মাহবুবুল আলম তারেক

বাংলাদেশ সরকার ১৮ এপ্রিল খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির নতুন মূল্য ঘোষণা করেছে। নতুন দাম ১৯ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন ঘোষণায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম হয়েছে ১১৫ টাকা, যা আগে ছিল ১০০ টাকা। পেট্রোলের দাম বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা, আগে ছিল ১১৬ টাকা। অকটেনের দাম এখন ১৪০ টাকা, যা আগে ছিল ১২০ টাকা। কেরোসিনের দাম বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা, আগে ছিল ১১২ টাকা। মোট বৃদ্ধি প্রায় ১০ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে।
এ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলার ও ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ১১৬ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, ভর্তুকির চাপ বহন করা আর সম্ভব হচ্ছিল না। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মুনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সকালের দাম বিকেলে বদলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশে স্থিতিশীল মূল্যব্যবস্থা ধরে রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না।
এর আগে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেছিল। মার্চ মাসেই এ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এপ্রিল মাসেও দাম না বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে দীর্ঘদিন ভর্তুকি বহন করায় সরকারের আর্থিক চাপ বেড়ে যায়। কর্মকর্তারা বলেছেন, এতে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। ফলে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি হবে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক পরিবার আগে থেকেই চাপে আছে। নতুন সিদ্ধান্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আরও ব্যয়বহুল হতে পারে। বিশেষ করে কম আয়ের মানুষ, দিনমজুর, শ্রমজীবী পরিবার এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী সতর্ক করে বলেছিলেন, সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বহু পরিবার সংগ্রাম করছে। নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের আরও বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে দেশে মূল্যস্ফীতি আরও ব্যাপকহারে বাড়তে পারে। কারণ জ্বালানি প্রায় সব খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পরিবহন, বিদ্যুৎ, কৃষি ও শিল্প—সবখানেই এর ব্যবহার রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. এম. মাসরুর রিয়াজ এই প্রভাবকে ‘ব্যাপকভিত্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে শ্রম ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং সেচ খরচ বাড়ে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি চাপ ফেলে।
অকটেনের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এটি মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী ও শহুরে মধ্যবিত্তের ওপর প্রভাব ফেলবে। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে। কারণ পরিবহন, কৃষি, সেচ এবং নিত্যপণ্য সরবরাহে ডিজেলের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ফলে খাদ্যদ্রব্যের দামও বাড়তে পারে।
ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস, ট্রাক ও পণ্য পরিবহনের খরচ দ্রুত বাড়বে। এর ফলে চাল, ডাল, সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে। বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষি খাতও এই সিদ্ধান্তে চাপে পড়বে। সেচ পাম্প, কৃষিযন্ত্র ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে কৃষকের লাভ কমে যেতে পারে।
শিল্প খাতেও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ পড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কারখানার উৎপাদন খরচও বাড়বে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেশি সমস্যায় পড়তে পারে।
কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধিও উদ্বেগজনক। গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর একটি অংশ এখনো রান্না ও আলো জ্বালাতে কেরোসিন ব্যবহার করে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় আরও বাড়বে।
তরল জ্বালানির পাশাপাশি এলপিজির দামও বাড়ানো হয়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো দাম বৃদ্ধি। ফলে এক মাসে মোট প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শহরের বহু পরিবার, ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। তাই তাদের ব্যয়ও দ্রুত বাড়বে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এই মূল্যবৃদ্ধিকে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক চাপ মোকাবিলার পদক্ষেপ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে দেশীয় বাজারে কিছু সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তবে শুধু দাম বাড়িয়ে সংকটের সমাধান হবে না। এর সঙ্গে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দরকার।’
তিনি আরও বলেন ‘ডিজেল ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যপণ্য, কৃষি উৎপাদন এবং শিল্প খরচ বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও আরও বাড়বে। এজন্য নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন হবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হলেও এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তাই জনগণকে বোঝানো, স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া এবং দ্রুত সহায়তা ঘোষণা করা জরুরি।’
