছেন বিভিন্ন পেশা, বয়স ও সামাজিক অবস্থান থেকে। কেউ ছিলেন শিক্ষার্থী, কেউ চাকরিজীবী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ প্রকৌশলী, আবার কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পেশাজীবী। তাঁদের প্রত্যেকের লক্ষ্য আলাদা ছিল, কিন্তু একটি বিষয় ছিল অভিন্ন—তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
বর্তমান বিশ্বে চীনের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের অংশ। আমাদের দেশে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প, যোগাযোগ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে এমন দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়, যারা শুধু নিজ নিজ পেশায় দক্ষ নন, বরং চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও ধারণা রাখেন।
একজন প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, গবেষক বা পেশাজীবী যদি চীনা ভাষায় যোগাযোগ করতে পারেন, তাহলে তাঁর কাজের ক্ষেত্র ও সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত হয়। চীনা ভাষা তাই শুধু একটি ভাষা নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজে লাগতে পারে এমন একটি দক্ষতাও।
চীনা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে আমার লক্ষ্য সবসময় ছিল, শিক্ষার্থীদের শুধু ভাষার নিয়ম শেখানো নয়, বরং বাস্তব জীবনে ভাষাটি ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করা। এই লক্ষ্য থেকেই গড়ে উঠেছে জং মেং চাইনিজ একাডেমি। এখানে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে আবাসিক নিবিড় প্রশিক্ষণ, সরাসরি শ্রেণিকক্ষ শিক্ষা এবং অনলাইন ইন্টারঅ্যাকটিভ শিক্ষা।
প্রত্যেক পদ্ধতির লক্ষ্য একই—শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চীনা ভাষা ব্যবহার করার উপযোগী করে তোলা।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আমার আন্তরিক আহ্বান, শেখা কখনো বন্ধ করবেন না। নিজের ওপর বিনিয়োগ করতে ভয় পাবেন না। চীনা ভাষা হোক বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক দক্ষতা—যে জ্ঞান আপনাকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে, সেটিই আপনার ভবিষ্যতের শক্তি।
শুধু ভাষা হয়তো একজন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে না। কিন্তু তা এমন কিছু দরজা খুলে দিতে পারে, যেগুলোর অস্তিত্ব সে আগে কল্পনাও করেনি। আর একজন শিক্ষক হিসেবে, আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ—আমার শিক্ষার্থীদের সাফল্যের মধ্যেই আমি আমার নিজের সাফল্যের প্রতিফলন দেখতে পাই।
• লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা, শিক্ষক, লেখক ও প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (ডাব্লিউএসসিসি)
.png)

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা উপেক্ষা করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার জুড়ে দেওয়া ‘মনগড়া’ শর্তে এমন সব বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক সরানো হয়েছে, যেখানে আগে থেকেই শিক্ষক সংকট ছিল। একই সঙ্গে কয়েকটি বিদ্যালয়
২০ ঘণ্টা আগে
বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতনও নতুন পে-স্কেলে হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি একথা জানান।
২০ ঘণ্টা আগে
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফুল হক পদত্যাগ করেছেন। সোমবার (৩১ আগস্ট) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বিজয়ী সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর এমফিলের ছাত্রত্ব বাতিল করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট।
৩১ আগস্ট ২০২৬