জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কেন হঠাৎ ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে ছাড় দিল আমেরিকা?

লেখা:
লেখা:
তনভিয়া বড়ুয়া

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৯: ৪৪
এআই জেনারেটেড ছবি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা চালু রেখেছে, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর। কিন্তু সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার সাময়িকভাবে ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে ছাড় দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই সিদ্ধান্ত? এর পেছনে কী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব কাজ করছে?

এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া এক জটিল পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে এবং বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়নি যে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ আরও কমে যাক। তাই সাময়িকভাবে ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর জানিয়েছে, এই অনুমতি মাত্র ৩০ দিনের জন্য। অর্থাৎ এই পরিবর্তন স্থায়ী নয়, বর্তমান পরিস্থিতি সামলানোর জন্য নেওয়া একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত। এই ছাড় অনুযায়ী, যে রাশিয়ান তেল ইতোমধ্যে জাহাজে তোলা হয়েছে এবং মাঝ সমুদ্রে আটকে রয়েছে, সেগুলোই শুধু কেনা যাবে। ফলে এই লেনদেন থেকে রাশিয়ার বড় ধরনের আর্থিক লাভ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছে ওয়াশিংটন।

এই সিদ্ধান্ত বোঝার জন্য সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। সেখানে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে।

ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির আমদানি করা তেলের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যখন ওই অঞ্চলে সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়, তখন ভারতের সামনে বিকল্প উৎস খুঁজে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সেই বিকল্পগুলির মধ্যে অন্যতম হলো রাশিয়া।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার উপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই সময় থেকেই রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করতে শুরু করে। ভারত সেই সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ রাশিয়ান তেল আমদানি করে। কয়েক বছরের মধ্যেই রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী হয়ে ওঠে।

তবে এই বাণিজ্য নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যে অস্বস্তি ছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনে ভারত পরোক্ষভাবে মস্কোর যুদ্ধ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। সেই কারণেই একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্কও চাপায়।

এই চাপের ফলে গত কয়েক মাসে ভারত কিছুটা রাশিয়ান তেলের আমদানি কমিয়েছিল। কিন্তু নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই পরিস্থিতি আবার বদলে গিয়েছে। তেলের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বিশ্ববাজারে দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এতে শুধু ভারত নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনীতিতেও চাপ পড়বে।

এই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আপাতত এই পথ বেছে নিয়েছে। তারা বুঝেছে, যদি ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশ হঠাৎ করে রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ আরও কমে যাবে। ফলে দাম আরও বেড়ে যাবে এবং তা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ওয়াশিংটনের বক্তব্য, এই ছাড় মূলত আন্তর্জাতিক তেল বাজারকে স্থিতিশীল রাখার জন্য। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারাও তার প্রভাব অনুভব করবে। তাই এই সিদ্ধান্তকে তারা একটি স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ব্যবস্থা বলে ব্যাখ্যা করছে।

এই সিদ্ধান্তের আরেকটি কূটনৈতিক দিকও রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি খারাপ করার ঝুঁকি নিতে চায় না ওয়াশিংটন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলেছেন, ভারত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করেছে এবং তারা আশা করছে ভবিষ্যতে ভারত আরও বেশি মার্কিন তেলও কিনবে। অর্থাৎ এই সিদ্ধান্তের মধ্যে এক ধরনের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা রয়েছে।

অন্যদিকে, নয়া দিল্লির বক্তব্য, তারা কোনো দেশের অনুমতির উপর নির্ভর করে তেল কেনে না। ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি বর্তমান বিশ্বের জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি উদাহরণ। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার উপর চাপ বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে তারা আবার বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল হতে দিতেও চায় না। ফলে কখনও কখনও নীতির মধ্যে এক ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যায়।

ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের উপর। যদি সেই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়ে এবং তেলের সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। তখন রাশিয়ান তেলের গুরুত্ব আবারও বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে যদি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে এই সাময়িক ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবার আগের নিষেধাজ্ঞা নীতি কঠোরভাবে কার্যকর হতে পারে।

প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীতির মধ্যে সবসময়ই এক ধরনের সমঝোতা থাকে। রাশিয়াকে চাপ দেওয়া যেমন ওয়াশিংটনের লক্ষ্য, তেমনি বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখাও তাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই বাস্তব অবস্থাকেই তুলে ধরে।

সম্পর্কিত