যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলায় কেন ব্যর্থ আন্তর্জাতিক আইন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ২১: ২৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৩-২৪ সালে দক্ষিণ লেবাননে আগ্রাসন চালায় ইসরায়েল। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে লেবানন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশহত্যার অভিযোগ এনেছে। তাদের দাবি, ইসরায়েল ওই অঞ্চলের ভৌত এবং পরিবেশগত কাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

গত মাসে একই অভিযোগ তুলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানান, তেহরানের জ্বালানি ডিপোগুলোতে ইসরায়েল বোমা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে সেখানে ‘কালো বৃষ্টি’ বা ব্ল্যাক রেইন হয়েছে। তাঁর মতে, এমন ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশহত্যার শামিল।

গাজার কৃষি জমির ওপর ইসরায়েলি বর্বরতার প্রভাব বর্ণনা করতে গিয়ে গবেষক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও একই শব্দ ব্যবহার করেছে।

মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়, তা বোঝাতে কয়েক দশক ধরেই ‘ইকোসাইড’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী নানা সংঘাতের কারণে পুরো বাস্তুসংস্থান বা ইকোলজি ধ্বংস হচ্ছে। ফলে এই শব্দ এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সংবিধির অধীনে শব্দটিকে আন্তর্জাতিক অপরাধে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।

ইকোসাইড কী?

ইকোসাইড বলতে মানুষের কাজের ফলে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিকে বোঝায়। ১৯৭০ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক আর্থার ডব্লিউ গ্যালস্টন প্রথম এই শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ নামের আগাছানাশক রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ বিপর্যয় বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

১৯৭২ সালে স্টকহোমে জাতিসংঘের মানব পরিবেশ সম্মেলনে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ওলোফ পালমে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করেন।

এরপর ১৯৯০ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ভিয়েতনাম তাদের দেশীয় আইনে ইকোসাইডকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। তারপর থেকে এই শব্দের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে। রাশিয়া, ইউক্রেন, চিলি, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের মতো অনেক দেশ তাদের আইনে ইকোসাইড বা সমতুল্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

২০২১ সালে ‘স্টপ ইকোসাইড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের অলাভজনক সংস্থার বিশেষজ্ঞ প্যানেল এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলে, ‘পরিবেশের মারাত্মক, ব্যাপক বা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করবে জেনেও যে অপরাধ করা হয়, তাই ইকোসাইড।’

তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে ‘ইকোসাইড’-এর এখনো কোনো সর্বজনীন বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই।

বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে ‘ইকোসাইডের’ পার্থক্য কোথায়?

অনেক আন্তর্জাতিক সনদে ‘ইকোসাইড’ সরাসরি না থাকলেও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

রোম সংবিধি অনুযায়ী, যদি আগে থেকেই বোঝা যায় কোনো হামলায় পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে এবং তা সরাসরি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলবে, তবে সেটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধরত পক্ষগুলো এমন কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবে না, যা পরিবেশের ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে।

১৯৭৮ সাল থেকে কার্যকর হওয়া ‘এনভায়রনমেন্টাল মডিফিকেশন কনভেনশন’-এও পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে কড়া নিয়ম রয়েছে। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপে যদি দীর্ঘস্থায়ী বা মারাত্মক প্রভাব পড়ে, তবে এই কনভেনশন অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ।

আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অভি সিংয়ের মতে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি। পরিবেশের ক্ষতি বা ইকোসাইডের ক্ষেত্রে এই নীতিকেও যুক্তিতর্ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি আমার দেশের নদীর পানিতে বিষ মিশিয়ে দিই এবং সেই পানি অন্য দেশে বয়ে যায়, তবে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।’

আইনজীবী অভি সিং বলেন, ‘বর্তমান বিভিন্ন আইন আসলে মানবকেন্দ্রিক। এই আইনে মানুষকেই ক্ষতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়। অন্যদিকে, ইকোসাইডে পরিবেশকে আলাদা সত্তা হিসেবে দেখা হয়েছে।’

বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতা কোথায়?

