এক্সপ্লেইনার
সুমন সুবহান

২০২৬ সালের বৈশ্বিক রাজনৈতিক মানচিত্রে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইসলামাবাদ আর অতীতের সেই ‘সাহায্যপ্রার্থী’ রাষ্ট্র নেই। মাত্র কয়েক বছর আগে যে দেশটিকে ওয়াশিংটন ‘বিশ্বস্ত নয়’ বলে তকমা দিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল, সেই পাকিস্তান আজ হোয়াইট হাউসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কাজ করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুপরিচিত ‘ট্রানজ্যাকশনাল ডিপ্লোম্যাসি’ বা লেনদেন-নির্ভর নীতি। ট্রাম্পের কাছে কূটনীতি মানেই একটি ‘ডিল’ বা ব্যবসা, যেখানে পাকিস্তান অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজেকে একটি অপরিহার্য পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
পশ্চিমা কোন দেশ বা কোন বিখ্যাত ব্যক্তি বা সংস্থা নয়, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ বন্ধে কাজ করছে পাকিস্তান, আর এর পেছনে রয়েছে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন। কেন এই হৃদ্য সম্পর্ক? এর শিকড় আসলে কূটনৈতিক টেবিলে নয়, বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের খনি থেকে আহরিত মূল্যবান খনিজ সম্পদ আর ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক দর্শন। আর তাই, একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি—যেখানে ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকা এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে; অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং আফগানিস্তানের অনিশ্চয়তা।
এই ত্রিভুজ সংকটের মাঝখানে পাকিস্তান বিশ্বের সামনে নিজেকে একজন দক্ষ ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রাম্পের ভাষায় পাকিস্তান এখন একটি ‘পিসমেকার’, কিন্তু পর্দার আড়ালের সত্যটি হলো—ইসলামাবাদ এখন আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ সম্পদের যোগান এবং গোয়েন্দা তথ্যের এক শক্তিশালী ভান্ডার। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নিয়ে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘পাকিস্তান ও আমার বন্ধু আসিম মুনির মধ্যপ্রাচ্যে যা করছেন, তা কেউ করতে পারেনি। তারা ইরান ও আমাদের মধ্যে এমন এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে যা বড় কোনো যুদ্ধ রুখে দিতে পারে। পাকিস্তান এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘‘পিসমেকার’’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’
ইসলামাবাদ কেবল তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে বসে নেই, বরং তারা তাদের মাটির নিচের ‘রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল’ এবং কূটনৈতিক প্রভাবকে ডলারে রূপান্তর করতে শিখেছে। ট্রাম্প-পাকিস্তান এই নতুন ‘রসায়ন’ কি কেবল সাময়িক কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি, নাকি এটি দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্যকে চিরতরে বদলে দেওয়ার কোনো সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে পর্দার আড়ালের সেই সব ডিল-মেকিংয়ের দিকে, যা ২০২৬ সালের এই অবিশ্বাস্য বন্ধুত্বের ভিত গড়ে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিরচেনা ‘বিজনেস মাইন্ডসেট’ বা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানের জন্য এক অভাবনীয় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নতুন রসায়নের প্রধানতম স্তম্ভ হলো খনিজ নিরাপত্তা। বর্তমান বিশ্বে হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য ‘রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল’ অপরিহার্য, যার বাজার এতদিন এককভাবে চীনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আমেরিকা এখন চীনের এই একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে মরিয়া, আর ঠিক এই মোক্ষম সময়ে ট্রাম্পের তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের রেকো ডিক খনি।
