leadT1ad

এক্সপ্লেইনার

শ্রমিকের সংজ্ঞা কী, প্রকৃত শ্রমিক কারা

স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকার এক ব্যস্ত মোড়ে দুপুরের রোদে দাঁড়িয়ে আছেন রফিক। তাঁর সামনে ঠেলাগাড়িতে ফুচকার ডালা সাজানো। আরও আছে কাঁচা আম, আলু, মসলা, টকজল। পাশ দিয়ে অবিরাম ছুটে যাচ্ছে বাস, রিকশা, মোটরসাইকেল। সকাল থেকে রাত—এই তাঁর জীবন, এই তাঁর শ্রম। প্রতিদিন তিনি কাজ করেন, আয় করেন, শহরের এক অদৃশ্য চক্রকে সচল রাখেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘রফিক কি শ্রমিক?’

জাতিসংঘ বা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষাকারী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী সবাই শ্রমিক নন। কিছু নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে পড়লে তবেই ‘একজন কর্মী’কে শ্রমিক বলা যায়।

মোদ্দাকথা, ‘শ্রমিক’-এর কোনো একক সংজ্ঞা নেই। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্নভাবে শ্রমিকের ব্যাখ্যা দেয়। আর সেই ভিন্নতার মধ্যেই তৈরি হয় বাস্তব জীবনের বৈষম্য।

আন্তর্জাতিক পরিসরে শ্রমিককে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হলো ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন বা আইএলও। কিন্তু শ্রমিক নিয়ে কাজ করলেও এই সংস্থা ‘শ্রমিক’ বা ‘কর্মচারী’-র কোনো নির্দিষ্ট একটি সংজ্ঞা দেয় না। আইএলও মূলত জোর দেয় ‘এমপ্লয়মেন্ট রিলেশনশিপ’এর ওপর—অর্থাৎ কাজের সম্পর্ক। তাদের মতে, একজন ব্যক্তি তখনই স্পষ্টভাবে শ্রমিক হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন সে কোনো নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করে, তার কাজের ধরন ও সময় অন্য কেউ নির্ধারণ করে, এবং সে মজুরি পায়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে গার্মেন্টস কারখানার কর্মী, অফিসের কেরানি কিংবা নির্মাণ শ্রমিক—তাদের পরিচয় নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। তারা শ্রমিক, কারণ তাদের কাজের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু রফিকের মতো একজন ফুচকাওয়ালা কিংবা রিকশাচালকের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটি অস্পষ্ট। তারা নিজেরাই নিজেদের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, নিজেরাই আয় করে। ফলে আইএলওর প্রচলিত সংজ্ঞায় তারা অনেক সময় ‘কর্মচারী’ হিসেবে পড়ে না। তবে আইএলও এটাও স্বীকার করে, আধুনিক অর্থনীতিতে এই ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ দ্রুত বাড়ছে এবং তাদেরও শ্রমবাজারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে জাতিসংঘের কাছে ‘শ্রমিক’ একটি আইনি পরিচয়ের চেয়ে বেশি। এটি একটি মানবাধিকারভিত্তিক ধারণা। তাদের বিভিন্ন নীতিমালায় বলা হয়, যে কেউ শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে, সে কিছু মৌলিক অধিকার পাওয়ার যোগ্য। তার কাজ ফরমাল হোক বা ইনফরমাল, চুক্তিভিত্তিক হোক বা স্বনিযুক্ত—এই পার্থক্য তার অধিকারকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না।

জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষের কাজ করার, ন্যায্য ও অনুকূল কর্মপরিবেশের অধিকার এবং সমান কাজের জন্য সমান মজুরি পাওয়ার অধিকার আছে।

এই দৃষ্টিতে রফিক শুধু একজন পথের বিক্রেতা নয়; তিনি একজন শ্রমজীবী মানুষ, যার নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায্য আয়ের অধিকার রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন রূপটি দেখা যায় রাষ্ট্রের আইনে। বাংলাদেশে শ্রমিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ লেবার এ্যাক্ট ২০০৬। এই আইনে শ্রমিক বলতে বোঝানো হয়েছে, এমন একজন ব্যক্তিকে, যিনি কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিল্পে মজুরির বিনিময়ে শারীরিক, কারিগরি বা দাপ্তরিক কাজ করেন। সংজ্ঞাটি স্পষ্ট, কিন্তু একই সঙ্গে সীমাবদ্ধ। এখানে ‘প্রতিষ্ঠান’ এ কাজ করা একটি প্রধান শর্ত। ফলে যারা এই কাঠামোর বাইরে—যেমন রিকশাচালক, হকার, বা ফুচকা-ঝালমুড়িওয়ালা—তারা এই আইনের আওতায় পড়ে না।

এই আইনি সীমারেখার বাস্তব প্রভাব গভীর। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে কিছুটা হলেও সুরক্ষা পায়। কিন্তু রফিকের মতো একজন হকার কোনো ন্যূনতম মজুরির অধিকার রাখে না, অসুস্থ হলে তার আয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই, এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো কাঠামোও নেই। অর্থাৎ, তিনি কাজ করেন, কিন্তু আইন তাঁকে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।

তবে এই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দৃষ্টিতে ‘শ্রমিক’ কেবল একটি আইনি শব্দ নয়, বরং একটি বিস্তৃত সামাজিক বাস্তবতা। তারা মনে করে, যে কেউ নিজের শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে, সে শ্রমিক—তা সে কারখানায় কাজ করুক, মাঠে কাজ করুক, বা শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে পণ্য বিক্রি করুক। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রিকশাচালক, হকার, গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক—সবাই একই শ্রেণির অংশ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) দীর্ঘদিন ধরে ‘অল ওয়ার্কারস’ ধারণার মাধ্যমে ফরমাল ও ইনফরমাল উভয় ধরনের কর্মরত মানুষকে শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। বিশেষ করে আইএলওর ‘রিকমেন্ডেশন নম্বর ২০৪’-এ ইনফরমাল অর্থনীতিতে যুক্ত হকার, গৃহকর্মী, স্বনিযুক্ত কর্মী কিংবা কৃষিশ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি ও অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ভারতের সেলফ উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্টভাবে বলে—‘আমরা স্ব-নিযুক্ত কর্মী বা বেতনভুক্ত কর্মী—যাই হই না কেন, আমরা আসলে শ্রমিক। কারণ আমরা কাজ করি।’

এই পার্থক্যগুলো শুধু তাত্ত্বিক নয়, এগুলো সমাজের ভেতরে দুটি সমান্তরাল বাস্তবতা তৈরি করে। একদিকে রয়েছে সংগঠিত খাতের শ্রমিকরা, যারা আইনি স্বীকৃতি পায় এবং কিছু অধিকার ভোগ করে। অন্যদিকে রয়েছে বিশাল একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী, যারা প্রতিদিন কাজ করেও সংজ্ঞার কারণে ‘শ্রমিক’ হিসেবে গণ্য হয় না। তাদের শ্রম দৃশ্যমান, কিন্তু তাদের পরিচয় নয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত