বিশ্লেষণ/ব্রিকসে সুযোগ নাকি চ্যালেঞ্জ, দিল্লির আমন্ত্রণে সাড়া দিলে যা ঘটতে পারে ঢাকার

ব্রিকসকে উন্নয়নের অর্থনীতির সংজ্ঞা বদলাতে হবে। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বরাজনীতির পুরোনো ছক যেন দ্রুত ভেঙে পড়ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর টানাপোড়েন সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা ও নতুন মেরুকরণ। একসময় যে বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল প্রায় একচ্ছত্র, সেখানে এখন চীন, ভারত, রাশিয়াসহ উদীয়মান শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাবের বলয় ক্রমেই বিস্তৃত করছে।

এই পরিবর্তন শুধু ভূরাজনীতির মানচিত্রই বদলাচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির হিসাবও। পুরোনো জোট ও নির্ভরতার জায়গায় তৈরি হচ্ছে নতুন অংশীদারত্ব। ফলে বিশ্ব এখন শুধু কে কতটা শক্তিশালী সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে নেই; বরং কে নতুন বিশ্বব্যবস্থার নিয়ম ও সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, সেই লড়াইও শুরু হয়েছে।

নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। চলতি বছর ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্বে থাকা ভারত এই সম্মেলনের আয়োজন করছে। ভারতের এবারের ব্রিকস সভাপতিত্বের মূল ভাবনা ‘বিল্ডিং ফর রিসিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কো-অপারেশন সাসটেইনেবিলিটি’। অর্থাৎ, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন।

এই সম্মেলন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও এবার ভারত বাংলাদেশকে সম্মেলনের আউটরিচ বা বিশেষ অতিথি পর্যায়ের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ফলে অতীতে সদস্য হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের ছিল, তা আসন্ন ব্রিকসে হওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দিল্লির সঙ্গে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন সেই সুযোগকে একই সঙ্গে কঠিনও করে তুলেছে।

ব্রিকস আসলে কী

ব্রিকস মূলত অর্থনৈতিক ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম। ২০০১ সালে অর্থনীতিবিদ জিম ও’ নিল’ এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন) প্রথম অক্ষর দিয়ে নাম দেন ‘ব্রিক’। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হওয়ায় নাম হয় ‘ব্রিকস’।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জোটটি বড় হয়েছে। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়াও সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার বিভিন্ন বিষয়ে সদস্য দেশগুলো সহযোগিতা করে।

তবে ব্রিকসকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ইউনিয়ন ভাবলে ভুল হবে। এর নিজস্ব একক মুদ্রা বা অভিন্ন বাজার নেই। বরং সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোই এর বড় লক্ষ্য।

ব্রিকসের কাজ কী

ব্রিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক সদস্য ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ এনডিবি এর সদস্য হয়। সে সময় রয়টার্স জানিয়েছিল, বাংলাদেশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উরুগুয়ে ছিল ব্যাংকটির প্রথম দফার নতুন সদস্য। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য না হলেও ব্রিকস সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত ছিল।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশল হওয়া উচিত ব্রিকসকে একক কোনো পক্ষের বা দেশের সমর্থনে থেকে এই সম্মেলনকে প্রত্যাখ্যান না করে নিজ দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।

এ ছাড়া ব্রিকসের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা। সম্প্রতি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও ব্রিকসের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে যে সুযোগ রয়েছে

বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের আগে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। কিন্তু ২০২৩ সালের আগস্টে ব্রিকস ছয়টি নতুন দেশকে সদস্য হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এগুলো হল আর্জেন্টিনা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে সেসময় বাংলাদেশের সদস্য হওয়ার কথা থাকলেও পরে সদস্যপদ পায়নি। তবে চলতি বছরের আসন্ন সম্মেলনে ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশকে আসন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানান। ব্রিকসে অংশগ্রহণের অর্থ কেবল আয়োজক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন নয়, বরং বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসার সুযোগ পাওয়া। উদীয়মান অর্থনীতির নেতাদের সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্মে আলোচনার সুযোগ বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে বাড়াতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশ যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়ে নতুন দরজা খুলতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাজার বহুমুখীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বড় সুযোগ হলো ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু অর্থায়ন, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে দক্ষিণের উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর করা।

সামনে যে চ্যালেঞ্জ

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। আগস্টের শুরুতে শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল বক্তব্য ঘিরেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়, বাংলাদেশ এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করলেও ভারত বলেছে, ওই অনুষ্ঠানটির সঙ্গে তাদের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

এর আগে চলতি বছরের জুনে নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছিল। ফলে দিল্লির মাটিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুধু বহুপক্ষীয় কূটনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। তবে এবারের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানালেও তাঁকে বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে নয়, বরং ব্রিকসের চেয়ারপার্সন হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। চিঠিতে এ ধরনের সম্বোধনকে অপমানজনক বলে মনে করছেন দেশের মন্ত্রিপরিষদ। এ কারণে তিনি এ সম্মেলনে যাবেন কি না, তা নিয়েও চলছে আলোচনা। ভারত আমন্ত্রণ জানালেও বাংলাদেশ এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো ব্রিকসের ভেতরের ভিন্নতা। ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো বড় শক্তির স্বার্থ সব বিষয়ে এক নয়। ডলারবিরোধী অবস্থান, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বিভিন্ন ইস্যুতে সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে ব্রিকসে যুক্ত হলেই বাংলাদেশ সহজে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের জন্য হিসাবটা কী

বাংলাদেশের জন্য এবারের সম্মেলনকে শুধু ‘সদস্য হওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে, বরং এটি হওয়া উচিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে। বাংলাদেশ যদি সম্মেলনে অংশ নেয়, তাহলে একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা সামলানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে নতুন যোগাযোগ তৈরি করা যাবে। আর যদি বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পূর্ণ সদস্য হতে চায়, এই আউটরিচ বৈঠক সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে।

তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশল হওয়া উচিত ব্রিকসকে একক কোনো পক্ষের বা দেশের সমর্থনে থেকে এই সম্মেলনকে প্রত্যাখ্যান না করে নিজ দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। নয়াদিল্লির সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ তাই শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারে এবং একই সঙ্গে ভারতসহ সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে পারে তার ওপর।

তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, রয়টার্স, দ্য পাইওনিয়ার, কার্নেগি এনডাউমেন্ট

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

ব্রিকসে সুযোগ নাকি চ্যালেঞ্জ, দিল্লির আমন্ত্রণে সাড়া দিলে যা ঘটতে পারে ঢাকার