২০২৫ সালের শেষভাগে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঐতিহাসিক খনিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান তাদের খনিগুলো মার্কিন প্রযুক্তির জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এখান থেকে লিথিয়াম, নিওডিয়ামিয়াম, তামা এবং অ্যান্টিমনির মতো মূল্যবান উপাদানের নিরবচ্ছিন্ন যোগান নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আমেরিকার বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রাণভোমরা। ২০২৬ সালের শুরুতে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট সামিটে' প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বেশ গর্বের সাথেই ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তান আর এখন কোনো দেশের ওপর সাহায্যের জন্য নির্ভরশীল নয়। আমরা এখন অংশীদারিত্বের যুগে পদার্পণ করেছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে আমাদের যে খনিজ ও ডিজিটাল চুক্তি হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে পাকিস্তান এখন বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের একটি অপরিহার্য অংশ। আমরা যেমন ওয়াশিংটনের বন্ধু, তেমনি তেহরান ও রিয়াদের আস্থার প্রতীক।’
এই অংশীদারত্ব ট্রাম্পকে এতটাই আশ্বস্ত করেছে যে, পাকিস্তানের সাথে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের খনিজ চুক্তির পর ফ্লোরিডার ‘মার-এ-লাগো’তে এক ইভেন্টে ট্রাম্প বলেন, ‘পাকিস্তান এখন আর কোনো সমস্যাগ্রস্ত দেশ নয়, তারা এখন আমাদের ‘‘বিজনেস পার্টনার’’। তাদের মাটিতে যা আছে (রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল), তা আমেরিকার ভবিষ্যৎ টেকনোলজির জন্য গেম-চেঞ্জার হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সাথে আমার ডিলটা খুব চমৎকার হয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে সাহায্য নিয়ে নয়, বাণিজ্য করেই বড় হতে হয়।’
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হৃদ্যতা কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ট্রাম্প পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সাথেও জড়িয়ে গেছে। ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’-এর সাথে পাকিস্তানের ডিজিটাল অংশীদারিত্ব এই সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইসলামাবাদে একটি বিশেষ ‘ক্রিপ্টো কাউন্সিল’ গঠন এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে মার্কিন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া ট্রাম্পের ব্যক্তিগত এজেন্ডার সাথে হুবহু মিলে গেছে। ফলে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক দূরত্ব ঘুচেছে রকেট গতিতে।
এই ডিল-মেকিংয়ের আরেকটি নিভৃত কিন্তু শক্তিশালী দিক হলো নিরাপত্তা সহযোগিতা। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আইএস এবং আঞ্চলিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান রোধে পাকিস্তান আমেরিকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করছে। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সাথে পাকিস্তানের এই গোয়েন্দা সহযোগিতা চমৎকারভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ওয়াশিংটন এখন পাকিস্তানের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল।
পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক এখন আর কোনো ‘দাতা-গ্রহীতা’র সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত বাণিজ্যিক জোট, যেখানে পাকিস্তানের ভূগর্ভস্থ সম্পদ আর ডিজিটাল নমনীয়তা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসিকে সফল করতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের চরম উত্তেজনা, যা ভারতের সামরিক ইতিহাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত, ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তান দর্শনে আমূল পরিবর্তন আনে। এই সংঘাত কেবল দুটি প্রতিবেশী দেশের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী। পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং বিশেষ করে তাদের উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা যেভাবে ভারতীয় বিমান বাহিনীর আধুনিক রাফায়েল বহরকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, তা পেন্টাগনের সমরবিদদেরও চমকে দিয়েছে।
অপারেশন সিঁদুর চলাকালীন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, তারা ভারতের ৫টি রাফায়েল বিমান ভূপাতিত করেছে। যদিও ভারত ও ফ্রান্স এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানায় যে, তাদের ‘X-Guard’ ডিকোয় প্রযুক্তি বিমানগুলোকে সুরক্ষিত রেখেছিল, তবুও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে এই খবরটি এক বিশাল কম্পন সৃষ্টি করে। ফরাসি প্রতিরক্ষা শিল্পের এই কথিত ‘আঘাত’ ট্রাম্পের নজর এড়ায়নি। ট্রাম্পের ব্যবসায়িক চোখ দ্রুত বুঝে নেয় যে, রাফায়েলের মতো দামী বিমানের এই বিপত্তি আদতে মার্কিন সমরাস্ত্রের (যেমন F-15 বা F-35) বাজার সম্প্রসারণের এক সুবর্ণ সুযোগ। ট্রাম্প তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে পাকিস্তানের এই সক্ষমতাকে স্বাগত জানান। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অকপটে বলেন, ‘আমি সব সময় জানতাম পাকিস্তানিরা দুর্দান্ত যোদ্ধা। কিন্তু সম্প্রতি তারা যা দেখিয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এখন বিশ্বের যেকোনো আধুনিক বাহিনীর সমকক্ষ। জেনারেল আসিম মুনির একজন শক্ত সামর্থ্যবান এবং বুদ্ধিমান নেতা, যার ওপর আমি আস্থা রাখতে পারি।’
ট্রাম্প পাকিস্তানকে আর কেবল দক্ষিণ এশিয়ার এক ‘ভাড়াটে সেনা’ হিসেবে দেখছেন না। তিনি মনে করেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ ‘অ্যাসিম্যাট্রিক ক্যাপাবিলিটি’ রয়েছে, যা সীমিত সম্পদেও শক্তিশালী শত্রুকে ঘায়েল করতে সক্ষম। এই যুদ্ধ-পরবর্তী প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্প ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। গাজা সংকট নিরসনেও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও জেনারেল আসিম মুনিরের সাথে তার দফায় দফায় বৈঠক এই সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরবর্তী এক সামরিক ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, "আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন কেবল পেশি শক্তির নয়, বরং প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। আমাদের আকাশসীমা রক্ষা করতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে আমাদের প্রতিরক্ষা কৌশলের গুরুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমরা শান্তির পক্ষে, তবে আমাদের আত্মরক্ষার ক্ষমতা নিয়ে কারো সংশয় থাকা উচিত নয়।’
সারকথা হলো, অপারেশন সিঁদুরের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানকে একটি শক্তিশালী সামরিক অংশীদার হিসেবে গণ্য করছে। এটি কেবল সীমান্ত রক্ষার লড়াই ছিল না, বরং এই লড়াইয়ের মাধ্যমেই পাকিস্তান ট্রাম্পের 'ডিল-মেকিং' টেবিলে নিজের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে এক শক্ত আসন নিশ্চিত করেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তান এক অভিজ্ঞ ‘সেতুবন্ধনকারী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১১-১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ টকস’ ছিল এই দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ঘটনা, যেখানে পাকিস্তান তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার প্রধান হোস্ট হিসেবে কাজ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি যুদ্ধের বিশাল ব্যয় ও ঝুঁকি এড়াতে পাকিস্তানের মতো একটি পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্রকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
ইসলামাবাদের এই তৎপরতার নেপথ্যে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ট্রাম্পের সেই বিশেষ ‘ডিল মেকিং’ পলিসি। একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তার ঐতিহাসিক গ্যারান্টার, অন্যদিকে ইরানের সাথে ভৌগোলিক ও ধর্মীয় সখ্যতা—এই দ্বৈত অবস্থানকে পুঁজি করে পাকিস্তান এখন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির কারিগর। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতেও পাকিস্তান আরব দেশগুলোর সাথে সমন্বয় রক্ষা করে ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ সম্প্রসারণে পর্দার আড়াল থেকে সমর্থন দিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। ট্রাম্পের চোখে পাকিস্তান এখন কেবল একটি দেশ নয়, বরং একটি ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী’ শক্তি।
এই কূটনৈতিক চাতুর্যের মাধ্যমেই ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনের কাছে নিজের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছে। মূলত ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল ত্রিমুখী যুদ্ধের লাগাম টেনে ধরতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইসলামাবাদের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল। পাকিস্তানের এই ‘স্মার্ট ডিপ্লোমাসি’ তাকে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের টেবিলে এক অনন্য উচ্চতায় বসিয়ে দিয়েছে। এভাবেই পিসমেকার ও ডিল-মেকার—উভয় রূপেই পাকিস্তান ২০২৬ সালের বিশ্বরাজনীতিতে এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে।
