এক্সপ্লেইনার/বাব এল-মান্দেব কেন গুরুত্বপূর্ণ, ‘হুতিদের নিয়ন্ত্রণে’ মানে কী

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে একটি সরু জলপথ রয়েছে, যার নাম ‘বাব এল-মান্দেব’। আরবি ভাষায় এই নামের অর্থ ‘কান্নার দুয়ার’ বা ‘গেট অব টিয়ার্স’। এই প্রণালির একপাশে ইয়েমেন, অন্যপাশে জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার উপকূল অবস্থিত।

প্রতিদিন শত শত তেলবাহী ট্যাংকার, গ্যাসের কনটেইনার, খাদ্যপণ্যের জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দীর্ঘদিন এটি ছিল নিছক একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক করিডর। কিন্তু বর্তমানে এটি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব। হরমুজ প্রণালি নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা চলছিল, এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বাব এল-মান্দেবও। সম্প্রতি ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি হুতি গোষ্ঠী এই জলপথ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

কেন এই ছোট্ট জলপথ এত গুরুত্বপূর্ণ

মানচিত্রে বাব এল-মান্দেবকে সামান্য মনে হলেও, এই সরু পথ দিয়েই লোহিত সাগর থেকে জাহাজ এডেন উপসাগর হয়ে আরব সাগরে এবং পরে ভারত মহাসাগরে পৌঁছায়। একইভাবে এই পথ ধরেই সুয়েজ খাল হয়ে জাহাজ ইউরোপের বন্দরে পৌঁছে। এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগকারী সবচেয়ে ছোট ও ব্যস্ততম সমুদ্রপথগুলোর একটি এটি।

তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, ভোগ্যপণ্য, খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামালের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। এই পথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজগুলোকে বাধ্য হয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হবে। এতে পথ ও সময় উভয়ই বাড়বে, বাড়বে খরচও। আর সেই বাড়তি খরচের চাপ শেষমেশ গিয়ে পড়বে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যের ওপর, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাজার-খরচে।

কোন ধরনের জাহাজ বাব এল-মান্দেবের ভেতর দিয়ে যায়

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই যাতায়াত করে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য এই রুট ধরেই ইউরোপ ও আমেরিকায় যায়। এ ছাড়া কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানিও এই পথ দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় পৌঁছায়।

এশিয়া—বিশেষত চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে উৎপাদিত পণ্য সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে যাওয়ার এটি ঐতিহ্যগত পথ। উল্টো দিকে ইউরোপ থেকে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক উপকরণ ও গাড়ি এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায় একই পথে। উভয় দিকেই ব্যাপক পরিমাণে নিত্যব্যবহার্য পণ্য, ইলেকট্রনিক্স, পোশাক ও খুচরা পণ্যও পরিবাহিত হয়।

মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার আমদানিকারকদের কাছে গমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এই রুট দিয়েই পৌঁছায়। পাশাপাশি বিভিন্ন খনিজ ও শিল্পকাঁচামালও এই পথে পরিবাহিত হয়।

পূর্ব আফ্রিকা ও হর্ন অব আফ্রিকার বন্দরগুলোতে পণ্য পৌঁছানোর জন্যও এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগর তীরবর্তী সৌদি আরব, সুদান ও মিশরের বন্দরগুলোর অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যও এই প্রণালীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

‘হুতিদের নিয়ন্ত্রণে’ মানে কী

লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতে ইয়েমেনি হুতি বিদ্রোহীদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক ও গভীর সংকট তৈরি করেছে। একদিকে তেল রপ্তানি চরম ঝুঁকিতে পড়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে ইরান একটি বড় কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্য ব্যাহত হয়। কারণ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। হরমুজের বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব তখন লোহিত সাগরের এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু এখন বিশ্বের এই দুই প্রধান নৌপথই চাপের মুখে থাকায় শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প রুট খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। নিরাপত্তা-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সুফান সেন্টারের একজন বিশ্লেষক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলেছেন, হুতিদের এই নিয়ন্ত্রণের ফলে শিপিং কোম্পানিগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে কেপ অব গুড হোপের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ বেছে নিতে হবে, যাতে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই বহুগুণ বেড়ে যাবে।

এই সংকট শুধু বাব এল-মান্দেবেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরবের অভ্যন্তরেও সম্প্রতি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরাক থেকে ছোড়া ড্রোন হামলার কারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকরা এই পুরো পরিস্থিতিকে ইরানের একটি সমন্বিত কৌশল হিসেবে দেখছেন। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাব এল-মান্দেবের নিকটবর্তী এলাকা দখলের এই হুতি অভিযান মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের চলমান আঞ্চলিক প্রতিরোধেরই একটি অংশ, যা পরোক্ষে ইরানি লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করছে।

তবে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেও হুতিরা জনসমক্ষে বিষয়টিকে কিছুটা লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করছে। হুতি পলিটব্যুরোর একজন সদস্য দাবি করেছেন, লোহিত সাগরের কার্গো রুটের জন্য তারা কোনো হুমকি নন। তাদের একজন সামরিক মুখপাত্রও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এই নৌপথ সম্পূর্ণ নিরাপদ। সৌদি জাহাজের ওপর আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ অবরোধ বলা যাচ্ছে না। যদিও প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে। তাদের বর্তমান প্রকাশ্য অবস্থান মূলত সৌদি আরবকেন্দ্রিক। তারা বেছে বেছে কেবল সৌদি জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, টাইমস অব ইসরায়েল, ইউরো নিউজ ও এনবিসি নিউজ

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত