মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ধর্মীয় রুপ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’ জানায়, যুদ্ধকে ধর্মীয় রুপ দেওয়া বিপজ্জনক। এতে মুসলিমবিরোধী মনোভাব উস্কানি পেতে পারে।’
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করে এবং এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানা হচ্ছে। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েলের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও সাইপ্রাসে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা করে।
একটি মার্কিন পর্যবেক্ষক সংস্থা দাবি করেছে, যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কিছু মার্কিন সেনাকে বলা হয়েছে যে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য নাকি ‘বাইবেলের শেষ দিনের ঘটনা ত্বরান্বিত করা’। একই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের শাসকদের ‘ধর্মান্ধ উগ্রবাদী’ বলে মন্তব্য করেছেন।
মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতাদের বক্তব্য
মার্কিন নজরদারি সংগঠন মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তাঁরা এমন কিছু অভিযোগ পেয়েছে যেখানে কিছু সেনাকে বোঝানো হয়েছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের লক্ষ্য হলো বাইবেলে বর্ণিত ‘আর্মাগেডন’ বা পৃথীবীর অন্তীম সময়ের যুদ্ধের সূচনা করা।
সংগঠনটির কাছে পাঠানো এক ই-মেইলে একজন অজ্ঞাতনামা ননকমিশন্ড অফিসার জানান, এক কমান্ডার সৈন্যদের উদ্দেশে বলেছেন এই যুদ্ধ ‘ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ।’ তিনি বাইবেলের বুক অব রিভেলেশন থেকে আর্মাগেডন ও যিশু খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্ধৃতিও দেন।’
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই কমান্ডার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘যিশু নিয়ে এসেছেন’ বলে দাবি করেন। ট্রাম্প ইরানে এমন এক সংঘাত শুরু করবে যা আর্মাগেডনের দিকে নিয়ে যাবে।
অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক নেতাও প্রকাশ্যে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন।
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাষ্যকার টাকার কার্লসনকে বলেন, ‘বাইবেলের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইসরায়েল যদি পুরো মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণেও নেয় তাতেও আপত্তির কিছু নেই। যদিও তিনি পরে বলেন ইসরায়েলের এমন পরিকল্পনা নেই।’
এদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ইরানের মতো একটি উগ্র শাসনব্যবস্থা যাঁরা ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস করে, তাঁদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়।’
রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘তোরার’ উল্লেখ করে ইরানকে বাইবেলের প্রাচীন শত্রু ‘আমালেক’ এর সঙ্গে তুলনা করেন। ইহুদি ঐতিহ্যে আমালেককে অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তিনি বলেন, ‘তোরায় বলা হয়েছে, আমালেক তোমাদের সঙ্গে যা করেছিল তা মনে রেখো। আমরা তা মনে রাখি এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিই।’
কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের মতে, এমন বক্তব্য ব্যবহার করে নেতানিয়াহু ইরানে হামলাকে নৈতিকভাবে বৈধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
কেন সংঘাতকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হচ্ছে?
যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জলিয়ন মিচেল। তিনি বলেন, অনেক সময় রাজনৈতিক নেতারা যুদ্ধকে ধর্মীয় রূপ দেন। তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে নিজেদের পদক্ষেপকে নৈতিকভাবে সঠিক হিসেবে দেখিয়ে জনগণের সমর্থন জোগাড় করা।
তাঁর মতে, সংঘাতের উভয় পক্ষেই এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা বিশ্বাস করেন ঈশ্বর তাঁদের পক্ষেই আছেন। ফলে প্রতিপক্ষকে অমানবিক বা শত্রু হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয়। এর ফলে পরে শান্তি প্রতিষ্ঠা আরও কঠিন হয়ে যায়।
কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুশরিফ বলেন, যুদ্ধ বা সংঘাতে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করার বড় কারণ দেশের ভেতরে সমর্থন জোগাড় করা, সভ্যতাগত সংঘাতের ধারণা তৈরি করা এবং রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করা।
তিনি বলেন, যখন সংঘাতকে ‘সভ্যতা বনাম উগ্রতা’ বা ‘সৎ বনাম অসৎ’ এর লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তখন সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি বুঝতে সহজ হয় এবং সমর্থন পাওয়া সহজ হয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে খ্রিস্টান জায়নিস্ট ধর্মযাজক জন হাগি কে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার পক্ষে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। সেখানে তিনি দাবি করেন, ‘ভবিষ্যতে রাশিয়া, তুরস্ক ও বিভিন্ন ইসলামি গোষ্ঠী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের শত্রুদের ধ্বংস করবেন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে অনেক ইভানজেলিক্যাল ও খ্রিস্টান জায়নিস্ট গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে বাইবেলের ‘শেষ সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী’র অংশ হিসেবে দেখেন যা রাজনৈতিক বক্তব্যকে আরও প্রভাবিত করে।
অতীতেও কি এমন হয়েছে?
এর আগেও নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের প্রসঙ্গে ‘আমালেক’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
তবে শুধুমাত্র ইসরায়েল নয়, ইতিহাসে দেখা যায় মার্কিন নেতারাও ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন। ২০০১ সালের নয় এগারোর হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে একবার ‘ক্রুসেড’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। যদিও পরে তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই ‘ক্রুসেড’ বোঝাতে চাননি বলে সাফাই দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে ইরানকে ঘিরে সংঘাত মূলত ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে ধর্মীয় প্রতীক ও ভাষা ব্যবহার করলে যুদ্ধকে নৈতিকভাবে ন্যায্য হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয় এবং সমর্থকদের আরও সংগঠিত করা যায়।
তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ একবার কোনো সংঘাতকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে রাজনৈতিক সমঝোতা কঠিন হয়ে পড়ে এবং কূটনৈতিক সমাধান আরও জটিল হয়ে যায়।
আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান খান সার্জিল