মৃত্যুবার্ষিকী/‘গদা’ হাতে জঁ লুক গদার, কিন্তু আঘাতটা শেষ পর্যন্ত নিজের দিকেও
গদার যেন বারবার প্রশ্ন করেছেন, সবাই যেমন চায়, তেমনই সিনেমা বানাতে হবে কেন? আর যখনই মনে হয়েছে তাঁর নিজের বানানো নিয়মই আবার ক্লিশে হয়ে উঠছে, তখনই তিনি সরে গেছেন অন্য পথে।

পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত হাতেগোনা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া হলিউড আমাদের শিখিয়েছিল কীভাবে পপকর্ন খেতে খেতে আরামে সিনেমা দেখতে হয়। তারা শব্দ আর দৃশ্যকে জুড়ে দিয়ে সুন্দর একটা গল্প বলত। পরে মানুষের মুখে মুখে ফিরে হলিউডের সেই নিটোল গল্পের ধারাই যেন হয়ে যায় সিনেমার অলিখিত ব্যাকরণ।
এরপর গদার এলেন ‘গদা’ হাতে। মনে হচ্ছিল, সিনেমার পুরোনো দেয়ালে তিনি গদা নিয়ে একের পর এক আঘাত করছেন। এই প্রথা ভাঙার তরঙ্গের শুরু হয় ১৯৬০ সালে ‘ব্রেথলেস’ নির্মাণ দিয়ে। প্রথম সিনেমা বানিয়েই তিনি যেন বললেন, এত আরামের কিছু নেই, ব্রেন খাটাও! তাঁর সিনেমা মানে দর্শকদের নিজের জগতে টেনে নেওয়া। তিনি বলেছিলেন, সিনেমার করপোরেট কাঠামোর তোয়াক্কা না করে বানাও তোমার মন যা চায়, ‘খেয়াল-খুশিমতো’। কিন্তু যে শিল্পমাধ্যম তাঁকে এত সম্মানের আসনে বসাল, তা নিয়েই গদার বললেন, ‘সিনেমা ইজ দ্য মোস্ট বিউটিফুল ফ্রড ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ (সিনেমা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রতারণা)।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে গদারের সিনেমা হয়ে উঠেছিল বিশ্ব ‘সিরিয়াস’ চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রখ্যাত সমালোচক মানোলা ডার্গিসের স্মৃতিচারণমূলক লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৮০ সালে গদারের ‘এভরি ম্যান ফর হিমসেলফ’ দেখে তিনি রীতিমতো ঘোরের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদ ও চলচ্চিত্র গবেষক অঁতোয়ান দ্য বেক এবং লা মঁদ পত্রিকার মিশেল গেরাঁ এ বিষয় নিয়ে লিখেছেন। তাঁদের লেখায় ‘ব্রেথলেস’ দিয়েই গদারের নতুন ধরনের সিনেমার ভাষা স্পষ্ট হয়ে ওঠার কথা এসেছে। তখনকার প্রথাগত সিনেমায় গল্প বলার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গদার তাঁর ছোট ক্যামেরায় শুট করে এডিটিং টেবিলে বসে বানালেন ‘জাম্প কাট’।
শুরুতে এই ধরনের সম্পাদনা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কারণ, সিনেমার প্রচলিত নিয়ম ছিল কাট এমনভাবে দেওয়া, যাতে দর্শক কাটটাকে আলাদা করে টের না পান। গদার ঠিক উল্টোটা করলেন।
নিজেকেই ভাঙার ইতিবৃত্ত
১৯৬০ থেকে ১৯৬৭—এই আট বছরে গদার ১৫টি সিনেমা বানিয়েছিলেন। ফরাসি পত্রিকা ‘লা মঁদ’-এ প্রকাশিত নিবন্ধ এবং অভিনেতা জঁ-পল বেলমন্ডোর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, গদার তরুণ অভিনেতাদের অভাবনীয় স্বাধীনতা দিতেন। যখন তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা বেলমন্ডোকে বলছিলেন যে তাঁর অভিনয়ে কোনো মেধা নেই, তখন গদার তাঁকে ডেকে নিলেন নিজের সিনেমায়। বেলমন্ডো একবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই দৃশ্যে আমি বারে ঢুকব, এরপর কী করব? স্ক্রিপ্টে তো তা লেখা নেই?’
গদারের সোজা উত্তর, ‘তোমার যা মন চায়! চাইলে বেসিনের ওপর প্রস্রাবও করে দিতে পারো!’

গল্প শুরু হবে, গল্প জমাট বাঁধবে, গল্পের সমাপ্তি হবে, এই তো আমাদের চিরচেনা হিসাব। গদার বললেন, ‘গল্পের একটা শুরু, মধ্যভাগ এবং শেষ থাকতে হবে ঠিকই, কিন্তু সেটা যে ক্রমানুসারেই হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই!’ আজকের নন-লিনিয়ার গল্প বলার ধারার সঙ্গে তাই অনেকেই গদারের নাম জুড়ে দেন।
তাঁর একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কিংবদন্তি নির্মাতা ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোও গদারের সিনেমায় গল্প বলার এই ভিন্নতা খেয়াল করেছিলেন। গদারের প্রথম দিককার সিনেমায় অতীতের কোনো উল্লেখ থাকত না। চরিত্রগুলো যেন শুধু বর্তমান নিয়েই বাঁচত। তারা কোথা থেকে এল, বাবা কে, মা কে, পরিবার কোথায়, এসব জানানোর কোনো আগ্রহ গদারের ছিল না।
বই পড়তে অনাগ্রহী আমরা গদারের সিনেমা দেখতে বসে আচমকা দেখি, একটা চরিত্র টানা চার-পাঁচ পৃষ্ঠা বই পড়ে যাচ্ছে। আর আমরা, বই থেকে পালিয়ে বেড়ানো মানুষেরা, মুগ্ধ হয়ে সেই বই পড়া শুনছি।
একসময়ের সেই প্রথাভাঙা গদার যখন নিজেই প্রথা হয়ে উঠলেন, তখন তিনি কী করলেন? ষাটের দশকের মাঝামাঝি গদারের একচ্ছত্র আধিপত্যে যখন সবাই মুগ্ধ, তখন তিনি বুঝলেন, সবাই তাঁর মতো করেই সিনেমা বানাতে চাইছে। সবাই যেমন চায়, তেমন হওয়ার বিরুদ্ধে তিনি সব সময়ই গদা হাতে দাঁড়িয়েছেন। এবার তিনি বুঝলেন, নিজেই হয়ে উঠছেন ক্লিশে, হয়ে উঠছেন গতানুগতিক। ব্যস, তিনি নিজের চেনা পথ ছেড়ে দিলেন।
১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলন তুঙ্গে ওঠার পর গদার বাণিজ্যিক সিনেমার কাঠামো থেকে সরে আসেন। জঁ-পিয়ের গোরিনের সঙ্গে মিলে তিনি গড়ে তুললেন রাজনৈতিক ও পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের দল ‘দ্য জিগা ভের্তভ গ্রুপ’। এরপর তাঁরা এমন সব সিনেমা বানাতে শুরু করলেন, যেগুলো আগের গদারের সিনেমা থেকে এতটাই আলাদা ছিল যে খোদ গদার-ভক্তদের কাছেও সেগুলো হয়ে উঠেছিল রীতিমতো বিরক্তিকর।
গদারের সিনেমার সেকাল
বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দর্শকেরা সেকালে আরাম করে সিনেমা উপভোগ করতেন বটে। কিন্তু গদারের দর্শকদের উপভোগের ধরনটা কেমন ছিল? এ বিষয়ে বিভিন্নজনের লেখায় ছড়িয়ে থাকা তথ্য থেকে একটা ছবি পাওয়া যায়। সাধারণ দর্শকেরা যখন আরামদায়ক চেয়ারে বসে সিনেমা দেখতে আসতেন, গদার তখন তাঁর ছবিতে টেক্সট ঢুকিয়ে, শব্দ কেটে, পর্দা লাল-নীল করে দর্শকদের ওপর রীতিমতো মনস্তাত্ত্বিক হামলা চালাতেন।

মানোলা ডার্গিসের লেখাতেই আছে, গদার দর্শকদের তাঁর জগতে টেনে নিয়ে আসতেন। আর কেউ যদি তাঁর ভাষা বুঝতে না পারতেন, ক্ষতিটা নাকি দর্শকেরই। ধনী দর্শকেরা তখন সাজগোজ করে সিনেমা দেখতে আসতেন। তাঁদের হাতে থাকত ব্যালকনির টিকিট। কিন্তু গদার তাঁদের সেই আরামটাই হারাম করে দিলেন।
গদার তরুণদের শিখিয়েছেন, সবাই যেমন চায়, তেমন হওয়ার কোনো দরকার নেই। তিনি শুধু নিয়ম ভেঙেই থেমে থাকেননি, সিনেমার ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাঁর সময়ের রাজনীতি ও সমাজের প্রতিচ্ছবি। আর তাই দর্শককে ভাবতে হয়েছে, অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে, কখনো কখনো নিজের দেখার অভ্যাস নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হয়েছে।
বন্ধুত্ব ও বিতর্কের সমীকরণ
একসময় ফরাসিদের বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল গদারকে ঘিরে বিতর্ক। তাঁর জীবন ঘাঁটলেও দেখা যায়, তাঁর চারপাশে সব সময় বিতর্কের মেঘ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। অঁতোয়ান দ্য বেকের বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে বলা যায়, গদার ছিলেন এক অদ্ভুত স্ববিরোধী মানুষ। তিনি পুঁজিবাদের চরম সমালোচনা করতেন, আবার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য বিজ্ঞাপনের শুটিংও করতেন। নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের ক্ষেত্রেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। তিনি অনায়াসে বলতেন, ‘মেয়েরা বামপন্থীদের পছন্দ করে, কারণ তারা বোকা আর রোমান্টিক।’
সবাই যখন তাঁর স্তুতি গাইছে, তখন গদারের একগুঁয়ে স্বভাবের কারণে বন্ধুদের সঙ্গেও তাঁর দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করল। ১৯৭৩ সালে তাঁর একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো তাঁকে চিঠিতে রীতিমতো তুলোধুনো করেছিলেন। ত্রুফোর ভাষায়, গদার তখন আর কিছুই নন, স্রেফ ‘প্যাডেস্টালের ওপর রাখা এক টুকরো আবর্জনা’!
এখানেই বোধহয় গদার অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তিনি কেবল পুরোনো দিনের নস্টালজিয়া আঁকড়ে পড়ে থাকেননি। যখন টেলিভিশন এল, সিরিয়াস নির্মাতারা যেখানে নাক সিঁটকাতেন, গদার সেখানেও কাজ করলেন। এমনকি বিজ্ঞাপনও বানিয়েছেন। পুঁজিবাদের সমালোচক হয়েও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন বানানো তাঁর এই স্ববিরোধিতারই আরেক উদাহরণ।
সিনেমা যখন ডিজিটাল যুগে পা রাখল, গদার তখনও নতুন কিছু করার চেষ্টা করলেন। ২০১৪ সালে বানালেন ‘গুডবাই টু ল্যাঙ্গুয়েজ’। ছবিটিতে তিনি ৩-ডি প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করলেন, যা প্রচলিত ৩-ডি সিনেমার ধারণা থেকে অনেকটাই আলাদা। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরস্কারও জিতেছিল।
গদার যেন বারবার একই প্রশ্ন করেছেন, সবাই যেমন চায়, তেমনই হতে হবে কেন? আর যখনই মনে হয়েছে তাঁর নিজের বানানো নিয়মই আবার ক্লিশে হয়ে উঠছে, তখনই তিনি সরে গেছেন অন্য পথে। সেই কারণেই হয়তো গদারকে বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, তিনি সারাজীবন গদা হাতে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু সেই গদার আঘাত শেষ পর্যন্ত নিজের দিকেও ফিরেছে।
.png)









