রায়হান রাহিম

‘সোবার’ পেজটার সাথে আমার প্রথম পরিচয় তাদের ‘সুগারবেবি দীপ্তি সিরিজ’ এর থ্রুতে! সামাজিক অবক্ষয়ের নানা রকম আলামত তাদের পেজের মোটামুটি সকল কন্টেন্টে না চাইতেও উইঠা আসে। ফলে অল্প দিনেই আমি তাদের ফ্যান হয়ে যাই। আমি তাদের পডকাস্ট ‘লয় ভাগছে’ নিয়ে আবছা জানতাম, কিন্তু কোনোদিনও সেই সমন্ধে আমার আগ্রহ আসে নাই। কিন্তু কেন জানি না, যখন তারা তাদের পডকাস্টকে বই আকারে পাবলিশ করার ঘোষণা দিলো, সেই ডে ওয়ান থেকে আমি সোবার প্রেজেন্টস ‘লয় ভাগছে’ নিয়া তুমুল এক্সাইটেড হয়ে গেলাম।
এক্সাইটমেন্ট মস্তিষ্ককে ড্যাশ করে দেয়, প্লাস হরর আমার ফেভারিট জনরা। তাই, সেই ড্যাশ হওয়া মস্তিষ্কতেই বইটা অর্ডার দিয়া দিলাম এবং এক মহান বেহুশপতিবার মাঝরাত থেকে পরের দিন শুক্রবার সন্ধ্যার ভেতর বইটা পড়া শেষ করে ফেললাম।
বই পড়াকালীন ফেসবুকে একটা অ্যাস্থেটিক ছবি তুইলা স্টোরি দিছিলাম সোশ্যাল ক্যাপিটাল বাড়ানোর মতলবে। তখন অনেকেই আমারে জিগাইছেন, ‘মালটা কেমন হইল?’ যারা আসলেই ‘লয় ভাগছে’ কেমন হইল জানতে চান তাদের জন্য এই রিভিউটা লেখতেছি (মিথ্যা কথা! এই রিভিউ লেখার মূল উদ্দেশ্য টিমের প্রেশার। ট্রেন্ড ধরতে আমার টিম সেরা রে!) ।
এই রিভিউতে স্পয়লার আছে। স্পয়লার পাইলে যারা মারা যাওয়ার অ্যাক্টিং করেন তাদেরকে ভাসানীর টোনে আসসালামুআলাইকুম! আপনারা তাড়াতাড়ি চইলা যান! আর যারা অন্যের স্পয়লারে দিশাহারা হন না, নিজের এক্সপেরিয়েন্স দিয়াই সলিড ব্রেইনগাজম পাইতে চান—তারা থাকেন!

রিভিউয়ের শুরুতে একটা কথা বইলা রাখি! কোনো বই হাতে নেওয়ার পর আমি সবার আগে প্রোডাকশন কোয়ালিটি দেখি না, আমি কন্টেন্ট দেখি। কিন্তু যারা প্রোডাকশন কোয়ালিটি দেখেন, তারাও তো মানুষ! সো তাদের কথা চিন্তা কইরা ঠিক করলাম আগে প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়া আলাপ করব।
আফসার ব্রাদার্সের বইগুলার প্রিন্ট কোয়ালিটি, কাভার আর ইলাস্ট্রেশন মোটামুটি মজাই হয়। ‘লয় ভাগছে’র প্রোডাকশনও মজা হইছে। ভেতরের গল্পগুলোর সাথে মিল রাইখা মডার্ন ভাইবের হরর এলিমেন্টস দিয়া খুব ক্লিন আর স্লিক একটা কভার ডিজাইন করছেন প্রচ্ছদ শিল্পী আবরার আবীর। হরর বই হইলেও কভারে ‘সোবার’ এর সিগনেচার কালার প্যালেট আর ফন্ট ব্যবহার করার ডিসিশনটা ভালো ছিল।
আমার ধারণা সোবারের ফ্যানবেজও এ কারণেই সহজে বইটার সাথে কানেক্ট করতে পারছে। বইয়ের ভেতর তীব্র শীতের মিমখ্যাত শামসুল কাকার কার্টুন সম্বলিত একটা বুকমার্ক ছিল। আর দুইটা স্টিকারও পাইছি যার একটাতে লেখা ‘খা চান, দেখবেন লালো ভাগবে’ আর আরেকটাতে ‘পবিত্র বৃহস্পতিবার রাত’। দুইটাই বলা যায় পাঠকের সাথে সোবারের ইনসাইড জোক। এই জিনিসপাতি দেইখা সোবারের সাথে যারা পরিচিত না তারা যদি বলে ফেলেন ‘কোথায় হাসতে হবে আন্ডারলাইন করে দিলে ভালো হত’—তাহলে অবাক হবো না!
সোবারের এডমিনদের সবাই অ্যানোনিমাস। ফলে এই বইয়ের লেখকরাও সবাই অ্যানোনিমাস । প্রতিটা গল্পের শুরুতে সেই অ্যানোনিমাস লেখকদের লেখক পরিচয়ের পাশাপাশি একটা এআই ইলাস্ট্রেশন বসানো হইছে। ডক্টর এফ ও মাকসরে বলবো খ্যাৎ প্রম্পট ইউজ কইরা খারাপ এআই ইলাস্ট্রেশন না করলেই ভালো হইত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নামে এই আর্টিফিশিয়াল ‘আর্ট’ বইটার ন্যাচারাল ভাইবটাকে একটু হইলেও ডিস্টার্ব করে।
এর চেয়ে আপনারা নিকেতন থেকে ছাতার মাথা এজেন্সিতে বেতন না পাওয়া কিছু এমার্জিং গ্রাফিক্স শ্রমিক হায়ার করতে পারতেন। এজেন্সি এমনেই তাদের পয়সা মাইরা খায়। আই গেজ টাকা না দেওয়ার চেয়ে, কম টাকা দিয়া অন্তত এর চেয়ে ভালো ইলাস্ট্রেশন করতে পারতেন।
যাই হোক, আজাইরা বিষয়ে বহুত বকর বকর করলাম। এইবার ভেতরের কন্টেন্ট নিয়া একটু আলাপ করি।
অত্যন্ত বোরিং জ্ঞানের আলাপ লাগায় আমি ‘দ্য সোবার পডকাস্ট’ ২-৩ পেজ পইড়াই স্কিপ মারছি। অইখান থিকাই মোটামুটি আমার ডর শুরু হইয়া গেছিল। এত টাকা দিয়া বই কেনা হইল, লস হইয়া যাইব না তো আবার?

তবে এই ভয় প্রথম গল্প ‘অতিথি’ পড়ার পরই কাইটা যায়। দেশবরেণ্য ফিল্ম ডিরেক্টর ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লম্পট কাস্টিং কাউছারের বয়ানে এই গল্পটার মূল থিম ব্ল্যাক ম্যাজিক। আমার অবজারভেশনে, ইউরোপিয়ান ব্ল্যাক ম্যাজিক আর বাংলাদেশি ব্ল্যাক ম্যাজিকের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যটা মূলত মেথড অ্যান্ড টুলস আর অবজেক্টিভসের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। কিন্তু এই গল্পটা পড়ার সময় খেয়াল করলাম মেথড অ্যান্ড টুলসের ক্ষেত্রে গ্লোবালি ডিল করা হইলেও কালো জাদুর অবজেক্টিভ পিওর বাংলাদেশি কন্টেক্সটে হাজির আছে। এবং এই দুইটা জিনিসকে এতো চমৎকারভাবে ব্লেন্ড করা হইছে যে লিটারেলি গল্পটা পড়ার পর কুত্তা, যেখানে সেখানে পইড়া থাকা মাথার চুল নিয়া আমি টানা দুইদিন আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম।
একটা হরর গল্পের মূল শত্রু তার প্রেডিক্টিবিলিটি। কিন্তু অতিথি পড়ার পর আমার প্রেডিক্টিবিলিটি বারবার ধ্বইসা পইড়া যাচ্ছিল। আমি যেটারে এন্ডিং ভাবতেছিলাম সেইটাই টুইস্ট হইয়া গল্পের নতুন রাস্তা তৈরি কইরা দিতেছিল, যা গল্পটার আলাদা একটা ডায়মেনশন খাড়া করতেছিল বারবার। এই লিনিয়ার থেকে মাল্টি ডায়মেনশনাল হরর জার্নির এন্ডিং পয়েন্টে আমার এন্টাগনিস্ট শেফালী ফুফু আর হাসনা বানুর ফেইটের জন্য খারাপ লাগে।
বইয়ের ওপেনিংয়েই এই রকম একটা গল্প রাখা আই গেজ এডিটর ডক্টর এফ ও মাকসের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেস্ট ডিসিশন।
পরের গল্পটার নাম ‘মাছি’। মাছি ডক্টর এফের গল্প। সাইকোলজিক্যাল হরর, বডি হরর, গ্রোটেস্ক আর সেন্সরি হররের দারুণ কম্বিনেশনের এই গল্পটা দারুণ এক রুরাল গথিক অ্যাম্বিয়েন্স ক্রিয়েট করছিল।
ডক্টর এফ, তার তরুণ বয়সের রক্ত গরম কন্ডিশনে, ভালোবাসা দিয়া এক গ্রামের হাসপাতালকে ভালো করে ফেলবেন ভেবেছিলেন। সেই হাসপাতালে রোগী আসতে চায় না। কারণ এখানে ভর্তি হলে কেউ বাঁচে না। কেন এইটা হয়, কীভাবে হয়—তারই এক্সপেরিয়েন্স গল্পটাতে তুইলা আনছেন ডক্টর এফ।
এই গল্পটা পড়ার পর হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলীর কথা মনে হইতেছিল। সাধারণত মিসির আলীর কাছে এইরকম সেটআপের গল্পগুলা আসলে উনি একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করায় ফেলতেন।
এরপরের গল্পের নাম ‘বিকৃত’। বিকৃত গল্পটার ন্যারেটর মাইশা কমিটির সভাপতি ওরফে মাকস। বিকৃত পড়ার পর আমার খালি একটা জিনিসই মনে হইছে। সেটা হইলো: কখনোই নেশা হলুদে গায়ে করবেন না! কারণ নেশা মস্তিষ্ককে বিকৃত করে দেয়। তারপর আপনি উল্টাপাল্টা জিনিস দেখেন। সেগুলা আবার এক্সাজেরেট করে গল্প ফাঁদেন।
বিকৃতর মতো বাজে গল্প পড়ার পর যে গল্পটা আসে তার নাম ‘মশারি’। মশারি জিনিসটা ছোটবেলা থিকাই আমার কাছে খুবই ব্যাডবাজ লাগে। মশারির ভেতর ঘুমাইতে গেলেই আমার দমবন্ধ হইয়া আসে। তাই সুজলা সুফলা মশা শ্যামলা এই বাংলাদেশে পিক ডেঙ্গু সিজনেও মশারি ছাড়া ঘুমানোর দায়ে আমাকে পরিবার পরিজনের হাতে হররোজ নানা রকম বুলিংয়ের শিকার হইতে হয়।
তো এইখানে ‘মশারি’ নামে যে গল্পটা আছে সেইটা ডক্টর এফের বয়ানের একটা গল্প যা তার ছোট ফুপির জীবনের একটা কাহিনী। ছোট ফুপা বিদেশে চলে যাওয়ার রাতে জ্বরে কাবু ফুপি মশারির ভেতর মেয়েকে নিয়ে শুয়ে আছেন। মাঝরাতে হঠাৎ দেখেন ঘরের কোণে অন্ধকার থেকে ফুপা দাঁড়িয়ে ডাকছেন— ‘মশারি খুলে দাও, আমি আসবো। বাচ্চাটাকে আমার কোলে দাও। আমার হাতে এত সময় নাই।’
সেই হরর ইন্সিডেন্টকে ডক্টর এফ তার ফুপির পোস্ট পার্টাম সাইকোসিস হিসেবে চিহ্নিত করেন। তখন আগের পুরা ঘটনাটাই হালকা লাগতে থাকে। এই ঘটনার কিছুদিন পর ফুপিরা দেশ ছেড়ে চলে যান। কিন্তু ঘটনা সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। ফুপির সেই ছোট্ট মেয়ে মারিয়া বারো বছর পর দেশে আসে। দেশে আসার পর এক রাতে এক দুঃস্বপ্ন দেখে সারারাত ঘুমাতে পারে না। সে দেখে যে মশারির ভেতর সে ঘুমাচ্ছিল, সেই মশারির বাইরে থেকে একটা ছায়া তাকে মশারি খুলে দিতে বলছে, তার সাথে যাবার জন্য ডাকছে।
কিছু ট্রমা যে আসলে জেনারেশনাল, আর সেই ট্রমার হরর স্টোরিটেলিং যে একটা নরমাল গল্পরেও নেক্সট লেভেলে নিয়া যাইতে পারে, ‘মশারি’ তারই উদাহরণ।
মশারি’র ছায়া থিকা বের হয়ে যখন ‘খুলনার খুন’ গল্পে ঢুকলাম, তখন মনে হইলো ভয়ের ডাইমেনশনটাই পাল্টায় গেল। এটা পিওরলি একটা খুনের গল্প, কিন্তু মাকস এখানে ভয়ের উৎস হিসেবে কোনো ভূতরে না আইনা হাজির করছেন মানুষের ভেতরের পশুত্বরে। আরবান হরর ধাঁচের এই গল্পটা ঠিক জমে নাই, কিন্তু একটা মরবিড কিওরিওসিটি রাইখা গেছে। এই গল্প পড়ার পর নতুন ভাড়াটিয়া নিয়া আপনার একটু অস্বস্তি লাগতে পারে জাস্ট এট্টুকই বইলা রাখলাম!