বর্তমান আইনের প্রথম বড় দুর্বলতা হলো পরিধি। রোম সংবিধি চারটি গুরুতর অপরাধকে স্বীকৃতি দেয়—গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসন।

এই সংবিধি পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিকে কেবল ‘যুদ্ধাপরাধের’ আওতায় আনে। এর মানে হলো, পরিবেশের ক্ষতিকে অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করতে হলে তা কেবল যুদ্ধের সময়েই ঘটতে হবে। যুদ্ধের বাইরে পরিবেশের ক্ষতি এই আইনের আওতায় পড়বে না।

আরেকটি বড় বাধা হলো বিচারিক এখতিয়ার বা জুরিসডিকশন। কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইনের ভিজিটিং লেকচারার মৃণালিনী শিন্ডে জানান, ইরান ও লেবাননের মতো দেশগুলো আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র নয়। ফলে এসব দেশের ক্ষেত্রে বিচারের প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমন কোনো শক্ত আইনি কাঠামো নেই, যার মাধ্যমে পরিবেশ ধ্বংসের জন্য সরাসরি ফৌজদারি দায়বদ্ধতা বা ক্রিমিনাল লায়াবিলিটি নিশ্চিত করা যায়।

পরিবেশ নীতির ওপর পরামর্শ দেওয়া বৈশ্বিক সংস্থা ‘আইইউসিএন’ ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইকোসাইডকে অপরাধ হিসেবে শুধু ‘স্বীকৃতি’ দিয়েছে।

মৃণালিনী শিন্ডের আশা, এই পদক্ষেপ হয়তো অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক আইনে এই অপরাধ অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত করবে।

এসব কারণেই রোম সংবিধিতে ‘ইকোসাইড’কে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। পরিবেশবাদীরা চান, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং আগ্রাসনের পাশাপাশি ইকোসাইডকেও যুক্ত করা হোক।

তবে এই অন্তর্ভুক্তি বাস্তবে করা খুব সহজ নয়। শিন্ডে বলেন, ‘রোম সংবিধিতে কোনো কিছু যুক্ত করতে হলে সদস্য রাষ্ট্রদের অধিবেশনে সংশোধনী প্রস্তাব আনতে হবে। প্রস্তাব সফল হতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন লাগবে।’

আইন প্রয়োগের কঠিন চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক কাঠামোতে ‘ইকোসাইড’ একেবারে অনুপস্থিত নয়। আইইউসিএনের একটি প্রস্তাবে ইকোসাইডকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালে কাউন্সিল অব ইউরোপ ‘প্রটেকশন অব দি এনভায়রনমেন্ট থ্রু ক্রিমিনাল ল কনভেনশন’ গ্রহণ করে। এই কনভেনশন প্রথম আইনগত আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা ব্যাপক মাত্রার পরিবেশ ধ্বংসকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে।

এই কনভেনশনের অধীনে বিদেশের মাটিতে সংঘটিত অপরাধের বিচারও ইউরোপের স্থানীয় আদালতে করা সম্ভব।

আইনজীবী অভি সিং এ প্রসঙ্গে বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য সর্বজনীন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো অপরাধ কোথায় ঘটেছে, তা বিবেচনা না করেই স্থানীয় ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।

তিনি আরও বলেন, ‘পরিবেশগত অপরাধে দায়ী কোনো ব্যক্তি যদি ইউরোপে যান, তবে যে কেউ তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারেন। তারা দাবি করতে পারেন, ওই ব্যক্তি ইকোসাইড করেছেন এবং এর জন্য তার বিচার করা উচিত।’

তবে চ্যালেঞ্জ হলো এই আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ। সিং এবং শিন্ডে উভয়েই জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে পরিবেশ ধ্বংসের জন্য আজ পর্যন্ত সরাসরি কোনো বিচার বা প্রসিকিউশন শুরু হয়নি।

এই বাস্তবতায় রোম সংবিধির অধীনে ‘ইকোসাইড’কে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে যুক্ত করলে বাস্তবে তা কোনো কাজে আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।

সিং মনে করেন, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষগুলোকে বারবার প্রশ্ন তুলতে হবে।

সিং বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনের আসল সমস্যা হলো ক্ষমতার চর্চা। যাদের হাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা, তারা যদি আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম না মানে, তবে এই আইনের শুধু নৈতিক দিক অবশিষ্ট থাকে।’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ করা।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত