আজ আন্তর্জাতিক জ্যাজ দিবস
আজ ৩০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক জ্যাজ দিবস। জ্যাজ মিউজিকের মাধ্যমে শান্তি, ঐক্য, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সমঝোতা প্রচারের উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে ইউনেসকো দিনটিকে জ্যাজ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। জ্যাজের ইতিহাস এবং প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে বিশ্বব্যাপী এই দিনে কনসার্ট ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
মিলু আমান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীতে সরাসরি যুদ্ধ না থাকলেও এক অদ্ভুত উত্তেজনা শুরু হয়। একে বলা হয় ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ বা ‘কোল্ড ওয়ার’। এই লড়াইটা ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে কে কার চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও আদর্শবান, তা প্রমাণের লড়াই। ঠিক এই সময়েই আমেরিকা অভিনব বুদ্ধি বের করল। তারা চাইল দেশে দেশে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা প্রচার করে প্রভাব বিস্তার করতে।
১৯৫৬ সালের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট শুরু করল নতুন কর্মসূচি। নাম ‘জ্যাজ অ্যাম্বাসেডর’। কারণ, জ্যাজ মিউজিককে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাংস্কৃতিক অস্ত্র’ বা ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে দেখা হতো। তাই লুই আর্মস্ট্রং, ডিজি গিলেস্পি এবং ডেভ ব্রুবেকের মতো কিংবদন্তি জ্যাজ মিউজিশিয়ানদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করল দেশটি।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ঢাকার মাটিতে পা রেখেছিলেন বিশ্বখ্যাত সব জ্যাজ মিউজিশিয়ান। প্রথমে ১৯৫৬ সালের ২ এপ্রিল বিখ্যাত মিউজিশিয়ান ডিজি গিলেস্পি ১৮ জনের বিশাল দল নিয়ে ঢাকায় এলেন। ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হলে তাঁর কনসার্টের আয়োজন করা হলো। কিন্তু দেখা গেল এক বিপত্তি!
অনেক আয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিকিট খুব একটা বিক্রি হয়নি। আসলে ঢাকার মানুষের কাছে তখন জ্যাজ ছিল একদম নতুন, আর টিকিটের দামও ছিল সাধারণের নাগালের বাইরে। বিষয়টি জানতে পেরে গিলেস্পি প্রথমে অবাক হলেও পরে তিনি সবার জন্য কনসার্টটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এই ট্যুরে গিলেস্পি কেবল কনসার্টেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ঢাকার রাস্তায় এক শিশুকে একতারা বাজাতে দেখে তিনি মুগ্ধ হন। নিজের ট্রাম্পেট বের করে সেই সুরে সুর মেলান। বিদেশের ট্রাম্পেট আর বাংলার একতারা, দুই আলাদা সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছিল ঢাকার রাজপথে। মজার ব্যাপার হলো, সেই জ্যাজ ব্যান্ডে তখন তরুণ কুইন্সি জোন্স-ও ছিলেন, যিনি পরে পৃথিবীবিখ্যাত সংগীত প্রযোজক হিসেবে নাম করেছেন।
এর দুই বছর পর, ১৯৫৮ সালের ২২ এপ্রিল ঢাকায় আসেন আরেক কিংবদন্তি ডেভ ব্রুবেক। তিনি ঢাকায় আসার আগে কলকাতায় শো করে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্যাক্সোফোন প্লেয়ার পল ডেসমন্ড এবং কৃষ্ণাঙ্গ বেজিস্ট ইউজিন রাইট। ডেভ ব্রুবেক বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি ব্যান্ডে কৃষ্ণাঙ্গ বেজিস্টকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় পারফর্ম করে ঐক্যের বার্তা তুলে ধরেন। এটা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে সাহসী পদক্ষেপ ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্যাজ হলো স্বাধীনতার প্রতীক।

ডেভ ব্রুবেক ঢাকায় এসে বাংলার লোকগান এবং এই অঞ্চলের গানের ছন্দ বা তালের ভক্ত হয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন, এখানকার গান শুধু সুর নয়, এতে অঙ্কের মতো নিখুঁত হিসেবও আছে। এখানকার বিশেষ কিছু ছন্দ (যেমন ৯/৮ বা ৫/৪ মাত্রা) তাঁর অ্যালবাম ‘টাইম আউট’-এ ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ব্লু রন্ডো আ লা তুর্ক’ এবং ‘টেক ফাইভ’-এর মতো সুরগুলোর পেছনে ঢাকার এই সফরের বড় ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়।
ঢাকায় জ্যাজ সংগীতের এই জোয়ার এখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৬০ সালে এলেন জ্যাজ ফ্লুটিস্ট হার্বি ম্যান। তিনি ঢাকার এসে দর্শকদের ল্যাটিন ও আফ্রো-কিউবান জ্যাজের ভিন্ন স্বাদ দিয়ে গেলেন। এরপর ১৯৬১ সালে স্যাক্সোফোন প্লেয়ার লাকি থম্পসনও অ্যাম্বাসেডর হয়ে এলেন। তিনিও ঢাকার শ্রোতাদের মন জয় করলেন।

এই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৩ সালে বিখ্যাত জ্যাজ তারকা ডিউক এলিনটন তাঁর বিশাল দল নিয়ে ঢাকায় আসেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত কনসার্টটি বৃহৎ অর্কেস্ট্রাল জ্যাজকে ঢাকার মঞ্চে তুলে ধরে। এটা তখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সব মিলিয়ে দেখলে, ঢাকার এই জ্যাজ ট্যুরগুলো ছিল পশ্চিমা সংগীতের সঙ্গে আমাদের দেশীয় সংগীতের সংযোগের উপায়। আজ যখন আন্তর্জাতিক জ্যাজ দিবসে আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন গুলিস্তান সিনেমা হল বা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সেই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঢাকায় একসময় বিশ্বখ্যাত সব জ্যাজ মিউজিশিয়ানদের যাতায়াত ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীতে সরাসরি যুদ্ধ না থাকলেও এক অদ্ভুত উত্তেজনা শুরু হয়। একে বলা হয় ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ বা ‘কোল্ড ওয়ার’। এই লড়াইটা ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে কে কার চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও আদর্শবান, তা প্রমাণের লড়াই। ঠিক এই সময়েই আমেরিকা অভিনব বুদ্ধি বের করল। তারা চাইল দেশে দেশে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা প্রচার করে প্রভাব বিস্তার করতে।
১৯৫৬ সালের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট শুরু করল নতুন কর্মসূচি। নাম ‘জ্যাজ অ্যাম্বাসেডর’। কারণ, জ্যাজ মিউজিককে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাংস্কৃতিক অস্ত্র’ বা ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে দেখা হতো। তাই লুই আর্মস্ট্রং, ডিজি গিলেস্পি এবং ডেভ ব্রুবেকের মতো কিংবদন্তি জ্যাজ মিউজিশিয়ানদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করল দেশটি।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ঢাকার মাটিতে পা রেখেছিলেন বিশ্বখ্যাত সব জ্যাজ মিউজিশিয়ান। প্রথমে ১৯৫৬ সালের ২ এপ্রিল বিখ্যাত মিউজিশিয়ান ডিজি গিলেস্পি ১৮ জনের বিশাল দল নিয়ে ঢাকায় এলেন। ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হলে তাঁর কনসার্টের আয়োজন করা হলো। কিন্তু দেখা গেল এক বিপত্তি!
অনেক আয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিকিট খুব একটা বিক্রি হয়নি। আসলে ঢাকার মানুষের কাছে তখন জ্যাজ ছিল একদম নতুন, আর টিকিটের দামও ছিল সাধারণের নাগালের বাইরে। বিষয়টি জানতে পেরে গিলেস্পি প্রথমে অবাক হলেও পরে তিনি সবার জন্য কনসার্টটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এই ট্যুরে গিলেস্পি কেবল কনসার্টেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ঢাকার রাস্তায় এক শিশুকে একতারা বাজাতে দেখে তিনি মুগ্ধ হন। নিজের ট্রাম্পেট বের করে সেই সুরে সুর মেলান। বিদেশের ট্রাম্পেট আর বাংলার একতারা, দুই আলাদা সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছিল ঢাকার রাজপথে। মজার ব্যাপার হলো, সেই জ্যাজ ব্যান্ডে তখন তরুণ কুইন্সি জোন্স-ও ছিলেন, যিনি পরে পৃথিবীবিখ্যাত সংগীত প্রযোজক হিসেবে নাম করেছেন।
এর দুই বছর পর, ১৯৫৮ সালের ২২ এপ্রিল ঢাকায় আসেন আরেক কিংবদন্তি ডেভ ব্রুবেক। তিনি ঢাকায় আসার আগে কলকাতায় শো করে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্যাক্সোফোন প্লেয়ার পল ডেসমন্ড এবং কৃষ্ণাঙ্গ বেজিস্ট ইউজিন রাইট। ডেভ ব্রুবেক বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি ব্যান্ডে কৃষ্ণাঙ্গ বেজিস্টকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় পারফর্ম করে ঐক্যের বার্তা তুলে ধরেন। এটা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে সাহসী পদক্ষেপ ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্যাজ হলো স্বাধীনতার প্রতীক।

ডেভ ব্রুবেক ঢাকায় এসে বাংলার লোকগান এবং এই অঞ্চলের গানের ছন্দ বা তালের ভক্ত হয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন, এখানকার গান শুধু সুর নয়, এতে অঙ্কের মতো নিখুঁত হিসেবও আছে। এখানকার বিশেষ কিছু ছন্দ (যেমন ৯/৮ বা ৫/৪ মাত্রা) তাঁর অ্যালবাম ‘টাইম আউট’-এ ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ব্লু রন্ডো আ লা তুর্ক’ এবং ‘টেক ফাইভ’-এর মতো সুরগুলোর পেছনে ঢাকার এই সফরের বড় ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়।
ঢাকায় জ্যাজ সংগীতের এই জোয়ার এখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৬০ সালে এলেন জ্যাজ ফ্লুটিস্ট হার্বি ম্যান। তিনি ঢাকার এসে দর্শকদের ল্যাটিন ও আফ্রো-কিউবান জ্যাজের ভিন্ন স্বাদ দিয়ে গেলেন। এরপর ১৯৬১ সালে স্যাক্সোফোন প্লেয়ার লাকি থম্পসনও অ্যাম্বাসেডর হয়ে এলেন। তিনিও ঢাকার শ্রোতাদের মন জয় করলেন।

এই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৩ সালে বিখ্যাত জ্যাজ তারকা ডিউক এলিনটন তাঁর বিশাল দল নিয়ে ঢাকায় আসেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত কনসার্টটি বৃহৎ অর্কেস্ট্রাল জ্যাজকে ঢাকার মঞ্চে তুলে ধরে। এটা তখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সব মিলিয়ে দেখলে, ঢাকার এই জ্যাজ ট্যুরগুলো ছিল পশ্চিমা সংগীতের সঙ্গে আমাদের দেশীয় সংগীতের সংযোগের উপায়। আজ যখন আন্তর্জাতিক জ্যাজ দিবসে আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন গুলিস্তান সিনেমা হল বা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সেই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঢাকায় একসময় বিশ্বখ্যাত সব জ্যাজ মিউজিশিয়ানদের যাতায়াত ছিল।
.png)

ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
১৬ ঘণ্টা আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
১৭ ঘণ্টা আগে
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
১৯ ঘণ্টা আগে
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূ
২০ ঘণ্টা আগে