খুলনার খুনের জাগতিক বিভৎসতা ডিল করার পর যে গল্পটা পড়লাম তার নাম ‘বাসা-বাড়ির গল্প’। হিস্ট্রিক্যাল হরর আর আরবান গথিকের ব্লেন্ডে ডক্টর এফ সেভেন্টি ওয়ানের ন্যাশনাল ট্রমারে খুচায়া বাইর কইরা আনতে ট্রাই করছেন এই গল্পে। ভার্সিটিতে উইঠা ‘পল্টারজিস্ট’ নামের একটা মুভি দেখছিলাম। ‘বাসা বাড়ির গল্প’ এর কনসেপ্টের সাথে এই মুভির ক্ল্যাসিক ‘বডিজ আন্ডার দ্য হাউস’ থিমের কিছুটা মিল আছে।
এরপরের গল্পের নাম ‘আবর্জনা’। আরবান হরর ধাঁচের এই গল্পে ময়লা খাওয়ার আবদার করা এক অদ্ভুতুড়ে লোক মাকসের বন্ধু রাসেলের স্বপ্নে এসে তার বাসায় ঢুকতে চায়। মাকসের ‘আবর্জনা’ গল্পটা পড়ার সময় একটা জায়গায় আইসা আমার খটকা লাগল। আমরা যেটারে হরর ভাবতেছি, সেইটা কি আসলে আমাদের সোসাইটির ব্রুটাল রিয়েলিটি না? আমাদের আশেপাশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা ক্ষুধার জ্বালায় ডাস্টবিনের আবর্জনা ঘেঁটে খাবার খোঁজে। আমরা প্রতিদিন তাদের ইগনোর করি, এড়ায় চলি। মাকস এখানে সেই ময়লার মানুষগুলারেই একটা ভৌতিক অবয়ব দিয়া আমাদের দরজায় এনে দাঁড় করায় দিছেন। ‘আবর্জনা’ মাকস থিকা আসা এই বইয়ের প্রথম গল্প যেইটা আমার অনেক ভাল্লাগছে।
পরের গল্পের নাম ‘জানালা’। সাইকোলজিক্যাল হরর আর প্যারানরমাল এক্টিভিটিজের ব্লেন্ডিংয়ে গা ছমছমে ডোপলগেঙ্গার আতঙ্কের এই গল্পটাতে ডক্টর এফ ভালোই একটা আনক্যানি ভাইব তৈরি করেছেন। ভূমিকম্পের মতো ন্যাচারাল ডিজেস্টারকে অলৌকিক ঘটনার প্যারালালে সাজানো এবং সেইটার চমৎকার ভিজুয়াল ডেসক্রিপশন আমার কাছে অনেক ব্রিলিয়ান্ট এফোর্ট মনে হইছে। এমন একটা ক্লস্ট্রোফোবিক সিচুয়েশনরে বডি হরর দিয়া শেষ করাটা সত্যি কথা বলতে অনেকটা ‘একের ভেতর অনেক’ ফিলিংস আইনা দিছিল।
কখনো কখনো প্রিয় মানুষরে হারায় ফেলাটাও হরর হইয়া উঠে। মাকসের মেটাফিজিক্যাল গল্প ‘আম্মু’ পড়ার পর আমার এইটাই মাথায় আসতেছিল। ‘আম্মু’ পড়ার পর মনে হইতেছিল আমাদের সাব কনশাস মন মাঝেমধ্যে এমন সব ডাইমেনশনে চইলা যাইতে পারে যা সবসময় লজিক দিয়া এক্সপ্লেইন করা অসম্ভব। গল্পটা শেষ কইরা ভাবতেছিলাম আমরা যা দেখি বা জানি, তার বাইরে কি আমাদের প্রিয়জনেরা অন্য কোথাও আমাদের জন্য ওয়েট করতে থাকে?
এই গল্পটা বইয়ের অন্য সব গল্পের তুলনায় একেবারেই আলাদা। কোনো সস্তা জাম্পস্কেয়ার নাই, খালি গভীর বিষণ্ণতা আর অলৌকিকত্বের সুইট এক মেলবন্ধন। আমরা যারা মা হারাইছি এই গল্পটা আমাদের ভেতর এক ধরণের মর্বিড স্যাটিসফেকশন তৈরি করার ক্ষমতা রাখে।

পরের গল্পের নাম ‘সিনার মাংস’। সিনার মাংস গল্পটা কাউন্ট শাইলক বিন ওয়ালিদের। ঘুল নামের একটা লাশখেকো জ্বিনের গল্প এটা, যেখানে স্লাইটলি মাজার ভাঙ্গার ইস্যুটা এন্ডোর্স করা হইছে। গল্পে প্রচুর জাম্প স্কেয়ার আর বডি হরর আছে, আছে ক্যানিবালিজমের এঙ্গেলও। গল্পের এন্ডিং প্রেডিক্টেবল আর ওভার এক্সাজেরেটেড। এই গল্পটা আমার খুব একটা ভাল্লাগেনাই। যারা অলৌকিকতার নামে জাম্প স্কেয়ার পছন্দ করেন তাদের ভাল্লাগতে পারে।
তবে এই বইয়ের এর পরের গল্পটা আমার আরেকটা পছন্দের গল্প, যার নাম ‘কমিউনিজমের ভূত!’ গল্পের লেখক ফটিক শাহ।

তো কমিউনিজমের ভূত গল্পটা ভাল্লাগার কয়েকটা কারণ আছে। ‘ভয়ংকর সুন্দর’ নামে একটা টার্ম আছে। সিলেটের ভয়ংকর সৌন্দর্য কী জিনিস এইটা একজন সিলেটি হিসেবে আমি এই গল্পে খুবই চমৎকারভাবে রিলেট করতে পেরেছি। অনিন্দ্য সুন্দর কোনো স্পেসে হরর ফিলিংস যে কী পরিমাণ হিট করে, আরি এস্টারের ‘মিডসমার’ যারা দেখছেন তাদের বোঝার কথা।
প্রকৃতি যেখানে রাজত্ব করে, সেখানে লিমিনাল স্পেস হররের ভয়াবহতা হিউম্যান এন্টিটিকে এত ক্ষুদ্র বানায় ফেলে যে, এই ক্ষুদ্রতা ইটসেলফ একটা চাপের জায়গা হয়ে উঠে। কিন্তু এই চাপযুক্ত মেজোফোবিয়ার সাথে যখন ফোক হররকে ব্লেন্ড করা হয় আর তার সাথে ড্রাগসের কানেকশনের সম্ভাবনা ওপেন থাকে তখন জিনিসটা ঠিক আর হরর থাকে না। একটা সাইকোলজিক্যাল ঘটনা হয়ে উঠে। এই সাইকোলজিক্যাল ঘটনাটা এই গল্পে ফটিক শাহ খুবই ন্যাচারাল ওয়েতে তুইলা আনতে পারছেন।

পরের গল্প বয়াতি বাবরের ‘দেখেন দিয়া মন’। ‘লেবার হরর’ নামে একটা সাব জনরা আছে। এই সাব জনরার ঘটনা খুবই সিম্পল। ক্যাপিলাটিস্ট এক্সপ্লয়টেশনের কারণে যদি কোনো কারখানায় শ্রমিক খুন হয়, তবে সেই শ্রমিকের আত্মারা সেই মারা যাওয়ার স্পেসেই আটকায় থাকে। দেখেন দিয়া মন অনেকটা এই রকমই একটা গল্প। একটা মজার বিষয় খেয়াল করলাম, এই গল্পের ভূতেরা জানে মাইরা ফেলে না। শুধু ডর দেখায়। শ্রমিক ভূত হইলেও যে তারে শ্রমিকই থাকতে হয় এই গল্প পড়ার পর আমার প্রাইম রিয়েলাইজেশন!
বহুত আলাপ কইরা ফালাইলাম। আর বেশি কথাও নাই বলার, কারণ এখন এই বইয়ের লাস্ট গল্পটা নিয়া কথা বলব। লাস্ট গল্পটা লেখা হইছে মাকস এবং ডক্টর এফ এর বয়ানে। একটা পেইন্টিং নিয়া দুইজনের আলাদা আলাদা বয়ান। যে পেইন্টিংটা নিয়া গল্পটা বলা হইছে সেই পেইন্টিংটাতে কেউ যা দেখতে চায়, সে নাকি তাই দেখে। হোয়াট ইফ, কেউ যা না দেখতে চায় সে তা দেখছে?
সাইকোলজিক্যাল হরর বলতে পারতাম এই গল্পটাকে। কিন্তু দুজন ব্যক্তি যখন আলাদা আলাদাভাবে একই ফিলের মধ্য দিয়ে যায় তবে এটাকে এইভাবে সাইকোলজিক্যাল হররের ট্যাগ দেওয়া কি ঠিক হবে? সম্ভবত না!
তো সব মিলায়ে, আমার কাছে ‘লয় ভাগছে’ রিসেন্ট টাইমের খুবই ইম্পোর্ট্যান্ট একটা হরর ফিকশন মনে হইছে আসলে। গতানুগতিক হরর ফিকশনের মতো মনোটোনাস স্টোরিটেলিং না থাকার কারণে, টিপিক্যাল কলিকাতাই ঢংয়ে ভয়কে আনলীশ না করার মুনশিয়ানায় এবং অনেক ধরণের হরর এক্সপেরিয়ান্সকে এন্ডোর্স করার জন্য এই বইটা আমি হরর পাগলুদের রেকমেন্ড করছি।
একবার পইড়াই দেখেন, যদি ভূত মানেই অন্ধকার আর বদ্ধ ঘর না ভাবেন, তবে লয় আসলেই ভাগতে পারে।

‘সোবার’ পেজটার সাথে আমার প্রথম পরিচয় তাদের ‘সুগারবেবি দীপ্তি সিরিজ’ এর থ্রুতে! সামাজিক অবক্ষয়ের নানা রকম আলামত তাদের পেজের মোটামুটি সকল কন্টেন্টে না চাইতেও উইঠা আসে। ফলে অল্প দিনেই আমি তাদের ফ্যান হয়ে যাই। আমি তাদের পডকাস্ট ‘লয় ভাগছে’ নিয়ে আবছা জানতাম, কিন্তু কোনোদিনও সেই সমন্ধে আমার আগ্রহ আসে নাই। কিন্তু কেন জানি না, যখন তারা তাদের পডকাস্টকে বই আকারে পাবলিশ করার ঘোষণা দিলো, সেই ডে ওয়ান থেকে আমি সোবার প্রেজেন্টস ‘লয় ভাগছে’ নিয়া তুমুল এক্সাইটেড হয়ে গেলাম।
এক্সাইটমেন্ট মস্তিষ্ককে ড্যাশ করে দেয়, প্লাস হরর আমার ফেভারিট জনরা। তাই, সেই ড্যাশ হওয়া মস্তিষ্কতেই বইটা অর্ডার দিয়া দিলাম এবং এক মহান বেহুশপতিবার মাঝরাত থেকে পরের দিন শুক্রবার সন্ধ্যার ভেতর বইটা পড়া শেষ করে ফেললাম।
বই পড়াকালীন ফেসবুকে একটা অ্যাস্থেটিক ছবি তুইলা স্টোরি দিছিলাম সোশ্যাল ক্যাপিটাল বাড়ানোর মতলবে। তখন অনেকেই আমারে জিগাইছেন, ‘মালটা কেমন হইল?’ যারা আসলেই ‘লয় ভাগছে’ কেমন হইল জানতে চান তাদের জন্য এই রিভিউটা লেখতেছি (মিথ্যা কথা! এই রিভিউ লেখার মূল উদ্দেশ্য টিমের প্রেশার। ট্রেন্ড ধরতে আমার টিম সেরা রে!) ।
এই রিভিউতে স্পয়লার আছে। স্পয়লার পাইলে যারা মারা যাওয়ার অ্যাক্টিং করেন তাদেরকে ভাসানীর টোনে আসসালামুআলাইকুম! আপনারা তাড়াতাড়ি চইলা যান! আর যারা অন্যের স্পয়লারে দিশাহারা হন না, নিজের এক্সপেরিয়েন্স দিয়াই সলিড ব্রেইনগাজম পাইতে চান—তারা থাকেন!

রিভিউয়ের শুরুতে একটা কথা বইলা রাখি! কোনো বই হাতে নেওয়ার পর আমি সবার আগে প্রোডাকশন কোয়ালিটি দেখি না, আমি কন্টেন্ট দেখি। কিন্তু যারা প্রোডাকশন কোয়ালিটি দেখেন, তারাও তো মানুষ! সো তাদের কথা চিন্তা কইরা ঠিক করলাম আগে প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়া আলাপ করব।
আফসার ব্রাদার্সের বইগুলার প্রিন্ট কোয়ালিটি, কাভার আর ইলাস্ট্রেশন মোটামুটি মজাই হয়। ‘লয় ভাগছে’র প্রোডাকশনও মজা হইছে। ভেতরের গল্পগুলোর সাথে মিল রাইখা মডার্ন ভাইবের হরর এলিমেন্টস দিয়া খুব ক্লিন আর স্লিক একটা কভার ডিজাইন করছেন প্রচ্ছদ শিল্পী আবরার আবীর। হরর বই হইলেও কভারে ‘সোবার’ এর সিগনেচার কালার প্যালেট আর ফন্ট ব্যবহার করার ডিসিশনটা ভালো ছিল।
আমার ধারণা সোবারের ফ্যানবেজও এ কারণেই সহজে বইটার সাথে কানেক্ট করতে পারছে। বইয়ের ভেতর তীব্র শীতের মিমখ্যাত শামসুল কাকার কার্টুন সম্বলিত একটা বুকমার্ক ছিল। আর দুইটা স্টিকারও পাইছি যার একটাতে লেখা ‘খা চান, দেখবেন লালো ভাগবে’ আর আরেকটাতে ‘পবিত্র বৃহস্পতিবার রাত’। দুইটাই বলা যায় পাঠকের সাথে সোবারের ইনসাইড জোক। এই জিনিসপাতি দেইখা সোবারের সাথে যারা পরিচিত না তারা যদি বলে ফেলেন ‘কোথায় হাসতে হবে আন্ডারলাইন করে দিলে ভালো হত’—তাহলে অবাক হবো না!
সোবারের এডমিনদের সবাই অ্যানোনিমাস। ফলে এই বইয়ের লেখকরাও সবাই অ্যানোনিমাস । প্রতিটা গল্পের শুরুতে সেই অ্যানোনিমাস লেখকদের লেখক পরিচয়ের পাশাপাশি একটা এআই ইলাস্ট্রেশন বসানো হইছে। ডক্টর এফ ও মাকসরে বলবো খ্যাৎ প্রম্পট ইউজ কইরা খারাপ এআই ইলাস্ট্রেশন না করলেই ভালো হইত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নামে এই আর্টিফিশিয়াল ‘আর্ট’ বইটার ন্যাচারাল ভাইবটাকে একটু হইলেও ডিস্টার্ব করে।
এর চেয়ে আপনারা নিকেতন থেকে ছাতার মাথা এজেন্সিতে বেতন না পাওয়া কিছু এমার্জিং গ্রাফিক্স শ্রমিক হায়ার করতে পারতেন। এজেন্সি এমনেই তাদের পয়সা মাইরা খায়। আই গেজ টাকা না দেওয়ার চেয়ে, কম টাকা দিয়া অন্তত এর চেয়ে ভালো ইলাস্ট্রেশন করতে পারতেন।
যাই হোক, আজাইরা বিষয়ে বহুত বকর বকর করলাম। এইবার ভেতরের কন্টেন্ট নিয়া একটু আলাপ করি।
অত্যন্ত বোরিং জ্ঞানের আলাপ লাগায় আমি ‘দ্য সোবার পডকাস্ট’ ২-৩ পেজ পইড়াই স্কিপ মারছি। অইখান থিকাই মোটামুটি আমার ডর শুরু হইয়া গেছিল। এত টাকা দিয়া বই কেনা হইল, লস হইয়া যাইব না তো আবার?

তবে এই ভয় প্রথম গল্প ‘অতিথি’ পড়ার পরই কাইটা যায়। দেশবরেণ্য ফিল্ম ডিরেক্টর ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লম্পট কাস্টিং কাউছারের বয়ানে এই গল্পটার মূল থিম ব্ল্যাক ম্যাজিক। আমার অবজারভেশনে, ইউরোপিয়ান ব্ল্যাক ম্যাজিক আর বাংলাদেশি ব্ল্যাক ম্যাজিকের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যটা মূলত মেথড অ্যান্ড টুলস আর অবজেক্টিভসের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। কিন্তু এই গল্পটা পড়ার সময় খেয়াল করলাম মেথড অ্যান্ড টুলসের ক্ষেত্রে গ্লোবালি ডিল করা হইলেও কালো জাদুর অবজেক্টিভ পিওর বাংলাদেশি কন্টেক্সটে হাজির আছে। এবং এই দুইটা জিনিসকে এতো চমৎকারভাবে ব্লেন্ড করা হইছে যে লিটারেলি গল্পটা পড়ার পর কুত্তা, যেখানে সেখানে পইড়া থাকা মাথার চুল নিয়া আমি টানা দুইদিন আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম।
একটা হরর গল্পের মূল শত্রু তার প্রেডিক্টিবিলিটি। কিন্তু অতিথি পড়ার পর আমার প্রেডিক্টিবিলিটি বারবার ধ্বইসা পইড়া যাচ্ছিল। আমি যেটারে এন্ডিং ভাবতেছিলাম সেইটাই টুইস্ট হইয়া গল্পের নতুন রাস্তা তৈরি কইরা দিতেছিল, যা গল্পটার আলাদা একটা ডায়মেনশন খাড়া করতেছিল বারবার। এই লিনিয়ার থেকে মাল্টি ডায়মেনশনাল হরর জার্নির এন্ডিং পয়েন্টে আমার এন্টাগনিস্ট শেফালী ফুফু আর হাসনা বানুর ফেইটের জন্য খারাপ লাগে।
বইয়ের ওপেনিংয়েই এই রকম একটা গল্প রাখা আই গেজ এডিটর ডক্টর এফ ও মাকসের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেস্ট ডিসিশন।
পরের গল্পটার নাম ‘মাছি’। মাছি ডক্টর এফের গল্প। সাইকোলজিক্যাল হরর, বডি হরর, গ্রোটেস্ক আর সেন্সরি হররের দারুণ কম্বিনেশনের এই গল্পটা দারুণ এক রুরাল গথিক অ্যাম্বিয়েন্স ক্রিয়েট করছিল।
ডক্টর এফ, তার তরুণ বয়সের রক্ত গরম কন্ডিশনে, ভালোবাসা দিয়া এক গ্রামের হাসপাতালকে ভালো করে ফেলবেন ভেবেছিলেন। সেই হাসপাতালে রোগী আসতে চায় না। কারণ এখানে ভর্তি হলে কেউ বাঁচে না। কেন এইটা হয়, কীভাবে হয়—তারই এক্সপেরিয়েন্স গল্পটাতে তুইলা আনছেন ডক্টর এফ।
এই গল্পটা পড়ার পর হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলীর কথা মনে হইতেছিল। সাধারণত মিসির আলীর কাছে এইরকম সেটআপের গল্পগুলা আসলে উনি একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করায় ফেলতেন।
এরপরের গল্পের নাম ‘বিকৃত’। বিকৃত গল্পটার ন্যারেটর মাইশা কমিটির সভাপতি ওরফে মাকস। বিকৃত পড়ার পর আমার খালি একটা জিনিসই মনে হইছে। সেটা হইলো: কখনোই নেশা হলুদে গায়ে করবেন না! কারণ নেশা মস্তিষ্ককে বিকৃত করে দেয়। তারপর আপনি উল্টাপাল্টা জিনিস দেখেন। সেগুলা আবার এক্সাজেরেট করে গল্প ফাঁদেন।
বিকৃতর মতো বাজে গল্প পড়ার পর যে গল্পটা আসে তার নাম ‘মশারি’। মশারি জিনিসটা ছোটবেলা থিকাই আমার কাছে খুবই ব্যাডবাজ লাগে। মশারির ভেতর ঘুমাইতে গেলেই আমার দমবন্ধ হইয়া আসে। তাই সুজলা সুফলা মশা শ্যামলা এই বাংলাদেশে পিক ডেঙ্গু সিজনেও মশারি ছাড়া ঘুমানোর দায়ে আমাকে পরিবার পরিজনের হাতে হররোজ নানা রকম বুলিংয়ের শিকার হইতে হয়।
তো এইখানে ‘মশারি’ নামে যে গল্পটা আছে সেইটা ডক্টর এফের বয়ানের একটা গল্প যা তার ছোট ফুপির জীবনের একটা কাহিনী। ছোট ফুপা বিদেশে চলে যাওয়ার রাতে জ্বরে কাবু ফুপি মশারির ভেতর মেয়েকে নিয়ে শুয়ে আছেন। মাঝরাতে হঠাৎ দেখেন ঘরের কোণে অন্ধকার থেকে ফুপা দাঁড়িয়ে ডাকছেন— ‘মশারি খুলে দাও, আমি আসবো। বাচ্চাটাকে আমার কোলে দাও। আমার হাতে এত সময় নাই।’
সেই হরর ইন্সিডেন্টকে ডক্টর এফ তার ফুপির পোস্ট পার্টাম সাইকোসিস হিসেবে চিহ্নিত করেন। তখন আগের পুরা ঘটনাটাই হালকা লাগতে থাকে। এই ঘটনার কিছুদিন পর ফুপিরা দেশ ছেড়ে চলে যান। কিন্তু ঘটনা সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। ফুপির সেই ছোট্ট মেয়ে মারিয়া বারো বছর পর দেশে আসে। দেশে আসার পর এক রাতে এক দুঃস্বপ্ন দেখে সারারাত ঘুমাতে পারে না। সে দেখে যে মশারির ভেতর সে ঘুমাচ্ছিল, সেই মশারির বাইরে থেকে একটা ছায়া তাকে মশারি খুলে দিতে বলছে, তার সাথে যাবার জন্য ডাকছে।
কিছু ট্রমা যে আসলে জেনারেশনাল, আর সেই ট্রমার হরর স্টোরিটেলিং যে একটা নরমাল গল্পরেও নেক্সট লেভেলে নিয়া যাইতে পারে, ‘মশারি’ তারই উদাহরণ।
মশারি’র ছায়া থিকা বের হয়ে যখন ‘খুলনার খুন’ গল্পে ঢুকলাম, তখন মনে হইলো ভয়ের ডাইমেনশনটাই পাল্টায় গেল। এটা পিওরলি একটা খুনের গল্প, কিন্তু মাকস এখানে ভয়ের উৎস হিসেবে কোনো ভূতরে না আইনা হাজির করছেন মানুষের ভেতরের পশুত্বরে। আরবান হরর ধাঁচের এই গল্পটা ঠিক জমে নাই, কিন্তু একটা মরবিড কিওরিওসিটি রাইখা গেছে। এই গল্প পড়ার পর নতুন ভাড়াটিয়া নিয়া আপনার একটু অস্বস্তি লাগতে পারে জাস্ট এট্টুকই বইলা রাখলাম!
খুলনার খুনের জাগতিক বিভৎসতা ডিল করার পর যে গল্পটা পড়লাম তার নাম ‘বাসা-বাড়ির গল্প’। হিস্ট্রিক্যাল হরর আর আরবান গথিকের ব্লেন্ডে ডক্টর এফ সেভেন্টি ওয়ানের ন্যাশনাল ট্রমারে খুচায়া বাইর কইরা আনতে ট্রাই করছেন এই গল্পে। ভার্সিটিতে উইঠা ‘পল্টারজিস্ট’ নামের একটা মুভি দেখছিলাম। ‘বাসা বাড়ির গল্প’ এর কনসেপ্টের সাথে এই মুভির ক্ল্যাসিক ‘বডিজ আন্ডার দ্য হাউস’ থিমের কিছুটা মিল আছে।
এরপরের গল্পের নাম ‘আবর্জনা’। আরবান হরর ধাঁচের এই গল্পে ময়লা খাওয়ার আবদার করা এক অদ্ভুতুড়ে লোক মাকসের বন্ধু রাসেলের স্বপ্নে এসে তার বাসায় ঢুকতে চায়। মাকসের ‘আবর্জনা’ গল্পটা পড়ার সময় একটা জায়গায় আইসা আমার খটকা লাগল। আমরা যেটারে হরর ভাবতেছি, সেইটা কি আসলে আমাদের সোসাইটির ব্রুটাল রিয়েলিটি না? আমাদের আশেপাশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা ক্ষুধার জ্বালায় ডাস্টবিনের আবর্জনা ঘেঁটে খাবার খোঁজে। আমরা প্রতিদিন তাদের ইগনোর করি, এড়ায় চলি। মাকস এখানে সেই ময়লার মানুষগুলারেই একটা ভৌতিক অবয়ব দিয়া আমাদের দরজায় এনে দাঁড় করায় দিছেন। ‘আবর্জনা’ মাকস থিকা আসা এই বইয়ের প্রথম গল্প যেইটা আমার অনেক ভাল্লাগছে।
পরের গল্পের নাম ‘জানালা’। সাইকোলজিক্যাল হরর আর প্যারানরমাল এক্টিভিটিজের ব্লেন্ডিংয়ে গা ছমছমে ডোপলগেঙ্গার আতঙ্কের এই গল্পটাতে ডক্টর এফ ভালোই একটা আনক্যানি ভাইব তৈরি করেছেন। ভূমিকম্পের মতো ন্যাচারাল ডিজেস্টারকে অলৌকিক ঘটনার প্যারালালে সাজানো এবং সেইটার চমৎকার ভিজুয়াল ডেসক্রিপশন আমার কাছে অনেক ব্রিলিয়ান্ট এফোর্ট মনে হইছে। এমন একটা ক্লস্ট্রোফোবিক সিচুয়েশনরে বডি হরর দিয়া শেষ করাটা সত্যি কথা বলতে অনেকটা ‘একের ভেতর অনেক’ ফিলিংস আইনা দিছিল।
কখনো কখনো প্রিয় মানুষরে হারায় ফেলাটাও হরর হইয়া উঠে। মাকসের মেটাফিজিক্যাল গল্প ‘আম্মু’ পড়ার পর আমার এইটাই মাথায় আসতেছিল। ‘আম্মু’ পড়ার পর মনে হইতেছিল আমাদের সাব কনশাস মন মাঝেমধ্যে এমন সব ডাইমেনশনে চইলা যাইতে পারে যা সবসময় লজিক দিয়া এক্সপ্লেইন করা অসম্ভব। গল্পটা শেষ কইরা ভাবতেছিলাম আমরা যা দেখি বা জানি, তার বাইরে কি আমাদের প্রিয়জনেরা অন্য কোথাও আমাদের জন্য ওয়েট করতে থাকে?
