মনোসংযোগ দিবস/কেন ফোন হাতে নিয়েছিলেন, সেটাই কি ভুলে যাচ্ছেন?
ফোন হাতে নিয়ে কী যেন করতে চেয়েছিলেন, একটু পরেই হয়তো সেটাই ভুলে গেলেন। এর মধ্যে একের পর এক রিল, নোটিফিকেশন আর স্ক্রলিং কেড়ে নিচ্ছে মনোযোগ। বিশ্ব মাইন্ডফুলনেস দিবসে তাই প্রশ্নটা মনোযোগ কোথায় রাখছি, সেটি বোঝার। মাইন্ডফুলনেস কী, সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে মনোযোগ ধরে রাখে এবং বর্তমান মুহূর্তে ফেরার উপায় নিয়েই এই লেখা।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোনটা হাতে নিলেন অ্যালার্ম বন্ধ করতে। নোটিফিকেশন দেখে বুঝলাম দুটো মেসেজ এসেছে। মেসেজ দেখতে গিয়ে ফেসবুকে ঢুকলাম। তাড়াহুড়ার মাঝেও একটা রিলসে চোখ আটকে গেল। এটা শেষ হতে না হতেই আরেকটা চলে এল। তারপর আরেকটা। হঠাৎ মনে হলো, ‘আচ্ছা, এতক্ষণ ধরে কী করছি?’
এমন ঘটনা দিনে কতবার ঘটে, হিসাব রাখা কঠিন। নোটিফিকেশন, রিল, শর্ট ভিডিও, বিজ্ঞাপন; সবকিছু যেন একই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। শুধু তাই নয়, ফোন হাতে নেওয়ার পর আমি যেমন কাজে মনোযোগ রাখতে পারছি না, তেমনি আমি কেন ফোন হাতে নিলাম সেটিও ভুলে গেলাম। এখানেই আসে ‘মাইন্ডফুলনেসের’ প্রসঙ্গ।
সহজ ভাষায় বললে, বর্তমান মুহূর্তে কী ঘটছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা এবং নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও চারপাশের পরিবেশ খেয়াল করাই হলো ‘মাইন্ডফুলনেস’ বা মনোসংযোগ।
একটু ভেবে দেখুন, মোবাইল ফোন আমাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, অনেক সময় ফোন হাতে না থাকলেও মনটা পড়ে থাকে ফোনের দিকেই। কাজের মধ্যে থেকেও মনে হয়, ফোনে নতুন কোনো মেসেজ এলো কি না, নোটিফিকেশন এসেছে কিনা। ফলে সামনে থাকা কাজটায় মন থাকলেও পুরোপুরি সেখানে থাকা হয় না। ফলে ধীরে ধীরে ‘প্রেজেন্ট মাইন্ডেড’ বা বর্তমান মুহূর্তে থাকার অভ্যাসটিই দুর্বল হয়ে যায়।
মনোযোগ যখন সবচেয়ে দামি পণ্য
আপনি ফেসবুকে ঢুকলেন। একটু স্ক্রল করলেন। একটা ভিডিও ভালো লাগল। তারপর আরেকটা। আপনি থামছেন না দেখে ফেসবুকও আপনাকে থামতে বলছে না। ইউটিউব শর্টসেও একই ব্যাপার। একটা ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই পরেরটা তৈরি। আপনাকে কিছু খুঁজতে হচ্ছে না। শুধু আঙুল দিয়ে ওপরের দিকে টানলেই হলো।
সোশ্যাল মিডিয়া এখন আর কোনো বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা এটিকে ব্যবহার করছি অভ্যাস হিসেবে, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে। সময় কাটানোর বিভিন্ন উপাদান আগেও আমাদের সামনে ছিল। তবে ফোনের সঙ্গে এসবের পার্থক্য আছে।
যেমন আগে টেলিভিশন দেখতে হলে আপনাকে ঠিক করতে হতো, ‘আমি টেলিভিশন দেখব।’ তারপর সময় বের করে টেলিভিশনের সামনে বসতেন। কিন্তু এখন অনেক সময়ই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। ফোন হাতে নিলেই একটার পর একটা কনটেন্ট আমাদের সামনে আসতে থাকে।
ইউটিউব বলছে, শর্টসের ভিডিও সাজানোর সময় তারা দর্শক আগে কী দেখেছে, কী খুঁজেছে, কোন ভিডিওতে কতক্ষণ ছিল—এমন নানা বিষয় বিবেচনা করে। উদ্দেশ্য হলো, দর্শকের কাছে তার পছন্দের ভিডিও পৌঁছে দেওয়া। কারণ আপনি যত বেশি সময় ভিডিও দেখবেন, বিজ্ঞাপন দেখার সুযোগও তত বাড়বে। আপনার সামনে বিজ্ঞাপন দেখানোই অনেক প্ল্যাটফর্মের আয়ের বড় পথ।
আবার ফেসবুকের কথাই ধরুন। এখন শুধু ফেসবুকে বসে পোস্ট দেখলেই হচ্ছে না। কনটেন্ট বানানোও সেখানে একটা আয়ের জায়গা হয়ে গেছে। মেটা ২০২৪ সালে ফেসবুক কনটেন্ট মনিটাইজেশন চালু করে। রিলস, ভিডিও, ছবি, লেখা—বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট থেকে নির্মাতারা আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।
২০২৬ সালের মার্চে মেটা জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ফেসবুক প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার কনটেন্ট নির্মাতাদের দিয়েছে। এর ৬০ শতাংশের বেশি গেছে রিলস থেকে।
আপনি রিলস দেখছেন। অন্যদিকে কেউ রিলস বানাচ্ছে। প্ল্যাটফর্ম চাইছে আপনি আরও রিলস দেখুন। নির্মাতা চাইছেন আরও মানুষ তার ভিডিও দেখুক। কারণ বেশি দেখা মানে বেশি আয় করার সম্ভাবনা। অর্থাৎ আপনার মনোযোগই এখানে ব্যবসার প্রধান পুঁজি।
২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব শুধু ‘কত ঘণ্টা ব্যবহার করছি’ দিয়ে বোঝা যায় না। কীভাবে ব্যবহার করছি, কেন ব্যবহার করছি এবং প্ল্যাটফর্মের নকশা কেমন; এসবও গুরুত্বপূর্ণ। আর এখানে মনোযোগের কথা যেমন আসছে, তেমনি আমি কোনো কাজে কতটা ‘মাইন্ডফুল’ সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের মনোযোগ যেমন কেড়ে নিচ্ছে, তেমনি কোনো কাজে ‘মাইন্ডফুল’ হওয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে। আমরা কাজ করছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের কাজে ‘মন’ নেই।
সোশ্যাল মিডিয়া আসার আগে আমাদের মনোযোগ কেমন ছিল
অনেকে হয়তো মনে করেন, সামাজিক মাধ্যম আসার আগে মানুষের মনোযোগ বেশি ছিল, কিন্তু এখন কয়েক সেকেন্ড পরপর আমরা মনোযোগ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আমাদের সময় কাটানোর ধরন বদলে গেছে আর তা নিয়েই যত আলোচনা-সমালোচনা।
হয়তো আগে বাসে বসে থাকার সময় পত্রিকা পড়তেন, বই পড়তেন, জানালার বাইরে তাকাতেন কিংবা পাশে বসা মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। অথচ এখন আমরা কোনকিছুর জন্য অপেক্ষাও করি ফোন হাতে নিয়ে। লিফট আসতে সময় লাগছে—ফোন। লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন—ফোন। খেতে বসেছেন—ফোন। ঘুমানোর আগে—ফোন।
তবে ‘সোশ্যাল মিডিয়ার আগে মানুষের গড় মনোযোগ অনেক বেশি ছিল এমন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের ২০২৫ সালের তথ্যেও দেখা যায়, মানুষের অবসর সময়ের বড় অংশ এখনো টেলিভিশন দেখা, সামাজিক যোগাযোগ, খেলাধুলা, বাইরে যাওয়া, পড়া বিভিন্ন কাজে ভাগ হয়ে থাকে। অর্থাৎ ফোন আসার পর বই, টেলিভিশন বা অন্য সবকিছু একেবারে হারিয়ে যায়নি। বরং আমাদের অবসর কাটানোর তালিকায় নতুন মাধ্যম যোগ হয়েছে।
আগে মানুষ বিনোদন খুঁজতে যেত, এখন বিনোদনই বারবার মানুষের সামনে এসে হাজির হচ্ছে। ফলে পাঁচ মিনিটের অবসরও খুব সহজে ত্রিশ মিনিটের স্ক্রলিংয়ে পরিণত হতে পারে। কারণ আমরা আমাদের চারপাশের পরিবেশের প্রতি সচেতন নই। অনেক সময় হাতের কাজ ফেলে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করি রিলস দেখতে। কারণ আমাদের মাইন্ডফুলনেস তুলনামূলক কম।
ফোন কি তবে ছুঁড়ে ফেলব?
মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে হলে ফোন ব্যবহার করা বন্ধ করে দিতে হবে, এমন নয়। বরং কখন, কেন বারবার ফোন হাতে নিচ্ছেন, সেটা খেয়াল করলেই ফোন অতিরিক্ত ব্যবহার করা থেকে দূরে থাকা যায়। যেমন কাজের সময় ফোনটা টেবিলে রাখলে স্ক্রিনটা উল্টো করে রাখতে পারেন। সামনে আলো জ্বলে উঠছে কি না, নতুন কিছু এসেছে কি না এসব চোখে না পড়লে ফোন দেখার ইচ্ছাও কিছুটা কমে। এতে করে ফোন হাতের কাছে থাকলেও প্রতি মুহূর্তে এটির দিকে তাকানোর দরকার হচ্ছে না।
নোটিফিকেশনের ক্ষেত্রেও একটু বাছবিচার করা যায়। সব অ্যাপের খবর তো জরুরি নয়। মেসেজ বা ফোনকলের নোটিফিকেশন চালু রেখে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্য অ্যাপের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিতে পারেন। পড়তে বা কোনো কাজে বসলে ফোনটা পাশে না রেখে একটু দূরে রাখুন। কারণ ফোন যত কাছে, একবার দেখে নেওয়ার অজুহাতও তত সহজ।
আর একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, অবসর মানেই স্ক্রলিং নয়। আগে মানুষ অবসরে বই পড়ত, হাঁটত, পরিবারের সঙ্গে গল্প করত, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত। এখন আড্ডায় বসেও অনেকে ফোনের পর্দায় চোখ রাখেন। তাই দিনের মধ্যে এমন কিছু সময় রাখা যেতে পারে, যখন ফোনটা একেবারেই হাতে থাকবে না। সেই সময়টায় খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতেই হবে, এমন নয়। চুপচাপ বসে থাকা, জানালার বাইরে তাকানো কিংবা একটু হাঁটাহাঁটিও হতে পারে।
মাইন্ডফুল হওয়ার আসল চর্চাটা এখানেই। হাঁটার সময় হাঁটায় মন দেওয়া, কারও সঙ্গে কথা বললে তার কথাটা মন দিয়ে শোনা, বই পড়ার সময় বারবার ফোনের দিকে না তাকিয়ে বইয়েই থাকা। কারণ ফোন দূরে রাখলেই মনোযোগ ফিরে আসে না। ফোন হাতে রেখেও সচেতন থাকা যায়, আবার ফোন একেবারে দূরে রেখেও মন অন্য কোথাও পড়ে থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ফোন কোথায় আছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এই মুহূর্তে আমি কোথায় আছি, আর আমার মনটা কোথায় আছে।
.png)








-7be686-256x144.webp)


