তুফায়েল আহমদ

ছেলেকে হারানোর শোক সামলে ওঠার আগেই নতুন এক আতঙ্কে রাত কাটাতে হচ্ছে মুন্সিগঞ্জের জসিম খানকে। গত ১৬ এপ্রিল বজ্রপাতে মারা যান তাঁর ছেলে আরাফাত খান। এখন টঙ্গীবাড়ীর কামারখাড়া সামাজিক কবরস্থানে প্রতি রাতে টর্চলাইট আর লাঠি হাতে তিনি বসে থাকেন ছেলের কবরের পাশে। গ্রামজুড়ে রটেছে, বজ্রপাতে মৃতদেহে নাকি তৈরি হয় দামি ম্যাগনেট। সেই লোভে চোরেরা লাশ চুরি করতে পারে! শুধু জসিম খান নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বজ্রপাতে প্রিয়জন হারানোর পর অনেক পরিবারকে এখন কবর পাহারার এমন করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এমন ঘটনা শুধু মুন্সিগঞ্জের নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির কবর পাহারার এমন খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। এসব ঘটনার মূলে রয়েছে অন্ধবিশ্বাস। এই খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে বজ্রপাতে মৃতের শরীরে ম্যাগনেট বা মূল্যবান ধাতু তৈরি হয়। এই বিশ্বাসের কারণে লাশ চুরির ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণার সত্যতা আছে কি?
লাশে কি সত্যিই ম্যাগনেট তৈরি হয়?
বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির শরীরে চুম্বক বা ম্যাগনেট তৈরি হওয়ার দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। মেঘের ভেতর জমা হওয়া বিদ্যুৎ হঠাৎ করে বেরিয়ে এলেই বজ্রপাত হয়। মেঘের পানি আর বরফ কণার ঘষাঘষিতে এই বিদ্যুতের জন্ম হয়। বিদ্যুৎ খুব বেশি বেড়ে গেলে বাতাস আর তা ধরে রাখতে পারে না। ফলে এই বিদ্যুৎ আলোর ঝলক হয়ে সোজা মাটিতে নেমে আসে। সাধারণ বজ্রপাতে ৩০ হাজার অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ থাকে, যা ১ লাখ ২০ হাজার অ্যাম্পিয়ারও হতে পারে। এ সময় চারপাশের বাতাস পলকের মাঝে ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম হয়ে যায়। এই প্রচণ্ড তাপ সূর্যের ওপরের অংশের চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী যেকোনো ধাতুকে স্থায়ী চুম্বকে পরিণত করতে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে রাখতে হয়। বজ্রপাতের সময়কাল মাত্র ১০ থেকে ৫০ মাইক্রোসেকেন্ড স্থায়ী হয়। এত অল্প সময়ে কোনো বস্তু চুম্বক হতে পারে না। লোহা বা নিকেলের মতো নির্দিষ্ট কিছু পদার্থই চুম্বকে রূপান্তরিত হতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের ফেরোম্যাগনেটিক পদার্থ বলা হয়।
মানুষের শরীর মূলত কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন দিয়ে তৈরি। মানবদেহের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মধ্যে আয়রন বা লোহা থাকে। রক্তের এই লোহা আয়ন আকারে থাকে। আয়ন আকারের লোহা স্থায়ী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে না। চৌম্বকত্বের আরেকটি বড় শত্রু হলো তাপ। বজ্রপাতের প্রচণ্ড তাপ ও বিদ্যুৎ প্রবাহের গতি এতই বেশি যে তাতে কোনো ধাতুর চুম্বক হওয়ার সুযোগ নেই; বরং তা বস্তুর চৌম্বক ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। বজ্রপাতের সময় উৎপন্ন হওয়া বিপুল তাপ যেকোনো বস্তুর চৌম্বক ক্ষমতাকে মুহূর্তেই বিলীন করে দেবে। তাত্ত্বিকভাবে শরীরে লোহা থাকলেও বজ্রপাতের তাপে তা চুম্বক হতে পারবে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মত
বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃতদেহ নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক গবেষণা হয়েছে। সাধারণ বৈদ্যুতিক শকে মৃত্যু এবং বজ্রপাতে মৃত্যুর মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিশেষজ্ঞ ড. সোহেল মাহমুদের এক গবেষণা মতে, বজ্রপাতে মৃত্যু মূলত হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঘটে। বজ্রপাতের বিদ্যুৎ যখন মস্তিষ্কের রেসপিরেটরি সেন্টারের মধ্য দিয়ে যায়, তখন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যায়।
ফরেনসিক তদন্তে বজ্রপাতে মৃতদেহে কোনো ম্যাগনেট পাওয়া যায় না। মৃতদেহে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষত বা চিহ্ন দেখা যায়। চামড়ার ওপর লালচে বা বেগুনি রঙের ফার্ন গাছের পাতার মতো নকশা তৈরি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে লিচটেনবার্গ ফিগার বলা হয়। কৈশিক নালিকা ফেটে যাওয়ার ফলে এই ক্ষতের সৃষ্টি হয়। উচ্চ ভোল্টেজের কারণে কোষের মেমব্রেনে ক্ষুদ্র ছিদ্র তৈরি হয়, যাকে ইলেকট্রোপোরেশন বলা হয়। শরীরে ধাতব গয়না বা মোবাইল ফোন থাকলে সেখানে বিদ্যুৎ ঘনীভূত হয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। সেই ধাতব বস্তুগুলোও চুম্বকে পরিণত হয় না।
ব্রিটিশ আমলের ‘ম্যাগনেটিক পিলার’ ও গুজবের ডালপালা
বজ্রপাতে মৃতদেহে ম্যাগনেট থাকার এই গুজবের শেকড় মূলত লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত সীমানা পিলারের গল্পের মধ্যে। ব্রিটিশ আমলে বজ্রপাত থেকে রক্ষার জন্য বা সীমানা নির্ধারণের কাজে দেশের বিভিন্ন স্থানে পিলার স্থাপন করা হয়েছিল। গ্রামের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুজব প্রচলিত রয়েছে, এই পিলারগুলোতে নাকি মহামূল্যবান ‘ম্যাগনেট’ বা চুম্বক রয়েছে, যা বজ্রপাত টেনে নেয়।
এই পিলারের গুজবের সূত্র ধরেই নতুন এক অদ্ভুত ধারণার জন্ম দেওয়া হয়। গ্রামে গ্রামে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যাদের গায়ে বজ্রপাত পড়ে, তাদের শরীরেও ওই পিলারের মতোই দামি ম্যাগনেট আছে বলে বজ্রপাত তাঁদের শরীরে আঘাত হানে। আর এই অমূলক ও গাঁজাখুরি গল্পের বশবর্তী হয়েই একশ্রেণির অসাধু লোক রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে বজ্রপাতে নিহতদের লাশ চুরির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
রেড মার্কারি ও প্রতারক চক্রের ফাঁদ
ম্যাগনেট বা মূল্যবান ধাতু তৈরির এই গুজবের নেপথ্যে রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তারা সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে ব্যবসার ফাঁদ পাতে। এই চক্রের সাথে রেড মার্কারি বা লাল পারদ প্রতারণার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। প্রতারক চক্র প্রচার করে যে বজ্রপাতের সময় উৎপন্ন উচ্চ শক্তির প্রভাবে মৃত ব্যক্তির হাড়ে রেড মার্কারি তৈরি হয়। তারা দাবি করে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতে, রেড মার্কারি বলতে কোনো পদার্থের অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের মতে রেড মার্কারি হলো অস্ত্র ব্যবসায়ী ও প্রতারকদের তৈরি একটি নিছক গুজব। বাংলাদেশের কিছু অসাধু চক্র এই রেড মার্কারির নাম করে প্রতারণা করে।
রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে প্রায়ই ম্যাগনেটিক কয়েন প্রতারক চক্র ধরা পড়ে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখা বা ডিবি বিভিন্ন সময় এসব চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে। প্রতারকরা দাবি করে ম্যাগনেটিক কয়েন বা পিলারে অলৌকিক শক্তি আছে। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্যমতে, বাংলাদেশে অন্তত ২০টির বেশি সক্রিয় চক্র রয়েছে। তারা কাল্পনিক ধাতুর লোভ দেখিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। চক্রগুলোর চাহিদার কারণেই গ্রামেগঞ্জে লাশ চুরির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
কবর পাহারা ও আর্থসামাজিক সংকট
লাশ চুরির আতঙ্ক গ্রামীণ সমাজে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। প্রিয়জন হারানোর শোকের চেয়েও অনেক পরিবারকে লাশ রক্ষার চিন্তায় বেশি উদগ্রীব থাকতে হয়। কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে কবর পাহারার ঘটনা বেশি দেখা যায়। মৃতদেহ চুরির হাত থেকে রক্ষা করতে অনেক পরিবার সাধারণ মাটির কবরের পরিবর্তে কংক্রিটের ঢালাই দিচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে এক বজ্রপাতে একই পরিবারের ৬ জন মারা যাওয়ার পর তাদের কবরের ওপর পুরু সিমেন্টের ঢালাই দেওয়া হয়েছিল। চোরেরা যেন কঙ্কাল চুরি করতে না পারে সেই জন্যই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃতদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই হলেন গ্রামীণ এলাকার কৃষক ও মৎস্যজীবী। খোলা মাঠে কাজ করার সময় তারা বেশি আক্রান্ত হন। একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে সেই পরিবার চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। এরপর লাশ পাহারার জন্য তাদের বাড়তি অর্থ খরচ করতে হয়। মুন্সীগঞ্জের জসিম খানের মতো অনেকেই ঋণ করে পাহারাদার রাখতে বাধ্য হন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও লাশ চুরির গুজব ঠেকাতে তা যথেষ্ট নয়।
বিশ্লেষকরা বলেন, বিজ্ঞানের যুগে এসেও বাংলাদেশে গুজব সমাজে টিকে থাকা আসলে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই প্রকাশ করে। প্রশাসনের উচিত প্রতারক চক্রগুলোকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে লাশ চুরির সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জনসচেতনতা তৈরি করাও জরুরী।

ছেলেকে হারানোর শোক সামলে ওঠার আগেই নতুন এক আতঙ্কে রাত কাটাতে হচ্ছে মুন্সিগঞ্জের জসিম খানকে। গত ১৬ এপ্রিল বজ্রপাতে মারা যান তাঁর ছেলে আরাফাত খান। এখন টঙ্গীবাড়ীর কামারখাড়া সামাজিক কবরস্থানে প্রতি রাতে টর্চলাইট আর লাঠি হাতে তিনি বসে থাকেন ছেলের কবরের পাশে। গ্রামজুড়ে রটেছে, বজ্রপাতে মৃতদেহে নাকি তৈরি হয় দামি ম্যাগনেট। সেই লোভে চোরেরা লাশ চুরি করতে পারে! শুধু জসিম খান নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বজ্রপাতে প্রিয়জন হারানোর পর অনেক পরিবারকে এখন কবর পাহারার এমন করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এমন ঘটনা শুধু মুন্সিগঞ্জের নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির কবর পাহারার এমন খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। এসব ঘটনার মূলে রয়েছে অন্ধবিশ্বাস। এই খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে বজ্রপাতে মৃতের শরীরে ম্যাগনেট বা মূল্যবান ধাতু তৈরি হয়। এই বিশ্বাসের কারণে লাশ চুরির ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণার সত্যতা আছে কি?
লাশে কি সত্যিই ম্যাগনেট তৈরি হয়?
বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির শরীরে চুম্বক বা ম্যাগনেট তৈরি হওয়ার দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। মেঘের ভেতর জমা হওয়া বিদ্যুৎ হঠাৎ করে বেরিয়ে এলেই বজ্রপাত হয়। মেঘের পানি আর বরফ কণার ঘষাঘষিতে এই বিদ্যুতের জন্ম হয়। বিদ্যুৎ খুব বেশি বেড়ে গেলে বাতাস আর তা ধরে রাখতে পারে না। ফলে এই বিদ্যুৎ আলোর ঝলক হয়ে সোজা মাটিতে নেমে আসে। সাধারণ বজ্রপাতে ৩০ হাজার অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ থাকে, যা ১ লাখ ২০ হাজার অ্যাম্পিয়ারও হতে পারে। এ সময় চারপাশের বাতাস পলকের মাঝে ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম হয়ে যায়। এই প্রচণ্ড তাপ সূর্যের ওপরের অংশের চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী যেকোনো ধাতুকে স্থায়ী চুম্বকে পরিণত করতে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে রাখতে হয়। বজ্রপাতের সময়কাল মাত্র ১০ থেকে ৫০ মাইক্রোসেকেন্ড স্থায়ী হয়। এত অল্প সময়ে কোনো বস্তু চুম্বক হতে পারে না। লোহা বা নিকেলের মতো নির্দিষ্ট কিছু পদার্থই চুম্বকে রূপান্তরিত হতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের ফেরোম্যাগনেটিক পদার্থ বলা হয়।
মানুষের শরীর মূলত কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন দিয়ে তৈরি। মানবদেহের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মধ্যে আয়রন বা লোহা থাকে। রক্তের এই লোহা আয়ন আকারে থাকে। আয়ন আকারের লোহা স্থায়ী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে না। চৌম্বকত্বের আরেকটি বড় শত্রু হলো তাপ। বজ্রপাতের প্রচণ্ড তাপ ও বিদ্যুৎ প্রবাহের গতি এতই বেশি যে তাতে কোনো ধাতুর চুম্বক হওয়ার সুযোগ নেই; বরং তা বস্তুর চৌম্বক ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। বজ্রপাতের সময় উৎপন্ন হওয়া বিপুল তাপ যেকোনো বস্তুর চৌম্বক ক্ষমতাকে মুহূর্তেই বিলীন করে দেবে। তাত্ত্বিকভাবে শরীরে লোহা থাকলেও বজ্রপাতের তাপে তা চুম্বক হতে পারবে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মত
বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃতদেহ নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক গবেষণা হয়েছে। সাধারণ বৈদ্যুতিক শকে মৃত্যু এবং বজ্রপাতে মৃত্যুর মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিশেষজ্ঞ ড. সোহেল মাহমুদের এক গবেষণা মতে, বজ্রপাতে মৃত্যু মূলত হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঘটে। বজ্রপাতের বিদ্যুৎ যখন মস্তিষ্কের রেসপিরেটরি সেন্টারের মধ্য দিয়ে যায়, তখন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যায়।
ফরেনসিক তদন্তে বজ্রপাতে মৃতদেহে কোনো ম্যাগনেট পাওয়া যায় না। মৃতদেহে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষত বা চিহ্ন দেখা যায়। চামড়ার ওপর লালচে বা বেগুনি রঙের ফার্ন গাছের পাতার মতো নকশা তৈরি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে লিচটেনবার্গ ফিগার বলা হয়। কৈশিক নালিকা ফেটে যাওয়ার ফলে এই ক্ষতের সৃষ্টি হয়। উচ্চ ভোল্টেজের কারণে কোষের মেমব্রেনে ক্ষুদ্র ছিদ্র তৈরি হয়, যাকে ইলেকট্রোপোরেশন বলা হয়। শরীরে ধাতব গয়না বা মোবাইল ফোন থাকলে সেখানে বিদ্যুৎ ঘনীভূত হয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। সেই ধাতব বস্তুগুলোও চুম্বকে পরিণত হয় না।
ব্রিটিশ আমলের ‘ম্যাগনেটিক পিলার’ ও গুজবের ডালপালা
বজ্রপাতে মৃতদেহে ম্যাগনেট থাকার এই গুজবের শেকড় মূলত লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত সীমানা পিলারের গল্পের মধ্যে। ব্রিটিশ আমলে বজ্রপাত থেকে রক্ষার জন্য বা সীমানা নির্ধারণের কাজে দেশের বিভিন্ন স্থানে পিলার স্থাপন করা হয়েছিল। গ্রামের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুজব প্রচলিত রয়েছে, এই পিলারগুলোতে নাকি মহামূল্যবান ‘ম্যাগনেট’ বা চুম্বক রয়েছে, যা বজ্রপাত টেনে নেয়।
এই পিলারের গুজবের সূত্র ধরেই নতুন এক অদ্ভুত ধারণার জন্ম দেওয়া হয়। গ্রামে গ্রামে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যাদের গায়ে বজ্রপাত পড়ে, তাদের শরীরেও ওই পিলারের মতোই দামি ম্যাগনেট আছে বলে বজ্রপাত তাঁদের শরীরে আঘাত হানে। আর এই অমূলক ও গাঁজাখুরি গল্পের বশবর্তী হয়েই একশ্রেণির অসাধু লোক রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে বজ্রপাতে নিহতদের লাশ চুরির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
রেড মার্কারি ও প্রতারক চক্রের ফাঁদ
ম্যাগনেট বা মূল্যবান ধাতু তৈরির এই গুজবের নেপথ্যে রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তারা সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে ব্যবসার ফাঁদ পাতে। এই চক্রের সাথে রেড মার্কারি বা লাল পারদ প্রতারণার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। প্রতারক চক্র প্রচার করে যে বজ্রপাতের সময় উৎপন্ন উচ্চ শক্তির প্রভাবে মৃত ব্যক্তির হাড়ে রেড মার্কারি তৈরি হয়। তারা দাবি করে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতে, রেড মার্কারি বলতে কোনো পদার্থের অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের মতে রেড মার্কারি হলো অস্ত্র ব্যবসায়ী ও প্রতারকদের তৈরি একটি নিছক গুজব। বাংলাদেশের কিছু অসাধু চক্র এই রেড মার্কারির নাম করে প্রতারণা করে।
রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে প্রায়ই ম্যাগনেটিক কয়েন প্রতারক চক্র ধরা পড়ে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখা বা ডিবি বিভিন্ন সময় এসব চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে। প্রতারকরা দাবি করে ম্যাগনেটিক কয়েন বা পিলারে অলৌকিক শক্তি আছে। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্যমতে, বাংলাদেশে অন্তত ২০টির বেশি সক্রিয় চক্র রয়েছে। তারা কাল্পনিক ধাতুর লোভ দেখিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। চক্রগুলোর চাহিদার কারণেই গ্রামেগঞ্জে লাশ চুরির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
কবর পাহারা ও আর্থসামাজিক সংকট
লাশ চুরির আতঙ্ক গ্রামীণ সমাজে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। প্রিয়জন হারানোর শোকের চেয়েও অনেক পরিবারকে লাশ রক্ষার চিন্তায় বেশি উদগ্রীব থাকতে হয়। কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে কবর পাহারার ঘটনা বেশি দেখা যায়। মৃতদেহ চুরির হাত থেকে রক্ষা করতে অনেক পরিবার সাধারণ মাটির কবরের পরিবর্তে কংক্রিটের ঢালাই দিচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে এক বজ্রপাতে একই পরিবারের ৬ জন মারা যাওয়ার পর তাদের কবরের ওপর পুরু সিমেন্টের ঢালাই দেওয়া হয়েছিল। চোরেরা যেন কঙ্কাল চুরি করতে না পারে সেই জন্যই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃতদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই হলেন গ্রামীণ এলাকার কৃষক ও মৎস্যজীবী। খোলা মাঠে কাজ করার সময় তারা বেশি আক্রান্ত হন। একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে সেই পরিবার চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। এরপর লাশ পাহারার জন্য তাদের বাড়তি অর্থ খরচ করতে হয়। মুন্সীগঞ্জের জসিম খানের মতো অনেকেই ঋণ করে পাহারাদার রাখতে বাধ্য হন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও লাশ চুরির গুজব ঠেকাতে তা যথেষ্ট নয়।
বিশ্লেষকরা বলেন, বিজ্ঞানের যুগে এসেও বাংলাদেশে গুজব সমাজে টিকে থাকা আসলে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই প্রকাশ করে। প্রশাসনের উচিত প্রতারক চক্রগুলোকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে লাশ চুরির সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জনসচেতনতা তৈরি করাও জরুরী।

২২ এপ্রিল, বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং পৃথিবীকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে দিনটি পালন করা হয়। ২০২৬ সালে এসে ধরিত্রী দিবস নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা প্রতীকী দিন নয়।
১ দিন আগে
বিশ্ব রাজনীতিতে জাতিসংঘের মহাসচিব পদটি বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও নৈতিকতার প্রতীক। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আবারও পাঁচ বছরের জন্য শুরু হতে যাচ্ছে দশম মহাসচিবের মেয়াদ। এই পদকে কেন্দ্র করে এখন বিশ্ব কূটনীতিতে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা।
১ দিন আগে
আজ ধরিত্রী দিবস। এদিন এলেই সবাই যেন পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। বিষয়—কার্বন নিঃসরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু নীতি। কিন্তু এই বড় আলোচনাগুলো প্রায়ই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে আড়াল করে দেয়; তা হলো, যে শহরে আমরা প্রতিদিন বাস করছি, সেটি কতটা বাসযোগ্য?
১ দিন আগে
২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক রাজনীতির এক অস্থির প্রেক্ষাপটে তুরস্ক আজ ভূ-রাজনৈতিক দাবার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের কাছে আঙ্কারা এখন ‘নতুন ইরান’ হিসেবে চিহ্নিত, যা বিশ্বরাজনীতিতে নতুন এক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২ দিন আগে