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বড় চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। তাই দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির উচ্চ মূল্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ধীর করতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ পড়তে পারে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন সদ্য নির্বাচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার তাদের ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ গড়ার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে নতুন করে বড় চাপ তৈরি করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন একটি কঠিন ‘ত্রিমুখী অর্থনৈতিক সংকট’ বা ট্রিলেমার মুখে পড়েছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সেই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং আমদানি ব্যয় একযোগে বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে বছরে জাতীয় আমদানি বিল প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটি বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান।
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনজীবনের ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
ডলারের বিনিময় হার এখন জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। টাকার মান দ্রুত কমে প্রতি ডলার ১২২ থেকে ১২৪ টাকার বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে আমদানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংক খাতের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চাইলেও বাংলাদেশ ব্যাংক “ফরওয়ার্ড বুকিং” নিরুৎসাহিত করে হস্তক্ষেপ করেছে। ফরওয়ার্ড বুকিং হলো ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত একটি বৈধ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে মুদ্রার দর ওঠানামার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা নেওয়া যায়।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেছেন, বাজারকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না দিলে আমদানিকারকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
বৃহৎ আমদানি বিলের চাপের মধ্যে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণের এই ‘ট্রিলেমা’ ডলারভিত্তিক জিডিপিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্য দিন দিন আরও নাজুক হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা পিছিয়ে পড়বে। এ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার ১৮ এপ্রিল খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির নতুন মূল্য ঘোষণা করেছে। নতুন দাম ১৯ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন ঘোষণায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম হয়েছে ১১৫ টাকা, যা আগে ছিল ১০০ টাকা। পেট্রোলের দাম বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা, আগে ছিল ১১৬ টাকা। অকটেনের দাম এখন ১৪০ টাকা, যা আগে ছিল ১২০ টাকা। কেরোসিনের দাম বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা, আগে ছিল ১১২ টাকা। মোট বৃদ্ধি প্রায় ১০ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে।
এ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলার ও ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ১১৬ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, ভর্তুকির চাপ বহন করা আর সম্ভব হচ্ছিল না। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মুনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সকালের দাম বিকেলে বদলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশে স্থিতিশীল মূল্যব্যবস্থা ধরে রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না।
এর আগে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেছিল। মার্চ মাসেই এ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এপ্রিল মাসেও দাম না বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে দীর্ঘদিন ভর্তুকি বহন করায় সরকারের আর্থিক চাপ বেড়ে যায়। কর্মকর্তারা বলেছেন, এতে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। ফলে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি হবে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক পরিবার আগে থেকেই চাপে আছে। নতুন সিদ্ধান্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আরও ব্যয়বহুল হতে পারে। বিশেষ করে কম আয়ের মানুষ, দিনমজুর, শ্রমজীবী পরিবার এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী সতর্ক করে বলেছিলেন, সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বহু পরিবার সংগ্রাম করছে। নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের আরও বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে দেশে মূল্যস্ফীতি আরও ব্যাপকহারে বাড়তে পারে। কারণ জ্বালানি প্রায় সব খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পরিবহন, বিদ্যুৎ, কৃষি ও শিল্প—সবখানেই এর ব্যবহার রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. এম. মাসরুর রিয়াজ এই প্রভাবকে ‘ব্যাপকভিত্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে শ্রম ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং সেচ খরচ বাড়ে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি চাপ ফেলে।
অকটেনের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এটি মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী ও শহুরে মধ্যবিত্তের ওপর প্রভাব ফেলবে। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে। কারণ পরিবহন, কৃষি, সেচ এবং নিত্যপণ্য সরবরাহে ডিজেলের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ফলে খাদ্যদ্রব্যের দামও বাড়তে পারে।
ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস, ট্রাক ও পণ্য পরিবহনের খরচ দ্রুত বাড়বে। এর ফলে চাল, ডাল, সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে। বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষি খাতও এই সিদ্ধান্তে চাপে পড়বে। সেচ পাম্প, কৃষিযন্ত্র ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে কৃষকের লাভ কমে যেতে পারে।
শিল্প খাতেও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ পড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কারখানার উৎপাদন খরচও বাড়বে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেশি সমস্যায় পড়তে পারে।
কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধিও উদ্বেগজনক। গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর একটি অংশ এখনো রান্না ও আলো জ্বালাতে কেরোসিন ব্যবহার করে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় আরও বাড়বে।
তরল জ্বালানির পাশাপাশি এলপিজির দামও বাড়ানো হয়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো দাম বৃদ্ধি। ফলে এক মাসে মোট প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শহরের বহু পরিবার, ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। তাই তাদের ব্যয়ও দ্রুত বাড়বে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এই মূল্যবৃদ্ধিকে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক চাপ মোকাবিলার পদক্ষেপ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে দেশীয় বাজারে কিছু সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তবে শুধু দাম বাড়িয়ে সংকটের সমাধান হবে না। এর সঙ্গে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দরকার।’
তিনি আরও বলেন ‘ডিজেল ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যপণ্য, কৃষি উৎপাদন এবং শিল্প খরচ বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও আরও বাড়বে। এজন্য নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন হবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হলেও এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তাই জনগণকে বোঝানো, স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া এবং দ্রুত সহায়তা ঘোষণা করা জরুরি।’
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বড় চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। তাই দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির উচ্চ মূল্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ধীর করতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ পড়তে পারে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন সদ্য নির্বাচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার তাদের ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ গড়ার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে নতুন করে বড় চাপ তৈরি করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন একটি কঠিন ‘ত্রিমুখী অর্থনৈতিক সংকট’ বা ট্রিলেমার মুখে পড়েছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সেই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং আমদানি ব্যয় একযোগে বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে বছরে জাতীয় আমদানি বিল প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটি বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান।
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনজীবনের ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
ডলারের বিনিময় হার এখন জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। টাকার মান দ্রুত কমে প্রতি ডলার ১২২ থেকে ১২৪ টাকার বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে আমদানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংক খাতের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চাইলেও বাংলাদেশ ব্যাংক “ফরওয়ার্ড বুকিং” নিরুৎসাহিত করে হস্তক্ষেপ করেছে। ফরওয়ার্ড বুকিং হলো ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত একটি বৈধ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে মুদ্রার দর ওঠানামার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা নেওয়া যায়।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেছেন, বাজারকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না দিলে আমদানিকারকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
বৃহৎ আমদানি বিলের চাপের মধ্যে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণের এই ‘ট্রিলেমা’ ডলারভিত্তিক জিডিপিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্য দিন দিন আরও নাজুক হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা পিছিয়ে পড়বে। এ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।

এই অবস্থায় যুদ্ধ অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রস্তাব দিয়েছে। ইরান সেই প্রস্তাবের জবাব দেওয়ার জন্য এখনো সময় নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
‘লাতমিয়া’ শোকগাথাগুলো আশুরার আচারের সঙ্গে যুক্ত। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন ইবনে আলীর শাহাদাতের স্মরণে এই আচার পালন করা হয়।
১ দিন আগে
নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন কীভাবে ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে, তার দারুণ এক উদাহরণ হয়ে থাকবে সদ্য শেষ হওয়া আসামের বিধানসভা নির্বাচন। শুধু সমর্থনের ভিত্তিতে নয়, নতুন এই প্রক্রিয়া বিজেপির পক্ষে ভোট টানতে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে, যা আগে ছিল না।
৩ দিন আগে
একবিংশ শতাব্দীর রণক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে নিঃশব্দে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কোটি ডলারের ট্যাংক বা অত্যাধুনিক ফাইটার প্লেন এখন কয়েক হাজার ডলারের ড্রোনের কাছে অসহায়।
৩ দিন আগে