এই গল্পটা বইয়ের অন্য সব গল্পের তুলনায় একেবারেই আলাদা। কোনো সস্তা জাম্পস্কেয়ার নাই, খালি গভীর বিষণ্ণতা আর অলৌকিকত্বের সুইট এক মেলবন্ধন। আমরা যারা মা হারাইছি এই গল্পটা আমাদের ভেতর এক ধরণের মর্বিড স্যাটিসফেকশন তৈরি করার ক্ষমতা রাখে।

পরের গল্পের নাম ‘সিনার মাংস’। সিনার মাংস গল্পটা কাউন্ট শাইলক বিন ওয়ালিদের। ঘুল নামের একটা লাশখেকো জ্বিনের গল্প এটা, যেখানে স্লাইটলি মাজার ভাঙ্গার ইস্যুটা এন্ডোর্স করা হইছে। গল্পে প্রচুর জাম্প স্কেয়ার আর বডি হরর আছে, আছে ক্যানিবালিজমের এঙ্গেলও। গল্পের এন্ডিং প্রেডিক্টেবল আর ওভার এক্সাজেরেটেড। এই গল্পটা আমার খুব একটা ভাল্লাগেনাই। যারা অলৌকিকতার নামে জাম্প স্কেয়ার পছন্দ করেন তাদের ভাল্লাগতে পারে।
তবে এই বইয়ের এর পরের গল্পটা আমার আরেকটা পছন্দের গল্প, যার নাম ‘কমিউনিজমের ভূত!’ গল্পের লেখক ফটিক শাহ।

তো কমিউনিজমের ভূত গল্পটা ভাল্লাগার কয়েকটা কারণ আছে। ‘ভয়ংকর সুন্দর’ নামে একটা টার্ম আছে। সিলেটের ভয়ংকর সৌন্দর্য কী জিনিস এইটা একজন সিলেটি হিসেবে আমি এই গল্পে খুবই চমৎকারভাবে রিলেট করতে পেরেছি। অনিন্দ্য সুন্দর কোনো স্পেসে হরর ফিলিংস যে কী পরিমাণ হিট করে, আরি এস্টারের ‘মিডসমার’ যারা দেখছেন তাদের বোঝার কথা।
প্রকৃতি যেখানে রাজত্ব করে, সেখানে লিমিনাল স্পেস হররের ভয়াবহতা হিউম্যান এন্টিটিকে এত ক্ষুদ্র বানায় ফেলে যে, এই ক্ষুদ্রতা ইটসেলফ একটা চাপের জায়গা হয়ে উঠে। কিন্তু এই চাপযুক্ত মেজোফোবিয়ার সাথে যখন ফোক হররকে ব্লেন্ড করা হয় আর তার সাথে ড্রাগসের কানেকশনের সম্ভাবনা ওপেন থাকে তখন জিনিসটা ঠিক আর হরর থাকে না। একটা সাইকোলজিক্যাল ঘটনা হয়ে উঠে। এই সাইকোলজিক্যাল ঘটনাটা এই গল্পে ফটিক শাহ খুবই ন্যাচারাল ওয়েতে তুইলা আনতে পারছেন।

পরের গল্প বয়াতি বাবরের ‘দেখেন দিয়া মন’। ‘লেবার হরর’ নামে একটা সাব জনরা আছে। এই সাব জনরার ঘটনা খুবই সিম্পল। ক্যাপিলাটিস্ট এক্সপ্লয়টেশনের কারণে যদি কোনো কারখানায় শ্রমিক খুন হয়, তবে সেই শ্রমিকের আত্মারা সেই মারা যাওয়ার স্পেসেই আটকায় থাকে। দেখেন দিয়া মন অনেকটা এই রকমই একটা গল্প। একটা মজার বিষয় খেয়াল করলাম, এই গল্পের ভূতেরা জানে মাইরা ফেলে না। শুধু ডর দেখায়। শ্রমিক ভূত হইলেও যে তারে শ্রমিকই থাকতে হয় এই গল্প পড়ার পর আমার প্রাইম রিয়েলাইজেশন!
বহুত আলাপ কইরা ফালাইলাম। আর বেশি কথাও নাই বলার, কারণ এখন এই বইয়ের লাস্ট গল্পটা নিয়া কথা বলব। লাস্ট গল্পটা লেখা হইছে মাকস এবং ডক্টর এফ এর বয়ানে। একটা পেইন্টিং নিয়া দুইজনের আলাদা আলাদা বয়ান। যে পেইন্টিংটা নিয়া গল্পটা বলা হইছে সেই পেইন্টিংটাতে কেউ যা দেখতে চায়, সে নাকি তাই দেখে। হোয়াট ইফ, কেউ যা না দেখতে চায় সে তা দেখছে?
সাইকোলজিক্যাল হরর বলতে পারতাম এই গল্পটাকে। কিন্তু দুজন ব্যক্তি যখন আলাদা আলাদাভাবে একই ফিলের মধ্য দিয়ে যায় তবে এটাকে এইভাবে সাইকোলজিক্যাল হররের ট্যাগ দেওয়া কি ঠিক হবে? সম্ভবত না!
তো সব মিলায়ে, আমার কাছে ‘লয় ভাগছে’ রিসেন্ট টাইমের খুবই ইম্পোর্ট্যান্ট একটা হরর ফিকশন মনে হইছে আসলে। গতানুগতিক হরর ফিকশনের মতো মনোটোনাস স্টোরিটেলিং না থাকার কারণে, টিপিক্যাল কলিকাতাই ঢংয়ে ভয়কে আনলীশ না করার মুনশিয়ানায় এবং অনেক ধরণের হরর এক্সপেরিয়ান্সকে এন্ডোর্স করার জন্য এই বইটা আমি হরর পাগলুদের রেকমেন্ড করছি।
একবার পইড়াই দেখেন, যদি ভূত মানেই অন্ধকার আর বদ্ধ ঘর না ভাবেন, তবে লয় আসলেই ভাগতে পারে।

আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠছিলাম, ‘ডিশের লাইনের’ মাধ্যমে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল ফ্রেন্ডস, সাইনফিল্ড, ম্যালকম ইন দ্য মিডল, স্ক্রাবসের মতো বহু সিটকম। প্রায় কুড়ি বছর পর, ১০ এপ্রিল ম্যালকম ইন দ্য মিডলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে চার পর্বের মিনিসিরিজ হিসেবে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হুলুতে মুক্তি পাওয়ার প্রথম ত
৪ দিন আগে
সম্প্রতি নেটস্ফিয়ার থিকা পলিটিক্যাল স্ফিয়ার–মোটামুটি সব জায়গাতেই একটা শব্দ প্রচুর শোনা যাইতেছে। সেই শব্দটা হইতেছে ‘গুপ্ত’।
৫ দিন আগে
গতরাতে আমি স্ক্রল করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছি। ফেসবুক থেকে ইনস্টাগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম থেকে টিকটক। এক ভিডিও শেষ হয়ে আরেকটা শুরু হয়। মুখ আসে, মুখ যায়। কোথাও বিয়ে, কোথাও ব্রেকআপ, কোথাও প্রতিবাদ, কোথাও নিখুঁত সাজানো ‘গার্ল ডিনার’। কোথাও কেউ তিরিশ সেকেন্ডে তার পুরো ট্রমা হিল করে ফেলছে—ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে
১২ দিন আগে
বাংলাদেশে এক সময়ে যাত্রার যে রমরমা অবস্থা ছিল, বলা চলে আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী তারই বিবর্তন। তাদের কস্টিউম, মেকআপ, এমনকি অভিনয়ের ধরনেও তারা যাত্রার প্রচন্ড হাইপার থিয়েট্রিকালিটিকে অনুসরণ করেন।
১৪ দিন আগে