বিবিসির বিশ্লেষণ

কেন ওপেক ছাড়ল আরব আমিরাত, যে প্রভাব পড়বে তেল–বাণিজ্যে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৩৪
প্রতীকী ছবি

তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হঠ্যাৎ বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণাটি বিশ্ব-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই আরব আমিরাত এই সংগঠনের সদস্য ছিল।

ওপেক বহু দশক ধরে তেল উৎপাদন কমানো বা বাড়ানোর মাধ্যমে এবং সদস্যদের কোটা বণ্টনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করেছে। ১৯৭০-এর দশকে তেল সংকটের সময় সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যা পরে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে।

ওপেক সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে সৌদি আরব। উৎপাদনের দিক থেকে আরব আমিরাতের অবস্থান দ্বিতীয়। অর্থাৎ, দাম নিয়ন্ত্রণে উৎপাদনের দিক দিয়ে আরব আমিরাত দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ‘সুইং প্রডিউসার’।

এ কারণেই আরব-আমিরাত দীর্ঘমেয়াদে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছে। সহজভাবে বলতে গেলে, আরব-আমিরাত তাদের বিনিয়োগ করা বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করতে চাইছে।

ওপেক কোটায় তেল উৎপাদন দিনে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেলে সীমাবদ্ধ রাখত। ফলে আয়ের দিক থেকে যে ত্যাগ স্বীকার করছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, তা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

তবে ওপেক ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত ইরান যুদ্ধের প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের টানাপোড়েন থাকার কারণও এই সিদ্ধন্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

সিদ্ধান্তটি ওপেকের জন্য একটি বড় ধাক্কা। এখন সংগঠনটির দীর্ঘমেয়াদি ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

আরব আমিরাত তাদের তেল সমুদ্রপথে বা পাইপলাইনের বাজারে আনতে পারলে দিনে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করতে চাইবে। এর জবাবে সৌদি আরবও তেলের দাম নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক যুদ্ধ শুরু করতে পারে। এই সিদ্ধান্ত আরব আমিরাত বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি সামাল দিতে পারলেও দরিদ্র ওপেক সদস্যদের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ইতোমধ্যেই আমিরাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা আবুধাবির তেলক্ষেত্র থেকে নতুন পাইপলাইন তৈরি করে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ফুজাইরাহ বন্দরের দিকে যাওয়ার চিন্তা করছে। এ মুহূর্তে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের কারণে কেবল তেলের বাজারেই প্রভাব পড়ছে না। তেল, গ্যাস, জ্বালানি, প্লাস্টিক ও খাদ্যের দামেও প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে।

বিশ্বে এখন প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১০ ডলারের কাছাকাছি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দাম ৫০ ডলারের কাছাকাছি নামতে পারে।

১৯৭০-এর দশকের তুলনায় এখন ওপেকের গুরুত্ব কমেছে। তখন আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যর ৮৫ শতাংশ সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণে ছিল। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৫০ শতাংশ নেমেছে। তেল এখন আর বিশ্ব-বাণিজ্যে আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওপেকের এখনো প্রভাব আছে তবে একচেটিয়া আগের মতো নেই।

পালাবদলের ইঙ্গিত

সাবেক সৌদি তেলমন্ত্রী শেখ ইয়ামানির বলেছিলেন, পাথরের যুগ শেষ হয়নি কারণ পৃথিবীতে পাথর ফুরিয়ে গিয়েছিল। তেলের যুগও শেষ হবে না কারণ তেল ফুরিয়ে যাবে। তার মানে ভবিষ্যতে অন্য জ্বালানি উৎস তেলের জায়গা নেবে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে আরব-আমিরাতের পদক্ষেপ তেলনির্ভর বিশ্বের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিদ্যুতায়নে বড় বিনিয়োগের কারণে চীন ইতিমধ্যে তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কিছুটা সামাল দিতে পেরেছে। হিসাব অনুযায়ী, চীনে গাড়ি, ট্রাক ও ট্রেনের বিদ্যুতায়নের ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা কমেছে। এভাবে বাড়তে থাকলে তেলের চাহিদা একসময় পুরোপুরি কমে যাবে।

এমন পরিস্থিতিতে চাহিদা কমে যাওয়ার আগেই তেলের মজুদ থেকে যত দ্রুত সম্ভব আয় তুলে নেওয়াই যৌক্তিক। আরব-আমিরাতের শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও বহুমুখী অর্থনীতি এই কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উপসাগরে সংঘাত থামার পর নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। আরব-আমিরাতের এ সিদ্ধান্ত অন্য দেশগুলোকেও একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে। এতে সৌদি আরবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল শুরু হলে অথবা আরব-আমিরাতের নতুন পাইপলাইন নির্মাণে গতি বাড়ালে ওপেকের বাধা ছাড়াই আগের চেয়ে অনেক বেশি তেল উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারবে। বর্তমান অবরোধে এর তেমন প্রভাব না পড়লেও পরে এটি সবকিছু বদলে দিতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত