এক্সপ্লেইনার

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘ফুয়েল লোডিং’ কী, কীভাবে আসবে বিদ্যুৎ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে ‘ফুয়েল লোডিং’। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ফুয়েল লোডিং বা চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি সরবরাহ। এটি সম্পন্ন হলেই ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়।

পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীর ঘেঁষে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বেলা আড়াইটায় আনুষ্ঠানিকভাবে ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কয়েক স্তরের নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইউনিট-১ এর জন্য জ্বালানি লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিক লাইসেন্স দেয়।

পারমাণবিক জ্বালানি বা ফুয়েল কী

কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্বল্পমাত্রায় পরিশোধিত ইউরেনিয়াম। এই ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে প্রথমে ছোট ট্যাবলেটের মতো দানা বা ‘পেলেট’ বানানো হয়, যার ব্যাস সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার হয়ে থাকে। এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতর সাজিয়ে তৈরি হয় ‘ফুয়েল রড’।

এরপর নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেকগুলো রড একসঙ্গে যুক্ত করে তৈরি করা হয় ‘জ্বালানি বান্ডিল’ বা ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি করে জ্বালানি রড রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই জ্বালানি বান্ডিলগুলোই চুল্লি বা রিঅ্যাক্টরের কেন্দ্রে বসানো হবে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে এ রকম মোট ১৬৩টি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে।

প্রতিটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি বা বান্ডিল প্রায় ৪ দশমিক ৬ মিটার (১৫ ফুট) দীর্ঘ এবং এর ওজন প্রায় ৭৫০ কেজি। এর মধ্যে প্রায় ৫৩৪ কেজি ইউরেনিয়াম জ্বালানি থাকে। একবার চুল্লিতে জ্বালানি লোড করা হলে তা দিয়ে টানা প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এরপর ব্যবহৃত জ্বালানিবর্জ্য বের করে নতুন জ্বালানি ঢোকানো ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি ইউনিট সর্বোচ্চ দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।

তবে ফুয়েল লোডিং শেষ হওয়ার পরই সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে আসবে না। জ্বালানি লোডিং শেষে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে আরও প্রায় ৩৪ দিন সময় লাগবে। পরীক্ষা শেষে চুল্লির সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ৩, ৫, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে আরও প্রায় ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।

ফুয়েল লোডিং কী এবং কীভাবে সম্পন্ন হয়

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কারিগরি প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং। এটি একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। আসল ইউরেনিয়াম লোড করার আগে ‘ডামি ফুয়েল’ বা আসল জ্বালানিহীন বান্ডিল দিয়ে মহড়া চালানো হয়, যাতে সব যন্ত্রপাতি ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা যাচাই করা যায়।

ফুয়েল লোডিংয়ের সময় রিঅ্যাক্টরের ভেতরের অংশ বা ভ্যাসেল পানিতে পূর্ণ রাখা হয়। কারণ, পানি বিকিরণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এরপর একটি বিশেষ ‘ফুয়েল লোডিং মেশিন’ বা রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একে একে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরের নির্ধারিত স্থানে বসানো হয়। প্রতিটি অ্যাসেম্বলি কোথায় বসবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে। পুরো সময়টিতে সিস্টেমটি ‘সাব-ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় থাকে এবং নিউট্রন মনিটরিং সিস্টেম চালু থাকে, যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। রুশ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সহায়তায় দেশীয় প্রকৌশলীরা এই কাজ সম্পন্ন করবেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে প্রায় ৩০ দিনের মতো সময় লাগে।

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ মিলবে কবে

জ্বালানি লোড করার পর চুল্লির ভেতরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন বা ‘ফিশন বিক্রিয়া’ শুরু করা হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। শুরুতে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ ক্ষমতার মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ স্তরে রেখে নিউক্লিয়ার ফিজিকসের প্যারামিটারগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পারমাণবিক বিভাজনের ফলে যে বিপুল তাপশক্তি উৎপন্ন হয়, তা দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয় এবং সেখান থেকেই মূলত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

তবে ফুয়েল লোডিং শেষ হওয়ার পরই সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে আসবে না। জ্বালানি লোডিং শেষে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে আরও প্রায় ৩৪ দিন সময় লাগবে। পরীক্ষা শেষে চুল্লির সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ৩, ৫, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে আরও প্রায় ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ৩০ শতাংশে বা প্রায় ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হলেই তা পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে, যা আগামী আগস্ট মাসের দিকে হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সবকিছু ঠিক থাকলে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময়ের প্রয়োজন হবে।

রূপপুর প্রকল্প: পটভূমি ও বাস্তবায়ন

পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের এই উদ্যোগের শুরুটা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। রূপপুরে জমি অধিগ্রহণের কয়েক বছর পর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সেটি বাতিল করে দেয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে এটিকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নানা ধাপ পেরিয়ে ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তরাষ্ট্রীয় চুক্তির মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত আলোর মুখ দেখে এবং ২০১৫ সালে রোসাটমের ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের সঙ্গে মূল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক এই প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। ডলারের দাম বাড়ার কারণে সম্প্রতি ২৬ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রকল্পের কাজ প্রায় সাড়ে তিন বছর পিছিয়ে গেছে। ঠিকাদারের সঙ্গে করা মূল চুক্তি অনুসারে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে। আর দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ করার কথা ২০২৪ সালের অক্টোবরে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল প্রকল্পের মেয়াদ। এখন অতিরিক্ত চুক্তিতে প্রথম ইউনিটের জন্য ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর সময় নির্ধারণ করেছে সরকার।

তবে এই কেন্দ্র চালু হলে তা দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তন আনবে। জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে কম খরচে দীর্ঘ মেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেবে রূপপুর, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করবে। এছাড়া সাধারণ জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ু যেখানে ২৫ থেকে ৩০ বছর, সেখানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলবে ৬০ বছর পর্যন্ত, যা প্রয়োজনীয় মেরামত সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব। নির্মাণ চলাকালে এই প্রকল্পে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ কাজ করেছেন এবং বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজ এরই মধ্যে পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। ফলে রিঅ্যাক্টরের সক্ষমতা ৩০ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পর আগামী আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে যে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা, তা গ্রিডে যুক্ত করতে অবকাঠামোগত বাধাও নেই।

সম্পর্কিত