পাকিস্তানের বর্তমান কৌশলগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—দেশটি কি তবে বেইজিংয়ের কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে আসছে? উত্তরটি হলো ‘না’; বরং ইসলামাবাদ এখন চীন ও আমেরিকার সাথে ভারসাম্য রক্ষার এক জটিল ও চতুর খেলায় মেতেছে। একদিকে চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' ইনিশিয়েটিভের অধীনে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তানের খনিজ ও জ্বালানি খাতে বেইজিংয়ের বিশাল বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের সাথে 'খনিজ নিরাপত্তা ডিল' করে পাকিস্তান নিজের ভূ-রাজনৈতিক ‘কারেন্সি’ বৃদ্ধি করছে।
বেলুচিস্তানের কৌশলগত গভীর সমুদ্রবন্দর গোয়াদর এবং এর সংলগ্ন অবকাঠামো এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে খনিজ চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান সেখানে একটি পশ্চিমা ভারসাম্য তৈরি করেছে। খাইবার অঞ্চলের গিরিপথ ও খনিগুলোতে চীনের প্রভাব বজায় রেখেও রেকো ডিক ও উত্তর ওয়াজিরিস্তানের খনিগুলো আমেরিকার জন্য উন্মুক্ত করা পাকিস্তানের এক অনন্য কূটনৈতিক চাতুর্য।
এই দুই পরাশক্তিকে একই টেবিলে রেখে পাকিস্তান মূলত নিজের অর্থনৈতিক ও সামরিক দর কষাকষির ক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চীনের অবকাঠামোগত ঋণের চাপ সামলাতে ট্রাম্পের ব্যবসায়িক বিনিয়োগকে ব্যবহার করা ইসলামাবাদের এই কৌশলের প্রধান লক্ষ্য। মূলত বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং ওয়াশিংটনের তাৎক্ষণিক লেনদেন—এই দুই নৌকায় পা দিয়েই পাকিস্তান ২০২৬ সালের ভূ-রাজনীতিতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখছে। এটি কেবল ভারসাম্য নয়, বরং দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারের এক মাস্টারপিস পরিকল্পনা।
অবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—পাকিস্তান কি সত্যিই একজন স্থায়ী ‘পিসমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, নাকি এটি কেবল ট্রাম্পের একটি সাময়িক ব্যবসায়িক ‘ডিল’? বর্তমানের এই ভূ-রাজনৈতিক ‘মধুচন্দ্রিমা’ আসলে কোনো চিরস্থায়ী আদর্শ নয়, বরং যতদিন উভয় পক্ষের ব্যবসায়িক ও সামরিক স্বার্থ সংরক্ষিত হবে, ততদিনই এই রসায়ন টেকসই থাকবে। তবে পাকিস্তানের এই ‘স্মার্ট ডিপ্লোমাসি’ যে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
ইসলামাবাদের এই অভাবনীয় প্রত্যাবর্তনে নয়াদিল্লি স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত; ভারতের নীতিনির্ধারকরা একে দেখছেন ওয়াশিংটনের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত অংশীদারত্বের’ প্রতি এক নতুন ঝুঁকি হিসেবে। বিশেষ করে ট্রাম্পের খনিজ ও সামরিক নির্ভরতা যখন ভারতের বদলে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য এক নতুন মোড় নিচ্ছে। আমেরিকা এখন ইসলামাবাদের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল, যা ভারতের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া এবং কূটনৈতিক আপত্তির মুখেও ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসি পাকিস্তানের সাথে এই নতুন বন্ধনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দিনশেষে এটি কেবল দুটি দেশের সম্পর্ক নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার বলয় ভেঙে নতুন সমীকরণ রচনার এক দুঃসাহসী প্রয়াস। পাকিস্তান পিসমেকার হোক বা ডিল-মেকার, ২০২৬ সালের এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে তারা যে এক খেলোয়াড় হিসেবে ফিরে এসেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই নতুন শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের এই বন্ধুত্বই হয়তো আগামী দশকের বিশ্বরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

২০২৬ সালের বৈশ্বিক রাজনৈতিক মানচিত্রে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইসলামাবাদ আর অতীতের সেই ‘সাহায্যপ্রার্থী’ রাষ্ট্র নেই। মাত্র কয়েক বছর আগে যে দেশটিকে ওয়াশিংটন ‘বিশ্বস্ত নয়’ বলে তকমা দিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল, সেই পাকিস্তান আজ হোয়াইট হাউসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কাজ করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুপরিচিত ‘ট্রানজ্যাকশনাল ডিপ্লোম্যাসি’ বা লেনদেন-নির্ভর নীতি। ট্রাম্পের কাছে কূটনীতি মানেই একটি ‘ডিল’ বা ব্যবসা, যেখানে পাকিস্তান অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজেকে একটি অপরিহার্য পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
পশ্চিমা কোন দেশ বা কোন বিখ্যাত ব্যক্তি বা সংস্থা নয়, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ বন্ধে কাজ করছে পাকিস্তান, আর এর পেছনে রয়েছে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন। কেন এই হৃদ্য সম্পর্ক? এর শিকড় আসলে কূটনৈতিক টেবিলে নয়, বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের খনি থেকে আহরিত মূল্যবান খনিজ সম্পদ আর ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক দর্শন। আর তাই, একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি—যেখানে ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকা এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে; অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং আফগানিস্তানের অনিশ্চয়তা।
এই ত্রিভুজ সংকটের মাঝখানে পাকিস্তান বিশ্বের সামনে নিজেকে একজন দক্ষ ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রাম্পের ভাষায় পাকিস্তান এখন একটি ‘পিসমেকার’, কিন্তু পর্দার আড়ালের সত্যটি হলো—ইসলামাবাদ এখন আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ সম্পদের যোগান এবং গোয়েন্দা তথ্যের এক শক্তিশালী ভান্ডার। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নিয়ে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘পাকিস্তান ও আমার বন্ধু আসিম মুনির মধ্যপ্রাচ্যে যা করছেন, তা কেউ করতে পারেনি। তারা ইরান ও আমাদের মধ্যে এমন এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে যা বড় কোনো যুদ্ধ রুখে দিতে পারে। পাকিস্তান এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘‘পিসমেকার’’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’
ইসলামাবাদ কেবল তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে বসে নেই, বরং তারা তাদের মাটির নিচের ‘রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল’ এবং কূটনৈতিক প্রভাবকে ডলারে রূপান্তর করতে শিখেছে। ট্রাম্প-পাকিস্তান এই নতুন ‘রসায়ন’ কি কেবল সাময়িক কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি, নাকি এটি দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্যকে চিরতরে বদলে দেওয়ার কোনো সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে পর্দার আড়ালের সেই সব ডিল-মেকিংয়ের দিকে, যা ২০২৬ সালের এই অবিশ্বাস্য বন্ধুত্বের ভিত গড়ে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিরচেনা ‘বিজনেস মাইন্ডসেট’ বা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানের জন্য এক অভাবনীয় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নতুন রসায়নের প্রধানতম স্তম্ভ হলো খনিজ নিরাপত্তা। বর্তমান বিশ্বে হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য ‘রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল’ অপরিহার্য, যার বাজার এতদিন এককভাবে চীনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আমেরিকা এখন চীনের এই একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে মরিয়া, আর ঠিক এই মোক্ষম সময়ে ট্রাম্পের তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের রেকো ডিক খনি।
২০২৫ সালের শেষভাগে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঐতিহাসিক খনিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান তাদের খনিগুলো মার্কিন প্রযুক্তির জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এখান থেকে লিথিয়াম, নিওডিয়ামিয়াম, তামা এবং অ্যান্টিমনির মতো মূল্যবান উপাদানের নিরবচ্ছিন্ন যোগান নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আমেরিকার বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রাণভোমরা। ২০২৬ সালের শুরুতে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট সামিটে' প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বেশ গর্বের সাথেই ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তান আর এখন কোনো দেশের ওপর সাহায্যের জন্য নির্ভরশীল নয়। আমরা এখন অংশীদারিত্বের যুগে পদার্পণ করেছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে আমাদের যে খনিজ ও ডিজিটাল চুক্তি হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে পাকিস্তান এখন বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের একটি অপরিহার্য অংশ। আমরা যেমন ওয়াশিংটনের বন্ধু, তেমনি তেহরান ও রিয়াদের আস্থার প্রতীক।’
এই অংশীদারত্ব ট্রাম্পকে এতটাই আশ্বস্ত করেছে যে, পাকিস্তানের সাথে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের খনিজ চুক্তির পর ফ্লোরিডার ‘মার-এ-লাগো’তে এক ইভেন্টে ট্রাম্প বলেন, ‘পাকিস্তান এখন আর কোনো সমস্যাগ্রস্ত দেশ নয়, তারা এখন আমাদের ‘‘বিজনেস পার্টনার’’। তাদের মাটিতে যা আছে (রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল), তা আমেরিকার ভবিষ্যৎ টেকনোলজির জন্য গেম-চেঞ্জার হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সাথে আমার ডিলটা খুব চমৎকার হয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে সাহায্য নিয়ে নয়, বাণিজ্য করেই বড় হতে হয়।’
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হৃদ্যতা কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ট্রাম্প পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সাথেও জড়িয়ে গেছে। ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’-এর সাথে পাকিস্তানের ডিজিটাল অংশীদারিত্ব এই সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইসলামাবাদে একটি বিশেষ ‘ক্রিপ্টো কাউন্সিল’ গঠন এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে মার্কিন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া ট্রাম্পের ব্যক্তিগত এজেন্ডার সাথে হুবহু মিলে গেছে। ফলে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক দূরত্ব ঘুচেছে রকেট গতিতে।
এই ডিল-মেকিংয়ের আরেকটি নিভৃত কিন্তু শক্তিশালী দিক হলো নিরাপত্তা সহযোগিতা। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আইএস এবং আঞ্চলিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান রোধে পাকিস্তান আমেরিকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করছে। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সাথে পাকিস্তানের এই গোয়েন্দা সহযোগিতা চমৎকারভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ওয়াশিংটন এখন পাকিস্তানের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল।
পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক এখন আর কোনো ‘দাতা-গ্রহীতা’র সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত বাণিজ্যিক জোট, যেখানে পাকিস্তানের ভূগর্ভস্থ সম্পদ আর ডিজিটাল নমনীয়তা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসিকে সফল করতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের চরম উত্তেজনা, যা ভারতের সামরিক ইতিহাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত, ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তান দর্শনে আমূল পরিবর্তন আনে। এই সংঘাত কেবল দুটি প্রতিবেশী দেশের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী। পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং বিশেষ করে তাদের উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা যেভাবে ভারতীয় বিমান বাহিনীর আধুনিক রাফায়েল বহরকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, তা পেন্টাগনের সমরবিদদেরও চমকে দিয়েছে।
অপারেশন সিঁদুর চলাকালীন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, তারা ভারতের ৫টি রাফায়েল বিমান ভূপাতিত করেছে। যদিও ভারত ও ফ্রান্স এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানায় যে, তাদের ‘X-Guard’ ডিকোয় প্রযুক্তি বিমানগুলোকে সুরক্ষিত রেখেছিল, তবুও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে এই খবরটি এক বিশাল কম্পন সৃষ্টি করে। ফরাসি প্রতিরক্ষা শিল্পের এই কথিত ‘আঘাত’ ট্রাম্পের নজর এড়ায়নি। ট্রাম্পের ব্যবসায়িক চোখ দ্রুত বুঝে নেয় যে, রাফায়েলের মতো দামী বিমানের এই বিপত্তি আদতে মার্কিন সমরাস্ত্রের (যেমন F-15 বা F-35) বাজার সম্প্রসারণের এক সুবর্ণ সুযোগ। ট্রাম্প তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে পাকিস্তানের এই সক্ষমতাকে স্বাগত জানান। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অকপটে বলেন, ‘আমি সব সময় জানতাম পাকিস্তানিরা দুর্দান্ত যোদ্ধা। কিন্তু সম্প্রতি তারা যা দেখিয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এখন বিশ্বের যেকোনো আধুনিক বাহিনীর সমকক্ষ। জেনারেল আসিম মুনির একজন শক্ত সামর্থ্যবান এবং বুদ্ধিমান নেতা, যার ওপর আমি আস্থা রাখতে পারি।’
ট্রাম্প পাকিস্তানকে আর কেবল দক্ষিণ এশিয়ার এক ‘ভাড়াটে সেনা’ হিসেবে দেখছেন না। তিনি মনে করেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ ‘অ্যাসিম্যাট্রিক ক্যাপাবিলিটি’ রয়েছে, যা সীমিত সম্পদেও শক্তিশালী শত্রুকে ঘায়েল করতে সক্ষম। এই যুদ্ধ-পরবর্তী প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্প ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। গাজা সংকট নিরসনেও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও জেনারেল আসিম মুনিরের সাথে তার দফায় দফায় বৈঠক এই সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরবর্তী এক সামরিক ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, "আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন কেবল পেশি শক্তির নয়, বরং প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। আমাদের আকাশসীমা রক্ষা করতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে আমাদের প্রতিরক্ষা কৌশলের গুরুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমরা শান্তির পক্ষে, তবে আমাদের আত্মরক্ষার ক্ষমতা নিয়ে কারো সংশয় থাকা উচিত নয়।’
সারকথা হলো, অপারেশন সিঁদুরের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানকে একটি শক্তিশালী সামরিক অংশীদার হিসেবে গণ্য করছে। এটি কেবল সীমান্ত রক্ষার লড়াই ছিল না, বরং এই লড়াইয়ের মাধ্যমেই পাকিস্তান ট্রাম্পের 'ডিল-মেকিং' টেবিলে নিজের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে এক শক্ত আসন নিশ্চিত করেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তান এক অভিজ্ঞ ‘সেতুবন্ধনকারী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১১-১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ টকস’ ছিল এই দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ঘটনা, যেখানে পাকিস্তান তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার প্রধান হোস্ট হিসেবে কাজ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি যুদ্ধের বিশাল ব্যয় ও ঝুঁকি এড়াতে পাকিস্তানের মতো একটি পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্রকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
ইসলামাবাদের এই তৎপরতার নেপথ্যে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ট্রাম্পের সেই বিশেষ ‘ডিল মেকিং’ পলিসি। একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তার ঐতিহাসিক গ্যারান্টার, অন্যদিকে ইরানের সাথে ভৌগোলিক ও ধর্মীয় সখ্যতা—এই দ্বৈত অবস্থানকে পুঁজি করে পাকিস্তান এখন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির কারিগর। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতেও পাকিস্তান আরব দেশগুলোর সাথে সমন্বয় রক্ষা করে ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ সম্প্রসারণে পর্দার আড়াল থেকে সমর্থন দিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। ট্রাম্পের চোখে পাকিস্তান এখন কেবল একটি দেশ নয়, বরং একটি ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী’ শক্তি।
এই কূটনৈতিক চাতুর্যের মাধ্যমেই ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনের কাছে নিজের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছে। মূলত ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল ত্রিমুখী যুদ্ধের লাগাম টেনে ধরতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইসলামাবাদের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল। পাকিস্তানের এই ‘স্মার্ট ডিপ্লোমাসি’ তাকে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের টেবিলে এক অনন্য উচ্চতায় বসিয়ে দিয়েছে। এভাবেই পিসমেকার ও ডিল-মেকার—উভয় রূপেই পাকিস্তান ২০২৬ সালের বিশ্বরাজনীতিতে এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে।
পাকিস্তানের বর্তমান কৌশলগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—দেশটি কি তবে বেইজিংয়ের কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে আসছে? উত্তরটি হলো ‘না’; বরং ইসলামাবাদ এখন চীন ও আমেরিকার সাথে ভারসাম্য রক্ষার এক জটিল ও চতুর খেলায় মেতেছে। একদিকে চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' ইনিশিয়েটিভের অধীনে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তানের খনিজ ও জ্বালানি খাতে বেইজিংয়ের বিশাল বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের সাথে 'খনিজ নিরাপত্তা ডিল' করে পাকিস্তান নিজের ভূ-রাজনৈতিক ‘কারেন্সি’ বৃদ্ধি করছে।
