ধরিত্রী দিবস কী, কীভাবে শুরু, কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ৩৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

২২ এপ্রিল, বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং পৃথিবীকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে দিনটি পালন করা হয়। ২০২৬ সালে এসে ধরিত্রী দিবস নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা প্রতীকী দিন নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, সুপেয় পানির সংকট, মাটির অবক্ষয়, প্লাস্টিক দূষণ এবং খাদ্যনিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো যখন চরম উদ্বেগের কারণ, তখন এই দিবসটি বিশ্ববাসীর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

২০২৬ সালের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আওয়ার পাওয়ার, আওয়ার প্ল্যানেট’ বা ‘আমাদের শক্তি, আমাদের ধরিত্রী’। আপাতদৃষ্টিতে এটি সাধারণ একটি বার্তা মনে হলেও, এর গভীরে নিহিত রয়েছে পরিবেশ রক্ষার এক বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আহ্বান।

ধরিত্রী দিবস আসলে কী

ধরিত্রী দিবস হলো পরিবেশ সচেতনতা এবং সুরক্ষার জন্য নিবেদিত একটি বার্ষিক বৈশ্বিক আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, স্কুল-কলেজ, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিকেরা মিলে এই দিনটি পালন করে।

এটি শুধু উদ্‌যাপন বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি কর্মমুখী দিন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবেশগত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করা। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জীবনযাপনে উৎসাহিত করাই এই দিবসের লক্ষ্য।

কবে এবং কীভাবে শুরু হলো

ধরিত্রী দিবসের সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে, যখন দূষণ নিয়ে জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হচ্ছিল।

১৯৬০-এর দশকে শিল্পায়নের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে দৃশ্যমান পরিবেশগত ক্ষতি শুরু হয়। শহরগুলো ধোঁয়াশায় ঢেকে যায়, কলকারখানার বর্জ্যে নদী দূষিত হতে থাকে এবং কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই যত্রতত্র বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ১৯৬৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারায় ভয়াবহ তেল নিঃসরণের ঘটনা এবং ওহাইও নদীর দূষণ পুরো দেশের মানুষের চোখ খুলে দেয়।

এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের তৎকালীন সিনেটর গেলর্ড নেলসন পরিবেশ সংস্কারের জন্য জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তৎকালীন যুদ্ধবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দেশজুড়ে পরিবেশ নিয়ে একটি জাতীয় সমাবেশের প্রস্তাব দেন। এই প্রচারণার দায়িত্ব দেওয়া হয় ডেনিস হেইস নামের এক তরুণ অধিকারকর্মীকে।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো পালিত হয় ধরিত্রী দিবস। ওই দিন ২ কোটি মানুষ পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। এর পরপরই মার্কিন সরকার ‘এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি’ (ইপিএ) বা পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা গঠন করে।

আন্তর্জাতিক রূপ পেল যেভাবে

শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৯০ সালে ধরিত্রী দিবস বৈশ্বিক রূপ লাভ করে। ওই বছর বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে এই দিবসের প্রচারণা চালানো হয়। এরপর থেকে এটি পরিবেশ সচেতনতার একটি বিশ্বজনীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। কেবল স্থানীয় দূষণ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বনায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই কৃষির মতো বিষয়গুলোও এর আওতাভুক্ত হয়।

পরবর্তী দশকগুলোতে পরিবেশ রক্ষায় ধরিত্রী দিবস অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। যেমন—২০১৬ সালের ধরিত্রী দিবসেই ঐতিহাসিক ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে’ স্বাক্ষর করেছিল বিশ্বের ২০০টি দেশ।

দিবসটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জরুরি প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। পৃথিবী যে অনিরাপদ এবং বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, তা এখন স্পষ্টত লক্ষণীয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত দেশগুলোর জন্য দিবসটির গুরুত্ব অপরিসীম।

বিশেষ করে ২০২৬ সালে এসে নিম্নোক্ত কারণগুলোতে ধরিত্রী দিবস সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক:

জলবায়ু পরিবর্তন: বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে দাবদাহ, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা ও তীব্রতা বেড়েই চলেছে।

পানির সংকট: অতিরিক্ত ব্যবহার, দূষণ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

জীববৈচিত্র্য হ্রাস: আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ ও জলবায়ুর প্রভাবের কারণে বন্য প্রাণী এবং পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যাচ্ছে।

মাটির অবক্ষয়: ভূমিক্ষয়, পুষ্টির ঘাটতি এবং অপরিকল্পিত চাষাবাদের কারণে উর্বর মাটি হুমকির মুখে।

প্লাস্টিক দূষণ: প্লাস্টিক বর্জ্য আমাদের মাটি, নদী এবং মহাসাগরকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।

আমাদের করণীয়

ধরিত্রী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গ্রহের প্রতি আমাদের সবার দায়িত্ব রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত কীভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে, এটি তার একটি শিক্ষণীয় প্ল্যাটফর্ম।

বসবাসযোগ্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে হলে আগে নিজেকে সচেতন হতে হবে এবং অন্যকে সচেতন করতে হবে। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও জরুরি। যেমন—নিয়মিত হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু ব্যবহার করা বা বাইরে যাওয়ার আগে মাস্ক পরার মতো ছোট ছোট সচেতনতাও একটি সুস্থ পৃথিবীর জন্য সহায়ক হতে পারে।

প্রকৃতিকে রক্ষা করার এই লড়াই শুধু একা কারও নয়, এটি সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিনির্বিশেষে সবার সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।

সম্পর্কিত