বেলুচিস্তানের কৌশলগত গভীর সমুদ্রবন্দর গোয়াদর এবং এর সংলগ্ন অবকাঠামো এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে খনিজ চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান সেখানে একটি পশ্চিমা ভারসাম্য তৈরি করেছে। খাইবার অঞ্চলের গিরিপথ ও খনিগুলোতে চীনের প্রভাব বজায় রেখেও রেকো ডিক ও উত্তর ওয়াজিরিস্তানের খনিগুলো আমেরিকার জন্য উন্মুক্ত করা পাকিস্তানের এক অনন্য কূটনৈতিক চাতুর্য।
এই দুই পরাশক্তিকে একই টেবিলে রেখে পাকিস্তান মূলত নিজের অর্থনৈতিক ও সামরিক দর কষাকষির ক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চীনের অবকাঠামোগত ঋণের চাপ সামলাতে ট্রাম্পের ব্যবসায়িক বিনিয়োগকে ব্যবহার করা ইসলামাবাদের এই কৌশলের প্রধান লক্ষ্য। মূলত বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং ওয়াশিংটনের তাৎক্ষণিক লেনদেন—এই দুই নৌকায় পা দিয়েই পাকিস্তান ২০২৬ সালের ভূ-রাজনীতিতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখছে। এটি কেবল ভারসাম্য নয়, বরং দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারের এক মাস্টারপিস পরিকল্পনা।
অবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—পাকিস্তান কি সত্যিই একজন স্থায়ী ‘পিসমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, নাকি এটি কেবল ট্রাম্পের একটি সাময়িক ব্যবসায়িক ‘ডিল’? বর্তমানের এই ভূ-রাজনৈতিক ‘মধুচন্দ্রিমা’ আসলে কোনো চিরস্থায়ী আদর্শ নয়, বরং যতদিন উভয় পক্ষের ব্যবসায়িক ও সামরিক স্বার্থ সংরক্ষিত হবে, ততদিনই এই রসায়ন টেকসই থাকবে। তবে পাকিস্তানের এই ‘স্মার্ট ডিপ্লোমাসি’ যে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
ইসলামাবাদের এই অভাবনীয় প্রত্যাবর্তনে নয়াদিল্লি স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত; ভারতের নীতিনির্ধারকরা একে দেখছেন ওয়াশিংটনের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত অংশীদারত্বের’ প্রতি এক নতুন ঝুঁকি হিসেবে। বিশেষ করে ট্রাম্পের খনিজ ও সামরিক নির্ভরতা যখন ভারতের বদলে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য এক নতুন মোড় নিচ্ছে। আমেরিকা এখন ইসলামাবাদের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল, যা ভারতের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া এবং কূটনৈতিক আপত্তির মুখেও ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসি পাকিস্তানের সাথে এই নতুন বন্ধনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দিনশেষে এটি কেবল দুটি দেশের সম্পর্ক নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার বলয় ভেঙে নতুন সমীকরণ রচনার এক দুঃসাহসী প্রয়াস। পাকিস্তান পিসমেকার হোক বা ডিল-মেকার, ২০২৬ সালের এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে তারা যে এক খেলোয়াড় হিসেবে ফিরে এসেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই নতুন শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের এই বন্ধুত্বই হয়তো আগামী দশকের বিশ্বরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

বাংলাদেশ সরকার ১৮ এপ্রিল খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির নতুন মূল্য ঘোষণা করেছে। নতুন দাম ১৯ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
৪ ঘণ্টা আগে
বর্তমানে বিশ্বরাজনীতির পুরো আলো কেড়ে নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, যেখানে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার আলোচনা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তেহরান আর ওয়াশিংটনের হাই-প্রোফাইল টেবিল যখন পারমাণবিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর ডুবছে চরম অন্ধকারে।
১ দিন আগে
চৈত্র পার হতেই কাঠফাটা রোদে পুড়ছে রাজধানী। ভ্যাপসা গরমে ত্রাহি দশা। আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস, চলতি সপ্তাহে ঢাকায় তাপপ্রবাহ আসছে। ২১ এপ্রিল থেকে এই দাবদাহ মাসের শেষঅবধি চলবে। ইতোমধ্যে রাজধানীতে তার আলামত মিলছে।
২ দিন আগে
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আধুনিক সামরিক ইতিহাসের গতিপথ আমূল বদলে দিয়ে কামানের গর্জন ও ট্যাংকের লড়াইয়ের পাশাপাশি এক নতুন প্রযুক্তির জয়গান গাইছে। কেননা দনবাসের বিস্তীর্ণ প্রান্তর থেকে বাখমুতের ধূলিমলিন ধ্বংসস্তূপ পর্যন্ত এখন রাজত্ব করছে ‘আনম্যান্ড গ্রাউন্ড ভেহিকল’ (ইউজিভি) বা বুদ্ধিমান স্থলচর রোবট
২ দিন আগে